Current state of writer’s building

১৩ বছর পর ‘রাজপাট’ ফিরছে মহাকরণে, অবহেলার ধুলো সরিয়ে জৌলুস ফিরছে লালবাড়ির! কতটা প্রস্তুত ‘বৃদ্ধ’ রাইটার্স বিল্ডিং?

ভোট-প্রচারে বিজেপি জানিয়েছিল, ভোটে জিতলে মহাকরণই হবে রাজ্যের মূল প্রশাসনিক ভবন। ৪মে, সোমবার ফলাফল ঘোষণার পর মঙ্গলবারই মহাকরণ মেরামতের জোর প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়। নতুন সরকার রাইটার্স থেকে কাজ করবে, এ কথা জানার পরেই পূর্ত দফতর তড়িঘড়ি মূল ব্লকের মেরামতি ও পুনরুজ্জীবন শুরু করে।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ১১ মে ২০২৬ ০৮:০১
Share:
০১ ১৭

হারানো গরিমা ফিরে পাচ্ছে মহাকরণ। এ রাজ্যের মুখ্য প্রশাসনিক ভবনের তকমা আবার ফিরে পাচ্ছে রাইটার্স বিল্ডিং। নবান্নের পাট চুকিয়ে প্রায় দেড় দশক পর আবার লালদিঘির উল্টো দিকের লালবাড়িতে তৎপরতা চোখে পড়ার মতো। রাজনৈতিক পালাবদলের পরে জৌলুস ফিরছে রাইটার্স বিল্ডিংয়ের। কারণ ব্রিটিশ আমলের এই হেরিটেজ ভবনেই বসবেন বাংলার নবম মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।

০২ ১৭

২০১৩ সালে মহাকরণ ছেড়ে গঙ্গাপারের নবান্নে ‘রাজপাট’ বসিয়েছিলেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ছেড়ে যাওয়ার আগে কথা ছিল, মাস পাঁচেকের মধ্যে মহাকরণে ফিরবেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর সরকার। সেই প্রতিশ্রুতি রাখেননি সাবেক মুখ্যমন্ত্রী। ফলাও করে ব্রিটিশ আমলের হেরিটেজ ভবন সংরক্ষণ ও পুনরুজ্জীবনের কাজের কথা জানিয়েছিল তৃণমূল সরকার।

Advertisement
০৩ ১৭

গত ১৩ বছরে সেই কাজ শেষ হয়নি। গত কয়েক বছর ওই বাড়ি খাঁ-খাঁ করত। হেরিটেজ ভবনটি সংস্কারের জন্য ছেড়ে দেওয়া হলেও সেই কাজ এই ক’বছরে এগিয়েছে শম্বুকগতিতেই। গত কয়েক বছর ধরেই চলছে সংস্কারের কাজ। বহিরঙ্গ ও অন্দরমহলে সারাইয়ে হাত পড়লেও কাজ সে ভাবে এগোয়নি। বেশির ভাগ অংশে এখনও ভাঙাচোরা দশা।

০৪ ১৭

২০১৩ সালের অক্টোবরে শুরু হয় মহাকরণের সংস্কার পর্ব। মুখ্যমন্ত্রীর কার্যালয়-সহ সব দফতর স্থানান্তরিত হয় হাওড়ার ‘নবান্ন’ ভবনে। স্থানান্তরের আগে পর্যন্ত এই ভবনে রাজ্য সরকারের ৩৪টি দফতর ছিল। সব মিলিয়ে কর্মরত ছিলেন প্রায় ছ’হাজার কর্মী। তাঁরা স্থানান্তরিত হন নতুন কার্যালয় নবান্নে।

০৫ ১৭

মহাকরণ সূত্রে খবর, বর্তমানে পুর ও নগরোন্নয়ন দফতর, আইন-সহ কয়েকটি ছোট দফতর থাকলেও তেমন ব্যস্ততা ছিল না। পাহারায় থাকা পুলিশকর্মীদেরও তেমন ব্যস্ত থাকতে দেখা যায়নি এত দিন। এ ছাড়া বেশ কিছু দফতরের আধিকারিক ও কর্মীদের নিত্য হাজিরা দিতে হত এখানেই। মহাকরণের সেই ঢিলেঢালা চেহারা এখন উধাও। ৮ মে-এর পর থেকে রাতারাতি ভোল বদলাতে শুরু করেছে লাল ইটের বাড়িটি। প্রশাসনিক সদর যে বদলে গিয়েছে!

