India’s Best Weapons

ব্রহ্মস থেকে স্কাইস্ট্রাইকার, যুদ্ধ আর রক্তের স্বাদ পাওয়া ভারতীয় মারণাস্ত্রের চাহিদা বাড়ছে! তালিকায় আর কী কী?

পাকিস্তানের সঙ্গে সংঘাতে নজরকাড়া পারফরম্যান্স করেছে একাধিক ভারতীয় মারণাস্ত্র। ফলে অস্ত্রের বাজারে এ দেশের হাতিয়ারের চাহিদা বাড়ছে। তাই প্রতিরক্ষা ব্যবসা থেকে বিপুল লাভের সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ১৫ মে ২০২৫ ০৭:৫৯
Share:
০১ ১৯

‘অপারেশন সিঁদুর’ এবং তাকে কেন্দ্র করে পাকিস্তানের সঙ্গে ছোটখাটো ‘যুদ্ধে’ ভারতের প্রাপ্তি কতটা? এই নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণের মধ্যেই প্রকাশ্যে আসছে একটি শব্দবন্ধ। সেটা হল ‘মেড ইন ইন্ডিয়া ওয়েপন’ বা দেশের মাটিতে তৈরি হাতিয়ার। সংশ্লিষ্ট অস্ত্রগুলির আঘাতে ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’ দশা হয়েছে ইসলামাবাদের। আর তাই জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে এর উল্লেখ করতে ভোলেননি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।

০২ ১৯

স্বাধীনতার পর থেকে অস্ত্র আমদানির দিকেই বেশি নজর দিয়েছে নয়াদিল্লি। ক্ষমতায় আসার পর থেকে হাতিয়ার নির্মাণে আত্মনির্ভর হওয়ার স্লোগান তোলেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। শুধু তা-ই নয়, অস্ত্র রফতানির উপরেও জোর দেয় কেন্দ্র। কিন্তু, ভারতের মাটিতে তৈরি হাতিয়ার কোনও যুদ্ধে সে ভাবে ব্যবহার না হওয়ায় বিশ্ব বাজারে সেগুলির তেমন কদর কখনওই দেখা যায়নি। ‘অপারেশন সিঁদুর’ পরবর্তী সময়ে সেই মানসিকতায় আমূল বদল আসতে চলেছে বলে মনে করছেন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকেরা।

Advertisement
০৩ ১৯

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-’২৪ আর্থিক বছরে ২,৫৩৯ কোটি টাকার হাতিয়ার রফতানি করে নয়াদিল্লি। গত অর্থবর্ষে (পড়ুন ২০২৪-’২৫) সেই অঙ্ক বেড়ে দাঁড়ায় ২৩ হাজার ৬২২ কোটি টাকা। শতাংশের বিচারে যা ১২.০৪। কিন্তু তার পরেও কেন্দ্রের ঠিক করা লক্ষ্যমাত্রায় অস্ত্র ব্যবসাকে নিয়ে যাওয়া যায়নি। চলতি আর্থিক বছরে সেই লক্ষ্য পূরণ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। কারণ, লড়াইয়ের ময়দানে ভাল পারফরম্যান্স করায় সংশ্লিষ্ট হাতিয়ারগুলির চাহিদা উত্তরোত্তর বাড়ছে বলে ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছে।

০৪ ১৯

এই তালিকায় প্রথমেই থাকবে আকাশ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা। সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি এই হাতিয়ারটি পাকিস্তানের ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্র হামলা রুখে দিতে বহুল পরিমাণে ব্যবহার হয়েছে বলে সূত্র মারফত মিলেছে খবর। এ ছাড়া ইসলামাবাদের যুদ্ধবিমান ধ্বংস করতে এটি ব্যবহার হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। আকাশ ক্ষেপণাস্ত্রের নকশা তৈরি করেছে ভারতের প্রতিরক্ষা গবেষণা সংস্থা ডিআরডিও (ডিফেন্স রিসার্চ ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজ়েশন)।

০৫ ১৯

২০২২ সালে মোট ১৫ ইউনিট আকাশ ক্ষেপণাস্ত্র কিনতে নয়াদিল্লির সঙ্গে আনুমানিক ছ’হাজার কোটি টাকার প্রতিরক্ষা চুক্তি করে আর্মেনিয়া। এর প্রতি ইউনিটে থাকে চারটি করে লঞ্চার এবং তিনটি করে ক্ষেপণাস্ত্র। চুক্তি মেনে গত বছরের নভেম্বরে হাতিয়ারটির প্রথম ব্যাচ এককালের সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্গত মধ্য এশিয়ার দেশটিকে সরবরাহ করে মোদী সরকার। বিশ্লেষকদের দাবি, আগামী দিনে আরও অনেক দেশ ভারতের থেকে এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা কিনবে।

০৬ ১৯

আকাশ ক্ষেপণাস্ত্র কেনার ব্যাপারে ইতিমধ্যেই আগ্রহ প্রকাশ করেছে ফিলিপিন্স, মিশর, ভিয়েতনাম এবং ব্রাজ়িল। অচিরেই এই দেশগুলির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হাতিয়ারটি নিয়ে প্রতিরক্ষা চুক্তি হতে পারে। এতে রয়েছে মাঝারি পাল্লার ভূমি থেকে আকাশ (সারফেস টু এয়ার) ক্ষেপণাস্ত্র। লক্ষ্যবস্তুকে চিহ্নিত করতে বিশেষ ধরনের একটি রেডার যুক্ত রয়েছে এই ব্যবস্থায়। সংশ্লিষ্ট ক্ষেপণাস্ত্রগুলির পাল্লা ২৫ থেকে ৩০ কিলোমিটার বলে জানা গিয়েছে।

০৭ ১৯

ডিআরডিও জানিয়েছে, দু’ভাবে লক্ষ্যবস্তুকে আঘাত করতে পারে আকাশ ক্ষেপণাস্ত্র। ট্র্যাকিং মোডে এটি একসঙ্গে ৬৪টি টার্গেটকে মাঝ-আকাশে ধ্বংস করতে সক্ষম। আবার সক্রিয় মোডে ১২টি লক্ষ্যবস্তুকে নিশানা করতে পারে আকাশ। ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাটি তুলনামূলক ভাবে সস্তা হওয়ায় আফ্রিকার কিছু দেশও এটি কিনতে আগ্রহী। এর নির্মাণকারী সংস্থা হল ভারত ইলেকট্রনিক্স লিমিটেড এবং ভারত ডায়নামিক্স লিমিডেট।

০৮ ১৯

১৯৮০-র দশকে ঘরোয়া প্রযুক্তিতে ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির উপর জোর দেয় ভারত। সেই প্রকল্পের আওতায় ডিআরডিওর বিজ্ঞানীদের হাতে জন্ম হয় আকাশ ক্ষেপণাস্ত্রের। এ ছাড়া পাকিস্তানের সঙ্গে স্বল্প পরিসরের ‘যুদ্ধে’ এই প্রতিষ্ঠানের তৈরি ডি-ফোর ব্যবস্থাটি খুবই কাজে এসেছে বলে জানা গিয়েছে। এর সাহায্যে তুরস্কের ড্রোনের হামলা ঠেকিয়ে দেয় সেনা। যদিও এই নিয়ে সরকারি ভাবে কোনও বিবৃতি দেওয়া হয়নি।

০৯ ১৯

ডি-ফোরের নির্মাণকারী সংস্থাও ভারত ইলেকট্রনিক্স। একে এককথায় ‘ড্রোন-কিলার’ হাতিয়ার বলা যেতে পারে। মূলত দু’ভাবে মানববিহীন উড়ুক্কু যান ধ্বংস করে এটি। প্রথম পদ্ধতিটি হল জিপিএস স্পুফিং। এর সাহায্যে ড্রোনকে ভুল পথে চালিত করে ডি-ফোর। জ্যাম করে মানববিহীন যানের রেডিয়ো ফ্রিকোয়েন্সি। দ্বিতীয়টি হল, লেজ়ার গাইডেড গুলি ছুড়ে মাঝ-আকাশে ড্রোনকে উড়িয়ে দেওয়া।

১০ ১৯

আধুনিক লড়াইয়ে ড্রোনের ভূমিকা অপরিসীম। বর্তমানে শত্রুসৈন্যকে বিপাকে ফেলতে একসঙ্গে একঝাঁক ড্রোন পাঠানোর রেওয়াজ চালু হয়েছে। ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর পর সেই রাস্তা ধরে পাক ফৌজও। জম্মু-কাশ্মীর, পঞ্জাব, রাজস্থান এবং গুজরাত সীমান্তে ঝাঁকে ঝাঁকে সোয়ার্ম ড্রোন পাঠিয়ে হামলা চালায় তাঁরা। যদিও তাতে তেমন লাভ হয়নি। অধিকাংশ ড্রোনকে মাঝ-আকাশে ধ্বংস করে ভারতের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।

১১ ১৯

আর সেই ছবি প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই ভারত ইলেকট্রনিক্সের ‘ড্রোন-কিলার’ ডি-ফোরের চাহিদা যে কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই ইস্যুতে সম্প্রতি মুখ খোলেন ডিআরডিওর প্রাক্তন চেয়ারম্যান জি সতীশ রেড্ডি। তাঁর কথায়, ‘‘আমাদের ড্রোন প্রতিরোধ ব্যবস্থাগুলি যে ভাবে কাজ করেছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। আশা করছি, এটা অনেককে আকর্ষণ করবে। সে ক্ষেত্রে অস্ত্র ব্যবসার দুনিয়ায় দেশীয় সংস্থাগুলির সুনাম অর্জনে সুবিধা হবে।’’

১২ ১৯

বিশ্লেষকদের দাবি, অস্ত্রের বাজারে অবশ্যই আলাদা জায়গা করে নেবে ‘স্কাইস্ট্রাইকার’ আত্মঘাতী ড্রোন। সূত্রের খবর, ‘অপারেশন সিঁদুর’-এ পাকিস্তান এবং পাক অধিকৃত জম্মু-কাশ্মীরে (পাকিস্তান অকুপায়েড জম্মু-কাশ্মীর বা পিওজেকে) মোট ন’টি জঙ্গিঘাঁটি গুঁড়িয়ে দিতে এই ড্রোন ব্যবহার করেছে ভারতীয় বায়ুসেনা। ইসলামাবাদের হাতে থাকা চিনের তৈরি এইচকিউ-৯পি নামের ‘আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা’ (এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম) একে চিহ্নিত করতে ব্যর্থ হয়।

