হান্টাভাইরাস নিয়ে উদ্বেগ ক্রমশ বাড়ছে সারা পৃথিবীতে। আর্জেন্তিনা থেকে আটলান্টিক মহাসাগরে ভেসে কেপ ভার্দে যাচ্ছিল এমভি হন্ডিয়াস নামের একটি প্রমোদতরী। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) জানিয়েছে, ওই জাহাজে আট জন হান্টাভাইরাসে সংক্রামিতকে শনাক্ত করা গিয়েছে। তাঁদের মধ্যে তিন জনের মৃত্যু হয়েছে।
জাহাজে সওয়ার পাঁচ জনের সংক্রমণ নিয়ে নিশ্চিত রিপোর্ট দিয়েছে গবেষণাগার। তিন জনের নিশ্চিত রিপোর্ট মেলেনি। ৬ এপ্রিল ওই জাহাজে প্রথম সংক্রামিতের খোঁজ মেলে। ১১ এপ্রিল তাঁর মৃত্যু হয়। পরে ওই ব্যক্তির স্ত্রীও আক্রান্ত হন। সেন্ট হেলেনায় তিনি জাহাজ থেকে নেমে যান। উড়ান যাত্রার পরে তাঁর অবস্থার অবনতি হয়। ২৫ এপ্রিল দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গে তাঁর মৃত্যু হয়।
এমভি হন্ডিয়াস নামের ওই প্রমোদতরীতে দু’জন ভারতীয় নাগরিকও ছিলেন। জানা গিয়েছে, ওই ভাইরাসে তাঁরাও আক্রান্ত হয়েছেন। যদিও রবিবার স্পেনে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাস জানিয়েছে, এমভি হন্ডিয়াস জাহাজে থাকা ভাইরাসে আক্রান্ত দুই ভারতীয় নাগরিক উপসর্গহীন এবং সুস্থ রয়েছেন।
দূতাবাস একটি বিবৃতিতে জানিয়েছে, ওই জাহাজে ক্রু হিসাবে কর্মরত দুই ভারতীয় নাগরিককে নেদারল্যান্ডসে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষা বিধি অনুযায়ী তাঁদের নিভৃতবাসে রাখা হয়েছে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, “স্প্যানিশ কর্তৃপক্ষ এবং ওই দুই ভারতীয় নাগরিকের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। ভারতীয় নাগরিকদের সুস্থতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করাও হচ্ছে।”
ফ্রান্সও জানিয়েছে, ওই জাহাজে পাঁচ জন ফরাসি যাত্রীর মধ্যে এক জন হান্টাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। রবিবার তাঁর উপসর্গ দেখা গিয়েছে। ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নু এক্স হ্যান্ডলে জানান, পাঁচ জনের মধ্যে এক জনের উপসৰ্গ দেখা গিয়েছে। এই পাঁচ জন যাত্রীকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত অবিলম্বে নিভৃতবাসে রাখা হয়েছে।
১২টি দেশকে সতর্ক করেছে হু। যে জাহাজে এই সংক্রমণ হয়েছে, তার যাত্রীরা আতঙ্কিত হয়ে গন্তব্যে পৌঁছোনোর আগেই নেমে গিয়েছেন। তাঁদের মাধ্যমে ভাইরাস ছড়ানোর আশঙ্কা রয়েছে বলে আমেরিকা, কানাডা, ডেনমার্ক, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, নিউ জ়িল্যান্ড, সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিস, সিঙ্গাপুর, সুইডেন, সুইৎজ়ারল্যান্ড, তুরস্ক, ব্রিটেনকে সতর্ক করা হয়েছে।
ফলে স্বাভাবিক ভাবেই হান্টাভাইরাস নিয়ে আশঙ্কা এবং উদ্বেগ— উভয়ই বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু কী এই হান্টাভাইরাস? কী ভাবে ছড়ায়? উপসর্গ কী? নামকরণই বা কী ভাবে? হান্টাভাইরাস হল এমন একটি ভাইরাস গোষ্ঠী যা প্রধানত ইঁদুর জাতীয় প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে ছড়ায়। শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করলে বা সংক্রামিত ইঁদুরের বর্জ্যের সংস্পর্শে এলে এটি গুরুতর অসুস্থতার কারণ হয়ে উঠতে পারে।
