প্লাবন বা বন্যায় প্রাণ বিপর্যয়ের উদাহরণ ভূরি ভূরি। কিন্তু বিয়ারের ‘বন্যায়’ ভেসে গিয়ে প্রাণহানির ঘটনার নজির বোধহয় একটিই। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে এক নজিরবিহীন ঘটনার সাক্ষী ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের রাজধানী। ঠিক যেন প্লাবন বয়ে যায় লন্ডন জুড়ে।
১৮১৪ সালের ১৭ অক্টোবর টটেনহ্যাম কোর্ট রোডের মিউক্স অ্যান্ড কোম্পানি ব্রিউয়ারিতে (বিয়ার তৈরির কারখানা) একটি অদ্ভুত বিপর্যয় ঘটে। একটি বিশাল বিয়ারের ভ্যাট (মস্ত কাঠের পিপে) ফেটে গিয়ে লন্ডন শহরের একাংশ জুড়ে থইথই করতে থাকে মদ।
দুর্ঘটনার ফলে ৩ লক্ষ ২০ হাজার গ্যালনেরও বেশি (১৪ লক্ষ লিটার) বিয়ারের জোয়ারে ভেসে যায় শহরটির বেশ কিছু এলাকা। শহরের অন্যতম দরিদ্র এলাকা সেন্ট জাইলসের আশপাশের রাস্তা এবং বাড়িঘরকে প্লাবিত করে দেয় বিয়ারের স্রোত।
মিউক্স অ্যান্ড কোং-এর মালিকানাধীন হর্স শু ব্রিউয়ারিটি গ্রেট রাসেল স্ট্রিট এবং টটেনহ্যাম কোর্ট রোডের এক কোণে তৈরি করা হয়েছিল। লন্ডনের বৃহত্তম ব্রিউয়ারিগুলির মধ্যে অন্যতম ছিল এটি। কয়েক দশক ধরে সেখানে কারখানাটি রমরম করে চলত। এই ব্রিউয়ারিটির বিশেষত্ব ছিল বাদামি মল্ট দিয়ে তৈরি এক স্বতন্ত্র স্বাদের বিয়ার।
কিন্তু খুব বেশি ভাল জিনিস কখনও কখনও খারাপ দিকে মোড় নিতে পারে। লন্ডনের সেন্ট জাইলসে ঘটে যাওয়া ঘটনা তার জলজ্যান্ত উদাহরণ। রাস্তায় বিনামূল্যে বিয়ারের ছড়াছড়ি হলেও ওই অঞ্চলের দরিদ্র বাসিন্দাদের জন্য ঘটনাটি অভিশাপ হয়ে নেমে আসে। ঘনবসতিপূর্ণ এই বস্তি এলাকায় মূলত দরিদ্র, নিঃস্ব, যৌনকর্মী এবং অপরাধীরা বাস করতেন।
জল বেরোনোর উপযুক্ত ব্যবস্থা না থাকায় বিয়ারের স্রোত শহর থেকে বেরিয়ে যেতে পারেনি। বাড়িগুলির বেসমেন্টে বিয়ার থইথই করতে থাকে। সেলারগুলি বিয়ারপূর্ণ হয়ে যায়। বাসিন্দারা প্রাণ বাঁচাতে আসবাবপত্রের উপর উঠে পড়তে বাধ্য হন।
তীব্র বেগে ধেয়ে আসা তরল অনেক কিছু ধ্বংস করে দেয়। এই ধ্বংসের বলি হন সাধারণ মানুষও। ফলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। এলাকার বাড়িগুলি জীর্ণ ও ভঙ্গুর হওয়ার কারণে দেওয়াল এবং ঘরবাড়ির বেসমেন্ট ভেঙে চূর্ণ হয়ে যায়। বিয়ারের ১৫ ফুট উঁচু ঢেউ এবং কারখানার ধ্বংসাবশেষ দু’টি বাড়ির বেসমেন্টে ঢুকে পড়ে। ফলে দু’টি বাড়ি ধসে পড়ে।
বিয়ার তৈরির কারখানার পিছনে একটি বাড়িতে বসে চা খাচ্ছিলেন এক তরুণী ও তাঁর মা। বিয়ারের ঢেউয়ের ধাক্কায় দু’জনেই মারা যান। পাশের বাড়ির একটি বেসমেন্টে দুই বছর বয়সি একটি আইরিশ ছেলের জন্য শোকসভা চলছিল। মদের ঢেউয়ে ঘর ভরে যাওয়ার ফলে সেই জমায়েতের পাঁচ জন নিহত হন।
পরে পাশের একটি বাড়িতে একটি শিশুর মৃতদেহও উদ্ধার করা হয়। আরও একটি প্রাণহানির ঘটনা তৎকালীন সংবাদপত্রে উল্লেখ করা হয়েছিল। পুরনো সংবাদ প্রতিবেদন থেকে জানা যায় নিকটবর্তী একটি পাবের কিশোরী পরিচারিকা বাসন মাজছিলেন। ব্রিউয়ারির দেওয়াল ধসে পড়ার ফলে তারও মৃত্যু হয়েছিল। আশ্চর্যজনক ভাবে, বিয়ার তৈরির কারখানায় কোনও কর্মীর মৃত্যু হয়নি। তবে কর্মীদের অনেকেই বিয়ারের স্রোতে ভেসে যান। অনেকে ধ্বংসস্তূপের নীচে চাপা পড়ে আহত হন।
