সোমবার, ৪ মে প্রকাশিত হল রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনের ফল। এ বার ২৩ এবং ২৯ এপ্রিল দু’দফায় সম্পন্ন হয় ভোট। দু’দিনই ভোটদানের হার ছিল ৯০ শতাংশের বেশি। মোটের উপর অবাধ ও শান্তিপূর্ণ হয়েছে এ বছরের নির্বাচন। তৃণমূল ও বিজেপিকে বাদ দিয়ে কেমন পারফর্ম করলেন অন্যান্য দলের হেভিওয়েটরা? আনন্দবাজার ডট কম-এর এই প্রতিবেদনে রইল তার হদিস।
মূল প্রতিপক্ষ তৃণমূল ও বিজেপিকে বাদ দিলে এ বারের বিধানসভা ভোটের বড় আকর্ষণ ছিলেন অধীররঞ্জন চৌধুরী। মুর্শিদাবাদের বহরমপুরে ১৭,৫৪৮ ভোটে হেরে যান তিনি। ৩০ বছর পর বিধানসভা ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন অধীর। নবাবের জেলার এই কেন্দ্রে জিতেছেন সুব্রত মৈত্র। তাঁর প্রাপ্ত ভোটের পরিমাণ ৯১,০৮৮।
১৯৯৯ সালে লোকসভা ভোটে বহরমপুর থেকে জিতে প্রথম বার সাংসদ হন অধীররঞ্জন। তার পর থেকে নবাবের জেলার ওই আসনটির সঙ্গে একরকম সমার্থক হয়ে যায় তাঁর নাম। কারণ, টানা পাঁচ বার বহরমপুরের বাসিন্দারা সংসদে পাঠান তাঁকে। মনমোহন সিংহ প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন রেল দফতরের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান অধীর। ২০১৯-’২৪ সাল পর্যন্ত লোকসভার বিরোধী দলনেতা ছিলেন তিনি।
এ-হেন বর্ষীয়ান কংগ্রেস নেতা অধীরকে নিয়ে কম বিতর্ক হয়নি। ১৯৯৬ সালে মুর্শিদাবাদের নবগ্রাম থেকে লড়ে বিধায়ক হন তিনি। রাজ্যে বামেদের সরকার তখন মধ্যগগনে। নির্বাচনের সময় নবাবের জেলার ওই কেন্দ্রে সশরীরে প্রচার করতে পারেননি অধীর। তাঁর বক্তৃতার রেকর্ডিং নিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরেছিলেন কংগ্রেসকর্মীরা। অন্য দিকে মুর্শিদাবাদ ছেড়ে প্রয়াত কংগ্রেস নেতা সোমেন মিত্রের আশ্রয়ে ছিলেন ‘বহরমপুরের রবিনহুড’। কারণ পুলিশ তাঁকে হন্যে হয়ে খুঁজছিল।
২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বহরমপুরে তৃণমূল প্রার্থী ইউসুফ পাঠানের কাছে ৮৫ হাজারের বেশি ভোটে হেরে যান অধীর। রাজ্যে ভরাডুবি হয় কংগ্রেসেরও। সঙ্গে সঙ্গে দায় স্বীকার করে প্রদেশ সভাপতির পদ থেকে ইস্তফা দেন অধীর। এ বার তাঁর বিরুদ্ধে তৃণমূল ও বিজেপির প্রার্থী ছিলেন নাড়ুগোপাল মুখোপাধ্যায় এবং সুব্রত মৈত্র।
বাম তারকা প্রার্থীদের তালিকায় রয়েছে মিনাক্ষী মুখোপাধ্যায়ের নাম। হুগলির উত্তরপাড়া বিধানসভা কেন্দ্র থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিপুল ভোটে হেরে গিয়েছেন তিনি। এই প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার সময় তৃতীয় স্থানে রয়েছেন সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য।
