হরমুজ় প্রণালীকে সচল ও স্বাভাবিক করার জন্য ইরানি নৌশক্তিকে পরাভূত করতে আসরে নেমেছে মার্কিন যু্দ্ধজাহাজগুলি। তেহরানের অস্ত্রকে ভোঁতা করতে সমস্ত শক্তি এক করে নেমেছে মার্কিন ফৌজ। হরমুজ় প্রণালীর মতো অত্যন্ত সঙ্কীর্ণ এবং কৌশলগত ভাবে গুরুত্বপূর্ণ জলপথে যুদ্ধের কৌশল আমূল বদলে দিয়েছে তেহরানের নৌবাহিনী।
শত্রুদেশগুলিকে পারস্য উপসাগর ও হরমুজ়ে নাকানিচোবানি খাওয়াতে তেহরানের তুরুপের তাস হয়ে উঠেছে ক্ষুদ্র হাতিয়ার। হরমুজ় প্রণালীতে ইরানের ক্ষুদ্রাকৃতি ডুবোজাহাজের বহর ত্রাস সৃষ্টি করেছে শত্রু নৌবহরের মধ্যে। মূলত গাদির শ্রেণির ক্ষুদ্রাকৃতির ডুবোজাহাজ দিয়ে হরমুজ় প্রণালী নিয়ন্ত্রণ করছে ইরানি নৌসেনা।
ওমান ও ইরানের মালিকানায় থাকা হরমুজ় প্রণালী অগভীর এবং ব্যস্ত নৌপথ। সঙ্কীর্ণ এই জলপথ দিয়ে বিশ্বের ২০ শতাংশ জ্বালানি পরিবহণ হয়। ফলে পারস্য উপসাগরে জাহাজের আনাগোনা লেগেই থাকে। এই অগভীর ও কোলাহলপূর্ণ পরিবেশের জন্য বিশেষ ভাবে তৈরি করা হয়েছে ক্ষুদ্র আকৃতির ডুবোজাহাজটিকে।
সঙ্কীর্ণ এই জলপথে বড় আকারের প্রচলিত ডুবোজাহাজগুলি প্রায়শই চলাচল করতে হিমশিম খায়। বিশাল এবং আধুনিক সাবমেরিনগুলোর পক্ষে এখানে গা ঢাকা দিয়ে থাকা বেশ কঠিন। আর এখানেই বাজিমাত করছে ইরান। কম গভীর জলে চলাচল করার অনায়াস দক্ষতা রয়েছে গাদির ডুবোজাহাজগুলির, যেখানে বড় সাবমেরিনগুলি ধরা পড়ে যাওয়ার প্রবল ঝুঁকি রয়েছে।
অগভীর সমুদ্রের একচ্ছত্র আধিপত্য রক্ষায় ইরানের মেরুদণ্ড হল গাদির-শ্রেণির ক্ষুদ্রাকৃতির ডুবোজাহাজগুলি। ২৯ মিটার লম্বা এবং মাত্র ১২০-১৫০ টন ওজনের নিঃশব্দ ঘাতকগুলি সমুদ্রের তলদেশের খাঁজ বা পাথুরে ভূ-প্রকৃতিকে ঢাল হিসাবে ব্যবহার করে রেডারের চোখ এড়িয়ে চলতে পারে।
ডুবোজাহাজগুলি সমুদ্রের তলদেশে ইঞ্জিনের শব্দ পুরোপুরি বন্ধ করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা নিথর হয়ে বসে থাকতে পারে। শত্রুপক্ষকে বিভ্রান্ত করার জন্য এটি অত্যন্ত কার্যকর কৌশল।
এই ডুবোজাহাজগুলির আকার ছোট হওয়ায় এদের ‘সোনার সিগনেচার’ খুবই সামান্য হয়। সাধারণত জলের নীচে কোনও বস্তুর (যেমন সাবমেরিন বা জাহাজ) উপস্থিতি নির্ধারণ করা হয় নির্গত শব্দের অনন্য নকশা থেকে। একেই ‘সোনার সিগনেচার’ বা শব্দচিহ্ন বলা হয়। নৌবাহিনী বা ডুবোজাহাজের চালকেরা এই নকশা বিশ্লেষণ করে শত্রুর জাহাজ বা ডুবোজাহাজের ধরন ও অবস্থান শনাক্ত করে থাকেন।
বিভিন্ন প্রতিরক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে ইরান পারস্য উপসাগর জুড়ে বিভিন্ন জায়গায় বর্তমানে এই ধরনের ২০টিরও বেশি ডুবোজাহাজ মোতায়েন করে রেখেছে। শত্রুপক্ষের উন্নত সোনার সিস্টেমগুলি এদের ছোট মাছ বা সামুদ্রিক প্রাণীর শব্দ থেকে আলাদা করতে হিমশিম খায়। গাদিরের ইঞ্জিনের শব্দ অত্যন্ত কম হওয়ায় এদের শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব।
পারমাণবিক অস্ত্রবহনকারী মার্কিন ডুবোজাহাজ চলাচল করার জন্য যথেষ্ট গভীরতার প্রয়োজন হয়। সেখানে গাদির মাত্র ৩০ মিটার গভীর জলেও চলাচল করতে পারে। জাহাজ চলাচলের উচ্চ পারিপার্শ্বিক কোলাহল ব্যবহার করে নিজেদের শব্দচিহ্ন আড়াল করে সমুদ্রতলে অবস্থান করে। লক্ষ্যবস্তুর জন্য নীরবে অপেক্ষা করে।
এই নীরব ঘাতকগুলিতে দু’টি করে ৫৩৩ মিমি টর্পেডো টিউব রয়েছে, যা থেকে ‘সুপারক্যাভিটেটিং’ টর্পেডো নিক্ষেপ করা যায়। একটি টর্পেডো নিজের চারপাশে বাতাসের বুদবুদ তৈরি করে ঘণ্টায় ৩৫০ কিমি বেগে আঘাত হানতে পারে। ফলে জাহাজগুলির পক্ষে এর আক্রমণ এড়িয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
সামরিক যুদ্ধাস্ত্র বিশ্লেষকদের মতে, গাদিরের সাম্প্রতিক উন্নত সংস্করণের ফলে এতে ‘জাস্ক-২’ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ‘জাস্ক’ শ্রেণির ক্ষেপণাস্ত্রটি অত্যাধুনিক সামরিক ডুবোজাহাজ থেকে অনেক বেশি পাল্লায় ছোড়া যায়। ফলে এই ছোট ডুবোজাহাজগুলি থেকে ৩০০ কিলোমিটার দূর পর্যন্ত ক্রুজ় ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা সম্ভব হবে।
এই ছোট সাবমেরিনগুলি জলযুদ্ধের পরিস্থিতিতে প্রধানত তিনটি উপায়ে শত্রুপক্ষকে ঘায়েল করতে পারে। প্রথমত রাতের অন্ধকারে বা খুব গোপনে প্রধান জাহাজ চলাচলের পথে নৌ-মাইন স্থাপন করে শত্রু নৌবাহিনীর চলাচলকে অচল করে দেওয়া। দ্বিতীয়ত খুব কাছ থেকে হঠাৎ টর্পেডো হামলা করে আঘাত হেনে দ্রুত পালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা। তৃতীয়ত শত্রুর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ এবং রিয়্যাল-টাইম তথ্য মূল ঘাঁটিতে পাঠানো।
ইরান বিগত চার দশক ধরে পারস্য উপসাগরের ভৌগোলিক অবস্থানকে নিখুঁত ভাবে পর্যালোচনা করে আসছে। সেই বুঝে এই অঞ্চলে তার ডুবোজাহাজের নাবিকদের প্রশিক্ষণ দিয়েছে। তেহরানের শাসকগোষ্ঠী হরমুজ়ের প্রাকৃতিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে ক্ষুদ্রাকৃতির যানগুলোকে ব্যবহার করে শত্রুপক্ষকে নাস্তানাবুদ করে তুলছে।
নৌযুদ্ধে একটি বড় ডুবোজাহাজ নিয়ে আক্রমণ হানার চেয়ে অনেকগুলি ছোট ডুবোজাহাজ নিয়ে একত্রে আক্রমণ করা অনেক বেশি কার্যকর। যখন অনেকগুলো ক্ষুদ্র ডুবোজাহাজ একত্রে বিভিন্ন দিক থেকে আক্রমণ করে, তখন শত্রুপক্ষের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। এটিকে বলা হয় ‘সোয়ার্মিং’ বা মৌমাছির মতো ঝাঁক বেঁধে আক্রমণ করা।
ইরানের হাতে থাকা ২০টি গাদির ডুবোজাহাজের মধ্যে আনুমানিক ১৬টি সক্রিয় রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। বেশির ভাগ গাদিরকে হরমোজ়গান প্রদেশের খাড়া পাহাড়ের গায়ে খোঁড়া মজবুত সুড়ঙ্গ এবং সমুদ্র-গুহা থেকে জলে নামানো হয়, যার ফলে উপগ্রহের নজর এড়িয়ে প্রথম থেকেই এরা জলের নীচে ডুবে থাকতে পারে।
বর্তমানে হরমুজ় প্রণালীতে যুদ্ধের কৌশল কিছুটা বদলে ফেলেছেন ইরানি নৌ কমান্ডারেরা। ‘বড় শক্তি’ নিয়ে আঘাত করার চেয়ে ‘বুদ্ধিদীপ্ত শক্তি’র দিকে ঝুঁকছে তেহরান। ছোট ডুবোজাহাজগুলি কম খরচে তৈরি করা যায়। ধ্বংস হলেও খুব বেশি আর্থিক ক্ষতি হয় না। কিন্তু এগুলো শত্রুপক্ষের কোটি কোটি ডলারের যুদ্ধজাহাজকে অকেজো করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
এটিকে মূলত ‘অ্যাসিমেট্রিক ওয়ারফেয়ার’ বা অসম যুদ্ধের একটি চমৎকার উদাহরণ বলে উল্লেখ করছেন প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞেরা। গাদির শ্রেণির ডুবোজাহাজগুলো ইরানের জন্য এমন একটি ‘অদৃশ্য শক্তি’, যা দিয়ে তারা ভৌগোলিক সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে শত্রুপক্ষের তুলনামূলক শক্তিশালী সামরিক প্রযুক্তির মোকাবিলা করছে।