Iran War Impact on India

রান্নার গ্যাস থেকে পেট্রল-ডিজ়েল, হু-হু করে বাড়তে পারে জিনিসের দাম! ইরান যুদ্ধে ‘সিঁদুরে মেঘ’ দেখছে ভারত

ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে জ্বলছে সমগ্র পশ্চিম এশিয়া। এর জেরে বিশ্ববাজারে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে অপরিশোধিত তেলের দর। এর কতটা ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে নয়াদিল্লির উপর? ভিন্‌দেশে সংঘাতের আঁচে পুড়তে হবে এ দেশের আমজনতাকে?

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ০৩ মার্চ ২০২৬ ১৬:৪৬
Share:
০১ ১৮

এক দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজ়রায়েল। অন্য দিকে ইরান। দুই শিবিরের মুখোমুখি সংঘর্ষে জ্বলছে পশ্চিম এশিয়া। ইতিমধ্যেই সংশ্লিষ্ট যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, কাতার, কুয়েত এবং বাহরাইনের মতো উপসাগরীয় দেশ। শুধু তা-ই নয়, সংঘর্ষে ‘নাক গলাতে’ দেখা যাচ্ছে ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানিকেও। ভারতের উপর পড়বে এর কতটা প্রভাব? বর্তমানে তারই চুলচেরা বিশ্লেষণ শুরু করে দিয়েছে কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকার।

০২ ১৮

ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়া ইস্তক বাড়ছে খনিজ তেলের দাম। কারণ, বিশ্বব্যাপী তরল সোনার সিংহভাগই রফতানি করে পশ্চিম এশিয়ার এই সমস্ত আরব দেশ। সংঘাত পরিস্থিতিতে তাদের পক্ষে তেল উৎপাদন এবং সরবরাহ যে কঠিন হচ্ছে, তা বলাই বাহুল্য। মার্কিন গণমাধ্যম ব্লুমবার্গের রিপোর্ট অনুযায়ী, এই পরিস্থিতি বজায় থাকলে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে তরল সোনার দর। ভারতীয় অর্থনীতির গায়ে সেই আঁচ পড়বে বুঝে তেলের বিকল্প বাজারের সন্ধান চালাচ্ছে নয়াদিল্লি।

Advertisement
০৩ ১৮

চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি আমেরিকা ও ইজ়রায়েল যৌথ ভাবে ইরানকে নিশানা করলে বেধে যায় যুদ্ধ। এর ঠিক দু’দিনের মাথায় (পড়ুন ২ মার্চ) সাত শতাংশ বৃদ্ধি পায় ব্রেন্ট ক্রুডের দর। ফলে ব্যারেলপ্রতি ৮২.৩৭ ডলারে পৌঁছে গিয়েছে ওই অপরিশোধিত তেল, গত বছরের (২০২৫ সাল) জানুয়ারির পর যা সর্বোচ্চ। আর্থিক বিশ্লেষক জ়িয়াদ দাউদ এবং দিনা এসফানদিয়ারি এ প্রসঙ্গে ব্লুমবার্গে লিখেছেন, প্রতি ব্যারেল তরল সোনার দর পৌঁছোতে পারে ১০৮ ডলারে।

০৪ ১৮

বর্তমানে খনিজ তেলের ৮২ শতাংশ বিদেশ থেকে আমদানি করে ভারত। এই পরিস্থিতিতে বিশ্ববাজারে ব্যারেলপ্রতি তরল সোনার দর এক ডলার বৃদ্ধি পেলে সংশ্লিষ্ট খাতে বার্ষিক খরচ বাড়তে পারে অন্তত ২০০ কোটি ডলার। এর জেরে নয়াদিল্লির বাণিজ্যিক ভারসাম্যের উপর যে চাপ পড়বে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। ফলে বিকল্প হিসাবে ফের রুশ উরাল ক্রুডের দিকে মুখ ফেরাবে মোদী সরকার? না কি ভরসা দেবে ভেনেজ়ুয়েলার অপরিশোধিত তেল? ঘুরপাক খাচ্ছে সেই প্রশ্ন।

০৫ ১৮

যুদ্ধ পরিস্থিতিতে পারস্য ও ওমান উপসাগরের সংযোগকারী হরমুজ় প্রণালী পুরোপুরি বন্ধ করেছে ইরান। ১৬৭ কিলোমিটার লম্বা এবং ৩৩-৩৯ কিলোমিটার চওড়া ওই সামুদ্রিক রাস্তাটি তেল সরবরাহের অন্যতম ব্যস্ত পথ হিসাবে পরিচিত। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী তরল সোনা সরবরাহের ২০ শতাংশই হয় হরমুজ় প্রণালী দিয়ে। চলতি বছরের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে আমদানি করা ক্রুডের ৫১ শতাংশ সংশ্লিষ্ট রাস্তাটি দিয়ে ঘরের মাটিতে এনেছে ভারত।

