সৈন্যশক্তির নিরিখে বিশ্বের কোন দেশ কতটা শক্তিশালী, ইতিমধ্যেই সেই তালিকা প্রকাশ করেছে গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ার ইনডেক্স। এর পাশাপাশি এশিয়ার দেশগুলির ফৌজি র্যাঙ্কিংও তুলে ধরেছে সংশ্লিষ্ট সমীক্ষক সংস্থা। সেখানে জায়গা পেয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মহাদেশের ৪৫টি রাষ্ট্র। তালিকায় উপরের দিকেই রয়েছে ভারতের নাম। গত বছরের (পড়ুন ২০২৫ সাল) তুলনায় অবনমন হয়েছে পাকিস্তানের। জায়গা ধরে রেখে নয়াদিল্লির উপরে আছে চিন।
সম্প্রতি ‘এশিয়ান মিলিটারি স্ট্রেন্থ, ২০২৬’ শীর্ষক একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ার। সেখানে ৬০টি আলাদা আলাদা বিষয়ের উপর ভিত্তি করে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মহাদেশটির অন্তর্গত ৪৫টি রাষ্ট্রের তালিকা তৈরি করেছে তারা। র্যাঙ্কিংয়ের সেরা সূচক স্থির করা হয়েছে শূন্যকে। অর্থাৎ, যে দেশ শূন্যের যত কাছে নম্বর পাবে, তাদের সামরিক শক্তি তত ভাল বলে ধরে নেওয়া হয়েছে।
সৈন্যশক্তির দিক থেকে র্যাঙ্কিংয়ের ক্ষেত্রে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের সামরিক বাজেট। এ ছাড়া কোন দেশের কাছে কী কী অত্যাধুনিক হাতিয়ার রয়েছে, তালিকা তৈরির সময় সেটিও খতিয়ে দেখেছেন সমীক্ষকেরা। সৈনিকদের সংখ্যা, নৌবহর এবং বিমানবাহিনীর ক্ষমতার নিরিখে রিপোর্ট তৈরি করেছেন তাঁরা।
‘এশিয়ান মিলিটারি স্ট্রেন্থ, ২০২৬’-এর তালিকায় প্রথম স্থানে রয়েছে রাশিয়া। সমীক্ষকেরা মস্কোকে দিয়েছেন ০.০৭৯১ নম্বর। বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি পরমাণু অস্ত্র রয়েছে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের হাতে। সেই সংখ্যা সাড়ে পাঁচ হাজারের আশপাশে বলে জানা গিয়েছে। সারা বিশ্বের সৈন্যশক্তির নিরিখে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ‘সুপার পাওয়ার’ এই দেশ।
বিশ্লেষকদের দাবি, গত প্রায় চার বছর ধরে ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধ চালিয়ে গেলেও দেশের এক ইঞ্চিও জমি হারাননি রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন। উল্টে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজের অবস্থান মজবুত করেছে তাঁর ফৌজ। পাশাপাশি, মার্কিন নেতৃত্বাধীন ইউরোপীয় সামরিক জোট নেটোর (নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজ়েশন) মনে ভয় ধরাতে পেরেছে তারা। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র-সহ পশ্চিমি দুনিয়ার ১৬ হাজারের বেশি নিষেধাজ্ঞার চ্যালেঞ্জ সামলেও নতুন অত্যাধুনিক হাতিয়ার তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে ক্রেমলিন।
