পূর্ব ইউরোপে রাশিয়া-ইউক্রেন হোক বা পশ্চিম এশিয়ার ইজ়রায়েল-হামাস। গত কয়েক বছর ধরেই বিভিন্ন ফ্রন্টের যুদ্ধকে কেন্দ্র করে সরগরম রয়েছে দুনিয়া। ২১ শতকের এই সমস্ত সংঘর্ষগুলির চুলচেরা বিশ্লেষণ জারি রেখেছেন এ দেশের দুঁদে সেনা অফিসার থেকে শুরু করে প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকেরা। তাঁদের দাবি, দ্রুত বদলে যাচ্ছে আক্রমণ ও প্রতি আক্রমণের কৌশল। পরিবর্তন এসেছে সমরাস্ত্রে। আর তাই শুধুমাত্র রাফাল লড়াকু জেট, এফ-৪০০ ট্রায়াম্ফ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (এয়ার ডিফেন্স) বা ব্রহ্মস সুপারসনিক ক্রুজ় ক্ষেপণাস্ত্রের উপর নজর রাখলে চলবে না নয়াদিল্লির।
এই ইস্যুতে সম্প্রতি ভারতীয় স্থলবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল অভয় কৃষ্ণের লেখা একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেছে ‘দ্য ইউরেশিয়ান টাইমস’। ফৌজের শীর্ষপদে থেকে ওই সেনা অফিসারের দাবি, বর্তমান সময়ে সস্তা দরের স্মার্ট কিছু হাতিয়ার ব্যবহারের প্রবণতা যথেষ্ট বৃদ্ধি পেয়েছে। সেগুলির ধ্বংসক্ষমতা কোটি কোটি ডলার ব্যয়ে নির্মিত অস্ত্রগুলির চেয়ে কোনও অংশে কম নয়। কখনও কখনও লড়াইয়ের গতিও বদলে দিচ্ছে তারা। এই রণকৌশলের দিকে নয়াদিল্লির সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে বলে উল্লেখ করেছেন তিনি।
নিজের লেখা প্রবন্ধে লেফটেন্যান্ট জেনারেল অভয় কৃষ্ণ জানিয়েছেন, যত দিন যাচ্ছে ততই আকারে ছোট ‘কামিকাজ়ে’ (আত্মঘাতী) ড্রোন, চলমান যুদ্ধাস্ত্র এবং রোবটিক্স হাতিয়ারের ব্যবহার বিভিন্ন রণাঙ্গনে বাড়ছে। নির্মাণখরচের নিরিখে এগুলি বেশ সস্তা। কিন্তু, কোটি কোটি ডলার ব্যয়ে তৈরি বোমারু বিমান, লড়াকু জেট বা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে দিব্যি এগুলির সাহায্যে ওড়ানো যাচ্ছে। তেল বা গোলা-বারুদের ডিপোর মতো কৌশলগত সম্পদ ধ্বংস করতেও পাইলটবিহীন যান বর্তমানে বাহিনীর ‘অটোমেটিক চয়েস’ হয়ে উঠেছে।
এ ব্যাপারে বেশ কিছু উদাহরণ দিয়েছেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল কৃষ্ণ। গত বছরের জুনে রাশিয়ার ভিতরে ঢুকে ড্রোন হামলা চালায় ইউক্রেনীয় গুপ্তচরবাহিনী। সেই অভিযানের পোশাকি নাম ছিল ‘অপারেশন স্পাইডারওয়েব’। এতে অত্যন্ত সস্তা দরের ১১৭টি ‘ফার্স্ট পার্সন ভিউ’ (এফপিভি) আত্মঘাতী মানববিহীন যান ব্যবহার করে কিভ। তাতে সব মিলিয়ে মস্কোর ৪১টি সামরিক বিমান ধ্বংস ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর মধ্যে ছিল টিইউ-৯৫-এর মতো কৌশলগত বোমারু বিমান। পশ্চিমি গণমাধ্যমগুলির দাবি, কয়েক ঘণ্টার ওই হামলায় ৭০০ কোটি ডলার লোকসানের মুখে পড়ে ক্রেমলিন।