০৬ ১৮

মার্কিন ও ইহুদি ফৌজের সঙ্গে সংঘাতের মধ্যেই হরমুজ় প্রণালীতে তিনটি তেলের ট্যাঙ্কারকে নিশানা করে তেহরান। তার মধ্যে একটিতে ছিলেন বেশ কয়েক জন ভারতীয়। ওই ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট রাস্তায় পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ। পাশাপাশি, অপরিশোধিত তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাসবাহী অন্তত ২০০টি জাহাজ হরমুজ়ের জলসীমায় নোঙর ফেলেছে বলে খবর পাওয়া গিয়েছে। এর জেরে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে পরিবহণ এবং বিমা খরচ।

০৭ ১৮

এই পরিস্থিতিতে বিকল্প রাস্তা হিসাবে লোহিত সাগর এবং এডেন উপসাগরকে বেছে নেওয়ার সুযোগ আছে ভারতের। হরমুজ়ের মতো সেখানকার বাব এল-মান্দেব প্রণালীটিও অপরিশোধিত তেল পরিবহণের ব্যস্ত সমুদ্রপথ হিসাবে বিখ্যাত। কিন্তু ইতিমধ্যেই ইরানের পক্ষ নিয়ে সংশ্লিষ্ট সংঘাতে নেমেছে প্যালেস্টাইনপন্থী ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা। ফলে সেখানে পণ্যবাহী জাহাজ আটকাতে পারে তারা। আর তাই পশ্চিম এশিয়া থেকে ক্রুড আমদানির চ্যালেঞ্জ বাড়ছে নয়াদিল্লির।

০৮ ১৮

পেট্রোলিয়াম মন্ত্রক সূত্রে খবর, আপাতত কেন্দ্রের হাতে ৭৪ দিনের তরল সোনা মজুত রয়েছে। ফলে সরবরাহ ধাক্কা খেলেও তাৎক্ষণিক ভাবে ঘরোয়া বাজারে পেট্রল-ডিজ়েলের দাম বৃদ্ধির আশঙ্কা কম। তবে যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে দ্রুত বদলাবে সেই পরিস্থিতি। অপরিশোধিত তেলের পাশাপাশি তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের ৮০ শতাংশ পশ্চিম এশিয়ার আরব দেশগুলি থেকে আমদানি করে থাকে ভারত। তার ৬০ শতাংশ আবার আসে হরমুজ় প্রণালী দিয়ে।

০৯ ১৮

আর তাই বিশ্লেষকদের দাবি, ইরান যুদ্ধের আঁচ এ দেশের আমজনতার হেঁশেলে পড়ার সর্বাধিক আশঙ্কা রয়েছে। এই সংঘর্ষের জেরে পেট্রল-ডিজ়েলের চেয়েও বেশি বাড়তে পারে রান্নার গ্যাসের দাম। অন্য দিকে উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে সতর্ক করেছে দেশের সবচেয়ে বড় বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠান এইচডিএফসি ব্যাঙ্ক। তাদের দাবি, তেলের দামে স্বল্পমেয়াদি বৃদ্ধি ভারতীয় মুদ্রার (রুপি) উপর চাপ সৃষ্টি করবে। এর জেরে হু-হু করে বাড়তে পারে আর্থিক ঘাটতির অঙ্ক।

১০ ১৮

২০২৬-’২৭ অর্থবর্ষে ঘাটতির পরিমাণ মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বা জিডিপির (গ্রস ডোমেস্টিক প্রোডাক্ট) এক শতাংশ থাকবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। কিন্তু, অপরিশোধিত তেলের দাম ১০ ডলার পর্যন্ত ধারাবাহিক ভাবে বৃদ্ধি পেলে, তাতে আসবে বড় বদল। সে ক্ষেত্রে অন্য বিষয়গুলি অপরিবর্তিত থাকলে আর্থিক ঘাটতি ৪০ থেকে ৫০ বেসিস পয়েন্ট বাড়তে পারে। এতে স্থবির হতে পারে অর্থনৈতিক বৃদ্ধি, বলছে এইচডিএফসি ব্যাঙ্ক।

১১ ১৮

ইরান যুদ্ধে তেলের দাম বৃদ্ধিতে ফের ঊর্ধ্বমুখী হতে পারে দেশের খুচরো বাজারের মূল্যবৃদ্ধির সূচক। বর্তমানে তা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সমর্থ হয়েছে রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া (আরবিআই)। গত বছরের (২০২৫ সাল) জুনে ভোক্তা মুদ্রাস্ফীতি ২.১ শতাংশে নেমে আসে। অক্টোবরে সেটা আরও কমে দাঁড়ায় ০.২৫ শতাংশ, যা ঐতিহাসিক ভাবে সর্বনিম্ন। চলতি বছরের জানুয়ারিতে অবশ্য ফের কিছুটা চড়েছে ওই সূচক। ওই সময় মুদ্রাস্ফীতির হার পৌঁছোয় ২.৭৫ শতাংশে।

১২ ১৮

গত বছর (২০২৫ সাল) ঘরোয়া মূল্যবৃদ্ধিতে পতন অব্যাহত থাকায় স্বস্তি পায় এ দেশের আমজনতা। আরবিআইয়ের আর্থিক সমীক্ষা রিপোর্ট অনুযায়ী, এর সূচক গড়ে ১.৮ শতাংশে ঘোরাফেরা করেছে। অন্য দিকে ২০২৫-’২৬ আর্থিক বছরের প্রথমার্ধে জিডিপি বৃদ্ধির হার ছিল আট শতাংশ। মুদ্রাস্ফীতির হারকে ২-৬ শতাংশের মধ্যে রাখার লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক। পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ সেই হিসাবকে পুরোপুরি বদলাতে পারে।

