কিশোরী বয়স থেকে আকাশে ওড়ার স্বপ্ন তাঁর। চাইতেন পাইলট হতে। ছোটবেলার সেই স্বপ্নপূরণ করেছেন তিনি। রাফাল যুদ্ধবিমানের প্রথম মহিলা পাইলট তিনি। এখন আকাশ থেকে মহাকাশে পাড়ি দেওয়ার স্বপ্ন বুনতে শুরু করেছেন শিবাঙ্গী সিংহ।
উত্তরপ্রদেশের বারাণসীতে জন্ম শিবাঙ্গীর। ছোট থেকেই পড়াশোনায় তুখোড় ছিলেন তিনি। পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলায়ও পারদর্শিতার অভাব ছিল না তাঁর। স্কুলের পড়াশোনা শেষ করে তিনি ভর্তি হন বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে।
কলেজের উচ্চশিক্ষায় দাঁড়ি টানার পর ২০১৬ সালে বায়ুসেনার অ্যাকাডেমিতে প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করেন শিবাঙ্গী। ১৯৯৫ সাল থেকে ভারতীয় বিমানবাহিনী তাদের বাহিনীতে মহিলাদের নিয়োগ শুরু করে। তবে যুদ্ধবিমান চালানোর অনুমতি ছিল না মহিলাদের। তা শুধুমাত্র পুরুষেরাই চালাতে পারতেন।
২০১৫ সালে মহিলাদের যুদ্ধবিমান চালানোর অনুমতি দেওয়া হয়। এক সাক্ষাৎকারে শিবাঙ্গী এই প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘‘আমার মতো বহু মহিলা ফাইটার পাইলট হয়েছেন। এতে যে শুধু আমাদের সমাজের অগ্রগতি ফুটে উঠেছে তা-ই নয়, মহিলারাও যে তাঁদের স্বপ্নপূরণ করতে পারেন সেই বার্তাও দিয়েছে।’’
ছোটবেলায় বারাণসী থেকে দিল্লি গিয়েছিলেন শিবাঙ্গী। নয়াদিল্লিতে বিমানবাহিনীর জাদুঘরে ঘুরছিলেন তিনি। চোখের সামনে এত বিমান এবং ভারতীয় বিমানবাহিনীর ইতিহাস জানতে পেরে পাইলট হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি।
শিবাঙ্গী এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন যে, তাঁর জীবনে অনুপ্রেরণার সবচেয়ে বড় উৎস তাঁর মা। শিবাঙ্গী বলেছিলেন, ‘‘মা কেবল আমায় শিক্ষিত করতে চায়নি। মা চেয়েছিল আমি যেন নিজের পায়ে দাঁড়াই, স্বাবলম্বী হই। জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে আমাকে সমর্থন করেছে মা।’’
শিবাঙ্গীই প্রথম নন, তাঁর পথিকৃৎ ছিলেন ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট অবনী চতুর্বেদী, ভাবনা কান্ত এবং মোহনা সিংহের মতো বহু মহিলা। ২০১৬ সালের জুন মাসে প্রথম ব্যাচের মহিলা ফাইটার পাইলট হিসাবে তাঁরা সকলেই ভারতীয় বায়ুসেনায় যোগ দিয়েছিলেন।
মিগ-২১ বাইসন চালানোর অভিজ্ঞতা রয়েছে শিবাঙ্গীর। রাজস্থানে বায়ুসেনার ফাইটারবেসে নিযুক্ত ছিলেন তিনি। সেখানে উইং কমান্ডার অভিনন্দন বর্তমানের সঙ্গে মিগ উড়িয়েছেন তিনি। ২০১৯ সালে বালাকোট বিমান হামলার পর একটি মিগ-২১ যুদ্ধবিমানকে গুলি করে নামিয়েছিল পাক সেনা। তখন পাক সেনার হাতে বেশ কিছু দিন বন্দি ছিলেন অভিনন্দন বর্তমান।
শিবাঙ্গী যখন প্রথম বার মিগ-২১ যুদ্ধবিমান উড়িয়েছিলেন তখন তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, একটি যুদ্ধবিমান নিয়ন্ত্রণের জন্য কী পরিমাণ দক্ষতার প্রয়োজন হয়। এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন যে, একা বিমান চালানোর সময় ভয় পেয়েছিলেন। কিন্তু সেই স্মৃতি মনে পড়লে তাঁর মন আনন্দে ভরে যায়।
এক যুদ্ধবিমান ছেড়ে অন্য যুদ্ধবিমান চালানোর জন্য নিতে হয় ‘কনভারসন ট্রেনিং’। শিবাঙ্গী যে হেতু রাফাল চালানোর আগে মিগ-২১ যুদ্ধবিমান চালাতেন, তাই তাঁকে এই প্রশিক্ষণ নিতে হয়েছিল।
কঠোর প্রশিক্ষণ শেষ হওয়ার পর অম্বালা বিমানঘাঁটিতে ‘গোল্ডেন অ্যারোজ’ স্কোয়াড্রনে যোগ দিয়েছিলেন শিবাঙ্গী। সেই সময় ভারতীয় বায়ুসেনায় মোট ১০ জন মহিলা ফাইটার পাইলট ছিলেন। কিন্তু শিবাঙ্গী তাঁদের মধ্যে প্রথম যিনি রাফাল যুদ্ধবিমান ওড়ানোর দায়িত্ব পান।
২০২০ সালে ভারতীয় বিমানবাহিনীর কঠোর নির্বাচন প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে শিবাঙ্গী ফরাসি প্রশিক্ষকদের সঙ্গে আলাদা ভাবে সিমুলেটর প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। ২০২২ সালের প্রজাতন্ত্র দিবসের কুচকাওয়াজে ভারতীয় বিমানবাহিনীর ট্যাবলোর অংশ ছিলেন শিবাঙ্গী।
এক সহকর্মী ফাইটার পাইলটকে বিয়ে করেছেন শিবাঙ্গী। বর্তমানে অন্য স্বপ্নপূরণের জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন তিনি। শিবাঙ্গী ছুঁতে চান মহাকাশ। আগামী দিনে মহাকাশে মানুষকে পাঠানোর পরিকল্পনা করছে ভারত। সেই অভিযানের সওয়ারি হতে চান তিনি। এমনকি টেস্ট পাইলট প্রশিক্ষণের জন্য আবেদনও করে ফেলেছেন ভারতের রাফাল যুদ্ধবিমানের প্রথম মহিলা পাইলট।