‘হান্টাভাইরাস’ শব্দটি একটি নির্দিষ্ট স্থানের সঙ্গে যুক্ত, যা এর উৎসকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে। বিরল কিন্তু সম্ভাব্য বিপজ্জনক রোগটি সাম্প্রতিক প্রাদুর্ভাবের কারণে আবার বিশ্বব্যাপী মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। যদিও বিশেষজ্ঞদের মতে, বেশির ভাগ মানুষ হয়তো এই সংক্রমণের সম্মুখীন হবেন না। তবে এর উচ্চ মৃত্যুহার এবং গুরুতর জটিলতা সচেতনতা এবং প্রাথমিক শনাক্তকরণকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
হান্টাভাইরাসের ইতিহাস বহু পুরোনো। রাজা-রাজড়াদের আমলেও এর উল্লেখ পাওয়া যায় বলে মনে করা হয়। তবে এটি প্রথম বিশ্বব্যাপী ব্যাপক মনোযোগ আকর্ষণ করে কোরীয় যুদ্ধের সময়। কোরীয় যুদ্ধের সময় সেনাদের মধ্যে কিডনির সমস্যা-সহ এক রহস্যময় রক্তক্ষরণজনিত জ্বর দেখা গিয়েছিল। এর পরেই সেই রোগের ভাইরাস নিয়ে গবেষণা শুরু হয়। ১৯৯৩ সালে আমেরিকার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলেও হান্টার মারাত্মক প্রাদুর্ভাব ঘটে, যেখানে ভাইরাসে সংক্রামিত ব্যক্তিরা ফুসফুসের গুরুতর রোগে আক্রান্ত হন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হান্টাভাইরাস নামটির একটি ভৌগোলিক গুরুত্ব রয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার হান্টান নদী থেকে এর নামকরণ। বিজ্ঞানীরা প্রথম সেই নদী সংলগ্ন এলাকা থেকে সংগ্রহ করা মেঠো ইঁদুরের দেহে ভাইরাসটি আবিষ্কার করেন। হান্টান নদী থেকে নাম দেওয়া হয় হান্টা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে, বিজ্ঞানীরা ভাইরাসটি সম্পর্কে আরও জানতে পারায় নামটি ব্যবহৃত হতে থাকে।
বিশ্বে এই রোগের প্রাদুর্ভাব একাধিক বার দেখা গিয়েছে। কিন্তু সে রকম মারাত্মক কোনও প্রভাব লক্ষ করা যায়নি। তবে সম্প্রতি ভাইরাসের ‘আন্দেস’ উপরূপ উদ্বেগের প্রধান কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে, যা আর্জেন্তিনা থেকে কাবো ভার্দেগামী প্রমোদতরীতে ছড়িয়েছে এবং এতে একাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে।
বৃহত্তর ভাইরাস পরিবারের অংশ হান্টা, ইঁদুর এবং ছুঁচোর মতো তীক্ষ্ণদন্তী প্রাণীর দেহে বাস করে। প্রাণীগুলো সাধারণত অসুস্থ না হয়েই ভাইরাসটি বহন করে। ফলে প্রকৃতিতে এই সংক্রমণ সহজে চোখে পড়ে না। মানুষ হান্টাভাইরাসের স্বাভাবিক পোষক নয় এবং মানুষ যখন এই ভাইরাসের সংস্পর্শে আসে, তখন এর ফল গুরুতর হতে পারে। বাতাসে ভাসমান ধূলিকণাকে আশ্রয় করে ছড়াতে পারে হান্টাভাইরাস। সাধারণত যখন কোনও ব্যক্তি তীক্ষ্ণদন্তী প্রাণীর মূত্র, মল বা লালার কণা দ্বারা দূষিত বাতাস শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে গ্রহণ করেন, তখন এই সংক্রমণ ঘটে। কোনও মানুষ সংক্রামিত প্রাণীর সরাসরি সংস্পর্শের মাধ্যমে বা কামড়-আঁচড় খেয়েও সংক্রামিত হতে পারেন।
হান্টাভাইরাস প্রধানত সংক্রামিত তীক্ষ্ণদন্তী প্রাণীর মলের সংস্পর্শে আসার মাধ্যমে ছড়ায়, বিশেষ করে ডিয়ার মাইস (হরিণ ইঁদুর)-এর ক্ষেত্রে। সংক্রমণের দুই থেকে চার সপ্তাহের মধ্যেই সাধারণত রোগের উপসর্গ দেখা দেয়। বিশেষজ্ঞদের অনেকে জানিয়েছেন, হান্টাভাইরাসের ‘আন্দেস’ উপরূপ বিশেষ ভাবে উদ্বেগজনক, কারণ এটিই হান্টার একমাত্র পরিচিত উপরূপ যা মানুষ থেকে মানুষে ছড়িয়েছে। যদিও কোভিড-১৯ বা হামের মতো রোগের তুলনায় এর সংক্রমণের হার কম। তবে মৃত্যুহার ৩৫-৫০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।
