যুদ্ধরত ইরানের সঙ্গে শান্তিবৈঠক থেকে শুরু করে বিরল খনিজের আমদানি। কিংবা ক্রিপ্টো ব্যবসার সম্প্রসারণ। গত এক বছরে নানা ‘প্রলোভনে’ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘নয়নের মণি’ হয়ে উঠেছেন পাকিস্তানের সেনা সর্বাধিনায়ক তথা সিডিএফ (চিফ অফ ডিফেন্স ফোর্সেস) ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির। যদিও দু’জনের এ-হেন মাখামাখিকে একেবারেই ভাল চোখে দেখছেন না যুক্তরাষ্ট্রের দুঁদে গোয়েন্দাকর্তারা। উল্টে ‘দুধ-কলা দিয়ে কালসাপ পোষা’ হচ্ছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তাঁরা, এমনকি বিষাক্ত ছোবল খেতে হতে পারে আমেরিকাকেও।
গত বছর (২০২৫ সাল) ‘অপারেশন সিঁদুর’-এ ভারতের হাতে মার খাওয়ার পর একাধিক পদোন্নতি হয় মুনিরের। স্থলবাহিনীর জেনারেল থেকে তাঁকে সরাসরি ফিল্ড মার্শাল হিসাবে নিযুক্ত করেন পাক প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জ়ারদারি। এর পরই ট্রাম্পের থেকে মধ্যাহ্নভোজের আমন্ত্রণ পান মুনির। সেখানে দু’জনের মধ্যে গড়ে ওঠে ‘বন্ধুত্ব’। ইসলামাবাদের সেনা সর্বাধিনায়কের হোয়াইট হাউসে পা রাখার সময়টা ছিল ২০২৫ সালের জুন।
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, ট্রাম্প-মুনির যখন মধ্যাহ্নভোজে ব্যস্ত, ঠিক তখনই ইরানের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে ইজ়রায়েল। সেই লড়াইয়ে একেবারে শেষলগ্নে যোগ দেয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। তেহরানের পরমাণু কেন্দ্রগুলিকে ধ্বংস করতে ‘বাঙ্কার বাস্টার’ (জিবিইউ-৫৭ ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স পেনিট্রেটর) বোমা ফেলে তারা। এর জন্য পঞ্চম প্রজন্মের ‘স্টেলথ’ শ্রেণির ‘বি-২ স্পিরিট’ বোমারু বিমানকে কাজে লাগায় আমেরিকার বায়ুসেনা, যা সাবেক পারস্যে ঢুকতে পাক আকাশপথ ব্যবহার করেছে বলে অভিযোগ উঠেছিল।
মার্কিন সামরিক বিশ্লেষকদের দাবি, মধ্যাহ্নভোজে এ ব্যাপারে ট্রাম্পকে সবুজ সঙ্কেত দেন মুনির। ফলে তাঁর উপর বেজায় খুশি হন যুক্তরাষ্ট্রের বর্ষীয়ান প্রেসিডেন্ট। পরবর্তী সময়ে একাধিক বার হোয়াইট হাউস সফর করেন ইসলামাবাদের ‘সিপাহসালার’। শুধু তা-ই নয়, প্রতি বারই ওয়াশিংটনকে বিভিন্ন ধরনের ‘প্রলোভন’ দেখিয়েছেন তিনি। এর মধ্যে অন্যতম হল দক্ষিণ-পশ্চিম পাক প্রদেশ বালোচিস্তানের বিপুল বিরল খনিজের ভান্ডার। এর জন্য আমেরিকার লগ্নি টানতেও কিছুটা সফল হয়েছেন তিনি।