একই কথা হামাসের ক্ষেত্রেও সত্যি। গাজ়া উপত্যকার লড়াই চলাকালীন প্যালেস্টাইনপন্থী এই সশস্ত্র গোষ্ঠীটি ঝাঁকে ঝাঁকে রকেট পাঠিয়ে ইজ়রায়েলি শহরগুলিকে নিশানা করছিল। ‘আয়রন ডোম’ নামের এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম ব্যবহার করে সেগুলি মাঝ-আকাশে ধ্বংস করে ইহুদি ফৌজ। পরে জানা যায়, এতে আর্থিক দিক থেকে যথেষ্টই লোকসান হয়েছে তেল আভিভের। কারণ, ‘আয়রন ডোম’-এ ব্যবহৃত এক একটি ‘তামির’ ক্ষেপণাস্ত্রের দাম কয়েক কোটি ডলার। সেখানে নামমাত্র টাকা খরচ করে (পড়ুন কয়েক হাজার) ধ্বংসাত্মক রকেট তৈরি করেছে হামাস।
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, গত দু’বছর ধরে প্যালেস্টাইনপন্থী বিদ্রোহীদের সঙ্গে লড়াইয়ে ‘আয়রন ডোম’ যে ১০০ শতাংশ সাফল্য পেয়েছে, এমনটা নয়। উল্টে হামাসের ড্রোন ও রকেট হামলায় বেশ কিছু জায়গায় ধ্বংস হয় এই আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। গত মে মাসে ‘অপারেশন সিঁদুর’ চলাকালীন চিন নির্মিত ‘এইচকিউ-৯পি’ নামের এয়ার ডিফেন্স সক্রিয় রেখেছিল পাকিস্তানের ফৌজ। লড়াইয়ের গোড়াতেই ইজ়রায়েলি ‘হারোপ’ কামিকাজ়ে ড্রোনের সাহায্যে সেটি উড়িয়ে দেয় ভারতীয় সেনা। ফলে পরবর্তী পর্যায়ে ইসলামাবাদের ১১টি বায়ুসেনা ঘাঁটিতে ‘ব্রহ্মস’ ক্ষেপণাস্ত্রে আক্রমণ শানাতে অসুবিধা হয়নি।
অবসরপ্রাপ্ত সেনা অফিসার লেফটেন্যান্ট জেনারেল কৃষ্ণ মনে করেন, ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর মার খাওয়া থেকে শিক্ষা নিয়েছে পাক সেনা। সেই কারণেই অভিযান পরবর্তী সময়ে ‘আর্মি রকেট ফোর্স কমান্ড’ তৈরির কথা ঘোষণা করে ইসলামাবাদ। গত বছর স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে (পড়ুন ১৪ অগস্ট) প্রকাশ্যে এ ব্যাপারে বিবৃতি দেন পশ্চিমের প্রতিবেশী দেশটির প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ় শরিফ। বলেন, ‘‘উন্নত প্রযুক্তিতে সজ্জিত এই বাহিনী ‘মাইলফলক’ হয়ে থেকে যাবে।’’ যদিও তার গঠনতন্ত্র নিয়ে খুব বেশি খবর প্রকাশ্যে আসেনি।
বর্তমানে চিনের ‘পিপল্স লিবারেশন আর্মি’ বা পিএলএ এবং ইরানি আধা সেনা ‘ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর’ বা আইআরজিসিতে রয়েছে বিশেষ রকেট বাহিনী। মূলত দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র এবং স্বল্পপাল্লার রকেট হামলার জন্য বিশেষ ভাবে প্রশিক্ষিত তারা। এ দেশের প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের একাংশের দাবি, ঠিক ওই আদলেই ‘আর্মি রকেট ফোর্স কম্যান্ড’ তৈরির নীলনকশা ছকে ফেলেছে পাক ফৌজ, যা আগামী দিনে অবশ্যই নয়াদিল্লির মাথাব্যথার কারণ হতে পারে। আর তাই ভারতীয় সেনায় কাঠামোগত কিছু রূপান্তরের প্রয়োজনীয়তার কথা বলতে শোনা গিয়েছে তাঁদের।
লেফটেন্যান্ট জেনারেল কৃষ্ণ অবশ্য এ ব্যাপারে বার বার চিনের উদাহরণ টেনেছেন। তাঁর কথায়, সামরিক ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স), রোবটিক্স এবং স্বায়ত্তশাসনমূলক যুদ্ধপ্রণালীর (অটোনোমাস ওয়ারফেয়ার) জন্য বিপুল লগ্নি করছে বেজিং। বৃহৎ পরিসরে নজরদারি ও ‘কামিকাজ়ে’ ড্রোন, রোবোটিক গ্রাউন্ড ভেহিকেল এবং সস্তা দরের অন্যান্য কিছু হাতিয়ার তৈরি করছে ড্রাগন। সেগুলির কিছু নিজেদের জন্য রেখে বাকিটা রফতানির পরিকল্পনা রয়েছে মান্দারিনভাষী সরকারের। চিনের এই সিদ্ধান্ত নয়াদিল্লির জন্য উদ্বেগজনক।
গত কয়েক বছরে বেজিং নির্মিত হাতিয়ারের সবচেয়ে বড় বাজারে পরিণত হয়েছে পাকিস্তান। সীমান্ত পার সন্ত্রাসবাদকে কেন্দ্র করে ভারতের সঙ্গে ইসলামাবাদের সংঘাত যে আগামী দিনেও অবশ্যম্ভাবী তা ভালই জানে ড্রাগন। সে ক্ষেত্রে রাওয়ালপিন্ডির ঘাড়ে পা রেখে রণাঙ্গনে নিজেদের তৈরি অস্ত্রের কার্যকারিতা কতটা, তা বুঝে নেওয়ার সুবিধা পাবে চিন। অন্য দিকে, সংশ্লিষ্ট সংঘর্ষগুলিতে নয়াদিল্লির অস্ত্রের দুর্বলতা প্রকাশ্যে আসার সম্ভাবনা থাকছে, যা আগামী দিনে ‘আগ্রাসী’ পিএলএ-র মোকাবিলায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে, বলছেন বিশ্লেষকেরা।
গত বছরের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ দফতরের (ডিপার্টমেন্ট অফ ওয়ার) সদর কার্যালয় পেন্টাগন থেকে ফাঁস হয় চিনের সামরিক শক্তি সংক্রান্ত একটি রিপোর্ট। সেখানে মুখোমুখি সংঘর্ষে ড্রাগনের হাতে বেদম মার খাওয়ার আশঙ্কার কথা উল্লেখ করে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরকারকে সতর্ক করেছেন আমেরিকার দুঁদে সেনা কমান্ডারেরা। রিপোর্টে দু’তরফের বাহিনীর তুলনা টানতে গিয়ে ‘ওভারম্যাচ’ (মিল খাচ্ছে না) শব্দবন্ধ ব্যবহার করতে দেখা গিয়েছে তাঁদের।
কোন যুক্তিতে চিনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে ব্যর্থ মার্কিন ফৌজ? এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে পেন্টাগনের গোপন রিপোর্টে বেশ কয়েকটি বিষয়ের উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথমত, খুব কম খরচে উন্নত প্রযুক্তির ড্রোন, হাইপারসনিক (শব্দের পাঁচ গুণের চেয়ে গতিশীল) অস্ত্র এবং সাইবার হাতিয়ার ব্যবহার করছে ড্রাগন পিএলএ। সেখানে আমেরিকার সেনাবাহিনীর অস্ত্রগুলি অনেক বেশি ব্যয়বহুল। বর্তমানে সেগুলির উৎপাদনও হচ্ছে যথেষ্ট ধীর গতিতে।
আমেরিকার প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের দাবি, আধুনিক লড়াইয়ে ডুবো ড্রোন এবং স্পাইঅয়্যারের গুরুত্ব দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই দুই অস্ত্রের নিরিখে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ঢের বেশি এগিয়ে আছে চিন। সমুদ্রের গভীরে বিছানো ইন্টারনেটের তার কেটে মার্কিন যোগাযোগ ব্যবস্থাকে পঙ্গু করতে পারে তারা। তা ছাড়া ওয়াশিংটনের রণতরী ডোবানোর ক্ষমতা রয়েছে ড্রাগনের হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের। স্পাইঅয়্যারে বেজিঙের আড়িপাতা ঠেকানোরও শক্তি নেই ওয়াশিংটনের।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকেরা মনে করেন, আমেরিকার সবচেয়ে বড় সমস্যার জায়গাটা হল, অনেক কম খরচে তাদের বড় আর্থিক আঘাত দিতে পারবে চিন। কারণ, কার্যত জলের দরে লাখ লাখ সামরিক ড্রোন ও হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করে বেজিং। সেখানে ড্রাগনের চেয়ে ২৩০ গুণ বেশি অর্থ ব্যয় করে রণতরী এবং অন্যান্য হাতিয়ার বানিয়েছে ওয়াশিংটন। যুদ্ধের সময় সেগুলি ধ্বংসের লোকসান সামলানো হোয়াইট হাউসের পক্ষে বেশ কঠিন।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের দাবি, গত পৌনে চার বছর ধরে চলা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে যা বার বার ঘটতে দেখা গিয়েছে। গোড়ার দিকে পশ্চিমের প্রতিবেশীর শহরগুলি পরপর দখল করতে ট্যাঙ্ক ও সাঁজোয়া গাড়ি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে মস্কোর ফৌজ। কিন্তু, ড্রোন ও জ্যাভলিনের মতো ট্যাঙ্কবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ক্রেমলিনের সেই গতি থামিয়ে দেয় কিভ। নদী বা সমুদ্রের জলের নীচের ড্রোন ব্যবহার করতেও দেখা গিয়েছে তাদের। এর পরই রণকৌশলে বড় বদল আনেন রুশ কমান্ডারেরা।
ইউক্রেনের উপর আক্রমণের ঝাঁজ বাড়াতে পরবর্তী সময়ে ইরানের তৈরি আত্মঘাতী ‘শাহেদ’ ড্রোন ব্যবহার করা শুরু করে মস্কো। তেহরান প্রযুক্তি হস্তান্তর করায় বর্তমানে বহুল পরিমাণে এগুলি ঘরের মাটিতেই তৈরি করছে রাশিয়া। ক্রেমলিন অবশ্য এর নতুন নাম দিয়েছে ‘গেরান-২’। একসঙ্গে ঝাঁক বেঁধে শত্রুর উপর হামলা চালানোর ক্ষমতা রয়েছে এই পাইলটবিহীন যানের।
রুশ ফৌজের মতো যুদ্ধপদ্ধতিতে বদল এনেছে ইজ়রায়েলও। সস্তায় শত্রুর রকেট বা ড্রোন আটকাতে ‘আয়রন বিম’ নামের একটি লেজ়ার হাতিয়ার নতুন বছরে বিভিন্ন জায়গায় মোতায়েন করেছে ইহুদি সেনা। এ-হেন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাটি আগামী দিনে সামরিক ক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটাতে চলেছে বলে একরকম নিশ্চিত তেল আভিভ।
ভারতীয় সেনার জন্য ‘আয়রন বিম’-এর মতো লেজ়ার হাতিয়ার তৈরি করেছে প্রতিরক্ষা গবেষণা সংস্থা ডিআরডিও (ডিফেন্স রিসার্চ ডেভলপমেন্ট অর্গানাইজ়েশন)। তবে সেটা ‘সোয়ার্ম’ ড্রোন বা ড্রোনের ঝাঁক ও রকেটের ঝাঁক আটকাতে কতটা সিদ্ধহস্ত, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তা ছাড়া ‘ফার্স্ট পার্সন ড্রোন’ এবং জলের গভীরে থাকা ড্রোন তৈরির দিকে নয়াদিল্লির অবিলম্বে নজর দেওয়া উচিত বলে মনে করেন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকেরা।