এই অস্ত্র ব্যবহারের মূল উদ্দেশ্য বিশাল এলাকা ধ্বংস করা বা কয়েক লক্ষ মানুষকে মেরে ফেলা নয়। বরং মানুষের মধ্যে তেজস্ক্রিয়তার বিষয়ে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে দেওয়া। একটি নির্দিষ্ট এলাকা, যেমন কোনও শহরের কেন্দ্রস্থল বা গুরুত্বপূর্ণ ভবনকে দীর্ঘ দিন ধরে ব্যবহারের অনুপযোগী করে তোলা। শত্রুদেশের এই বোমা ব্যবহারের নেপথ্যে থাকে অর্থনৈতিক ক্ষতিসাধনের উদ্দেশ্য। দূষিত তেজস্ক্রিয় এলাকা পরিষ্কার করতে বিপুল অর্থ ও সময় খরচ করানো।
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএএইএ) অনুমান, ইরানের হাতে এখন ৬০ শতাংশ বিশুদ্ধ ৪৪০.৯ কেজি (৯৭২ পাউন্ড) ইউরেনিয়াম রয়েছে। পরমাণু অস্ত্রের জন্য প্রয়োজন হয় ইউরেনিয়ামের আইসোটোপ ইউরেনিয়াম-২৩৫। প্রাকৃতিক ভাবে ইউরেনিয়ামে এই আইসোটোপ থাকে ০.৭ শতাংশ। ইউরেনিয়ামকে বিশুদ্ধ করে এর পরিমাণকে ৩ থেকে ৫ শতাংশে নিয়ে যাওয়া হলে সেই ইউরেনিয়াম বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে ব্যবহার করা যায়।
তবে পরমাণু অস্ত্রের জন্য প্রয়োজন ইউরেনিয়ামের ৯০ শতাংশ বা তার বেশি বিশুদ্ধতা। সেই পর্যায়ে পৌঁছোতে পারলে তবেই কোনও দেশ পরমাণু অস্ত্র তৈরি করতে পারবে। ইরান এখনও সেই পর্যায়ে পৌঁছোয়নি বলে খবর রয়েছে আন্তর্জাতিক মঞ্চে। তবে গোপনে ইরান তাদের কেন্দ্রে ইউরেনিয়ামের ৯০ শতাংশের বিশুদ্ধতার গণ্ডি ছুঁয়ে ফেলেছে কি না, তা কেউ জানে না।
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী ইরানের হাতে পরমাণু বোমা তৈরির রসদ না থাকলেও অন্য একটি মারাত্মক অস্ত্র তৈরির পথে হাঁটতে পারে ইরান। এমনটাই রব উঠেছে বিভিন্ন মহলে। পারমাণবিক বোমার মতো গণবিধ্বংসী মারণাস্ত্র না হলেও সেই অস্ত্রটি ব্যবহারের ফলাফল সুদূরপ্রসারী হতে পারে।
তেজস্ক্রিয় উৎসগুলিকে বিস্ফোরকের মধ্যে ভরে গাড়ি, ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে হামলা চালালে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের চেয়ে শত্রু দেশের উপর মনস্তাত্ত্বিক এবং অর্থনৈতিক প্রভাব বেশি পড়ে। যদিও আজ পর্যন্ত কোনও রাষ্ট্র বা কোনও যুদ্ধে সরকারি ভাবে এটি ব্যবহারের খবর পাওয়া যায়নি।
২০২২ সালে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে ‘ডার্টি বম্ব’ ব্যবহারের পরিকল্পনার অভিযোগ তুলেছিল রাশিয়া। মার্কিন-ইজ়রায়েলি হামলা এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে তেহরানের প্রতিশোধমূলক হামলার পরিপ্রেক্ষিতে অনেকের মনে সেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। পশ্চিম এশিয়ায় চলমান যুদ্ধের আবহে তুলনামূলক কম প্রাণঘাতী এবং বেশি সমস্যা সৃষ্টিকারী সেই ‘নোংরা বোমা’কেই কি বেছে নেবে তেহরান?