সিপিএমের অন্দরে মিনাক্ষীর পরিচয় ‘বর্ধমান লাইন’। দলের রাজ্য দফতর আলিমুদ্দিন স্ট্রিটের যে ঘরে একসময় বিনয় কোঙার থাকতেন, সেখানেই তাঁর থাকার ব্যবস্থা করেছেন শীর্ষনেতৃত্ব। একসময় কলেজে অস্থায়ী ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্টের কাজ করতেন পলি (মিনাক্ষীর ডাকনাম)। ছিলেন যুব সংগঠন ডিওয়াইএফআইয়ের রাজ্য সম্পাদক। গত বছরের এপ্রিলে তামিলনাড়ুর মাদুরাইয়ে হওয়া পার্টি কংগ্রেসে দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হন তিনি।
হুগলির উত্তরপাড়ায় মিনাক্ষীর বিরুদ্ধে শীর্ষাণ্য বন্দ্যোপাধ্যায়কে প্রার্থী করেছিল তৃণমূল। যদিও বিজেপির টিকিটে লড়ে জিতেছেন দীপাঞ্জন চক্রবর্তী। এনএসজিতে কর্মরত ছিলেন তিনি। তাঁদের বিরুদ্ধে ‘পলিগ্রাফ’ টেস্টে সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য পুরোপুরি ফেল করেছেন বললে অত্যুক্তি হবে না।
সিপিএমের তারকা প্রার্থীদের তালিকায় দ্বিতীয় নাম বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যের। একদা বাম দুর্গ হিসাবে পরিচিত যাদবপুর থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে হেরে গিয়েছেন তিনি। তাঁর মূল দুই প্রতিপক্ষ তৃণমূলের বিদায়ী বিধায়ক দেবব্রত (মলয়) মজুমদার এবং বিজেপির শর্বরী মুখোপাধ্যায়। এই প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়া পর্যন্ত তৃতীয় স্থানে রয়েছেন বিকাশরঞ্জন।
২০০৫-’১০ সাল পর্যন্ত কলকাতার মেয়র ছিলেন দুঁদে আইনজীবী বিকাশরঞ্জন। তখন অবশ্য রাজ্যের শাসনক্ষমতায় বামফ্রন্ট। একসময় বামশাসিত ত্রিপুরার অ্যাডভোকেট জেনারেলের দায়িত্বও সামলেছেন বিকাশ। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে তাঁকে যাদবপুর কেন্দ্রের প্রার্থী করে সিপিএম। কিন্তু তৃণমূলের মিমি চক্রবর্তীর কাছে বিপুল ভোটে হেরে যান তিনি।
২০২০ সালের বাম-কংগ্রেস জোটের প্রার্থী হিসাবে রাজ্যসভার সাংসদ হন বিকাশরঞ্জন। রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে ওঠা একাধিক দুর্নীতি মামলায় সুপ্রিম কোর্ট ও হাই কোর্টে সওয়াল করেছেন তিনি। ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটে তাঁর প্রাপ্ত ভোটের পরিমাণ ছিল ৩ লক্ষ ২ হাজার ২৬৪। ২১.০৪ শতাংশ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় স্থানে ছিলেন তিনি।
মালদহের মালতিপুরের কংগ্রেস তারকা প্রার্থী মৌসম বেনজির নূর হেরেছেন ৫৯,৭৪৭ ভোট। এই কেন্দ্র থেকে জিতে বিধানসভায় যাচ্ছেন তৃণমূলের আব্দুর রহিম বক্সী। তাঁর প্রাপ্ত ভোটের পরিমাণ ১ লক্ষ ৪ হাজার ১২৩। মৌসম পেয়েছেন ৪৪,৩৭৬ ভোট।
মালদহের অবিসংবাদি কংগ্রেস নেতা বরকত গনি খান চৌধুরীর উত্তরসূরি মৌসম রাজ্য বিধানসভায় প্রথম বার পা রাখেন মাত্র ২৯ বছর বয়সে। তবে মেয়াদ শেষের আগেই মালদহ উত্তর থেকে জিতে সংসদে চলে যান তিনি। এই সময়েই শতাব্দীপ্রাচীন দলটির ‘হাইকমান্ডের’ নজরে পড়ে যান তিনি। ২০১৯ সালে লোকসভা ভোটের আগে যোগ দেন তৃণমূলে। তবে সে বার নির্বাচনী বৈতরণী পেরোতে পারেননি মৌসম।