১৩ ১৮

তেলের দাম বৃদ্ধিতে দেশের আর্থিক এবং বাণিজ্যিক ভারসাম্য নষ্ট হলে আরও এক দিক থেকে সমস্যা হবে ভারতের। বিশেষজ্ঞদের কথায়, মুদ্রাস্ফীতির সূচক ঊর্ধ্বমুখী হলে রেপো রেট বা সুদের হার হ্রাস করা রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্কের পক্ষে অসম্ভব। তখন ভাসমান হারে বাড়ি বা গা়ড়ির ঋণে একেবারেই স্বস্তি পাবে না মধ্যবিত্ত। পাশাপাশি, এই সংঘাতের জেরে ডলারের নিরিখে পড়তে পারে টাকার দাম। ইতিমধ্যেই তা ৯০ থেকে ৯১-এর মধ্যে ঘোরাফেরা করছে।

১৪ ১৮

ইরান যুদ্ধের জেরে আপাতত বন্ধ আছে আরব দেশগুলির আকাশসীমা। ব্যাহত হচ্ছে দুবাই পর্যন্ত পণ্যবাহী জাহাজের পরিবহণও। ফলে মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ভারতের পশ্চিম এশিয়ার ব্যবসা। উদাহরণ হিসাবে আমিরশাহির কথা বলা যেতে পারে। উপসাগরীয় দেশটি নয়াদিল্লিকে বিপুল পরিমাণে সোনা ও না-কাটা হিরে (রাফ ডায়মন্ড) সরবরাহ করে থাকে। ফি বছর বিপুল হলুদ ধাতু আমদানি করে কেন্দ্র। এর ৫০-৬০ শতাংশই আসে দুবাই থেকে।

১৫ ১৮

তা ছাড়া বিপুল খরচ করে দক্ষিণ ইরানের চাবাহার বন্দরটি তৈরি করেছে নয়াদিল্লি। উত্তর ইজ়রায়েলের হাইফা বন্দর নিয়ন্ত্রণ করছে এ দেশের আদানি গোষ্ঠী। যুদ্ধের সময় দু’টি জায়গাতেই হামলা হতে পারে। এতে কৌশলগত বিনিয়োগগুলি সম্পূর্ণ ভাবে জলে যেতে পারে। আর তাই কূটনৈতিক পথে সেগুলিকে বাঁচানোর মরিয়া চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে কেন্দ্র।

১৬ ১৮

পশ্চিম এশিয়ায় সংঘর্ষ শুরু হতেই মন্ত্রিসভার নিরাপত্তা বিষয়ক কমিটির সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্করকে ইজ়রায়েলের সঙ্গে যোগাযোগ করতে দেখা গিয়েছে। তবে সরাসরি ভাবে কোনও পক্ষের হয়েই কথা বলেনি নয়াদিল্লি। যথেষ্ট সাবধানি বিবৃতি দিয়েছে কেন্দ্র। পাশাপাশি, আরব দেশগুলিতে আটকে পড়া ভারতীয়দের উদ্ধারে উদ্যোগী হচ্ছে সরকার।

১৭ ১৮

সূত্রের খবর, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে জ্বালানি সরবরাহ বজায় রাখতে পারস্য উপসাগর সংলগ্ন এলাকায় নৌবাহিনী মোতায়েন করছে নয়াদিল্লি। তা ছাড়া বিবদমান দেশগুলিকে কাছে টানতে মানবিক সাহায্য দেওয়ার সিদ্ধান্তও নিয়েছে কেন্দ্র। পাশাপাশি, আরব দেশগুলিতে আটকে পড়া ভারতীয়দের উদ্ধারে নামছে এ দেশের বায়ুসেনা। তাই তিন বাহিনীকেই ‘হাই অ্যালার্টে’ থাকার নির্দেশ দিয়েছে মোদী প্রশাসন।

১৮ ১৮

যুদ্ধের গোড়াতেই ইজ়রায়েল এবং আমেরিকার যৌথ হামলায় প্রাণ হারান ইরানের শিয়া ধর্মগুরু তথা সর্বোচ্চ নেতা (সুপ্রিম লিডার) আয়াতোল্লাহ আলি খামেনেই। এই ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে বিক্ষোভে শামিল হয়েছেন বহু মানুষ। সংশ্লিষ্ট জনরোষ ইহুদি বা মার্কিন দূতাবাসের উপর আছড়ে পড়া অসম্ভব নয়। ফলে সে দিকেও সতর্ক দৃষ্টি রাখছে কেন্দ্র। তেহরানের সমর্থনে উস্কানিমূলক মন্তব্য করলে চিহ্নিত করে পদক্ষেপের নির্দেশ দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক।

সব ছবি: সংগৃহীত ও এআই সহায়তায় প্রণীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement