রাস্তার ধারে দোতলা বাড়ি। আর সেই দোতলা বাড়ির জানলায় বিপজ্জনক ভাবে দাঁড়িয়ে এক তরুণী। একদল পুরুষ তাঁকে ক্রেনের সাহায্যে নীচে নামিয়ে আনার চেষ্টা করছেন। ছবিটি সৌদি আরবের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের এক শহরের।
দোতলা বাড়িটি মহিলাদের জন্য নিবেদিত একটি ‘যত্ন-কেন্দ্র’ (কেয়ার সেন্টার) বা ‘দার আল-রিয়া’র। যেখানে ‘যত্নের’ ঠেলায় পালানোর চেষ্টা করছেন এক মহিলা! তেমনই একটি ছবি প্রকাশ্যে এসেছে। সেই ছবিকে ঘিরে হইচইও পড়েছে।
অভিযোগ, সৌদি আরবের কুখ্যাত সেই ‘যত্ন-কেন্দ্রে’ আটকে রাখা হয়েছে ওই মহিলাকে। যেখানে ‘অবাধ্য’, বিবাহ-বহির্ভূত যৌন সম্পর্কে জড়িয়ে পড়া বা বাড়ির কাজে অমনোযোগী অন্য মহিলাদের সঙ্গে বন্দি রয়েছেন তিনি। সহ্য করতে হচ্ছে অকথ্য অত্যাচার। আর তাঁকে সেই ‘নরক-যন্ত্রণা’ ভোগ করতে পাঠিয়েছে তাঁরই পরিবার।
সৌদি আরবের মহিলাদের জন্য তৈরি সেই সব গোপন ‘যত্ন-কেন্দ্র’ বা ‘দার আল-রিয়া’গুলি আনুষ্ঠানিক ভাবে ‘অবাধ্য’ মহিলাদের ‘পুনর্বাসন’ কেন্দ্র হিসাবে বর্ণনা করা হয় সৌদি আরবে। সম্প্রতি সমালোচনার মুখে পড়েছে সেগুলি।
‘দার আল-রিয়া’গুলিতে থেকে এসেছেন এমন মহিলা এবং কর্মীদের উদ্ধৃত করে সংবাদমাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, ‘সহবত’ শেখাতে ওই ‘যত্ন-কেন্দ্র’গুলিতে অকথ্য অত্যাচার করা হয় মহিলাদের। সাপ্তাহিক বেত্রাঘাত, জোরপূর্বক ধর্মীয় শিক্ষা এবং বহির্বিশ্ব থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার পাঠ পড়ানো হয় তাঁদের। সেই অভিজ্ঞতা নাকি ‘নারকীয়’।
প্রতিবেদনে এ-ও উঠে এসেছে, বছরের পর বছর ধরে বন্দিদশা এবং ‘দার আল-রিয়া’ কর্তৃপক্ষের অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে অনেক মহিলাই সেখানে আত্মহত্যা করেন। আত্মহত্যার চেষ্টার নজিরও অনেক। পুরুষ অভিভাবক বা পরিবারের অনুমতি ছাড়া মহিলাদের সেখান থেকে বার হতে দেওয়া হয় না।
‘দার আল-রিয়া’ নিয়ে জনসমক্ষে কথা বলা বা ছবি-ভিডিয়ো শেয়ার করা প্রায় অসম্ভব। কিন্তু বিগত ছ’মাস ধরে ‘দ্য গার্ডিয়ান’ ওই প্রতিষ্ঠানগুলির ভিতরের অবস্থা সম্পর্কে একাধিক সাক্ষ্য সংগ্রহ করে। সেই তথ্যই উঠে এসেছে প্রতিবেদনে।
কিন্তু অভিযোগ কতটা সত্যি? লন্ডনে কর্মরত সৌদি আরবের এক সমাজকর্মীর কথায়, “এক জন অল্পবয়সি মেয়ে বা মহিলা যত ক্ষণ ওদের নিয়ম মেনে নিতে পারবেন তত ক্ষণই সেখানে থাকতে পারবেন।”
‘দার আল-রিয়া’কে নিষিদ্ধ করার দাবিতে অনেক দিন ধরেই প্রচার চালাচ্ছেন সারা আল-ইয়াহিয়া (নাম পরিবর্তিত) নামে এক মহিলা। সৌদি আরবের ওই ‘যত্ন-কেন্দ্র’গুলিকে মহিলাদের কারাগার হিসাবে বর্ণনা করেছেন তিনি।
সারার দাবি, ‘দার আল-রিয়া’তে ঢোকার সময় নগ্ন করে তল্লাশি করা হয় মহিলাদের। কুমারীত্বের পরীক্ষাও করা হয়। এর পর ধীরে ধীরে ওই মহিলাদের মাদকাসক্ত করে দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ তুলেছেন তিনি।
ভয়াবহ অভিজ্ঞতার বিবরণ দিতে গিয়ে তিনি এ-ও দাবি করেছেন, ‘দার আল-রিয়া’তে কোনও মহিলাকে নাম ধরে ডাকা হয় না। বদলে দেওয়া হয় একটি করে নম্বর। সেই নম্বরের মাধ্যমেই ডাকা হয় তাঁদের।
সারা অভিযোগ করেছেন, যত্নের নামে মহিলাদের অত্যাচার করা হয় ‘দার আল-রিয়া’তে। প্রার্থনা না করার জন্য শাস্তি দেওয়া হয়। অন্য মহিলাদের সঙ্গে মেলামেশা করলে জোটে বেত্রাঘাত। নির্বাসনে থাকা সারা দাবি করেছেন, তাঁর নিজের বাবা ‘দার আল-রিয়া’কে হুমকি হিসাবে ব্যবহার করতেন।
সৌদির সমাজকর্মীদের দাবি, মূলত ৬০-এর দশকে তৈরি ‘যত্ন-কেন্দ্র’গুলি মহিলাদের নিয়ন্ত্রণ এবং শাস্তি দেওয়ার জন্য একটি অপ্রচলিত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে সৌদির প্রশাসন। বিষয়টি সে দেশের নারী ক্ষমতায়নের জন্য করা প্রচারের সরাসরি বিরোধিতা বলেও দাবি করেছেন সমাজকর্মীদের একাংশ।
সমাজকর্মীরা এ-ও জানিয়েছেন, সৌদির অনেক মহিলাকে যেমন তাঁদের পরিবার সমর্থন করে, তেমনই অনেককে আবার পরিবারই যন্ত্রণা ভোগ করানোর জন্য ‘দার আল-রিয়া’তে পাঠায়।
মানবাধিকার গোষ্ঠী ‘এএলকিউএসটি’ আবার দাবি করেছে, ‘দার আল-রিয়া’গুলি লিঙ্গ নীতি প্রয়োগের জন্য কুখ্যাত হাতিয়ার। ‘এএলকিউএসটি’র অন্যতম কর্মী নাদিয়ান আবদুল আজ়িজ় সৌদি কর্তৃপক্ষকে ওই বৈষম্যমূলক ‘যত্ন-কেন্দ্র’গুলি বাতিল করার এবং প্রকৃত আশ্রয়কেন্দ্র স্থাপন করার আহ্বান জানিয়েছেন সরকারকে।
যদিও এ সব অভিযোগ নিয়ে সৌদি সরকারের দাবি অন্য। সরকারের মুখপাত্র জানিয়েছেন, সুরক্ষিত নন এমন মহিলাদের আশ্রয়কেন্দ্র হিসাবে গড়ে তোলা হয়েছে ‘দার আল-রিয়া’। মহিলাদের জোর করে আটকে রাখা, দুর্ব্যবহার করা বা বলপ্রয়োগের দাবিও অস্বীকার করেছেন তিনি।
মুখপাত্র বলেছেন, ‘‘এগুলি কোনও রকম আটক কেন্দ্র নয়। নির্যাতনের যে কোনও অভিযোগকে গুরুত্ব সহকারে বিচার করা হয়। মহিলারা যে কোনও সময় এই সব কেন্দ্র ছেড়ে বেরিয়ে যেতে পারেন। অভিভাবক বা পরিবারের সদস্যদের অনুমোদনেরও প্রয়োজন নেই।’’