লোকসভা ভোটে হারলেও ঘাসফুল শিবির গনির উত্তরসূরিকে ছুড়ে ফেলে দেয়নি। ২০২০ সালে তৃণমূলের টিকিটে রাজ্যসভার সাংসদ হন মৌসম। তবে এ বার মেয়াদ শেষের আগেই দলবদলে ফিরে যান কংগ্রেসে। জীবনের প্রথম লগ্নে সুজাপুরে দাঁড়িয়ে জেতেন তিনি। তবে কেন্দ্র বদলে এ বার মালতীপুরে লড়তে হয়েছে তাঁকে।
এ বারের ভোটে দমদম উত্তর কেন্দ্রে সিপিএমের টিকিটে লড়েছেন দীপ্সিতা ধর। তাঁর বিরুদ্ধে রাজ্যের মন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যকে প্রার্থী করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। উত্তর ২৪ পরগনার এই আসনে বিজেপি প্রার্থী সৌরভ সিকদার। কিন্তু, ভোটে হেরে যাওয়ায় রাজ্য বিধানসভায় আপাতত পা রাখা হচ্ছে না জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনী দীপ্সিতার।
২০২১ সালের রাজ্য বিধানসভা ভোটে হাওড়ার বালি এবং ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে হুগলির শ্রীরামপুর কেন্দ্রে দীপ্সিতাকে প্রার্থী করে সিপিএম। কোনও বারই জয়ের মুখ দেখতে পারেননি তিনি। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময় বামেদের ছাত্র সংগঠন এসএফআইয়ের ইউনিট সভাপতি ও সচিব হন দীপ্সিতা। বাংলার রাজনীতিতে সিপিএমের ‘তরুণ তুর্কি’ নেত্রী হিসাবে উঠে এসেছেন তিনি।
এ বছরের বিধানসভা ভোটে অন্যতম চর্চিত নাম হুমায়ুন কবীর। তৃণমূল ছেড়ে নতুন দল তৈরি করে নির্বাচন লড়ছেন তিনি। দলের নাম ‘আমজনতা উন্নয়ন পার্টি’ (এজেইউপি)। মুর্শিদাবাদের নওদা ও রেজিনগর, দু’টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন হুমায়ুন। দু’টিতেই জিতেছেন তিনি। নওদায় তাঁর জয়ের ব্যবধান ২৭,৯৪৩। অন্য দিকে রেজিনগরে ৫৮,৮৭৬ ভোটে জিতেছেন তিনি।
বাংলার রাজনীতিতে হুমায়ুনকে ‘আয়ারাম-গয়ারাম’ বললে অত্যুক্তি হবে না। গত ১৫ বছরে কংগ্রেস, তৃণমূল এবং বিজেপি তিনটি দলেই ঘুরেছেন তিনি। ভোট ঘোষণার পর তাঁর সঙ্গে আসন সমঝোতা করে আসাদউদ্দিন ওয়েইসির দল মিম। কিন্তু, কয়েক দিনের মধ্যেই বিজেপির সঙ্গে হুমায়ুনের গোপন আঁতাঁত সংক্রান্ত একটি ভিডিয়ো ভাইরাল হলে সেই সমঝোতা থেকে বেরিয়ে আসে তারা। অন্য দিকে অভিযোগ উড়িয়ে গোটাটাই এআই দিয়ে তৈরি বলে জানিয়েছেন নওদা ও রেজিনগরের প্রার্থী।
অন্য দলগুলির নজরকাড়া তারকা প্রার্থীদের মধ্যে অন্যতম হলেন নওশাদ সিদ্দিকি। ভাঙড় থেকে দ্বিতীয় বার জিতে ফের বিধানসভায় পা রাখবেন আইএসএফের (ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট) এই নেতা। অন্য দিকে কেন্দ্র বদলে তাঁর বিরুদ্ধে তৃণমূলের টিকিটে লড়ে হারলেন শওকত মোল্লা।
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বাম-কংগ্রেস-আইএসএফ জোটের প্রার্থী ছিলেন নওশাদ। স্বাধীনতা-পূর্ব বাকি দু’টি দলের ভরাডুবি হলেও শিবরাত্রির সলতে হয়ে বিধানসভায় পা রাখেন ফুরফুরা শরিফের পীরজাদার ভাই। রাজ্যের শাসক দল তৃণমূলের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে গ্রেফতারও হতে হয়েছে তাঁকে। গত পাঁচ বছরে বাংলার রাজনীতিতে ‘ভাইজান’ হিসাবে আলাদা পরিচয় পেয়েছেন তিনি।
