ডাকসাইটের সুন্দরী এক তরুণীকে বিয়ে করে রাজপ্রাসাদে ফিরেছেন রাজা। কিন্তু কোন কুহকিনীর পাল্লায় যে পড়েছেন, সেটা তখনও আন্দাজ করতে পারেননি তিনি! মাস কয়েকের মধ্যে দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভ দানা বাঁধতে হুঁশ ফিরল তাঁর। তত ক্ষণে অবশ্য অনেকটাই দেরি হয়ে গিয়েছে। গোটা বিষয়টিতে নাক গলাতে শুরু করছেন পড়শি রাষ্ট্রের এক ‘ধুরন্ধর’ গুপ্তচর। ফলস্বরূপ শেষ পর্যন্ত রাজা-রানী দু’জনকেই ছাড়তে হয় গদি। অন্য দিকে স্বাধীনতার ২৮ বছরের মাথায় হিমালয়ের বুকে সীমান্তের বিস্তার ঘটায় দিল্লি।
১৯৭৫ সালে স্বাধীন রাষ্ট্র সিকিমের ভারতে অন্তর্ভুক্তি কোনও রূপকথার চেয়ে কম নয়। এতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন নয়াদিল্লির ‘স্পাই মাস্টার’ হিসাবে পরিচিত অজিত ডোভাল। বিনা রক্তপাতে, কোনও রকম ফৌজি অভিযান না চালিয়ে হিমালয়ের কোলের বিশাল এলাকা এ দেশের সঙ্গে মিশিয়ে দেন তিনি। চিরতরে ভারতীয় সেনার হাতে চলে আসে নাথু লা-র মতো গুরুত্বপূর্ণ গিরিপথ। দীর্ঘ দিন ধরে তা পাওয়ার মরিয়া চেষ্টা চালিয়েও ব্যর্থ হয়েছে চিন।
কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকারের ‘জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা’ বা এনএসএ (ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাডভাইসার) পদে থাকা ডোভাল আদপে কেরল ক্যাডারের আইপিএস অফিসার। ১৯৬৮ সালে পুলিশের চাকরিতে যোগ দিলেও হাতে গোনা কয়েক দিন খাঁকি উর্দিতে চাকরি করেছেন তিনি। দীর্ঘ কর্মজীবনের বেশির ভাগটাই কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চ’ বা আইবিতে কেটেছে তাঁর। সেই সূত্রে ছদ্মবেশে কয়েক বছর পাকিস্তানেও ছিলেন ভারতের ‘জেমস বন্ড’।
কর্মজীবনের প্রথম দিকে ডোভালকে দেশের উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলিতে মোতায়েন করে আইবি। ওই সময় সিকিম স্বাধীন রাষ্ট্র হলেও ‘ভারত সুরক্ষিত এলাকা’ বা ‘প্রোটেক্টরেট অফ ইন্ডিয়া’ হিসাবে ছিল তার পরিচিতি। এর জন্য অবশ্য ১৯৫০ সালে কেন্দ্রের জওহরলাল নেহরু সরকারের সঙ্গে বিশেষ চুক্তি করে গ্যাংটক। ‘ভারত সুরক্ষিত এলাকা’ হওয়ায় সিকিমের প্রতিরক্ষা, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং বিদেশনীতি পুরোপুরি ভাবে নিয়ন্ত্রণ করত দিল্লি। বাকি যাবতীয় বিষয় ছিল সেখানকার রাজপরিবারের হাতে।
১৬৪২ সাল থেকে সিকিমে রাজত্ব করছিল চোগিয়াল রাজবংশ। ভারত স্বাধীন হওয়ার সময়ে সেখানকার রাজা ছিলেন তাশি নামগিয়াল। ১৯৬৩ সালে নেহরুর অনুমতি নিয়ে তাশির পুত্র তথা যুবরাজ থোন্ডুপ বিয়ে করেন ২২ বছরের তরুণী হোপ কুককে। চার হাত এক হওয়ার কয়েক দিনের মাথাতেই ইহলোক ত্যাগ করেন তাশি। ফলে নতুন চোগিয়াল হিসাবে রাজ্যাভিষেক হয় থোন্ডুপের। আর তাঁর স্ত্রী হোপ কুক হন সেখানকার নতুন ‘গিয়ালমো’ বা রানি। তাঁর আবার ছিল মার্কিন নাগরিকত্ব। বিয়ের পর মার্কিন নাগরিকত্ব ত্যাগ করে থোন্ডুপের সঙ্গে সিকিমে চলে আসেন তিনি।
থোন্ডুপ রাজা হয়ে বসতেই গ্যাংটকের রাজনৈতিক বিষয়ে ‘নাক গলাতে’ শুরু করেন আমেরিকায় বড় হওয়া হোপ। স্বামীকে নিয়ে প্রায়ই বিদেশ চলে যেতেন তিনি। উদ্দেশ্য, সিকিমের জন্য আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়। শুধু তা-ই নয়, ১৯৬৬ সালে ‘বুলেটিন অব টিবেটোলজি’তে প্রকাশিত প্রবন্ধে দার্জিলিংকে নিয়ে বিস্ফোরক দাবি করে বসেন ‘গিয়ালমো’। পশ্চিম বাংলার শৈল শহরকে অবিলম্বে সিকিমের হাতে তুলে দেওয়ার আর্জি জানান তিনি।