হোয়াইট হাউসের মধ্যাহ্নভোজের পর থেকেই প্রকাশ্যে মুনিরের প্রশংসা করতে থাকেন ট্রাম্প। কখনও তাঁকে ‘অসাধারণ মানুষ’ বা ‘মহান যোদ্ধা’ বলেছেন। আবার কিছু ক্ষেত্রে তাঁর সম্পর্কে ‘আমার প্রিয় ফিল্ড মার্শাল’ শব্দবন্ধও ব্যবহার করতে দেখা গিয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে। বছর ঘুরতেই এই নিয়ে ভুরু কোঁচকাতে শুরু করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের দুঁদে গোয়েন্দারা। তাঁদের দাবি, ইসলামাবাদের সিডিএফকে বিশ্বাস করে ভুল করছেন ‘পোটাস’ (প্রেসিডেন্ট অফ দ্য ইউনাইটেড স্টেটস)।
সম্প্রতি, যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রিয় গণমাধ্যম ফক্স নিউজ় ডিজিটালকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এই বিষয়ে মুখ খোলেন সামরিক নজরদার সংস্থা ‘ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অফ ডেমোক্রেসি’-এর সিনিয়র ফেলো বিল রোগিয়ো। তাঁর কথায়, ‘‘কোনও অবস্থাতেই ট্রাম্পের পাকিস্তানকে বিশ্বাস করা উচিত নয়। কারণ, অতীতে আফগানিস্তানের যুদ্ধে পিঠে ছুরি বসানো বন্ধুর ভূমিকা পালন করেছে ইসলামাবাদ। আমাদের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে তালিবানকে সমর্থন জুগিয়ে গিয়েছে তারা। ইরানের ক্ষেত্রেও তেমনই মতলব রয়েছে মুনিরের।’’
প্রায় একই সুর শোনা গিয়েছে অবসরপ্রাপ্ত পাক সেনাকর্তা আহমেদ সইদের গলাতেও। তিনি জানিয়েছেন, ইরানের মূল ফৌজ ‘ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর’ বা আইআরজিসির বহু কমান্ডারের সঙ্গে ব্যক্তিগত সুসম্পর্ক রয়েছে মুনিরের। তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন কুর্দ ফোর্সের সাবেক জেনারেল কাসেম সুলেমানি। ২০২০ সালে ইরাকে ড্রোন হামলায় তাঁকে হত্যা করে মার্কিন ফৌজ।
এ ছাড়া আইআরজিসির কমান্ডার হুসেন সালামির কথাও বলা যেতে পারে। গত বছরের (২০২৫ সাল) জুনে ইজ়রায়েলি বিমানহানায় মৃত্যু হয় তাঁর। বিশ্লেষকদের দাবি, বর্তমানে তেহরান এবং ওয়াশিংটনের মধ্যে দু’নৌকায় পা দিয়ে চলার চেষ্টা করছেন মুনির। তাঁর উদ্দেশ্য হল, সাহায্যের নাম করে ট্রাম্পের থেকে কোটি কোটি ডলার হাতিয়ে নেওয়া। এই অর্থ আগামী দিনে পাক জঙ্গি সংগঠনগুলিকে ফুলেফেঁপে উঠতে সাহায্য করবে। পাশাপাশি, গোপনে ইরানি ফৌজকে মদত জুগিয়ে লড়াই চালু রাখতে চাইছেন তিনি।
সামরিক নজরদার সংস্থা ‘ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অফ ডেমোক্রেসি’ অবশ্য মনে করে, মুনিরের দিক থেকে এ রকম করার নেপথ্যে একাধিক কারণ রয়েছে। প্রথমত, গোড়া থেকেই ইজ়রায়েলের ধ্বংস চেয়ে আসছেন তিনি। দ্বিতীয়ত, পাক ফৌজে শিয়া মুসলিমের সংখ্যা নেহাত কম নয়। ফলে ইরানের বিরুদ্ধে গেলে সেনা-বিদ্রোহের মুখে পড়তে হতে পারে তাঁকে। তৃতীয়ত, মার্কিন অর্থানুকূল্য পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন আর্থিক দিক থেকে চরম সঙ্কটে থাকা ইসলামাবাদের ফিল্ড মার্শাল।
সাক্ষাৎকারে বিল জানিয়েছেন, সেই কারণেই ইরান-আমেরিকা শান্তিবৈঠকে বার বার জোর দিচ্ছেন মুনির। সেনা পোশাকেই তেহরান সফর করতে দেখা যাচ্ছে তাঁকে। পাশাপাশি, ট্রাম্পের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলছেন তিনি। অন্য দিকে ইহুদিদের বিরুদ্ধে বিষ উগরে চলেছে পাক প্রশাসন। আর তাই এ বছরের এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে ইজ়রায়েলকে ‘ক্যানসার রাষ্ট্র’ বলে তোপ দাগেন ইসলামাবাদের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খোয়াজ়া আসিফ।
সামরিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন, ইরান যুদ্ধে পাক ফৌজের সাহায্য চেয়ে ট্রাম্প যে চাপ তৈরি করতে পারেন, তার ইঙ্গিত আগেই পেয়ে যান ইসলামাবাদের ফিল্ড মার্শাল। আর তাই প্রতিবেশী আফগানিস্তানের সঙ্গে পায়ে পা লাগিয়ে ঝগড়া করতে দেরি করেননি তিনি। মুনিরের নির্দেশে ফেব্রুয়ারিতেই হিন্দুকুশের কোলের দেশটিতে হামলা শুরু করে রাওয়ালপিন্ডির বিমানবাহিনী। এতে এক ঢিলে দুই পাখি মারতে সক্ষম হন পশ্চিমের প্রতিবেশীর সেনা সর্বাধিনায়ক।
গত ফেব্রুয়ারিতে পাকিস্তান-আফগানিস্তান যুদ্ধ শুরু করে ইরানের দিকে নজর দেওয়া সম্ভব নয় বলে ট্রাম্পকে বুঝিয়ে দেন মুনির। তা ছাড়া এই চালে সৈনিক বিদ্রোহ আটকে দিতেও সক্ষম হন তিনি। ইসলামাবাদের ফিল্ড মার্শালের এ-হেন দু’মুখো নীতি ধরে ফেলতে ইজ়রায়েলের বেশি সময় লাগেনি। আর তাই ইরানের শান্তিবৈঠকের মধ্যস্থতাকারী হিসাবে ভারতের পশ্চিমের প্রতিবেশীর গ্রহণযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে তেল আভিভ।
মুনিরের উপর আরও একটি কারণে সন্দেহ দানা বেঁধেছে মার্কিন গোয়েন্দাদের। ২০১৮-’১৯ আর্থিক বছরে আট মাসের জন্য পাক গুপ্তচর সংস্থা ইন্টার সার্ভিসেস ইনটেলিজেন্সের (আইএসআই) প্রধান হিসাবে নিযুক্ত ছিলেন তিনি। ওই সময় আইআরজিসির গুপ্তচর ও গোয়েন্দা বাহিনীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ গড়ে ওঠে তাঁর। নীতিগত ভাবে প্যালেস্টাইনপন্থী বিদ্রোহী গোষ্ঠী গাজ়ার হামাস, লেবাননের হিজ়বুল্লা এবং ইয়েমেনের হুথিদের প্রতি চূড়ান্ত সমর্থন রয়েছে ইসলামাবাদের ফিল্ড মার্শালের।
প্যালেস্টাইনপন্থী এই তিন বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে আমেরিকা ও ইজ়রায়েলের চরম শত্রু বললে অত্যুক্তি হবে না। আর তাই মুনিরের প্রতি ট্রাম্পের ‘দুর্বলতা’ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন যুক্তরাষ্ট্রের আমজনতাও। ২০২৩ সালে এই সংক্রান্ত একটি সমীক্ষায় স্পষ্ট হয়ে যায় সেই ছবি। সেখানে ভারতকে ‘বন্ধু’ রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দিয়েছেন ৫৭ শতাংশ মার্কিন নাগরিক। পাকিস্তান পেয়েছে ২৮ শতাংশের সমর্থন।