বামেদের তারকা প্রার্থী কলতান দাশগুপ্ত সিপিএমের টিকিটে লড়েছেন উত্তর ২৪ পরগনার পানিহাটিতে। এই কেন্দ্রে আরজি করের নির্যাতিতা চিকিৎসকের মা-কে প্রার্থী করেছে বিজেপি। তৃণমূল দাঁড় করিয়েছে বিদায়ী বিধায়ক নির্মল ঘোষের পুত্র তীর্থঙ্করকে। পানিহাটির বাসিন্দারা তাঁদের বিধায়ক হিসাবে কলতানকে বেছে নেয়নি। তৃতীয় স্থান পেতে চলেছেন তিনি।
উত্তর ২৪ পরগনার কামারহাটি পুনরুদ্ধারে নেমে ফের ব্যর্থ হলেন সিপিএমের মানস মুখোপাধ্যায়। এই কেন্দ্রে টানা দু’বার জিতলেন রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী তথা তৃণমূলের দাপুটে নেতা মদন মিত্র। ৫,৬৪৬ ভোটে জিতেছেন তিনি। মানস নেমে গিয়েছেন তৃতীয় স্থানে। তাঁর প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা ২০,২০৩।
বাম তারকা প্রার্থীদের তালিকায় নাম আছে আফরিন বেগমের (শিল্পী)। কলকাতার বালিগঞ্জে লড়ে তৃতীয় হয়েছেন তিনি। সেখানকার জয়ী প্রার্থী হলেন রাজ্যের সাবেক মন্ত্রী তথা বর্ষীয়ান তৃণমূল নেতা শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়। ৬১,৪৭৬ ভোটে জিতেছেন তিনি। আফরিনের প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা মাত্র ৭,১৮৫।
বাম আমলে দাপুটে নেতা তথা মন্ত্রী গৌতম দেবের পুত্র সপ্তর্ষিকে এ বারের বিধানসভা ভোটে টিকিট দিয়েছে সিপিএম। রাজারহাট নিউটাউন কেন্দ্র থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে হেরে গিয়েছেন তিনি। নির্বাচনী লড়াইয়ে তাঁর দুই মূল প্রতিপক্ষ ছিলেন তৃণমূলের বিদায়ী বিধায়ক তাপস চট্টোপাধ্যায় এবং বিজেপির পীযূষ কনোরিয়া। এই প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়া পর্যন্ত তৃতীয় স্থানে রয়েছেন গৌতম-পুত্র।
বাংলায় দলের হাল ফেরাতে ভোটের ময়দানে নেমে হেরে গিয়েছেন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার। হুগলির শ্রীরামপুরে চতুর্থ হয়েছেন তিনি। এই কেন্দ্রে ৮,৬৮৫ ভোটে জিতেছেন বিজেপির ভাস্কর ভট্টাচার্য। শুভঙ্কর পেয়েছেন মাত্র ২,৮৮৪ ভোট।
পরাজিত তারকা প্রার্থীদের তালিকায় নাম আছে বামেদের দেবলীনা হেমব্রমের। বাঁকুড়ার রানিবাঁধে তৃতীয় হয়েছেন তিনি। তাঁর প্রাপ্ত ভোটের পরিমাণ ১৩,২০০। এই কেন্দ্রে ৫২,২৬৯ ভোটে জিতে বিধায়ক হলেন বিজেপির ক্ষুদিরাম টুডু।
বাম জমানায় বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন ২০০৬-’১১ সাল পর্যন্ত উপজাতি বিষয়ক মন্ত্রী ছিলেন দেবলীনা। শুধু তা-ই নয়, বাঁকুড়ার রানিবাঁধ থেকে তিন বার ভোটে জেতেন তিনি। ২০১১ সালে তৃণমূল ঝড়ে বাম সরকারের পতন হলেও নিজের আসন ধরে রেখেছিলেন দেবলীনা। ২০১৯ সালে ঝাড়গ্রাম লোকসভা কেন্দ্রে তাঁকে দাঁড় করায় সিপিএম। সেখানে অবশ্য বিজেপির কুমার হেমব্রমের কাছে হেরে যান তিনি।