এই ঘটনার ঠিক পরের বছর (পড়ুন ১৯৬৭ সাল) স্ত্রীর উস্কানিতে বাছাই করা বুদ্ধিজীবী এবং শিক্ষাবিদদের নিয়ে ‘স্টাডি ফোরাম’ নামের একটি বিশেষ কমিটি তৈরি করেন রাজা থোন্ডুপ। এঁদের কাজ ছিল স্বাধীন সিকিমের পক্ষে জনমত তৈরি করা। ফলে হোপ কুককে নিয়ে নয়াদিল্লির মনে দানা বাঁধে সন্দেহ। ওই সময় তাঁকে মার্কিন গুপ্তচরবাহিনী ‘সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি’ বা সিআইএর এজেন্ট বলেও মনে করা হয়েছিল।
তবে সিকিমকে নিয়ে নয়াদিল্লির ধৈর্যের বাঁধ ভাঙে ১৯৬৮ সালের ১৫ অগস্ট। সে বছরের স্বাধীনতা দিবসে গ্যাংটকের রাস্তায় বিশেষ মিছিল করে স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীরা। তাঁদের হাতে থাকা প্যাকার্ডে লেখা ছিল ‘ভারতীয়েরা সিকিম ছাড়ো’। এই ঘটনার কয়েক দিনের মাথায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কাছে জমা পড়ে একটি গোয়েন্দা রিপোর্ট। তাতে লেখা ছিল, পড়ুয়াদের ওই পদযাত্রা সম্পূর্ণ ভাবে হোপের মস্তিষ্কপ্রসূত। ভুটানের মতো বাড়তি স্বাধীনতা চাইছেন তিনি।
১৯৬৮ সালে রাষ্ট্রপুঞ্জের সদস্যপদ পায় সিকিমের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভুটান। থিম্ফুর এই সাফল্যকে একেবারেই সুনজরে দেখেনি দিল্লি। কারণ, তত দিনে উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলিতে প্রভাব বাড়াচ্ছিল চিন। গোয়েন্দা রিপোর্ট অনুযায়ী, গত শতাব্দীর ৬০-এর দশকের শেষ দিকে সিকিমের ঠিক উত্তরে চুম্বি উপত্যকায় ঘাঁটি গাড়ে বেজিঙের ‘পিপল্স লিবারেশন আর্মি’ বা পিএলএ। এর পর গ্যাংটককে নিয়ে আর কোনও ঝুঁকি নিতে রাজি হননি নেহরু-কন্যা ইন্দিরা।
সিকিমের ভারতে অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে অন্যতম বড় ভূমিকা নেয় ভারতীয় গুপ্তচর সংস্থা ‘রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিসিস উইং’ বা র। তাদের ‘অপারেশন গ্যাংটক’-এর পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ রয়েছে সংশ্লিষ্ট সংস্থার সাবেক প্রধান জিবিএস সিধুর লেখা ‘সিকিম: ডন অফ ডেমোক্র্যাসি’ বইয়ে। তিনি জানিয়েছেন, ১৯৭২ সালে হঠাৎই এক দিন র-এর তৎকালীন প্রধান আর এন কাও এবং তাঁর প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি পি এন হাকসারকে ডেকে পাঠিয়ে গ্যাংটকের রাজার একটি চিঠি দেখান ইন্দিরা গান্ধী।
সংশ্লিষ্ট চিঠিতে সিকিমের রাজা নিজেকে ‘হিজ় ম্যাজেস্টি’ বলে সম্বোধন করেছিলেন, যা সাধারণত স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রধানরা ব্যবহার করতেন। এ-হেন ‘অবাধ্য’ চোগিয়ালকে কী ভাবে সাজা দেওয়া যায়, র-এর প্রধানের কাছে তা জানতে চান ইন্দিরা। কাও এর জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে দু’সপ্তাহ সময় চেয়ে নিয়েছিলেন। যদিও দিন দশকের মধ্যে গ্যাংটকের ভারতভুক্তির নীল নকশা ইন্দিরা গান্ধীর সামনে তুলে ধরেন তিনি।
দিল্লির চার দেওয়ালে যাবতীয় পরিকল্পনা ছকে নেওয়ার পর অজিত ডোভালকে মাঠে নামান কেন্দ্রীয় গোয়েন্দারা। গ্যাংটকে পৌঁছে ধীরে ধীরে সেখানকার রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে থাকেন তিনি। পাশাপাশি, মিশতেন এলাকাবাসীদের সঙ্গে। সুচতুর ডোভাল বুঝতে পারেন, সিকিমের অধিকাংশ বাসিন্দাই নেপালি এবং রাজপরিবারের প্রতি যথেষ্ট ক্ষোভ রয়েছে তাঁদের। তা ছাড়া কোনও অবস্থাতেই চিন বা মার্কিন প্রভাব মানবে না হিমালয়ের কোলের বাসিন্দারা।
ওই সময়ে গ্যাংটকের জনপ্রিয় রাজনৈতিক দলগুলির একটি ছিল ‘সিকিম ন্যাশনাল কংগ্রেস’। এর নেতা কাজি লেন্দুপ দোরজি ছিলেন রাজপরিবারের কট্টর বিরোধী। নেপালিরা অবশ্য তাঁকে খুবই পছন্দ করতেন। ১৯৭২ সালের শেষ দিক থেকে অত্যন্ত গোপনে লেন্দুপ দোরজি এবং তাঁর দলের নেতা-নেত্রীদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে থাকেন ভারতীয় গোয়েন্দারা। এঁদের মধ্যে ছিলেন ডোভালও।
লেন্দুপের অভিযোগ ছিল, সিকিমের রাজপরিবারকে অকুণ্ঠ সমর্থন দিচ্ছে ভারত। গ্যাংটকে গণতন্ত্র আসুক, তা একেবারেই চায় না নয়াদিল্লি। তাঁর এই ভুল ধারণা কাটাতে ডোভাল ও তাঁর সতীর্থদের রীতিমতো কালঘাম ছুটে গিয়েছিল। ১৯৭৩ সাল আসতে আসতে এ দেশ থেকে বিপুল আর্থিক সাহায্য পেতে থাকে ‘সিকিম ন্যাশনাল কংগ্রেস’। ফলে রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে আমজনতাকে এককাট্টা করার কাজ কোমর বেঁধে শুরু করে দেয় তারা।
১৯৭৩ সালে হঠাৎ করেই সিকিমে শুরু হয় প্রবল গণআন্দোলন। ওই সময়ে রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে ক্ষিপ্ত জনতাকে রাস্তায় নামাতে সক্ষম হন ডোভাল। ১৯৭৪ সালে ভারতের নির্বাচন কমিশনের তত্ত্বাবধানে ভোট হয় সিকিমে। তাতে ৩২টির মধ্যে ৩১টি আসনে জেতে ‘সিকিম ন্যাশনাল কংগ্রেস’। লেন্দুপ দোরজি প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ গ্রহণ করেন। সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে অভিনন্দন জানান ইন্দিরা গান্ধী।
ক্ষমতা পাওয়ার কয়েক দিনের মাথাতেই ভারতের থেকে আরও বেশি সহযোগিতা পেয়ে পৃথক একটি বিল আনেন লেন্দুপ দর্জি। রাজা থোন্ডুপ তাঁর প্রবল বিরোধিতা করেছিলেন। যদিও এর পর গ্যাংটকের ভারতে অন্তর্ভুক্তি ছিল সময়ের অপেক্ষা। ১৯৭৫ সালে সিকিমের আইনসভা রাজতন্ত্র বিলুপ্ত করে এ দেশে মিশে যাওয়ার পক্ষে ভোট দেয়। পরে একটি গণভোটও আয়োজিত হয়েছিল। তাতে ৯৭ শতাংশের সমর্থন ছিল দিল্লির দিকে।
ভারতভুক্তির পর সিকিমের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথ নেন লেন্দুপ দোরজি। রাজা থোন্ডুপকে ছেড়ে চলে যান হোপ কুক। ভারতীয় গোয়েন্দাদের একাংশের দাবি, সিআইএর সঙ্গে মোটেই যুক্ত ছিলেন না হোপ। রাজপরিবারের বিরুদ্ধে অসন্তোষ থেকে এই ধরনের গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল। সাংবাদিকতার প্রতি প্রবল আগ্রহ ছিল তাঁর।
‘অপারেশন গ্যাংটক’-এ বর্তমান এনএসএ-র সাফল্যের কাহিনি ‘অজ়িত ডোভাল: অন আ মিশন’ বইয়ে তুলে ধরেন দেবদত্ত ডি। সেখানে তিনি জানিয়েছেন, ১৯৭৩-এর বিক্ষোভে সিকিমে মোতায়েন ভারতীয় সৈনিকদের কাজে লাগান দিল্লির ‘ধুরন্ধর’ স্পাই মাস্টার। সাদা পোশাকে বিভিন্ন জায়গায় নেপালিদের সঙ্গে মিশে গিয়ে গণআন্দোলনে মদত দিতেন তিনি। ফলে শেষ পর্যন্ত তাঁর বুদ্ধির কাছে হারতে হয় রানি হোপ কুককে।