সাধারণ বোমা বা কামানের গোলার গায়ে তেজস্ক্রিয় ইউরেনিয়ামের আস্তরণ পড়লেই হয়ে ওঠে আরও বিধ্বংসী। বিস্ফোরকের সঙ্গে তেজস্ক্রিয় পদার্থ মেশানো হলে তা আরও প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। এই বোমা ব্যবহারে সামগ্রিক ভাবে পরিবেশ দূষিত হয়ে ওঠে। ইউরেনিয়ামের মতো তেজস্ক্রিয় পদার্থের সংস্পর্শে এলে ক্যানসারের মতো রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
আদতে এই বোমার নাম ‘ডার্টি বম্ব’ বা ‘রেডিয়োলজিক্যাল ডিজ়পার্সাল ডিভাইস’ (আরডিডি)। এগুলি আকাশ থেকে কয়েকটি প্রচলিত তেজস্ক্রিয় পদার্থ ছড়িয়ে দিতে পারে। যে এলাকার ওপর ডার্টি বম্ব পড়ে, সেখানে ছড়িয়ে পড়ে প্রচুর পরিমাণে তেজস্ক্রিয় পদার্থ।
তেজস্ক্রিয় পদার্থগুলি ভেঙে যায় গামা ও এক্স-রে’তে। তার সঙ্গে হয় আলফা ও বিটা রশ্মির বিকিরণ। গামা ও এক্স-রে বাতাসে দ্রুত ছড়ায় অনেক দূর পর্যন্ত। শরীরের ভিতরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গে ঢুকে যেতে পারে তেজস্ক্রিয় বিকিরণ। খাবার, শ্বাসের সঙ্গে শরীরে ঢুকলেও তা অত্যন্ত ক্ষতিকারক।
তখন সেই বিস্ফোরণের শক্তিতে ভিতরের তেজস্ক্রিয় পদার্থ গুঁড়ো বা তরল আকারে চারপাশের বাতাস, মাটিতে ছড়িয়ে পড়ে। ডার্টি বোমা পরমাণু বোমার মতো বিধ্বংসী না হলেও এটি গণ-আতঙ্ক তৈরির অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করা হয়।
পারমাণবিক বোমা হল একটি মহা-বিধ্বংসী অস্ত্র, যা প্রচণ্ড তাপ এবং তেজস্ক্রিয়তা দিয়ে তাৎক্ষণিক ভাবে লক্ষ লক্ষ প্রাণহানি ঘটাতে পারে। অন্য দিকে, ডার্টি বোমা হল একটি সাধারণ বোমা যা তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে দিয়ে নির্দিষ্ট এলাকা দূষিত করে এবং মানুষের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি আতঙ্ক ও স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। ডার্টি বোমার তেজস্ক্রিয়তা পারমাণবিক বোমার তুলনায় অনেক কম মারাত্মক।
বেশ কয়েকটি অস্ত্র ব্যবহারের উপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে বিশ্ব জুড়ে। শুধুমাত্র আধুনিক যুদ্ধের ইতিহাসে নয়, প্রাচীন যুগেও যুদ্ধক্ষেত্রে অস্ত্রের উপর নিয়ন্ত্রণের নিয়ম চালু ছিল। আন্তর্জাতিক মানবিক আইন মেনে আধুনিক যুদ্ধাস্ত্রের ক্ষেত্রে কিছু নিষিদ্ধ বা সীমিত অস্ত্রের রূপরেখা তৈরি করেছে ‘দ্য কনভেনশন অন সার্টেন কনভেনশনাল ওয়েপন্স’।
সেই আন্তর্জাতিক আইন ও প্রথা অনুযায়ী এই বোমাটির ব্যবহার নিষিদ্ধ এবং অবৈধ। মারাত্মক তেজস্ক্রিয় অস্ত্রটি জনস্বাস্থ্যকে চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিতে পারে।
পর্যাপ্ত তেজস্ক্রিয় পদার্থ, বিস্ফোরক পাওয়া গেলে এটি তৈরির জ্ঞান আছে এমন যে কোনও দেশই তত্ত্বগত ভাবে বোমাটি তৈরি করতে পারে। চিকিৎসা বা শিল্পক্ষেত্রে ব্যবহৃত রেডিয়োঅ্যাক্টিভ আইসোটোপ (সিজিয়াম-১৩৭, কোবাল্ট-৬০ বা অ্যামেরিসিয়াম-২৪১) দিয়ে সহজেই তেজস্ক্রিয় পদার্থ তৈরি করা যায়। সাধারণত হাসপাতাল, গবেষণাগার বা শিল্পকারখানা থেকে চুরি বা অবৈধ ভাবে সংগ্রহ করা যায় এগুলি।
ডিনামাইট বা অন্য কোনও শক্তিশালী বাণিজ্যিক বিস্ফোরক ব্যবহার করে কোনও শহরের নির্দিষ্ট এলাকায় তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে দেওয়া যেতে পারে। মাটি, বহুতল যানবাহন, মানুষ, বাতাস (শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে), এমনকি জল এবং খাবারকেও দূষিত করতে পারে এটি।
তবে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল মহলের একাংশের ধারণা, ইরান এই পরিস্থিতিতে ডার্টি বোমা ব্যবহার করার হঠকারিতা দেখাবে না। এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইজ়রায়েলের মতো পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশের বিরুদ্ধে সরাসরি উস্কানির শামিল হবে, যার জবাবে তারা ব্যাপক প্রতিশোধমূলক হামলা চালাতে পিছপা হবে না।
তবে ইরানে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের উপস্থিতি অন্যান্য দেশের (বিশেষ করে আমেরিকা) শিরঃপীড়ার কারণ। এটি ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার মাত্রা বাড়াতেও যথেষ্ট ভূমিকা রাখে। সমস্ত পরিস্থিতি খতিয়ে দেখে আপাতত বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, ডার্টি বোমা দিয়ে হামলা একটি সুদূরপ্রসারী আশঙ্কা। চলমান পরিস্থিতিতে বোমা ব্যবহার নয়, বরং সামরিক, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপই ইরানের কাছে সহজ বিকল্প।