শহুরে এলাকা। মাথা তুলে দাঁড়িয়ে রয়েছে অগণিত বহুতল। তার মধ্যেই একটি বহুতলের ভাঙা ছাদের উপর ধুন্ধুমার হলিউডের দুই জনপ্রিয় অভিনেতা টম ক্রুজ় এবং ব্র্যাড পিটের। মাঝেমধ্যে সংলাপ বিনিময়ও চলছে। দেখে মনে হচ্ছে কোনও মারকাটারি অ্যাকশন ছবির দৃশ্য।
সপ্তাহখানেক আগে সমাজমাধ্যমে ভাইরাল মাত্র ১৫ সেকেন্ডের সেই ক্লিপই এখন তীব্র ক্ষোভ এবং ব্যাপক আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে আমেরিকার স্বপ্ননগরী হলিউডে। কিন্তু কেন? কারণ, যে ভিডিয়োটি প্রকাশ্যে এসেছে, তা কোনও ছবির দৃশ্য নয়।
এ রকম কোনও দৃশ্যে একসঙ্গে অভিনয়ই করেননি টম এবং ব্র্যাড। পুরো ভিডিয়োটিই কৃত্রিম মেধা বা এআইয়ের কারসাজি। কৃত্রিম মেধার সাহায্যে তৈরি করা হয়েছে সেটি। কিন্তু খুব ভাল করে দেখেও অনেক রথী-মহারথী ধরতে পারবেন না যে, সেটি এআই দিয়ে বানানো।
বহুলপ্রচারিত এই ভিডিয়োটি তৈরি করেছেন আইরিশ পরিচালক রুইরি রবিনসন। আর সেটি তৈরি করতে ব্যবহার করেছেন ‘সিড্যান্স ২.০’। ‘সিড্যান্স ২.০’ হল একটি কৃত্রিম মেধা বা এআইয়ের ভিডিয়ো ‘জেনারেশন টুল’, যা টিকটকের মূল সংস্থা তথা চিনা প্রযুক্তি সংস্থা বাইটড্যান্সের মালিকানাধীন।
‘সিড্যান্স ২.০’-তে দু’টি বাক্যের সঠিক ‘প্রম্পট’ এবং একটি ক্লিকের মাধ্যমে রুইরি যে ভিডিয়ো তৈরি করেছেন, তা বাস্তবকেও হার মানাচ্ছে। ভিডিয়োটি এতটাই নিপুণ ভাবে বানানো হয়েছে যে, কোনও ভাবেই তার কারচুপি ধরা সম্ভব নয়।
সিড্যান্সের এই অত্যাশ্চর্য বাস্তবসম্মত ফলাফল ইতিপূর্বে তৈরি হওয়া যে কোনও কৃত্রিম মেধা ভিডিয়োর তুলনায় অনেক উন্নত। অর্থাৎ, ‘এআই স্লপ’ ভিডিয়ো তৈরির ক্ষেত্রে যুগান্তকারী পদক্ষেপ করে ফেলেছে বাইটড্যান্স।
তবে সেই ভিডিয়োই বিতর্ক এবং ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে হলিউডের অন্দরে। চিনা প্রযুক্তি এ ভাবে আমেরিকা তথা যে কোনও দেশের চলচ্চিত্র দুনিয়াকে চিরতরে বদলে দিতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞেরা।
অনেকে আবার দাবি করেছেন, ‘সিড্যান্স ২.০’ হল হলিউডকে ধ্বংস করে আমেরিকার অর্থনীতিতে আঘাত হানার চিনা প্রচেষ্টা। এআই টুলটি থাকলে পরিচালক, অভিনেতা এবং অভিনেত্রীদের কোনও প্রয়োজনই পড়বে না। এআইয়ের সাহায্যে এ ভাবেই ভিডিয়ো বানিয়ে পূর্ণদৈর্ঘ্যের ছবি তৈরি করে ফেলতে পারবেন যে কেউ।
অন্য দিকে, সিড্যান্সের সর্বশেষ প্রযুক্তি দেখে বিস্মিত হলিউডের সঙ্গে যুক্ত অনেকেই। এ প্রসঙ্গে বিখ্যাত হলিউড ছবি ‘ডেডপুল’ ছবির চিত্রনাট্যকার রেট রিস এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, টম-ব্র্যাডের ভিডিয়োটি তাঁর মেরুদণ্ডে ‘ঠান্ডা স্রোত’ বইয়ে দিয়েছে। ভয়ে কেঁপে উঠেছেন তিনি। একই মত হলিউডের সঙ্গে জড়িত আরও অনেকের। তা নিয়ে ইতিমধ্যেই তোলপাড় শুরু হয়েছে হলিউডের অন্দরে।
জনপ্রিয় অ্যানিমেটেড সিরিজ় ‘রিক অ্যান্ড মর্টি’র নির্বাহী প্রযোজক এবং লেখক হিদার অ্যান ক্যাম্পবেল জানিয়েছেন, গত সপ্তাহে তাঁর সমাজমাধ্যম অ্যাকাউন্টগুলি ওই ধরনের ভিডিয়োয় ভরে গিয়েছিল। বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগও প্রকাশ করেন তিনি। অনেকে আবার পুরো বিষয়টির নিন্দা করেও সরব হয়েছেন।
কয়েক মাস আগেই সিড্যান্স চালু করে বাইটড্যান্স। তবে বাজারে খুব একটি হইচই ফেলতে পারেনি চিনা এআই ভিডিয়ো জেনারেশন টুলটি। এর পর গত সপ্তাহে আত্মপ্রকাশ করে ‘সিড্যান্স ২.০’, যা সিড্যান্সের আধুনিক সংস্করণ।
বাইটড্যান্সের তরফে একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে ‘সিড্যান্স ২.০’-এর দরাজ প্রশংসা করা হয়। আপডেট করা টুলের ‘নির্ভুল, বাস্তবসম্মত ভিডিয়ো বানানোর দক্ষতা এবং নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা’রও সুনাম করা হয়। এ-ও বলা হয়েছে যে, পেশাদার এবং সৃজনশীল মানুষেরা বিশেষ উপকৃত হবেন ওই এআই টুল ব্যবহার করলে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, প্রক্রিয়াটি এতটাই স্বাভাবিক এবং দক্ষতার সঙ্গে করা হয় যে ব্যবহারকারীরা এক জন সত্যিকারের পরিচালকের মতো ভিডিয়ো বানাতে পারবেন। এর পরেই ওই টুলে ভিডিয়ো বানাতে ভিড় জমান অনেক ব্যবহারকারী।
তাঁদের মধ্যেই ছিলেন আইরিশ পরিচালক রবিনসন। টম এবং ব্র্যাডের একাধিক এআই-সৃষ্ট ভিডিয়ো তৈরি করে সেগুলি সমাজমাধ্যমে পোস্ট করেন তিনি। এর পরেই হইচই পড়ে। নড়েচড়ে বলে হলিউডও।
বাইটড্যান্সকে তাৎক্ষণাৎ তাদের কার্যকলাপ বন্ধ করার কথা বলেন মোশন পিকচার অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান এবং প্রধান এগজ়িকিউটিভ চার্লস রিভকিন। সিড্যান্স ২.০-এর বিরুদ্ধে অনুমোদন ছাড়া কপিরাইটযুক্ত কাজ ব্যবহারের অভিযোগও তোলা হয়।
সেই অভিযোগের ভিত্তিতে প্রথমে বাইটড্যান্সের তরফে কোনও মন্তব্য করা হয়নি। অন্য দিকে হলিউডের অভিনেতা এবং শিল্পীদের প্রতিনিধিত্বকারী সংস্থার ন্যাশনাল এগজ়িকিউটিভ ডিরেক্টর তথা চিফ নেগোশিয়েটর ডানকান ক্র্যাবট্রি-আয়ারল্যান্ড স্পষ্ট করেন, অভিনেতা, শিল্পী এবং তাঁদের নিয়ে কাজের ডিজিটাল প্রতিলিপি সম্পর্কে নির্দিষ্ট এবং প্রয়োগযোগ্য নিয়ম রয়েছে।
ডানকান এ-ও দাবি করেন, টম-ব্র্যাডের এআই ভিডিয়ো তৈরির জন্য তাঁদের অনুমতির প্রয়োজন। কারও সুনির্দিষ্ট সম্মতি ছাড়া কেউ তাঁদের নিয়ে কোনও রকম ভিডিয়ো তৈরি করতে পারেন না।
এর পরেই মুখ খুলেছে বাইটড্যান্স। চিনা প্রযুক্তি সংস্থাটি জানিয়েছে, ভিডিয়ো বানানোর এআই টুলটি নিয়ে ‘সুরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করার’ জন্য পদক্ষেপ করছে তারা। সিড্যান্স ২.০ নিয়ে উদ্বেগ স্বীকার করে সংস্থাটি বলেছে, মেধাস্বত্ব (ইনটেলেকচুয়াল প্রপার্টি)-এর অধিকারকে ‘সম্মান’ করে তারা। এআই ভিডিয়ো জেনারেশন টুলটি আপাতত চিনে সীমিত পরীক্ষামূলক সংস্করণ হিসাবে উপলব্ধ বলেও জানানো হয়েছে।
অন্য দিকে, সিড্যান্স ২.০-কে ‘সবচেয়ে উন্নত’ এআই ভিডিয়ো জেনারেশন মডেল হিসাবে দাবি করেছে সুইৎজ়ারল্যান্ডের নামী পরামর্শদাতা সংস্থা ‘সিটিওএল ডিজিটাল সলিউশনস’। ব্যবহারিক পরীক্ষায় চিনা এআই টুলটি ওপেনএআই, সোরা২ এবং গুগ্লের ভিয়ো ৩.১-কে ছাড়িয়ে গিয়েছে বলেও সুইস সংস্থাটির তরফে মন্তব্য করা হয়েছে।