কারখানায় মজুত ছিল প্রায় বাইশ ফুট উঁচু, কাঠের তৈরি বিয়ার তৈরির ট্যাঙ্ক। এই ব্রিউয়ারির মদ উৎপাদন এবং মজুতক্ষমতা ছিল শহরে অন্য মদ তৈরির কারখানার তুলনায় অনেকটাই বেশি। প্রায় সাড়ে তিন লক্ষ ব্যারেল বিয়ার মজুত থাকত এখানে। ট্যাঙ্কটিকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য চারধার ঘিরে দেওয়া হয়েছিল মজবুত লোহার রিং দিয়ে।
১৭ অক্টোবর বিকেলে ট্যাঙ্কের চারপাশের লোহার রিংগুলির একটি ভেঙে যায়। প্রায় এক ঘণ্টা পরে পুরো ট্যাঙ্কটিই ফেটে যায়। গাঁজানোর জন্য রাখা মদের পাত্র ফেটে যেতেই তার ধাক্কায় কারখানার পিছনের দেওয়াল ফেটে যায়। সেই চাপের কারণে বিয়ারের ভাঁটির অন্যান্য কাঠের পাত্র ফেটে যায়। ফলে বিয়ারের স্রোত নামে রাস্তায়।
এই বিনামূল্যের বিয়ার সংগ্রহের জন্য শয়ে শয়ে বাসিন্দার মধ্যে হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। বালতি বালতি মদ বাড়িতে মজুত করার হিড়িক পড়ে। এমনকি রাস্তা থেকেও সরাসরি অনেকে বিয়ার পান করেছিলেন বলে দাবি। স্ত্রী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলেই সেই বিয়ার খেয়ে রাস্তায় যত্রতত্র পড়ে ছিলেন। কয়েক দিন পরে মদের বিষক্রিয়ায় আরও এক ব্যক্তির মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়।
কয়েক মাস ধরে এলাকায় বিয়ারের দুর্গন্ধে টেকা দায় হয়ে পড়েছিল। ঘটনাটির পর ব্রিউয়ারির পিছনের অংশের ধ্বংসস্তূপটি ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। মদের কারখানার ধ্বংসাবশেষ রাতারাতি আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। কারখানার পাহারাদারেরা ধ্বংস হয়ে যাওয়া বিয়ার ভ্যাটের ধ্বংসাবশেষ দেখার জন্য এক পয়সা করে নিতেন। এই দর্শনার্থীদের অনেকেই নিহতদের শেষকৃত্যের জন্য মুক্তহস্তে দান করেছিলেন।
অপ্রত্যাশিত এই বিপর্যয়ের ফলে ব্রিউয়ারির প্রায় ২৩০০০ পাউন্ড (আজ প্রায় ১২ লক্ষ পাউন্ড) ক্ষতি হয়েছিল। তবে সংস্থাটি বিয়ারের উপর বসানো আবগারি শুল্ক পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছিল। সেই শুল্ক ফেরত পাওয়ার ফলে সংস্থাটি দেউলিয়া হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পেয়েছিল। হারিয়ে যাওয়া বিয়ারের ব্যারেলগুলির ক্ষতিপূরণ হিসাবে সংস্থাটিকে ৭ হাজার ২৫০ পাউন্ড (বর্তমান হিসাবে ৪ লক্ষ পাউন্ড) ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছিল।
সেই বিপর্যয়ের তদন্ত শুরু হয়। তদন্তের শেষে এই বিপর্যয়কে ‘ঈশ্বরের কাজ’ বলে রায় দেওয়া হয়। ব্রিউয়ারিটির উপর কোনও দোষ চাপানো হয়নি। যেহেতু ব্রিউয়ারিটির তরফে কোনও ভুল হয়নি বলে প্রমাণিত হয়েছিল, তাই ক্ষতিগ্রস্তদের পরিবার অথবা যাঁরা তাঁদের বাড়িঘর এবং সম্পত্তি হারিয়েছেন তাঁদের কোনও ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়নি।
এই অনন্য বিপর্যয়ের কারণে কাঠের গাঁজন পাত্রগুলি সরিয়ে কংক্রিটের তৈরি পাত্রের ব্যবহার শুরু করে মদের কারখানাটি। ব্রিউয়ারিটি শীঘ্রই আবার ব্যবসা শুরু করে। উৎপাদনকারী সংস্থা মিউক্স তাদের কাজকর্ম অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে যাওয়ায় ১৯২১ সালে কারখানা বন্ধ হয়ে যায়। পরের বছর ব্রিউয়ারিটি ভেঙে ফেলা হয় এবং পরে সেই জায়গায় ডোমিনিয়ন থিয়েটার তৈরি করা হয়।