গত বছরের অক্টোবরে একটি সামরিক হাসপাতাল পরিদর্শন গিয়ে নতুন যুগের হাতিয়ার সম্পর্কে গণমাধ্যমের কাছে মুখ খোলেন পুতিন। তিনি বলেন, ‘‘পরমাণু শক্তিচালিত স্বয়ংক্রিয় মনুষ্যবিহীন সাবমার্সিবল যান ‘পোসাইডন’ পরীক্ষায় সাফল্য মিলেছে। এর পাল্লা সীমাহীন।’’ ২০২৫ সালের ২১ অক্টোবর পরমাণু অস্ত্রবহনে সক্ষম ৯এম৭৩০ বুরেভেস্টনিক (স্টর্ম পেট্রেল) নামের একটি ক্রুজ় ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালায় রাশিয়া। উৎক্ষেপণের পর তা ১৪ হাজার কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করেছিল। আকাশে ছিল ১৫ ঘণ্টা।
এশিয়ান র্যাঙ্কিংয়ে দু’নম্বরে জায়গা পেয়েছে গণপ্রজাতন্ত্রী চিন (পিপল্স রিপাবলিক অফ চায়না)। গত বছর মস্কোর সমান পয়েন্ট পেয়েছিল বেজিং। এ বার অবশ্য সেটা হয়নি। পাওয়ার ইনডেক্সে ড্রাগনের প্রাপ্ত নম্বর দাঁড়িয়েছে ০.০৯১৯। তার জন্য অবশ্য প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের অনেকে পিএলএ-র অভ্যন্তরীণ কলহকে দায়ী করেছেন।
এ বছরের জানুয়ারিতে পিএলএ-র শীর্ষ আধিকারিক তথা চিনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-ঘনিষ্ঠ লিউ ঝেনলির বিরুদ্ধে আমেরিকাকে পরমাণু অস্ত্রের গোপন তথ্য পাচারের মারাত্মক অভিযোগ ওঠে। পশ্চিমি গণমাধ্যমগুলির একাংশের দাবি, সেনা অভ্যুত্থানের সলতে পাকাচ্ছিলেন তিনি। তখনই অবশ্য তাঁকে গ্রেফতার করে ড্রাগন প্রশাসন। চক্রান্তে আর এক শীর্ষ সেনা আধিকারিক ঝাং ইউশিয়া যুক্ত ছিলেন বলে মনে করা হচ্ছে। তবে তাঁকে আটক করা হয়েছে কি না, তা অবশ্য স্পষ্ট নয়।
এই তালিকায় ভারত রয়েছে তৃতীয় স্থানে। গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ারের সমীক্ষকেরা নয়াদিল্লিকে দিয়েছেন ০.১৩৪৬ পয়েন্ট। এ দেশের স্থলবাহিনীতেই রয়েছেন ২১.৪৮ লক্ষ সৈনিক। এ ছাড়া নৌ ও বিমানবাহিনীর সৈনিকের সংখ্যা যথাক্রমে ১.৪৮ লক্ষ ও ২.৮৯ লক্ষ। বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ের ক্ষেত্রে ভারত ও চিন রয়েছে তৃতীয় ও চতুর্থ স্থানে। গত বছরের (২০২৫ সাল) তুলনায় এ বার অবশ্য নম্বর কিছুটা কমেছে নয়াদিল্লির। তার জন্য বেশ কয়েকটি কারণকে চিহ্নিত করেছেন বিশ্লেষকেরা।
২০২৬-’২৭ আর্থিক বছরে প্রতিরক্ষাখাতে ৭ লক্ষ ৮৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে কেন্দ্র। ২০২৫-’২৬ অর্থবর্ষে তা ছিল ৬.৮১ লক্ষ কোটি টাকা। অর্থাৎ, এ বার সামরিকখাতে ব্যয়বৃদ্ধির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ১৫.৩ শতাংশ। শুধু তা-ই নয়, চলতি বছরের বাজেটে প্রতিরক্ষাক্ষেত্রে আধুনিকীকরণের জন্য ২ লক্ষ ১৯ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে মোদী সরকার, গত অর্থবর্ষের তুলনায় যেটা ২১ শতাংশ বেশি।
