সমাজমাধ্যমে আছেন কিন্তু মাঠে-ময়দানের রাজনীতিতে নেই। এ-হেন অভিযোগে বিদ্ধ বামেদের কপালে জুটেছে ‘ফেসবুক বিপ্লবী’র তকমা। রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনে দুই মূল প্রতিপক্ষ তৃণমূল বা বিজেপির কেউই তাঁদের বিশেষ পাত্তা দেয়নি। তার পরেও এ বারের ভোটে কেমন ফল করলেন লাল ঝান্ডার তারকা প্রার্থীরা? আনন্দবাজার ডট কম-এর এই প্রতিবেদনে রইল তার হদিস।
বাম তারকা প্রার্থীদের তালিকায় প্রথমেই আসবে মিনাক্ষী মুখোপাধ্যায়ের নাম। হুগলির উত্তরপাড়া বিধানসভা কেন্দ্র থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিপুল ভোটে হেরে গিয়েছেন তিনি। এই প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার সময় তৃতীয় স্থানে রয়েছেন সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য।
২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রামে প্রার্থী হন মিনাক্ষী। সে বার তাঁর দুই মূল প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং রাজ্যের বিরোধী দলনেতা তথা বিজেপির ‘হেভিওয়েট’ প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারী। নির্বাচনে অবশ্য সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যের কপালে শিকে ছেঁড়েনি। কেন্দ্র বদলে মিনাক্ষীকে এ বার হুগলির উত্তরপাড়ায় প্রার্থী করে বামেরা।
নন্দীগ্রামে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সময় তৃতীয় স্থান পেয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হয় মিনাক্ষীকে। মাত্র ৬,২৬৭টি ভোট পান তিনি। সেখানে শুভেন্দু অধিকারী এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রাপ্ত ভোটের পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ১ লক্ষ ১০ হাজার ৭৬৪ এবং ১ লক্ষ ৮ হাজার ৮০৮। মাত্র ২.৭৪ শতাংশ ভোট গিয়েছিল সিপিএমের রাজ্য কমিটির সদস্যের ঝুলিতে।
সিপিএমের তারকা প্রার্থীদের তালিকায় দ্বিতীয় নাম বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যের। একদা বাম দুর্গ হিসাবে পরিচিত যাদবপুর থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে হেরে গিয়েছেন তিনি। তাঁর মূল দুই প্রতিপক্ষ তৃণমূলের বিদায়ী বিধায়ক দেবব্রত (মলয়) মজুমদার এবং বিজেপির শর্বরী মুখোপাধ্যায়। এই প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়া পর্যন্ত তৃতীয় স্থানে রয়েছেন বিকাশরঞ্জন।
২০০৫-’১০ সাল পর্যন্ত কলকাতার মেয়র ছিলেন দুঁদে আইনজীবী বিকাশরঞ্জন। তখন অবশ্য রাজ্যের শাসনক্ষমতায় বামফ্রন্ট। একসময় বামশাসিত ত্রিপুরার অ্যাডভোকেট জেনারেলের দায়িত্বও সামলেছেন বিকাশ। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে তাঁকে যাদবপুর কেন্দ্রের প্রার্থী করে সিপিএম। কিন্তু তৃণমূলের মিমি চক্রবর্তীর কাছে বিপুল ভোটে হেরে যান তিনি।
২০২০ সালের বাম-কংগ্রেস জোটের প্রার্থী হিসাবে রাজ্যসভার সাংসদ হন বিকাশরঞ্জন। রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে ওঠা একাধিক দুর্নীতি মামলায় সুপ্রিম কোর্ট ও হাই কোর্টে সওয়াল করেছেন তিনি। ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটে তাঁর প্রাপ্ত ভোটের পরিমাণ ছিল ৩ লক্ষ ২ হাজার ২৬৪। ২১.০৪ শতাংশ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় স্থানে ছিলেন তিনি।
