আফগানিস্তানে নারীদের অধিকারের সীমানা সঙ্কুচিত হল আরও। এ বার বিশেষ শর্তে নারীদের বিরুদ্ধে গার্হস্থ্য হিংসাকে ‘বৈধ’ করল তালিবান সরকার। জানিয়ে দিল, এখন থেকে স্ত্রী এবং সন্তানদের শারীরিক ভাবে শাস্তি দিতে পারবেন আফগান পুরুষেরা। যত ক্ষণ না পর্যন্ত স্ত্রী বা সন্তানের হাড় ভাঙে বা শরীরে ক্ষতের সৃষ্টি হয়, তত ক্ষণ তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসাবে গণ্য হবে না।
আফগানিস্তান সরকারের জারি করা এই নয়া দণ্ডবিধিতে সম্প্রতি সিলমোহর দিয়েছেন তালিবদের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা হিবাতুল্লাহ আখুন্দজ়াদা। আখুন্দজ়াদার স্বাক্ষরিত দণ্ডবিধিটি একটি ভিন্ন ধরনের বর্ণব্যবস্থাও তৈরি করেছে, যা অপরাধী ‘স্বাধীন’ না ‘দাস’, তার উপর ভিত্তি করে বিভিন্ন স্তরের শাস্তির অনুমতি দেয়।
তালিবানের জারি করা ওই দণ্ডবিধিতে বলা হয়েছে, যদি কোনও আফগান স্বামী ‘জোরপূর্বক বল প্রয়োগ’ করার কারণে তাঁর স্ত্রীর হাড় ভাঙে বা শরীরে আঘাতের সৃষ্টি হয় এবং তা যদি বাইরে থেকে দেখা যায়, তা হলে অভিযুক্তের ১৫ দিনের কারাদণ্ড হতে পারে।
এ ছাড়াও পুরুষকে কেবল তখনই দোষী সাব্যস্ত করা হবে, যদি কোনও মহিলা আদালতে নির্যাতনের বিষয়টি সফল ভাবে প্রমাণ করতে পারেন। সে ক্ষেত্রে ওই মহিলাকে আদালতে যেতে হবে স্বামী বা পুরুষ সঙ্গীকে সঙ্গে নিয়েই। মনে করা হচ্ছে নির্যাতিতাকে বিচারকের কাছে শারীরিক ক্ষতও দেখাতে হবে সম্পূর্ণ রূপে আবৃত অবস্থায়।
অন্য দিকে, ওই একই নিয়ম বলছে, আফগানিস্তানের এক জন বিবাহিত মহিলা যদি স্বামীর অনুমতি ছাড়া তাঁর আত্মীয়দের সঙ্গে দেখা করতে যান, তা হলে তাঁকে তিন মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড দেওয়া হতে পারে।
নতুন ওই দণ্ডবিধির ৯ নম্বর ধারা অনুযায়ী, আফগান সমাজকে চারটি শ্রেণিতে বিভক্ত করা হয়েছে— ধর্মীয় পণ্ডিত (উলেমা), অভিজাত (আশরাফ), মধ্যবিত্ত এবং নিম্নবিত্ত। নয়া নিয়মে এখন থেকে একই অপরাধের শাস্তি আর অপরাধের প্রকৃতি বা গুরুত্ব দিয়ে নির্ধারিত হবে না। নির্ধারিত হবে অভিযুক্তের সামাজিক মর্যাদা দিয়ে।
অর্থাৎ, আফগান সমাজে এক জন অভিজাত এবং এক জন নিম্নবিত্ত একই অপরাধ করলেও শাস্তির প্রকৃতি এবং ধরন হবে আলাদা। একই অপরাধের জন্য অভিজাতকে অপেক্ষাকৃত লঘু দণ্ড দেওয়া হবে।
দণ্ডবিধি অনুযায়ী, যদি তালিবানের কোনও ধর্মীয় পণ্ডিত কোনও অপরাধ করেন, তবে তাঁকে কেবলমাত্র পরামর্শ দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হবে। একই অপরাধ যদি অভিজাত শ্রেণির কেউ করেন, তা হলে তাঁকে আদালতে সমন করা হবে। তবে তাঁকেও আদালতে পরামর্শ দিয়ে ছেড়়ে দেওয়া হবে।
সেই একই অপরাধে আফগান সমাজের মধ্য এবং নিম্নবিত্ত শ্রেণির শাস্তি আলাদা। মধ্যবিত্তকে ওই অপরাধের জন্য কারাদণ্ড ভোগ করতে হতে পারে। নিম্নবিত্ত শ্রেণির সাজা আরও কঠিন। ওই একই অপরাধের জন্য তাঁদের ভাগ্যে জুটতে পারে কারাদণ্ড এবং মারধর— উভয়ই।
নয়া দণ্ডবিধিতে গুরুতর অপরাধের জন্য অভিযুক্তদের শারীরিক ভাবে শাস্তি প্রয়োগ করার অধিকার দেওয়া হয়েছে ইসলামি ধর্মগুরুদের। সে ক্ষেত্রে আইনের সংশোধনমূলক সাজা প্রযোজ্য হবে না।
৯০ পৃষ্ঠার নতুন এই দণ্ডবিধি ২০০৯ সালে আফগানিস্তানে চালু হওয়া ‘এলিমিনেশন অফ ভায়োলেন্স এগেইনস্ট উওমেন (ইভিএডব্লিউ)’ বা নারীর বিরুদ্ধে হিংসা নির্মূল আইনও বাতিল করেছে। পূর্ববর্তী মার্কিন-সমর্থিত আফগান সরকার ইভিএডব্লিউ চালু করেছিল।
নয়া দণ্ডবিধির বিরুদ্ধে যাতে মানুষ অসন্তোষ না প্রকাশ করতে পারেন, তারও ব্যবস্থা আগেভাগে সেরে রেখেছে তালিবান সরকার। নতুন নিয়মে বলা হয়েছে, চালু করা এই দণ্ডবিধি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা করাও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ফলে আফগান সমাজের মানুষেরা নাম প্রকাশ না করার শর্তেও বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে ভয় পাচ্ছেন বলে উঠে এসেছে সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট’-এর প্রতিবেদনে।
নির্বাসনে কর্মরত আফগান মানবাধিকার সংস্থা ‘রাওয়াদারি’ এক বিবৃতিতে রাষ্ট্রপুঞ্জ এবং অন্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলিকে আফগানিস্তানের তালিবান সরকারের ‘ফৌজদারি কার্যবিধি বাস্তবায়ন অবিলম্বে বন্ধ’ করার এবং এটিকে বাস্তবে পরিণত হওয়া রোধ করার জন্য সব রকম চেষ্টা চালানোর আহ্বান জানিয়েছে।
নারী এবং বালিকাদের বিরুদ্ধে হিংসার বিষয়ে রাষ্ট্রপুঞ্জের বিশেষ দূত রিম আলসালেম বিষয়টি প্রসঙ্গে সমাজমাধ্যম এক্স-এ লিখেছেন, ‘‘নারী এবং বালিকাদের জন্য এই সর্বশেষ আইনের প্রভাব ভয়াবহ। কারণ, তালিবান বুঝতে পেরেছে যে কেউ তাদের থামাতে পারবে না। আন্তর্জাতিক মহল কি তাদের ভুল প্রমাণ করবে? আর যদি এখন না করে তা হলে আর কখন করবে?’’
২০২১ সালে আফগানিস্তান থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করেছিল আমেরিকা। এর পরই হিন্দুকুশের কোলের দেশটিতে দ্বিতীয় বারের জন্য ক্ষমতায় ফেরে তালিবান। কুর্সিতে বসেই শরিয়া আইন চালু করে তারা। আফগানিস্তানে দ্বিতীয় বারের জন্য তালিবেরা সরকার গড়ার পর থেকেই সে দেশে নারীদের অধিকার তলানিতে গিয়েছে।
রাজদণ্ড হাতে পাওয়া ইস্তক নারীশিক্ষার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন তালিবান নেতৃত্ব। আফগানিস্তানে পুনরায় ক্ষমতা দখলের ন’মাসের মাথায়, ২০২২ সালের মার্চে আচমকা মেয়েদের হাই স্কুল এবং কলেজে যাওয়ার উপরে নিষেধাজ্ঞা চাপিয়েছিল তালিবান। আমেরিকা-সহ বিশ্বের বেশির ভাগ দেশই তার প্রতিবাদ জানিয়েছিল।
তবে তালিবান সরকার সে সময় জানিয়েছিলেন, তাঁদের সরকার মোটেও নারীশিক্ষার বিরোধী নয়। কিন্তু পোশাকবিধি-সহ বেশ কিছু দিকে নজর দেওয়ার উদ্দেশ্যে কয়েক মাস মেয়েদের পঠনপাঠন বন্ধ রাখা হয়েছিল। তার পর থেকে কার্যত মধ্য ও উচ্চশিক্ষার দরজা খোলেনি মেয়েদের সামনে।
এ ছাড়়াও মহিলাদের জোরে কথা বলার উপরেও নিষেধাজ্ঞা চাপিয়েছে তালিবান সরকার। আফগানিস্তানের মহিলারা জনসমক্ষে বা বাড়ির ভিতরে জোরে কথা বলতে পারবেন না বলে নিয়ম চালু করা হয়েছে। নারীদের প্রকাশ্যে কথা বলাও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আফগানিস্তানে যে গুটি কয়েক মহিলা বাড়ির বাইরে গিয়ে কাজ করার অনুমতি পান, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন স্বাস্থ্যকর্মীরা।
পাশাপাশি, তালিবদের জারি করা নিয়ম অনুযায়ী, আফগান মহিলাদের সব সময় সারা শরীর ঢেকে রাখতে হবে। ছাড় পাবে না মুখমণ্ডলও। অপরিচিত পুরুষদের দিকে তাকানোর ক্ষেত্রেও নারীদের উপর নিষেধাজ্ঞা চাপানো হয়েছে।
তালিবান সরকারের কড়া নির্দেশ রয়েছে, মহিলারা যে পোশাক পরবেন তা যেন কোনও ভাবেই পাতলা না হয়। পোশাক হবে না ছোট বা আঁটোসাঁটো। গাড়িচালকদেরও নির্দেশ দেওয়া হয়, হিজাববিহীন বা সঙ্গে পুরুষ নেই এমন মহিলাদের যেন কোনও ভাবেই ট্যাক্সিতে না চাপানো হয়। গাড়িতে গান বাজানো এবং পুরুষদের সঙ্গে মহিলাদের মেলামেশাতেও জারি রয়েছে নিষেধাজ্ঞা।
যে মহিলারা নিয়ম অমান্য করবেন, তাঁদের গ্রেফতার করে জেলে পাঠানো হবে বলেও কড়া নির্দেশ আছে তালিবান সরকারের। পাশাপাশি, মেয়েদের ক্রিকেট খেলা বা জনসমক্ষে আসার উপরেও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেন তাঁরা। গত চার বছরে এর বিরুদ্ধে আফগান মেয়েদের একাধিক বার প্রকাশ্যে প্রতিবাদ জানাতেও দেখা গিয়েছে।
যে যাই বলুক না কেন, তালিবান যে নারী স্বাধীনতার পক্ষে নয়, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। রিপোর্ট বলছে, আফগানিস্তানে মেয়েরা এখন শুধু প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পায়। সেখানেও শিক্ষার্থীর সংখ্যা দ্রুত কমছে! এর ফলে শিশুশ্রম ও বাল্যবিবাহ বেড়ে যেতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছিল ইউনেস্কো। তার মধ্যেই আবার আফগান মহিলাদের উপর গার্হস্থ্য হিংসাকে ‘বৈধ’ করে নয়া দণ্ডবিধি চালু করল তালিবান।