Ahmed Al-Sharaa

ইরান যুদ্ধে ইউরোপের ত্রাতা হতে কেন মরা পাইপলাইনের ‘কঙ্কাল’ বার করতে মরিয়া সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট, প্রাক্তন আল কায়দা নেতা?

আহমদ আল-শারা। সিরিয়ার বর্তমান প্রেসিডেন্ট। সম্প্রতি জার্মান চ্যান্সেলরের সঙ্গে বৈঠক করে খবরের শিরোনামে উঠে এসেছেন। কিন্তু কে এই আহমদ?

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ০৩ এপ্রিল ২০২৬ ০৭:৫৩
Share:
০১ ২০

সিরিয়ার মরুভূমির নীচে চাপা পড়ে রয়েছে একটি পাইপলাইন, যা বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সঙ্কটের মধ্যে যুঝতে থাকা ইউরোপকে জ্বালানি সরবরাহ করত। অপরিশোধিত তেল আসত সেই পাইপ দিয়ে। তবে গত ৪০ বছরে এক ফোঁটা তেলও ওই পাইপলাইন দিয়ে যায়নি। বর্তমানে সেই পাইপলাইন আবার চালু করতে উঠেপড়ে লেগেছেন এক জন।

০২ ২০

তিনি আহমদ আল-শারা। সিরিয়ার বর্তমান প্রেসিডেন্ট। সম্প্রতি জার্মান চ্যান্সেলরের সঙ্গে বৈঠক করে খবরের শিরোনামে উঠে এসেছেন। কিন্তু কে এই আহমদ? কেন মরুভূমির গর্ভ থেকে পুরনো পাইপলাইন খুঁড়ে আবার তা চালু করতে চান তিনি?

Advertisement
০৩ ২০

তিন বছর আগে পর্যন্ত আমেরিকার সন্ত্রাসবাদী নজরদারি তালিকায় নাম ছিল আহমদের। তাঁর উপর নিষেধাজ্ঞাও চাপানো ছিল। কারণ, জঙ্গি সংগঠন আল কায়দার প্রাক্তন নেতা তিনি। ইরাকের কুখ্যাত আবু ঘ্রাইব জেলে একসময় বন্দিও ছিলেন তিনি।

০৪ ২০

প্রায় দেড় দশকের গৃহযুদ্ধের পর ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বাশার আল-আসাদের সরকারকে উৎখাত করে সিরিয়ার রাজধানী দামাস্কাস দখল করেছিল বিদ্রোহী গোষ্ঠী হায়াত তাহরির আল-শাম (এইচটিএস) এবং তাদের সহযোগী ‘জইশ আল-ইজ্জা’র যৌথবাহিনী। একসময় নুসরা ফ্রন্ট নামে পরিচিত এই এইচটিএস প্রায় দেড় দশক ধরে সিরিয়ায় আল-কায়েদার সহযোগী ছিল। কয়েক বছর আগে তারা আল-কায়দার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে।

০৫ ২০

ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট আসাদ প্রাণ বাঁচাতে সিরিয়া ছেড়ে রাশিয়ায় চলে যান। এর পরে বিদ্রোহী গোষ্ঠীর শীর্ষনেতা আবু মুহাম্মদ আল-জোলানি অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের কথা ঘোষণা করেন। সিরিয়ার অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হন আহমদ। প্রধানমন্ত্রী হন আর এক বিদ্রোহী নেতা মহম্মদ আল-বশির।

০৬ ২০

প্রেসিডেন্ট হওয়ার পরেই সিরিয়ার সংবিধানকে বাতিল ঘোষণা করেছিলেন আহমদ। গত বছর সৌদি আরবের রিয়াধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গেও দেখা করেছিলেন তিনি।

০৭ ২০

সে সময় সিরিয়ার অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান আহমেদের উপর থেকে সমস্ত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নিয়েছিল রাষ্ট্রপুঞ্জ। ১৫ সদস্যের রাষ্ট্রপুঞ্জ নিরাপত্তা পরিষদের ১৪টি দেশই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পক্ষে সায় দেয়। তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে একমাত্র চিন ভোটদানে বিরত থেকেছিল। রাষ্ট্রপুঞ্জের এই সিদ্ধান্তের ফলে সিরিয়ায় সংখ্যালঘু শিয়া এবং দ্রুজদের উপর সুন্নি জঙ্গি-শাসকদের অত্যাচারের মাত্রা আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছিল।

০৮ ২০

প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগে সিরিয়ার নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে যানবাহনের উপর কর নেওয়ার জন্য টোল বুথ চালাতেন আহমদ। সেই থেকে বিপুল অর্থ উপার্জন করেন তিনি। সেই টাকা দিয়ে নিজস্ব সেনাবাহিনীও গড়ে তোলেন।

০৯ ২০

বিশেষজ্ঞদের দাবি, মতাদর্শ দিয়ে সিরিয়া দখল করেননি আহমদ। তিনি সিরিয়া দখল করেছেন পণ্যের চাহিদা পূরণ করে। আর তার জন্য ঢেলেছেন টাকা। এখন প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর তাঁর চিন্তাভাবনার স্তর আরও এক ধাপ এগিয়েছে।

১০ ২০

১৯৪৭ সাল। বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী ইউরোপ তখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। জ্বালানি সঙ্কট দেখা গিয়েছে সমগ্র ইউরোপ জুড়ে। সেই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে উঠেপড়ে লাগে মহাদেশটি। সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসে সৌদি আরব।

১১ ২০

কাজ শুরু করে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় জ্বালানি এবং রাসায়নিক প্রতিষ্ঠান আরামকো (সৌদি আরবের তেল সংস্থা)। তিন বছর ধরে মরুভূমি, পর্বত কেটে সৌদির তেলক্ষেত্র থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত একটি পাইপলাইন বসান ১৬ হাজার কর্মী।

১২ ২০

১৬৪৮ কিলোমিটারের সেই ইস্পাতের পাইপলাইনের নাম দেওয়া হয় ‘ট্যাপলাইন’। সেই সময় এটি ছিল বিশ্বের দীর্ঘতম পাইপলাইন। সুয়েজ এড়িয়ে দিনে পাঁচ লক্ষ ব্যারল অপরিশোধিত তেল সরবরাহ করা শুরু হয় এই পাইপলাইন দিয়ে।

১৩ ২০

কিন্তু পরে যুদ্ধ, রাজনীতি এবং সস্তায় তেলবাহী জাহাজের রমরমা ওই পাইপলাইনের প্রভাবকে কম করতে থাকে। ১৯৯০ সাল নাগাদ ট্যাপলাইন দিয়ে তেল সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।

১৪ ২০

রাশিয়া থেকে প্রাকৃতিক গ্যাস পশ্চিম ইউরোপে সরবরাহ করার জন্য একই রকম ভাবে ‘নর্ড স্ট্রিম’ নামে একটি পাইপলাইন তৈরি করা হয়েছিল। মনে করা হয়েছিল অর্থনৈতিক সহাবস্থান দু’পক্ষের মধ্যে শান্তি বজায় রাখবে।

১৫ ২০

কিন্তু ইউক্রেন এবং রাশিয়ার মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ওই পাইপলাইন দিয়ে প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দেয় মস্কো। আবার জ্বালানি সঙ্কটের মধ্যে পড়ে ইউরোপ। ১ লক্ষ কোটি ইউরোরও বেশি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ে মহাদেশটি।

১৬ ২০

সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমদ আল-শারা নিজের দেশের ইতিহাস জানেন। ইউরোপের দুর্বলতাও জানেন। জ্বালানির জন্য মূলত অন্যদের উপরেই নির্ভর করে থাকতে হয় ইউরোপকে।

১৭ ২০

এখন ইউরোপকে জ্বালানির জন্য শুধু অন্যের পরিকাঠামোর উপর নির্ভরতা থেকে বার করে আনারই প্রস্তাব দিচ্ছেন না আহমদ, ইউরোপকে নিজের পরিকাঠামো ব্যবহারের প্রস্তাব দিচ্ছেন তিনি।

১৮ ২০

সিরিয়ার যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠনের জন্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ প্রয়োজন। এখন সিরিয়ার নেতৃত্বের দাবি, ভূমধ্যসাগর হয়ে ইউরোপে পশ্চিম এশিয়ার জ্বালানি সরবরাহের দায়িত্ব নেবে তারা। ফলে আমেরিকা-ইজ়রায়েল এবং ইরানের সংঘাতের কারণে অবরুদ্ধ হরমুজ় প্রণালী এবং অস্থিতিশীল লোহিত সাগরকে এড়িয়ে ইউরোপে জ্বালানি পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে।

১৯ ২০

এর জন্য ইরাক (কিরকুক-বানিয়াস) এবং সৌদি আরবের (ট্যাপলাইন) মধ্য দিয়ে পরিত্যক্ত পাইপলাইনগুলো পুনরায় চালু করা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন আহমদ। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক একটি প্ল্যাটফর্মে এই প্রস্তাব দিয়েছেন আহমদ। সিরিয়ার প্রেসিডেন্টের সেই প্রস্তাবে ইতিমধ্যেই জার্মানি কিছুটা আগ্রহ দেখিয়েছে বলে খবর।

২০ ২০

যদিও এই পাইপলাইন পুনরায় চালু করলেও চাহিদার কারণে তা কোনও ভাবেই উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আসা সমস্ত তেল এবং অন্যান্য জ্বালানি সরবরাহের বিকল্প হবে না বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞেরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সিরিয়াকে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় প্রমাণ করতে উঠেপড়ে লেগেছেন সে দেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান তথা প্রাক্তন আল কায়দা নেতা। একই সঙ্গে তাঁর লক্ষ্য, সিরিয়ার পকেট ভরানো। ফলে তাঁর প্রস্তাব কতটা মান্যতা পাবে বা ফলপ্রসূ হবে, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের অনেকেই সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।

সব ছবি: সংগৃহীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement