ডেমোক্র্যাটিক পিপল্স রিপাবলিক অফ কোরিয়া বা নর্থ কোরিয়া (উত্তর কোরিয়া)। কিম জং উনের আপন দেশ। ‘শিবঠাকুরের আপন দেশ’-এর মতো সেখানে হাঁচতে গেলে টিকিট কাটতে হয় না ঠিকই, তবে নিয়মকানুন সেখানেও ‘সর্বনেশে’।
উত্তর কোরিয়ার সীমান্তে যেন আস্ত প্রাচীর তৈরি করে রেখেছেন একনায়ক কিম। দেশের ভিতরে কী হচ্ছে না হচ্ছে, তার খুব কম তথ্যই বাইরের দুনিয়া জানতে পারে। আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, কিমের প্রশাসন খুব সতর্ক ভাবে উত্তর কোরিয়ায় তৈরি করেছে ‘অচলায়তন’।
উত্তর কোরিয়ায় কিমের কঠোর অনুশাসন থেকে রেহাই পান না নাগরিকেরা। সকলের জন্যই একগুচ্ছ অদ্ভুত এবং কঠোর নিয়ম বেঁধে দিয়েছেন কিম। তার অন্যথা হওয়ার জো নেই। ২০১০ সাল থেকে উত্তর কোরিয়া শাসন করছেন কিম। দেশে তাঁর কথা ‘বেদবাক্য’। একনায়ক কিমের উপরে আর কেউ কথা বলতে পারেন না। কিমের আগেও দেশটিতে একনায়কতন্ত্র প্রচলিত ছিল।
অভিযোগ, সেখানে হামেশাই লুণ্ঠিত হয় মানবাধিকার। শাসক তাঁর সুবিধা অনুযায়ী দেশ চালান। নিয়ন্ত্রণ করা হয় নাগরিকদের স্বাভাবিক গতিবিধিও। নিয়ম না মানলেই পড়তে হয় কড়া শাস্তির মুখে। বাদ যায় না শিশুরাও।
ফলে এমন দেশ এবং একনায়কতন্ত্রের ফাঁস থেকে মুক্তির পথ খোঁজেন উত্তর কোরিয়ার অনেক নাগরিকই। কেউ পারেন। অনেকেই পারেন না। তবে এক বার উত্তর কোরিয়ার অচলায়তন ভেঙে হইচই ফেলেছিল ন’জনের এক পরিবার। ১০ বছরের দীর্ঘ পরিকল্পনার জেরে দু’ঘণ্টায় মুক্তি পেয়েছিলেন তাঁরা। পালিয়েছিলেন কিমের দেশ ছেড়়ে। কী ভাবে?
২০২৩ সালের ৬ মে-র রাত। একটি পরিবারের ন’জন সদস্য উত্তর কোরিয়ার উপকূল থেকে মাছ ধরার ছোট নৌকায় চড়ে নিঃশব্দে হলুদ সাগরে (ইয়োলো সি) প্রবেশ করেন। দু’ঘণ্টার মধ্যেই তাঁরা উত্তর এবং রিপাবলিক অফ কোরিয়া বা সাউথ কোরিয়ার (দক্ষিণ কোরিয়া) মধ্যকার বিতর্কিত সামুদ্রিক সীমান্ত, নর্দার্ন লিমিট লাইন অতিক্রম করে নিরাপদ দূরত্বে পৌঁছে যান। যে কোনও মানদণ্ডেই এটি ছিল এক অসাধারণ কৃতিত্ব।
তবে তাঁরা এই পরিকল্পনা শুরু করেছিলেন এক দশকেরও বেশি আগে। প্রথমে ওই পরিবারের কর্তা সমুদ্রপথে দেশ ছেড়ে পালানোর প্রস্তাব দেন। কিন্তু তিনি তা পারেননি। তার আগেই মারা যান। অবশেষে এক রাতে তাঁরা যাত্রা শুরু করেন। প্রয়াত কর্তার দুই ছেলে, কিম ইল-হিয়ক এবং কিম ই-হিয়ক পরিবার নিয়ে দেশ ছাড়েন। নৌকায় বহন করে নিয়ে যান বাবার চিতাভস্ম।
প্রথমে কিম ই-হিয়ক উপকূল এলাকায় এসে বসবাস শুরু করেন। মাছ ধরা শেখেন তিনি। নিজের একটি নৌকাও জোগাড় করেন। ঘুষ দিয়ে নীরবে স্থানীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলেন।
এর পর দাদা কিম ইল-হিয়ককেও ডেকে নেন তিনি। দুই ভাই জেলে সেজে বার বার কড়া পাহারায় থাকা সীমান্ত জলসীমার দিকে যাত্রা করেন। কী ভাবে উপকূলরক্ষী বাহিনী টহল দেয়, তা খতিয়ে দেখেন। নজরদারির সময় হিসাব করেন।