এ বারের ভোটে দমদম উত্তর কেন্দ্রে সিপিএমের টিকিটে লড়েছেন দীপ্সিতা ধর। তাঁর বিরুদ্ধে রাজ্যের মন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যকে প্রার্থী করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। উত্তর ২৪ পরগনার এই আসনে বিজেপি প্রার্থী সৌরভ সিকদার। কিন্তু, ভোটে হেরে যাওয়ায় রাজ্য বিধানসভায় আপাতত পা রাখা হচ্ছে না জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনী দীপ্সিতার।
২০২১ সালের রাজ্য বিধানসভা ভোটে হাওড়ার বালি এবং ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে হুগলির শ্রীরামপুর কেন্দ্রে দীপ্সিতাকে প্রার্থী করে সিপিএম। কোনও বারই জয়ের মুখ দেখতে পারেননি তিনি। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময় বামেদের ছাত্র সংগঠন এসএফআইয়ের ইউনিট সভাপতি ও সচিব হন দীপ্সিতা। বাংলার রাজনীতিতে সিপিএমের ‘তরুণ তুর্কি’ নেত্রী হিসাবে উঠে এসেছেন তিনি।
বালিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ২০২১ সালে মাত্র ৩১,৩০৭টি ভোট পান দীপ্সিতা। ফলে তৃতীয় স্থানে নেমে যেতে হয় তাঁকে। সে বার বালিতে জেতেন তৃণমূলের রানা চট্টোপাধ্যায়। তাঁর জয়ের ব্যবধান ছিল ৬,২৩৭ ভোট। দ্বিতীয় স্থানে ছিলেন বিজেপি প্রার্থী বৈশালী ডালমিয়া।
বামেদের তারকা প্রার্থী কলতান দাশগুপ্ত সিপিএমের টিকিটে লড়েছেন উত্তর ২৪ পরগনার পানিহাটিতে। এই কেন্দ্রে আরজি করের নির্যাতিতা চিকিৎসকের মা-কে প্রার্থী করেছে বিজেপি। তৃণমূল দাঁড় করিয়েছে বিদায়ী বিধায়ক নির্মল ঘোষের পুত্র তীর্থঙ্করকে। পানিহাটির বাসিন্দারা তাঁদের বিধায়ক হিসাবে কলতানকে বেছে নেয়নি। তৃতীয় স্থান পেতে চলেছেন তিনি।
২০২৪ সালের অগস্টে আরজি কর হাসপাতালের ভিতরেই ধর্ষণ ও খুন করা হয় এক তরুণী চিকিৎসককে। সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তাল হয় বাংলার রাজনীতি। নিহতের বিচারের দাবিতে পথে নামেন বহু মানুষ। সেই আন্দোলনের অন্যতম মুখ ছিলেন কলতান। ওই সময় তাঁকে গ্রেফতারও করে পুলিশ। বর্তমানে আটটি এফআইআরে নাম আছে তাঁর। সেগুলিকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বলে উল্লেখ করেছেন এই তরুণ বাম নেতা।
উত্তর ২৪ পরগনার কামারহাটি পুনরুদ্ধারে ফের এক বার মানস মুখোপাধ্যায়কে প্রার্থী করেছিল সিপিএম। সেখানে তৃণমূলের টিকিটে লড়েছেন বিদায়ী বিধায়ক তথা রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী মদন মিত্র। বিজেপি প্রার্থীর নাম অরূপ চৌধুরী। দলের ইচ্ছা অবশ্য পূরণ করতে পারবেন না মানস। কারণ তৃতীয় স্থানে নেমে গিয়েছেন তিনি।
২০০১-’১১ সাল পর্যন্ত দু’দফায় কামারহাটির বিধায়ক ছিলেন সিপিএমের দাপুটে নেতা মানস। ২০১৬ সালে ফের এক বার ওই কেন্দ্রে জেতেন তিনি। তবে গত বিধানসভা নির্বাচনে (২০২১ সাল) তৃণমূলের মদন মিত্রের কাছে হারতে হয় তাঁকে। অভিজ্ঞতার কারণেই ফের তাঁকে টিকিট দিয়েছিল সিপিএম।
বাম তারকা প্রার্থীদের তালিকায় নাম আছে আফরিন বেগমের (শিল্পী)। কলকাতার বালিগঞ্জ কেন্দ্র থেকে সিপিএমের টিকিটে লড়েছেন তিনি। তাঁর তিন মূল প্রতিপক্ষ হলেন রাজ্যের সাবেক মন্ত্রী তথা বর্ষীয়ান তৃণমূল নেতা শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়, বিজেপির শতরূপা এবং কংগ্রেসের রোহন মিত্র। এই কেন্দ্রে বিপুল ভোটে হেরে যাওয়ায় বিধানসভায় যাওয়া হচ্ছে না আফরিনের।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি স্কলার আফরিন এ বারই প্রথম ভোটে লড়লেন। শোভনদেব এবং শতরূপার থেকে বয়সে তিনি অনেকটাই ছোট। সিপিএমের ছাত্র সংগঠন এসএফআইয়ের হাত ধরে রাজনীতিতে হাতেখড়ি হয়েছে তাঁর। প্রচারে আমজনতার সমস্যার কথাই বেশি করে তুলে ধরতে দেখা গিয়েছিল আফরিনকে।
বাম আমলে দাপুটে নেতা তথা মন্ত্রী গৌতম দেবের পুত্র সপ্তর্ষিকে এ বারের বিধানসভা ভোটে টিকিট দিয়েছে সিপিএম। রাজারহাট নিউটাউন কেন্দ্র থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে হেরে গিয়েছেন তিনি। নির্বাচনী লড়াইয়ে তাঁর দুই মূল প্রতিপক্ষ ছিলেন তৃণমূলের বিদায়ী বিধায়ক তাপস চট্টোপাধ্যায় এবং বিজেপির পীযূষ কনোরিয়া। এই প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়া পর্যন্ত তৃতীয় স্থানে রয়েছেন গৌতম-পুত্র।
বছর ৩৮-এর সপ্তর্ষির বিরুদ্ধে দু’টি ফৌজদারি মামলা রয়েছে। সমাজমাধ্যমে বেশ সক্রিয় তিনি। বাম আমলে তাঁর বাবা গৌতম দেব ছিলেন জনস্বাস্থ্য, কারিগরি এবং আবাসন দফতরের মন্ত্রী। সিপিএমের রাজ্য কমিটির সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্যপদও পান তিনি। একসময় উত্তর ২৪ পরগনার জেলা কমিটির সম্পাদক ছিলেন গৌতম দেব। তাঁরই ছেলে সপ্তর্ষিকে পর পর দু’বার একই কেন্দ্র থেকে প্রার্থী করে দল।
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে রাজারহাট নিউটাউন আসনে তৃতীয় স্থান পান গৌতমের পুত্র। তাঁর প্রাপ্ত ভোটের পরিমাণ ছিল ৩১,৫৪৩। শতাংশের নিরিখে সেটা ১৩.৪৩। সে বার ৫৬ হাজারের বেশি ভোটে জয়ী হন তৃণমূলের তাপস চট্টোপাধ্যায়। তাঁর প্রাপ্ত ভোটের পরিমাণ ছিল ৪৪.৩ শতাংশ।
বামেদের আর এক তারকা প্রার্থী হলেন রাজ্যের সাবেক মন্ত্রী দেবলীনা হেমব্রম। এ বারের ভোটে বাঁকুড়ার রানিবাঁধ থেকে সিপিএমের টিকিটে লড়েছেন তিনি। তাঁর বিরুদ্ধে তনুশ্রী হাঁসদা এবং ক্ষুদিরাম টুডুকে প্রার্থী করেছে যথাক্রমে তৃণমূল ও বিজেপি। নির্বাচনে শিকে না ছেঁড়ায় বিধানসভায় যেতে পারবেন না দেবলীনা।
বাম জমানায় বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন ২০০৬-’১১ সাল পর্যন্ত উপজাতি বিষয়ক মন্ত্রী ছিলেন দেবলীনা। শুধু তা-ই নয়, বাঁকুড়ার রানিবাঁধ থেকে তিন বার ভোটে জেতেন তিনি। ২০১১ সালে তৃণমূল ঝড়ে বাম সরকারের পতন হলেও নিজের আসন ধরে রেখেছিলেন দেবলীনা। ২০১৯ সালে ঝাড়গ্রাম লোকসভা কেন্দ্রে তাঁকে দাঁড় করায় সিপিএম। সেখানে অবশ্য বিজেপির কুমার হেমব্রমের কাছে হেরে যান তিনি।
২০১২ সালে চিটফান্ড কেলেঙ্কারিকে কেন্দ্র করে উত্তাল হয় রাজ্য বিধানসভা। এই ইস্যুতে বলতে উঠে শাসক দল তৃণমূলের বিরুদ্ধে সুর চড়ান দেবলীনা। অভিযোগ, এর পরই অধিবেশন কক্ষের ভিতরে তাঁর উপর চওড়া হন বেশ কয়েক জন তৃণমূল বিধায়ক। ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে কলকাতার ব্রিগেড সমাবেশে সাঁওতালি ভাষায় বক্তৃতা করেন দেবলীনা, যা সমাজমাধ্যমে শোরগোল ফেলে দিয়েছিল।
এ বারের বিধানসভা নির্বাচনে ১৯৫টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে সিপিএম। ২০১৬ এবং ২০২১ সালের থেকে এই সংখ্যা অনেকটাই বেশি। এ ছাড়া শরিক দলগুলিকে ধরলে ২৫২টি কেন্দ্রে প্রার্থী দাঁড় করিয়েছে রাজ্য বামফ্রন্ট।
তারকা প্রার্থীরা হারলেও এ বারের বিধানসভা ভোটে একটি আসন পাচ্ছে বামেরা। মুর্শিদাবাদের ডোমকল কেন্দ্রে এগিয়ে আছেন মহম্মদ মুস্তাফিজ়ুর রহমান। গত পাঁচ বছরে রাজ্য বিধানসভায় লাল ঝান্ডার আসনসংখ্যা ছিল শূন্য। ২০২৬ সালে সেই খরা যে কাটতে চলেছে, তা বলাই বাহুল্য।