একই সমীক্ষায় ৪০ শতাংশ আমেরিকাবাসী ‘শত্রু’ দেশ হিসাবে পাকিস্তানকে চিহ্নিত করেছেন। অন্য দিকে ভারতকে ‘দুশমন’ মনে করেন মাত্র ১১ শতাংশ মার্কিন। সেখানেও আবার রয়েছে নীতিগত পার্থক্য। যুক্তরাষ্ট্রের বাসিন্দাদের চোখে শান্তিভঙ্গকারী এবং সন্ত্রাসবাদ ছড়ানো রাষ্ট্র হিসাবে উঠে এসেছে ইসলামাবাদ। নয়াদিল্লির সঙ্গে শত্রুতা কেবলমাত্র অর্থনৈতিক কারণে বলে জানিয়েছেন তাঁরা।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভয়ঙ্কর জঙ্গি হামলা চালায় আল কায়দা। যাত্রিবাহী বিমান ছিনতাই করে নিউ ইয়র্কের ‘বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা’র (ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার) জোড়া গগনচুম্বী ইমারতে ফিদায়েঁ আক্রমণ শানায় তারা। এ ছাড়া একটি উড়োজাহাজ আছড়ে পড়ে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ দফতরের (ডিপার্টমেন্ট অফ ওয়ার) সদর কার্যালয় পেন্টাগনেও।
ওই ঘটনার বদলা নিতে আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান শুরু করে আমেরিকা। এর সাঙ্কেতিক নাম ছিল ‘অপারেশন এন্ডুয়েরিং ফ্রিডম’। ওই সময় স্থলবেষ্টিত ‘কাবুলিওয়ালার দেশে’ হামলা চালাতে নিজেদের সমুদ্রবন্দর এবং আকাশসীমা খুলে দেয় পাকিস্তান। ইসলামাবাদের কুর্সিতে তখন ছিলেন জেনারেল পারভেজ় মুশারফ।
মার্কিন গোয়েন্দাদের দাবি, ‘অপারেশন এন্ডুয়েরিং ফ্রিডম’ চলাকালীন তলায় তলায় আফগান যোদ্ধাদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে গিয়েছিল পাক ফৌজ ও আইএসআই। আর তাই লাদেনকে নিকেশ করতে তোরাবোরা পাহাড়ে ব্যাপক বোমাবর্ষণ করেও কোনও লাভ হয়নি। উল্টে পঠানদের চোরগোপ্তা হামলায় প্রাণ যায় বহু আমেরিকান সৈনিকের।
২০১১ সালের ২ মে পাকিস্তানের অ্যাবটাবাদে কমান্ডো অভিযান চালিয়ে লাদেনকে নিকেশ করে যুক্তরাষ্ট্র। সেই অভিযানের সাঙ্কেতিক নাম ‘অপারেশন নেপচুন স্ফিয়ার’ রেখেছিল পেন্টাগন। পরবর্তী কালে আল কায়দার শীর্ষনেতার লুকিয়ে থাকার বিষয়টি জানা ছিল না বলে সাফাই দেয় পাক ফৌজ। বিষয়টি নিয়ে সন্দেহপ্রকাশ করেন অধিকাংশ মার্কিন গোয়েন্দাই।
আর তাই ইরানের ক্ষেত্রেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হওয়ার আশঙ্কা থাকছে বলে সতর্ক করেছেন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকেরা। যদিও কোনও কিছুকেই সে ভাবে পাত্তা দিচ্ছেন না ট্রাম্প। তেহরানের সংঘর্ষবিরতির জন্য ইসলামাবাদ সফরের ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। তাঁর ক্রিপ্টো ব্যবসার দেখভাল মুনির করছেন বলেই কি এই ভালবাসা? জবাব দেবে সময়।