সম্প্রতি ইন্ডিগোর কয়েক হাজার উড়ান বাতিলের ফলে দেশ জুড়ে চরম হয়রানির মুখে পড়েছিলেন বহু যাত্রী। তার পরেই ভারতের উড়ান পরিষেবার ক্ষেত্রে মাত্র দু’টি বিমানসংস্থার আধিপত্য নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।
সে সময় খোদ বিমান পরিবহণমন্ত্রী উড়ান ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতার পরিবেশ বহাল রাখতে আরও বেশি পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছিলেন।
সেই আবহে সম্পূর্ণ নতুন দু’টি সংস্থাকে যাত্রী পরিষেবা শুরুর ছাড়পত্র দেয় বিমান পরিবহণ মন্ত্রক। নাম আল হিন্দ এয়ার এবং ফ্লাই এক্সপ্রেস।
মন্ত্রকের ‘নো অবজেকশন সার্টিফিকেট’ পেয়েছে তারা। ২০২৫-এ ওই ছাড়পত্র পেয়েছে উত্তরপ্রদেশের সংস্থা শঙ্খ এয়ারও। সূত্রের খবর, চলতি বছরেই চালু হচ্ছে সংস্থাগুলির উড়ান।
কেরলভিত্তিক ‘আল হিন্দ’ গোষ্ঠী দ্বারা পরিচালিত ‘আল হিন্দ এয়ার’ দক্ষিণ ভারতে এটিআর টার্বোপ্রপ বিমানের একটি বহর নিয়ে তাদের কার্যক্রম শুরু করতে চায় বলে জানিয়েছে। ‘এয়ার অপারেটর সার্টিফিকেট’ পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে সংস্থাটি। ফ্লাই এক্সপ্রেসও তাদের ওয়েবসাইটে জানিয়েছে যে তারা ‘শীঘ্রই আসছে’।
তবে এই তিন বিমানসংস্থাকে নিয়েই মানুষের মধ্যে কৌতূহল তুঙ্গে। এর মধ্যে আল হিন্দ এয়ারের সাফল্য মানুষের মধ্যেও বিশেষ অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে।
আল হিন্দ এয়ার ‘আল হিন্দ’ গোষ্ঠীর মালিকানাধীন। ‘আল হিন্দ’ কেরলের একটি পুরনো এবং জনপ্রিয় ভ্রমণ এবং পর্যটন সংস্থা। বিমান পরিবহণ মন্ত্রকের কাছ থেকে ছাড়পত্র পাওয়া নতুন বিমান সংস্থাটি এ বছরের শেষের দিকে এটিআর ৭২-৬০০ টার্বোপ্রপ বিমান দিয়ে কার্যক্রম শুরু করার পরিকল্পনা করছে। সংস্থার তরফে জানানো হয়েছে যাত্রীদের কাছে ‘ঝামেলামুক্ত এবং মসৃণ’ অভ্যন্তরীণ বিমান পরিষেবা পৌঁছে দেওয়াই তাদের লক্ষ্য।
আল হিন্দ বিমানসংস্থার মালিক একসময় ছিলেন বিমানের টিকিটবিক্রেতা। আল হিন্দ এয়ারের উত্থান আধুনিক ভারতের অন্যতম আকর্ষণীয় উদ্যোক্তার সাফল্যের গল্প হিসাবে উঠে এসেছে।
আল হিন্দ এয়ারের মালিক হলেন মোহম্মেদ হ্যারিস তট্টরাথীল। ‘আল হিন্দ গ্রুপ অফ কোম্পানিজ়’-এর ডিরেক্টর এবং চেয়ারম্যান তিনি।
তট্টরাথীলের জন্ম কেরলের কালিকটের (কোজিকোড়ে) এক মধ্যবিত্ত পরিবারে। পড়াশোনা করেছেন ইতিহাস এবং অর্থনীতি নিয়ে। পরে ফার্মাকোলজি নিয়েও পড়াশোনা করেন।
ভ্রমণ এবং পর্যটনক্ষেত্রে আগ্রহের কারণে এর পর মল্লাপুরমের কালিকট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পর্যটন এবং ভ্রমণ পরিষেবা ব্যবস্থাপনা নিয়ে ডিগ্রি অর্জন করেন তট্টরাথীল। এ ছাড়াও পর্যটন ও ভ্রমণ পরিষেবা ব্যবস্থাপনায় আইএটিএ প্রশিক্ষণও নেন।
বর্তমানে কোটি কোটি টাকার মালিক তট্টরাথীল কিন্তু জীবন শুরু করেছিলেন ছোট একটি ভ্রমণ এবং পর্যটন সংস্থা দিয়ে। আল হিন্দ গোষ্ঠীর ওয়েবসাইট অনুযায়ী, সংস্থাটি ১৯৯২ সালে আল হিন্দ ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস প্রাইভেট লিমিটেড নামে একটি ভ্রমণ সংস্থার মাধ্যমে যাত্রা শুরু করে। যাত্রীদের বিমানের টিকিট কেটে দিত তট্টরাথীলের সংস্থা। তিনি নিজেও দীর্ঘ দিন ওই কাজ করেছেন।
কেরল থেকে পশ্চিম এশিয়ায় কাজের খোঁজে যাওয়া মানুষদের বিমানের টিকিট, সেখানে গিয়ে থাকার ব্যবস্থা, যাতায়াতেরও ব্যবস্থা করে দেয় আল হিন্দ। ধীরে ধীরে সংস্থার পসার বৃদ্ধি পায়। ব্যবসা শুরুর তিন বছরের মধ্যে ১৯৯৫ সালে পশ্চিম এশিয়াতেও ব্যবসা সম্প্রসারিত করে আল হিন্দ।
১৯৯০-এর দশকের গোড়ার দিকে তৈরি কেরলভিত্তিক টিকিটিং এবং ট্যুর অপারেটর থেকে আল হিন্দকে একটি শক্তিশালী ভ্রমণ সংস্থায় পরিণত করেছেন তট্টরাথীল। সারা বিশ্বে ১০০টিরও বেশি অফিস রয়েছে সংস্থাটির, যার মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরশাহি এবং পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলিতে এর শক্তিশালী উপস্থিতি রয়েছে।
আল হিন্দ এয়ারলাইন্সের সদর দফতর কোচিতে অবস্থিত এবং কোচিন ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট লিমিটেডের সহযোগিতায় এটি পরিচালনা করা হয়। সংস্থাটি বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময়, গাড়ি ভাড়া, বাস পরিষেবা, পণ্য সরবরাহ পরিষেবা এবং হোটেল ও রিসর্ট পরিষেবাও প্রদান করে।
বিদেশে ব্যবসা বৃদ্ধি করলেও আল হিন্দ এখনও কেরলে নিজেদের নাম ধরে রেখেছে। কেরল তথা ভারতের পর্যটনশিল্পে এখনও একটি সুপরিচিত নাম আল হিন্দ। আর উদয়াস্ত পরিশ্রম করে সংস্থাটিকে উন্নতির সেই শিখরে পৌঁছে দিয়েছেন যিনি, তিনি তট্টরাথীল।
সেই আল হিন্দই এ বার নতুন বিমান পরিষেবা চালু করতে চলেছে ভারতে। সংস্থার আর এক জন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হলেন পিভি ভালসারাজ। তিনি আল হিন্দ গ্রুপের ম্যানেজমেন্ট ডিরেক্টর হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন। সংস্থাটির বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন তিনি।