প্রতি সমুদ্রযাত্রা থেকে ফিরে তিলে তিলে পালানোর পরিকল্পনা কষতে থাকেন কিম ইল-হিয়ক এবং কিম ই-হিয়ক। সিদ্ধান্ত নেন, এমন ভাবেই পালাবেন যেন, ‘পোড়া দেশে’ আর কখনও ফিরতে না হয়।
দীর্ঘ ১০ বছরের অপেক্ষা এবং পরিকল্পনার পর পরিবারটি ঠিক করে ২০২৩ সালের ৬ মে-র রাতে চুপিচুপি দেশ ছাড়বেন তাঁরা। ওই রাতে বসন্তের এক ঝড় তাঁদের পালানোর জন্য অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি করেছিল। ঝড়ের কারণে সমুদ্রের দৃশ্যমানতা কমে যাওয়ায় টহলদারদের নজরদারিও কমে। ফলে উপকূলের কাছে নৈশপ্রহরীদের ঘুষ দিয়ে রওনা দেয় নয় সদস্যের পরিবার।
পরিবারের মহিলাদের মধ্যে ছিলেন কিম ইল-হিয়কের পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীও। প্রথমে হেঁটে একটি মাইনক্ষেত্র পার হতে হয়েছিল তাঁদের। তবে অনেক আগেই সেই পথ দিয়ে যাওয়ার ছক কষে রেখেছিল পরিবার। মুখস্থ করে রেখেছিল মাইনক্ষেত্রের নকশা।
যাওয়ার সময় পরিবারের চার এবং ছয় বছর বয়সি দু’টি ছোট শিশুকে চটের বস্তার ভিতরে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল এবং পুরো পথ তাদের চুপ করে থাকতে বলা হয়েছিল। এর পর সমুদ্রের কাছে পৌঁছে নৌকায় চড়েন পরিবারের নয় সদস্য।
নৌকা চালাতে শুরু করেন হাঁটার গতির চেয়ে সামান্য বেশি গতিতে। নৌকাটি এতটাই ধীর গতিতে চলছিল যে রাডারে তা এক ভাসমান ধ্বংসাবশেষের মতো দেখাচ্ছিল। সংবাদমমাধ্যম সিএনএন-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, কিম ইল-হিয়ক পরে জানিয়েছিলেন যে, নৌকায় চড়ে পালানোর সময় ইঞ্জিনের শব্দের চেয়ে তাঁর নিজের হৃদস্পন্দনের শব্দ যেন বেশি জোরালো ছিল।
দীর্ঘ ক্ষণ নৌকা চালানোর পর অবশেষে রাতের আকাশে আলোকিত দক্ষিণ কোরিয়ার ইয়নপিয়ং দ্বীপটি দেখতে পান কিম ইল-হিয়ক এবং কিম ই-হিয়ক। এমন সময় দক্ষিণ কোরিয়ার নৌবাহিনীর একটি জাহাজ তাঁদের দিকে এগিয়ে আসে। পরিবারটি নিজেদের পরিচয় দেওয়ার পর তাঁদের সঙ্গে করে নিয়ে যায় দক্ষিণ কোরিয়ার নৌসেনা। অবসান ঘটে পরিবারটির দুঃসহ অভিজ্ঞতার।
চার মাস পর কিম ইল-হিয়কের স্ত্রী দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সোলে এক কন্যাসন্তানের জন্ম দেন। এক বছর পর শিশুটির প্রথম জন্মদিন উদ্যাপনের জন্য একত্রিত হয়েছিল পরিবারটি। এর দু’মাস পর স্কুবা ডাইভিং করতে গিয়ে কিম ই-হিয়কের মৃত্যু হয়। মাত্র ১৯ মাস ‘স্বাধীনতা’ ভোগ করতে পেরেছিলেন তিনি।
কিম ইল-হিয়ক এখন দক্ষিণ কোরিয়ায় একজন রন্ধনশিল্পী হিসাবে কাজ করছেন। উত্তর কোরিয়ায় তাঁর জীবন নিয়ে মাঝেমধ্যেই জনসমক্ষে কথা বলতে শোনা যায় তাঁকে। ২০২৬ সালের মার্চে দ্বিতীয় কন্যাসন্তানের বাবা হন তিনি। কিম ইল-হিয়ক সিএনএন-কে বলেন, ‘‘আমি নিজেকে পৃথিবীর সেরা ভাগ্যবানদের এক জন বলে মনে করি।’’