১৩ ১৯

‘স্কাইস্ট্রাইকার’-এর নির্মাণকারী সংস্থা হল আদানি গোষ্ঠীর বেঙ্গালুরুভিত্তিক সংস্থা আলফা ডিজ়াইন। ইজ়রায়েলি সংস্থা এলবিট সিকিউরিটিজ়ের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে এটিকে তৈরি করেছে তারা। বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, চলতি আর্থিক বছরে অস্ত্র বিক্রির ক্ষেত্রে ড্রোনকে প্রথম সারিতে রাখবে ভারত। আর সেখানে অবশ্যই নাম থাকবে ‘স্কাইস্ট্রাইকার’-এর।

১৪ ১৯

এ ছাড়া নাগাস্ত্র-১ নামের আরও একটি আত্মঘাতী ড্রোনের চাহিদা হাতিয়ারের বাজারে বাড়তে চলেছে বলে মনে করা হচ্ছে। সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি এটি হল ভারতের প্রথম আত্মঘাতী মানববিহীন যান। তবে এর পাল্লা খুব বেশি নয়। নাগপুরের সংস্থা সোলার ইন্ডাস্ট্রিজ় এর নির্মাণকারী সংস্থা।

১৫ ১৯

তবে হাতিয়ারের বাজারে সবচেয়ে বড় জায়গা পেতে পারে ব্রহ্মস সুপারসনিক ক্রুজ় ক্ষেপণাস্ত্র। সূত্রের খবর, এর সাহায্যে পাকিস্তানের একাধিক বায়ুসেনাঘাঁটিকে গুঁড়িয়ে দেয় ভারতীয় বিমানবাহিনী। রুশ সংস্থা এনপিও মাশিনোস্ট্রোয়েনিয়ার সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে সংশ্লিষ্ট ক্ষেপণাস্ত্রটিকে তৈরি করেছে ডিআরডিও। এর নির্মাণকারী সংস্থা হল ব্রহ্মস অ্যারোস্পেস লিমিটেড।

১৬ ১৯

গত ১১ মে লখনউয়ে ব্রহ্মসের নতুন কারখানার উদ্বোধন করেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংহ। সেখানে হাজির ছিলেন উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ। পাক বায়ুসেনার ছাউনিগুলিতে সংশ্লিষ্ট ক্রুজ় ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলার প্রসঙ্গটি তিনিই তোলেন। যদিও সেনার তরফে এই নিয়ে কোনও বিবৃতি দেওয়া হয়নি।

১৭ ১৯

বর্তমানে তিন ধরনের ব্রহ্মস ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ভারতীয় ফৌজ। তার মধ্যে রয়েছে স্থলভাগ এবং যুদ্ধবিমান থেকে ছোড়ার ক্রুজ় ক্ষেপণাস্ত্র। এ ছাড়া রণতরীর জন্য আলাদা ধরনের ব্রহ্মস রয়েছে। সেগুলি মূলত ডেস্ট্রয়ার শ্রেণির যুদ্ধজাহাজে ব্যবহার করে ভারতীয় নৌবাহিনী।

১৮ ১৯

২০২২ সালে ব্রহ্মস কিনতে নয়াদিল্লির সঙ্গে ৩৭ কোটি ৫০ লক্ষ ডলারের প্রতিরক্ষাচুক্তি করে ফিলিপিন্স। সেইমতো ইতিমধ্যেই এই ক্ষেপণাস্ত্রটির দু’টি ব্যাচ দক্ষিণ চিন সাগরের দেশটিতে পাঠিয়েছে কেন্দ্র। ইন্দোনেশিয়া, পশ্চিম এশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একাধিক দেশ সংশ্লিষ্ট হাতিয়ারটি কিনতে আগ্রহ দেখিয়েছে বলে জানা গিয়েছে।

১৯ ১৯

বিশ্লেষকদের অবশ্য দাবি, বিশ্বের অস্ত্রের বাজারে পা জমানোর ক্ষেত্রে ভারতের একটা সমস্যা রয়েছে। ‘অপারেশন সিঁদুর’ এবং তার পরবর্তী সময়ে চলা সংঘর্ষে ব্যবহার হওয়া অধিকাংশ হাতিয়ারই যৌথ উদ্যোগে তৈরি করেছে নয়াদিল্লি। ফলে সেগুলি বিক্রির ক্ষেত্রে অনেক ক্ষেত্রেই রাশিয়া বা ইজ়রায়েলের অনুমতি নিতে হতে পারে। প্রতিরক্ষাচুক্তির ক্ষেত্রে এটা বড় বাধা হতে পারে বলে মনে করছেন তাঁরা।

সব ছবি: সংগৃহীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement