এক বছরেরও বেশি সময় ধরে ক্রমাগত চরিত্রহননের মুখে পড়ছেন তিনি। কটাক্ষ-বিদ্রুপ-ঘৃণাভাষণের শিকার হচ্ছেন। তাই তিনি যে আধ্যাত্মিক পথে হাঁটার চিন্তাভাবনা করেছিলেন, তা থেকে সরে আসার কথা ভাবছেন। তেমনটাই ঘোষণা করলেন মহাকুম্ভে ভাইরাল নেটপ্রভাবী তথা সাধ্বী হর্ষা রিচারিয়া।
উত্তরাখণ্ডের বাসিন্দা হর্ষা এক জন নেটপ্রভাবী। গত বছর প্রয়াগরাজে আয়োজিত মহাকুম্ভের সময় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন তিনি। নেটপ্রভাবী হর্ষাকে মহাকুম্ভের আসরে সাধ্বীর পোশাকে দেখে হইচই পড়ে গিয়েছিল।
হর্ষার অনুরাগীদের দাবি ছিল, জাগতিক মোহমায়া ছেড়ে শান্তির খোঁজে আধ্যাত্মিকতার পথে পা বাড়িয়েছেন তিনি। যদিও নেটাগরিকদের একাংশের মতে, পুরোটাই ছিল ‘লোকদেখানো’। নিজের অনুরাগীদের সংখ্যা বাড়াতেই তিনি ‘সাধ্বী সেজে’ মহাকুম্ভের মেলায় ঘুরছিলেন।
তবে এ কথা সকলেই স্বীকার করে নিয়েছিলেন যে, সন্ন্যাসিনীর জীবন গ্রহণ করুন বা না করুন, তিনি সত্যিই সুন্দরী। অনেকেই সে সময় তাঁর সৌন্দর্যে মজেছিলেন। তাঁকে নিয়ে কৌতূহলও তৈরি হয়।
কিন্তু কে এই হর্ষা? হর্ষার বাড়ি উত্তরাখণ্ডে। অতীতে সঞ্চালিকা হিসাবে কাজ করতেন এই নেটপ্রভাবী। পরিচয় দিতেন ‘অ্যাঙ্কর হর্ষা’ নামে। সমাজমাধ্যমে নিয়মিত সঞ্চালনার ছবি, ভিডিয়োও পোস্ট করতেন।
হর্ষার দেশ-বিদেশ ভ্রমণের বহু ছবি তাঁর ইনস্টাগ্রামের পাতায় রয়েছে। ২০২৪ সালের নভেম্বরে ব্যাঙ্ককের হুয়া হিন সিটিতে একটি ‘ডেস্টিনেশন’ বিয়ের আয়োজন করেছিলেন হর্ষা। এর পরে মায়ানমারের মান্দালয় শহরেও একটি ‘ডেস্টিনেশন’ বিবাহের আয়োজন করেছিলেন তিনি।
ইনস্টাগ্রামে হর্ষার ফলোয়ারের সংখ্যা ১০ লক্ষেরও বেশি। গত কয়েক বছরে দু’হাজারের বেশি পোস্ট তিনি ইনস্টাগ্রামে ভাগ করে নিয়েছেন। তবে বছর তিনেক আগে সন্ন্যাসিনীর জীবন বেছে নেন হর্ষা। আচার্য মহামণ্ডলেশ্বরের কাছে দীক্ষা নিয়ে সাধ্বী হন তিনি।
তার পর থেকে হর্ষা নিজের পরিচয় দেন ‘সমাজকর্মী এবং হিন্দু সনাতনী সিংহী’ হিসাবে। যদিও এখনও সঞ্চালিকা হিসাবে কাজ করেন তিনি। নেটপ্রভাবী হিসাবেও কাজ করেন।
তবে হর্ষাকে সাধারণত যে সব পোশাকে দেখা যায়, তার থেকে সম্পূর্ণ অন্য রূপে মহাকুম্ভে ধরা দিয়েছিলেন তিনি। সাধ্বীর পোশাক, কপালে তিলক এবং ফুলের মালা পরে রথে চড়ে মহাকুম্ভে পৌঁছেছিলেন নেটপ্রভাবী। পেয়েছিলেন, ‘সবচেয়ে সুন্দরী সাধ্বী’র তকমাও।
মহাকুম্ভে পৌঁছে একটি সাক্ষাৎকারে ৩১ বছর বয়সি নেটপ্রভাবী জানিয়েছিলেন, তিনি সব কিছু ছেড়ে নতুন পোশাক পরেছেন। তিনি বলেছিলেন, ‘‘আমার যা প্রয়োজন, সব ছেড়ে দিয়ে এই পথ গ্রহণ করেছি। আমি অভ্যন্তরীণ শান্তির জন্য একজন সাধ্বীর জীবন বেছে নিয়েছি।’’
হর্ষা আরও জানিয়েছিলেন, দু’বছর ধরে সাধ্বী হিসাবে জীবনযাপন করছিলেন তিনি। তাঁর কথায়, ‘‘অভিনয়, অ্যাঙ্কারিং থেকে বিশ্বভ্রমণ— যখন আপনি জীবনে অনেক কিছু পেয়ে যাবেন, তখন বুঝতে পারবেন যে এর মধ্যে কোনওটাই সত্যিকারের শান্তি আনে না। যখন ভক্তি আকর্ষণ করতে শুরু করে তখন জাগতিক সংযোগ থেকে দূরে সরে যেতে ইচ্ছা করে। নিজেকে প্রার্থনা, স্তোত্র এবং ঈশ্বরের প্রতি ভক্তিতে সমর্পণ করতে ইচ্ছা করে।’’
হর্ষার সাক্ষাৎকারের ভিডিয়ো ভাইরাল হতেই তাঁকে নিয়ে হইচই পড়ে। নেটাগরিকদের অনেকেই তাঁকে সন্ন্যাসিনীর জীবন বেছে নেওয়ার জন্য বাহবা জানিয়েছিলেন। তবে নেটাগরিকদের অন্য একাংশ হর্ষার অতীতের ভিডিয়ো পোস্ট করতে শুরু করেন। তাঁদের দাবি ছিল, হর্ষা সবটাই করছেন খ্যাতি পাওয়ার জন্য। তাঁর এই নতুন রূপ স্রেফ ‘লোকদেখানো’।
হর্ষা এখন দাবি করেছেন, মহাকুম্ভের পর থেকে প্রায় এক বছর ধরে নেটমাধ্যমে ক্রমাগত আক্রমণের শিকার হচ্ছেন তিনি। চরিত্রহনন করা হচ্ছে তাঁর। আর সে কারণেই এ বার আধ্যাত্মিক পথ ছেড়ে বেরিয়ে আসছেন তিনি।
অভিযোগ, গত এক বছর ধরে হর্ষাকে ব্যাপক ট্রোলিং, চরিত্রহনন এবং অযৌক্তিক অভিযোগের শিকার হতে হয়েছে। ডিপফেক ভিডিয়োও বেরিয়েছে তাঁর। আর সে সব কারণেই আধ্যাত্মিকতা থেকে দূরে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা ভেবেছেন তিনি। বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যে ইনস্টাগ্রামে একটি আবেগঘন পোস্টও করেছেন হর্ষা।
ইনস্টাগ্রামে পোস্ট হর্ষা জানিয়েছেন, নেটাগরিকদের নির্যাতনের কারণে মানসিক ভাবে ভেঙে পড়েছেন তিনি। তাঁর চরিত্রের দিকে বার বার আঙুল তোলার বিষয়টি সহ্য করতে পারছেন না। পাশাপাশি প্রশ্ন তুলেছেন, তিনি কোনও ধর্ষক বা চোর নন। কেবল আধ্যাত্মিকতার পথ বেছে নেওয়ার জন্য কেন তাঁকে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে?
ইনস্টাগ্রাম পোস্টে হর্ষা বলেছেন, ‘‘যথেষ্ট হয়েছে। আমি আর সহ্য করতে পারছি না। মানুষের পক্ষে একজন মেয়ের চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলা কত সহজ। আমি সীতা নই যে অগ্নিপরীক্ষা দিয়ে সব কিছু সহ্য করব।’’
নেটপ্রভাবী এ-ও দাবি করেছেন, বার বার অসম্মান এবং নির্যাতন তিনি আর সহ্য করতে চান না। আর্থিক চাপও তাঁর সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেছে। হর্ষা বলেছেন, “মৌনী অমাবস্যার পরে, আমি ধর্মের পথ ছেড়ে আমার আগের পেশায় ফিরে যাব। বিরোধিতা এবং ঋণের কারণে আমি এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছি। যথেষ্ট হয়েছে। আমি আর সহ্য করতে পারছি না। জয় শ্রী রাম। আমি আমার নিজের পথেই হাঁটব।’’
হর্ষার এই সিদ্ধান্তের কারণে স্বাভাবিক ভাবেই দুঃখপ্রকাশ করেছেন তাঁর অনুরাগীরা। অনেকে আবার নেটপ্রভাবীকে আগের রূপে ফিরে পাবেন বলে উচ্ছ্বাসও প্রকাশ করেছেন।