গত ১ ফেব্রুয়ারি সংসদে পেশ করা বাজেট অনুযায়ী, ২০২৬-’২৭ অর্থবর্ষে দেশের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের (জিডিপি) ১১ শতাংশ প্রতিরক্ষাখাতে ব্যয় করবে ভারত। ২০২৫-’২৬ আর্থিক বছরে সেটা ছিল মাত্র আট শতাংশ। তবে বিশ্লেষকদের দাবি, শেষ কয়েক বছরে সামরিক ব্যয়বরাদ্দ বৃদ্ধি পেলেও হাতিয়ারের গবেষণায় খুব কম খরচ করেছে কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকার। তা ছাড়া রাশিয়া ও চিনের তুলনায় প্রতিরক্ষা বাজেটের নিরিখে এখনও অনেকটাই পিছিয়ে আছে নয়াদিল্লি।
সাম্প্রতিক সময়ে ঘরের মাটিতে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম নির্মাণে জোর দিয়েছে কেন্দ্র। হাইপারসোনিক ক্ষেপণাস্ত্রের সফল পরীক্ষা করেছে প্রতিরক্ষা গবেষণা সংস্থা ডিআরডিও। এ ছাড়া অত্যাধুনিক ড্রোন প্রযুক্তিতেও উন্নতি লক্ষ করা গিয়েছে। ভারত মহাসাগরীয় এলাকায় শক্তিবৃদ্ধি করতে একের পর এক রণতরী এবং ডুবোজাহাজ নৌবাহিনীর হাতে তুলে দিয়েছে সরকার। পাশাপাশি, সবাইকে চমকে দিয়ে গত দু’বছরে পরমাণু অস্ত্রের সম্ভারও বাড়িয়েছে ভারত।
বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ে পাকিস্তানের স্থান ১৪। তবে এশিয়ার তালিকায় ইসলামাবাদ রয়েছে অষ্টম স্থানে। পরমাণু শক্তিধর ভারতের পশ্চিম পারের প্রতিবেশীটিকে ০.২৬২৬ নম্বর দিয়েছেন সমীক্ষকেরা। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, ২০২৪ সাল থেকে ক্রমাগত অবনমন হচ্ছে ইসলামাবাদের। সে বছর বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ে নবম স্থানে ছিলেন রাওয়ালপিন্ডির জেনারেলরা। ২০২৫ সালে ১২-তে নেমে আসেন তাঁরা। গত বছর এশিয়ার তালিকায় সপ্তম স্থান পেয়েছিল পাকিস্তান।
গত বছরের জুনে ভারতীয় সেনার ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর মুখে পড়ে বেহাল দশা হয় পাকিস্তানের। নয়াদিল্লির ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় চোখের নিমেষে ধ্বংস হয়ে যায় ইসলামাবাদের ১১টি বায়ুসেনা ঘাঁটি। এ ছাড়াও মাঝ-আকাশের লড়াইয়ে একাধিক লড়াকু জেট হারান রাওয়ালপিন্ডির সেনা অফিসারেরা। ওই সংঘাত থামার পর আফগানিস্তানের সঙ্গে সীমান্ত সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে পাক সেনা। সেখানেও তালিবানের বিরুদ্ধে তেমন সুবিধা করতে পারেনি তারা। এগুলিকেই নম্বর কমার মুখ্য কারণ হিসাবে চিহ্নিত করেছেন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকেরা।
এশিয়ার তালিকায় চার, পাঁচ ও ছয় নম্বরে আছে দক্ষিণ কোরিয়া (রিপাবলিক অফ কোরিয়া), জাপান এবং তুরস্ক। গত বছরের (পড়ুন ২০২৫ সাল) তুলনায় এক ধাপ উপরে উঠে এসেছে টোকিয়ো। শুধু তা-ই নয়, চিনের সঙ্গে সংঘাত বৃদ্ধি পাওয়ায় অত্যাধুনিক হাতিয়ার তৈরির দিকে বেশ নজর দিয়েছেন ‘সামুরাই যোদ্ধা’রা। সামরিকখাতে ব্যয় বৃদ্ধিও করেছে প্রশান্ত মহাসাগরীয় ওই দ্বীপরাষ্ট্র, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯-’৪৫) পর গত ৮০ বছরে যা প্রথম।
পাকিস্তানের ঠিক উপরে রয়েছে ইন্দোনেশিয়া। এশিয়ার তালিকায় জাকার্তার র্যাঙ্কিং সাত। পাওয়ার ইনডেক্সে তাদের ০.২৫৮২ নম্বর দিয়েছেন সমীক্ষকেরা। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সামরিকখাতে ব্যয় বৃদ্ধি করেছে সাবেক ওলন্দাজদের উপনিবেশ। বিমানবাহিনীর শক্তি বাড়াতে চার প্রজন্মের ৪২টি রাফাল লড়াকু জেটের বরাত ফরাসি সংস্থা দাসোঁ অ্যাভিয়েশনকে দিয়েছে তারা। এ ছাড়া ব্রহ্মস ক্রুজ় ক্ষেপণাস্ত্রের জন্য ভারতের সঙ্গে আলোচনা চালাচ্ছে ইন্দোনেশিয়ার সরকার।
গত বছরের জুনে মুখোমুখি সংঘাতে জড়িয়ে পড়া ইজ়রায়েল ও ইরানের অবস্থানগত কোনও পরিবর্তন হয়নি। এশিয়ার তালিকায় ইহুদিরা রয়েছে নয় নম্বরে। আর তেহরানের স্থান ১০। ২০২৫ সালের নিরিখে বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ে অবশ্য অবনমন হয়েছে সাবেক পারস্য দেশের। গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ারের তালিকায় সেখানে দু’ধাপ নীচে নেমে গিয়েছে তারা।
২০২৫ সালে তাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার সীমিত সংঘাতে উত্তপ্ত হয় দূর প্রাচ্য। গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ারের এশীয় তালিকায় তারা রয়েছে যথাক্রমে ১৩ ও ৩২ নম্বরে। দু’টি দেশই বহুল পরিমাণে বাড়িয়েছে প্রতিরক্ষা বাজেট। অন্য দিকে, যুক্তরাষ্ট্রের রক্তচাপ বাড়িয়ে বিশ্বতালিকায় ৩৪ থেকে ৩১ নম্বরে উঠে এসেছে উত্তর কোরিয়া বা ডিপিআরকে (ডেমোক্রেটিক পিপল্স রিপাবলিক অফ কোরিয়া)। এশিয়ার ১৬ নম্বর র্যাঙ্কিং পেয়েছে পিয়ংইয়ং।
‘এশিয়ান মিলিটারি স্ট্রেন্থ, ২০২৬’-এর তালিকায় চিনের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়া তাইওয়ান (রিপাবলিক অফ চায়না), ফিলিপিন্স এবং মঙ্গোলিয়া রয়েছে যথাক্রমে ১১, ১৯ এবং ৩৫ নম্বরে। এ ছাড়া সৌদি আরব পেয়েছে ১৪ নম্বর স্থান। গত বছর পাকিস্তানের সঙ্গে ‘কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি’তে সই করে রিয়াধ। সেখানে বলা হয়েছে, এই দু’য়ের মধ্যে কোনও একটি দেশ তৃতীয় কোনও শক্তি দ্বারা আক্রান্ত বা আগ্রাসনের শিকার হলে, তাকে উভয় দেশের উপর আঘাত বা যুদ্ধ হিসাবে বিবেচনা করা হবে। দু’টি দেশেরই অবনমন হওয়ায় সংঘাত পরিস্থিতিতে তারা একে অপরকে কতটা সাহায্য করতে পারবে, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।
পাকিস্তান ও চিনকে বাদ দিলে ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলির কারওরই সামরিক শক্তি বলার মতো নয়। এশিয়ার তালিকায় ১৭ নম্বরে মায়ানমার, ১৮ নম্বরে বাংলাদেশ, ২৬ নম্বরে শ্রীলঙ্কা, ৪২ নম্বরে আফগানিস্তান, ৪৩ নম্বরে নেপাল এবং ৪৫ নম্বরে নাম রয়েছে ভুটানের। এদের মধ্যে মায়ানমার, নেপাল এবং শ্রীলঙ্কার র্যাঙ্কিং গত বছরের তুলনায় কিছুটা ভাল হয়েছে। তালিবানশাসিত কাবুল পা পিছলেও সীমান্ত সংঘাতে পাক ফৌজকে সমানে সমানে টক্কর দিচ্ছে।