০৬ ১৭

ভোট-প্রচারে বিজেপি জানিয়েছিল, ভোটে জিতলে মহাকরণই হবে রাজ্যের মূল প্রশাসনিক ভবন। ৪ মে, সোমবার ফলাফল ঘোষণার পর মঙ্গলবার মহাকরণ মেরামতের জোর প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়। নতুন সরকার রাইটার্স থেকে কাজ করবে, এ কথা জানার পরেই পূর্ত দফতর তড়িঘড়ি মূল ব্লকের মেরামতি ও পুনরুজ্জীবন শুরু করে। আনাগোনা বাড়ে বিভিন্ন দফতরের কর্মীদের। আবার পা পড়ে সাংবাদিকদের। সবমিলিয়ে সেই ঝিমিয়ে পড়া ভাব উধাও এক লহমায়।

০৭ ১৭

৯ মে বিজেপি সরকার শপথগ্রহণের আগেই কমলা আলোয় সেজে উঠেছিল শতাব্দীপ্রাচীন এই ভবনটি। তার গায়ে পড়েছে রঙের পোঁচও। মহাকরণের ভিতরের চত্বরে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়-সহ বিজেপি নেতৃত্বের ছবি দেওয়া সুবিশাল ফ্লেক্স জানান দিচ্ছে সেই তৎপরতাকেই। সরেছে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর নামের ফলক। যদিও জ্যোতি বসু, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য বা মমতা যে ঘরে বসে রাজ্য চালাতেন সেই ঘরে বসবেন না শুভেন্দু। দোতলার মুখ্যমন্ত্রীর ঘরের ঠিক উপরে একটি ঘর সাজানো হচ্ছে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীর জন্য।

০৮ ১৭

সংশ্লিষ্ট সূত্রের খবর, পূর্ত দফতরের একটি শাখা (যাদের অধীনে মহাকরণ) ভবনের একটি ব্লকে স্থানান্তরিত হয়েছে বিদ্যুৎ ও নির্মাণের কাজের পরিকল্পনা এবং তা কার্যকর করার জন্য। মহাকরণের দ্বিতীয় তলে একটা সময় সার দিয়ে বসতেন মুখ্যমন্ত্রী, মুখ্যসচিব, স্বরাষ্ট্রসচিব, অর্থসচিব-সহ গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীরা। তৃতীয় তলেও সার দেওয়া ঘরের এক একটিতে ছিল এক এক জন মন্ত্রীর দফতর। গোটা মহাকরণকে রাতারাতি বদলে ফেলা সম্ভব নয়।

০৯ ১৭

রাজ্য প্রশাসনের মুখ্য দফতরের কৌলীন্য হারানোর পর সেই ব্যস্ততা আর চোখে পড়ত না শেষ ১৩ বছর। উধাও হয়ে যায় মহাকরণের গমগমে ভাব। একতলা, দোতলার সারি সারি ঘরগুলি ছিল তালাবন্ধ। খাঁ-খাঁ করত করিডর, বারান্দাগুলি। মহাকরণ সংস্কারের মূল দায়িত্ব রাজ্যের পূর্ত দফতরের। সেই স্বার্থে লালবাড়ির মাঝের বেশ কি‌ছু অংশ পুরোপুরি ভেঙে দেওয়া হয়েছে।

১০ ১৭

সংস্কারের কাজে হাত দেওয়ার পর বিশেষজ্ঞেরা জানিয়েছিলেন, ইট-সুরকির কাঠামোর পরীক্ষা-নিরীক্ষাতেই অনেকটা সময় লেগেছে। তাঁদের কথায়, প্রায় ২৫০ বছরের পুরনো ওই ভবন যে ভিতরে ভিতরে এত জীর্ণ হয়েছে তা খালি চোখে ধরা পড়েনি। তাই খুব সাবধানে দেওয়ালের পলেস্তারা খসিয়ে সংস্কারের কাজ এগোচ্ছে।

১১ ১৭

মেঝের পুরনো নকশাদার টালি চটিয়ে নতুন করে ঢালাইয়ের কাজ চলছে প্রতিটি তলায়। ভিন্‌রাজ্য থেকে টালিগুলি নতুন করে আনানোর বিপুল খরচ। তাই মেঝের সমস্ত টালি চটিয়ে হালফ্যাশনের টালি বসানোর কাজ চলছিল। মূল ব্লকের তিনটি তলার সেই কাজ বেশ কিছুটা হলেও এগিয়েছে। ক্রিমরঙা টালিতে সেজে উঠছে টানা বারান্দার মেঝে। মন্ত্রীদের ঘরগুলিতে বসেছে কাঠের নতুন দরজাও।

১২ ১৭

স্বাধীনতার পর বিধানচন্দ্র রায়ের আমল থেকে মহাকরণের মাঝখানের ফাঁকা জায়গায় তৈরি হয়েছে নতুন আরও চারটি ভবন। ওই চারটি ভবন ভেঙে ফেলার কথা বলা হয়েছে। তার বদলে পিছনের ব্লকগুলিকে আরও চওড়া করে মহাকরণকে একটি সার্বিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে তৃণমূলের আমলে। সেই ফাঁকা অংশে একতলা ভবন তৈরি করে তা জুড়ে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে মেন ব্লক এবং পিছনের ব্লকের সঙ্গে।

১৩ ১৭

ওই ভবনগুলিতে পার্কিং, ভিআইপি-লাউঞ্জ, ক্যান্টিন, রেস্তরাঁ ইত্যাদি রাখার প্রস্তাব রয়েছে। উপরের ছাদে তৈরি হবে বাগান। একটি অংশে একটি জাদুঘর তৈরির প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। মহাকরণের একতলার ক্যান্টিনগুলি অবশ্য এখনও চলছে বহাল তবিয়তে। সকাল থেকেই অল্প অল্প ভিড় জমে খাবার জায়গাগুলিতে।

১৪ ১৭

মহাকরণের প্রাচীন লিফ্‌টগুলি এই সে দিনও ছিল দিব্যি কর্মক্ষম। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য মহাকরণে এসে লিফ্‌টে করে উঠে পড়তেন উপরে এবং করিডর দিয়ে হেঁটে ঢুকতেন নিজের ঘরে। মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে কার্যভার নেওয়ার পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ওঠানামার জন্য সিঁড়ি ও লিফ্‌ট দুই-ই ব্যবহার করতেন। ইতিমধ্যেই ভিআইপি লিফ্‌টটিকে (মুখ্যমন্ত্রী যেটি ব্যবহার করেন) সরিয়ে স্বয়ংক্রিয় আধুনিক লিফ্‌ট জায়গা করে নিয়েছে। ধীরে ধীরে বাকি লিফ‌টিটও বদলে ফেলা হবে বলে জানা গিয়েছে।

১৫ ১৭

সূত্রের দাবি, ইতিমধ্যেই পূর্তকর্তা এবং ইঞ্জিনিয়ারদের দল পরিদর্শন করেছেন মূল এলাকাগুলি। দ্বিতীয় তলে মুখ্যমন্ত্রী, মুখ্যসচিব, স্বরাষ্ট্রসচিব বা অন্যদের ঘরগুলির (আগে যে যেখানে বসতেন) প্রাথমিক মেরামতি হয়েছে। এখন বাকি অন্য কাজকর্ম। বিদ্যুতের লাইন টানার পৃথক ব্যবস্থা করা হয়েছে ইতিমধ্যে। মনে করা হচ্ছে, শীঘ্রই যুদ্ধকালীন তৎপরতায় সেই কাজ শুরু হবে। একই সঙ্গে, সেখানে জোর দেওয়া হয়েছে নিরাপত্তার উপরেও।

১৬ ১৭

প্রায় ১০ বছর আগে ২০১৫ সালে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্যবিদ্যার বিশেষজ্ঞদের নিয়ে তৈরি কমিটি রিপোর্ট দিয়েছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারকে। সেই রিপোর্ট খতিয়ে দেখে সরকার একটি অভিজ্ঞ সংস্থাকে বাছাই করে। তার পর মহাকরণ সংস্কারের ‘আসল কাজ’ শুরু হয়। সেই কাজ শেষ হতে বছর দুয়েক লাগবে, এমনটাই মনে করা হয়েছিল।

১৭ ১৭

প্রায় দশক পার করেও ‘আসল কাজের’ চার ভাগের এক ভাগও শেষ করতে পারেনি ভারপ্রাপ্ত সংস্থা। এমন অভিযোগ মহাকরণের অন্দরেই। নতুন সরকার এসে রাজ্য প্রশাসনের সদর দফতরের সংস্কার কবে কত দ্রুত শেষ করতে পারে সেটাই এখন দেখার

ছবি: পিটিআই, অমিত দত্ত, বিশ্বরূপ দত্ত, বিশ্বনাথ বণিক ও সংগৃহীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement