১০২ বছর বয়সে শেষ বিয়ে। ১৩৪ জন সন্তান-সন্ততি, নাতি-পুতি। দেখেছেন দুই বিশ্বযুদ্ধই! ১৪২ বছর বয়সে মৃত্যু হল সৌদি আরবের সবচেয়ে বয়স্ক নাগরিক হিসাবে স্বীকৃত শেখ নাসের বিন রাদ্দান আল রশিদ আল ওয়াদাইয়ের।
গত ১১ জানুয়ারি রবিবার মৃত্যু হয়েছে নাসেরের। বার্ধক্যজনিত কারণে মারা গিয়েছেন তিনি। তেমনটাই জানিয়েছেন তাঁর পরিবারের সদস্যেরা।
বয়স এবং প্রচলিত রীতিনীতিকে উপেক্ষা করে অসাধারণ জীবনযাপন এবং দীর্ঘ আয়ুর জন্য সারা বিশ্বের মনোযোগ আকর্ষণ করেছিলেন নাসের। তাঁর মৃত্যুর খবর প্রকাশ্যে আসতে শোকপ্রকাশ করেছেন অনেকেই। হইচই পড়েছে নেটপাড়াতেও। তাঁকে নিয়ে কৌতূহলও তৈরি হয়েছে সাধারণ মানুষের মনে।
সঠিক সাল এবং তারিখ না জানা গেলেও ১৮৮৩-’৮৪ সাল নাগাদ সৌদিতে নাসেরের জন্ম। তাঁর পরিবার এবং সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা গিয়েছে, ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে দক্ষিণ সৌদি আরবের দাহরান আল এলাকায় জন্ম হয় তাঁর।
স্বাধীন দেশ হিসাবে সৌদির জন্ম ১৯৩২ সালে। অর্থাৎ, সৌদি আরব দেশ হিসাবে ঘোষণা হওয়ার অনেক আগেই জন্ম হয়েছিল নাসেরের। সৌদিকে তিলে তিলে গড়ে উঠতে দেখেছিলেন তিনি।
নাসের দেখেছিলেন ধু-ধু মরুভূমি থেকে কী ভাবে একটি আধুনিক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হয়েছে সৌদি। অর্থনীতির উত্থানে সৌদির দ্রুত পরিকাঠামোগত উন্নয়ন এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও পরিবর্তনের সাক্ষী ছিলেন তিনি।
একাধিক সৌদি শাসকের শাসনকালেরও সাক্ষী ছিলেন নাসের। জীবদ্দশায় সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠাতা তথা বাদশা আবদুল আজিজ বিন আবদুল রহমান আল সৌদ ওরফে ইবনে সৌদের শাসনকাল যেমন তিনি দেখেছিলেন, তেমনই বর্তমান শাসক তথা বাদশা সলমন বিন আবদুল আজিজ আল সৌদের শাসনকালও দেখেছিলেন।
পশ্চিম এশিয়া তথা সারা বিশ্বের বহু রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং অস্থিরতার সাক্ষী ছিলেন নাসের। দেখেছেন দুই বিশ্বযুদ্ধই।
কর্মসূত্রে নাসেরের যৌবনকাল কেটেছে দক্ষিণ সৌদি আরবে। কাজের জন্য প্রায়ই ইয়েমেনে সফর করতে হত তাঁকে, যা তখনকার সময়ে একটি সাধারণ বিষয় ছিল।
জীবনের শেষের বছরগুলি স্থানীয়দের কাছে ধর্মীয় এবং সামাজিক অবস্থানের প্রতি নিষ্ঠার জন্য পরিচিতি পেয়েছিলেন নাসের। নাসেরের সঙ্গে দেখা করার জন্য এবং তাঁর সান্নিধ্য পাওয়ার জন্য অনেকেই তাঁর বাড়ির বাইরে ভিড় জমাতেন।
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জীবনে ৪০ বারেরও বেশি হজে গিয়েছিলেন নাসের, যা তাঁকে সম্প্রদায়ের কাছে এক জন সম্মাননীয় মানুষে পরিণত করেছিল। নাসেরের পরিবার সংবাদমাধ্যমে জানিয়েছে, শেষ বয়সেও শারীরিক এবং মানসিক ভাবে সুস্থ ছিলেন নাসের। এমনকি, শেষের বছরগুলিতেও তিনি সামাজিক ভাবে সক্রিয় ছিলেন।
নাসেরের ব্যক্তিগত জীবনও ছিল আলোচনার বিষয়। একাধিক বিয়ে করেছিলেন তিনি। শেষ বিয়ে করেন ১১০ বছর বয়সে। শেষ বিয়ে থেকে এক কন্যাসন্তানও হয় তাঁর। সেই খবরের জেরে পশ্চিম এশীয় সংবাদমাধ্যমের শিরোনামেও উঠে এসেছিলেন তিনি।
নাসেরের শতোর্ধ্ব বয়সে বিয়ে এবং পিতৃত্বের অধিকারী হওয়া যেমন সারা বিশ্বকে অবাক করেছিল, তেমনই স্থানীয়দের চোখে তাঁর জন্য সম্ভ্রম অনেক গুণ বাড়িয়ে তুলেছিল। মৃত্যুর আগে পর্যন্ত বিশাল এক পরিবারের প্রধান ছিলেন শেখ নাসের। ১৩৪ জন সন্তান, নাতি-নাতনি এবং প্রপৌত্র-প্রপৌত্রী ছিল তাঁর।
নাসেরের পরিবারের দাবি, আরাম-আয়েশের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সারাজীবন শৃঙ্খলা এবং সংযমের মধ্যে দিয়ে জীবন কাটিয়েছিলেন তিনি। স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসও বজায় রেখেছিলেন। ছকে বাঁধা নিয়মের বাইরে জীবন কাটাতে তিনি পছন্দ করতেন না।
১০০ বছর পেরিয়েও নাসেরের শারীরিক এবং মানসিক স্ফূর্তি ও দৈনন্দিন রুটিন চিকিৎসক এবং গবেষকদেরও আগ্রহের বিষয়ে পরিণত হয়েছিল। তাঁর প্রাণশক্তি এবং জ্ঞানও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিল অনেকের কাছে।
গত রবিবার রিয়াধে বার্ধক্যজনিত কারণে মৃত্যু হয় নাসেরের। মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ১৪২ বছর। জানা গিয়েছে, মারা যাওয়ার কয়েক দিন আগে থেকে হঠাৎই অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন তিনি। বিছানা থেকে উঠতে পারছিলেন না।
নাসেরের মৃত্যুতে সৌদি জুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। রিয়াধে তাঁর শেষকৃত্যের সময় সৌদির অনেক গণ্যমান্য রাজনীতিক, ধর্মীয় এবং সামাজিক ব্যক্তিত্ব উপস্থিত হয়েছিলেন।
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দাহরান আল জানুবে গ্রামে নাসেরের অন্তিমযাত্রায় প্রায় সাত হাজার মানুষ যোগ দিয়েছিলেন। তাঁকে তাঁর বাড়ির কাছেই সমাহিত করা হয়েছে।