করোনার মতোই হান্টা আরএনএ ভাইরাস। দ্রুত এক শরীর থেকে অন্য শরীরে ছড়িয়ে পড়তে পারে। আবার খুব তাড়াতাড়ি তাদের জিনের রাসায়নিক বদল বা মিউটেশনও ঘটাতে পারে। হু জানাচ্ছে, এই ভাইরাস মানুষের শরীরে ঢুকে পড়লে সবচেয়ে আগে ফুসফুস ও কিডনির ক্ষতি করে। হান্টাভাইরাসের লক্ষণগুলো সাধারণত দু’টি পর্যায়ে দেখা যায়। প্রাথমিক পর্যায়ে জ্বর, ক্লান্তি, পেশির ব্যথা, মাথাব্যথা, মাথা ঘোরা এবং কাঁপুনি হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে অসুস্থতাটি এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে এবং কোনও জটিলতা ছাড়াই সেরে যেতে পারে।
তবে রোগটি বাড়লে রোগীদের শ্বাসকষ্টজনিত জটিলতা দেখা দিতে পারে। নিউমোনিয়ার লক্ষণ, অ্যাকিউট রেসপিরেটরি ডিসট্রেস সিনড্রোম (এআরডিএস), শ্বাসকষ্ট দেখা যায়। বুকে চাপ এবং কাশিও হতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত শ্বাসতন্ত্রের বিকলতার কারণ হতে পারে।
বর্তমানে হান্টাভাইরাসের জন্য কোনও অনুমোদিত টিকা বা নির্দিষ্ট ‘অ্যান্টিভাইরাল’ চিকিৎসা নেই। যদিও কিছু অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ আশাব্যঞ্জক ফল দেখিয়েছে। হান্টাভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধ করতে মূলত ইঁদুর এবং তাদের দ্বারা দূষিত জিনিসপত্রের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।
বাড়ি, চালাঘর, কেবিন, গ্যারেজ এবং গুদামঘরও ঝুঁকির কারণ হতে পারে। ভাইরাসের সংক্রামণ প্রতিরোধের জন্য ইঁদুর প্রবেশপথ বন্ধ করা, খাবার নিরাপদে সংরক্ষণ করা, থাকার জায়গা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা এবং শুকনো মল-মূত্রযুক্ত ধুলো এড়িয়ে যাওয়া উচিত বলেই মত বিশেষজ্ঞদের।
প্রাদুর্ভাবযুক্ত এলাকায় ভ্রমণকারী ব্যক্তিদের আট সপ্তাহের মধ্যে উপসর্গ দেখা দিলে তাঁদের অবিলম্বে ডাক্তারকে জানানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ইঁদুরের উপদ্রবযুক্ত এলাকা পরিষ্কার করার সময় বা ইঁদুর-দূষিত বর্জ্য নাড়াচাড়া করার সময় ব্যক্তিদের সংস্পর্শের ঝুঁকি কমাতে দস্তানা এবং মাস্ক পরা উচিত বলেও সাবধান করা হয়েছে। যদিও হান্টাভাইরাস একটি বিরল রোগ, তা সত্ত্বেও এর গুরুতর পরিণতি কমাতে এবং আরও বিস্তার রোধ করতে সময়মতো মনোযোগ, সচেতনতা এবং সঠিক প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা অপরিহার্য।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু)-র মহামারি ও অতিমারি বিভাগের ডিরেক্টর মাকিয়া ফন কেরখোডে ইতিমধ্যেই আশ্বাস দিয়েছেন, হান্টাভাইরাস করোনাভাইরাসের মতো কিছু নয়। ফলে সংক্রমণের মাত্রা তার ধারেপাশে যাওয়ার কোনও কারণ নেই। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, তাঁরা বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান টেড্রস অ্যাডানম গেব্রিয়েসাস জানিয়েছেন, সংক্রামিত ইঁদুর বা ওই জাতীয় প্রাণীর মূত্র, লালারস, নাক বা চোখের জল থেকে এই সংক্রমণ ছড়ায়। এই ভাইরাসে সংক্রামিত হওয়ার ঘটনা মূলত দক্ষিণ আমেরিকাতেই চোখে পড়ে। হু জানিয়েছে, কেউ সংক্রামিতের সংস্পর্শে দীর্ঘ ক্ষণ থাকলে তবেই আক্রান্ত হতে পারেন। সে ক্ষেত্রে সংক্রামিতের সঙ্গে একই বাড়িতে বাস করলে, তাঁর সঙ্গী হলে বা তাঁকে সেবা করলে সেই ব্যক্তিও আক্রান্ত হতে পারেন।