মাঝ-আকাশ থেকে পাক খেয়ে ভেঙে পড়ছে লড়াকু জেট। দাউ দাউ করে জ্বলছে ইঞ্জিন। বিপদ বুঝে ককপিট ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছেন পাইলট। কিছু ক্ষণের মধ্যেই প্যারাশুটে আরবের তপ্ত মরুভূমিতে নেমে আসতে দেখা যায় তাঁকে। ইরান বনাম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজ়রায়েল যুদ্ধের এ-হেন হাড়হিম করা ভিডিয়ো ইতিমধ্যেই ভাইরাল হয়েছে সমাজমাধ্যমে। প্রায় তার সঙ্গে সঙ্গেই লড়াকু জেট ধ্বংসের ‘কৃতিত্ব’কে কেন্দ্র করে দড়ি টানাটানিতে জড়িয়ে পড়েছে বিবদমান দুই পক্ষ।
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন ও ইহুদি ফৌজ একযোগে ইরানকে নিশানা করলে পশ্চিম এশিয়ায় বেধে যায় লড়াই। আক্রমণের প্রাথমিক ধাক্কা সামলে পাল্টা ‘হাইপারসনিক’ (শব্দের পাঁচ গুণের চেয়ে গতিশীল) ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোনে প্রত্যাঘাত শানায় তেহরান। পাশাপাশি, আকাশ প্রতিরক্ষা (এয়ার ডিফেন্স) ব্যবস্থাকে সক্রিয় করে সাবেক পারস্যের সেনা। এই পরিস্থিতিতে যুদ্ধের তৃতীয় দিনে (পড়ুন ২ মার্চ) প্রকাশ্যে আসে আমেরিকার এফ-১৫ ইগল যুদ্ধবিমান ভেঙে পড়ার ভিডিয়ো, যা নিয়ে শুরু হয় হইচই।
মার্কিন এফ-১৫ লড়াকু জেট ধ্বংসের ভিডিয়ো সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার কিছু ক্ষণের মধ্যেই বিবৃতি দেন ইরানি সেনার মুখপাত্র ইব্রাহিম জোলফাগারি। তেহরানের প্রত্যাঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক যুদ্ধবিমান ধ্বংস হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। এ ক্ষেত্রে অবশ্য কোনও সংখ্যা উল্লেখ করেননি সাবেক পারস্যের ওই ফৌজি আধিকারিক। ওই দিনই জেট ভাঙার কথা স্বীকার করে কুয়েত প্রশাসন এবং আমেরিকার যুদ্ধ দফতরের (ডিপার্টমেন্ট অফ ওয়ার) সদর কার্যালয় পেন্টাগন।
কুয়েতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের তরফে একটি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ১ মার্চ দুপুরে মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলি আরবের মরুভূমিতে ভেঙে পড়ে। ধ্বংস হওয়া জেটের লড়াকু পাইলটেরা নিরাপদে রয়েছেন। তাঁদের উদ্ধার করেছে স্থানীয় প্রশাসন। অন্য দিকে পেন্টাগনের দাবি, মোট তিনটি এফ-১৫ ইগল যুদ্ধবিমান হারিয়েছে আমেরিকা। ইরানি সেনা নয়, সেগুলি ভেঙেছে কুয়েতের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ‘বন্ধুত্বপূর্ণ’ আক্রমণে।
পেন্টাগনের এই মন্তব্যকে কেন্দ্র করেই শুরু হয়েছে বিতর্ক। পশ্চিম এশিয়ায় আছে মার্কিন সেনার কেন্দ্রীয় কমান্ড সেন্টকম। কুয়েতের আকাশ প্রতিরক্ষার দায়িত্বও রয়েছে তাদেরই কাঁধে। সেই লক্ষ্যে আরব মুলুকটিতে প্যাট্রিয়ট এয়ার ডিফেন্স মোতায়েন রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। সেখানকার ইন্টারসেপ্টর রকেটেই কি ধ্বংস হয়েছে ওই তিন জেট? নিজেরাই নিজেদের যুদ্ধবিমানকে কী ভাবে গুলি করে নামাল আমেরিকা? এই সমস্ত প্রশ্নে অবশ্য মুখে কুলুপ এঁটে আছে ওয়াশিংটন।
সেন্টকম সূত্রকে উদ্ধৃত করে সিএনএন জানিয়েছে, কুয়েতের আলি আল সালেম বায়ুসেনা ঘাঁটির ১০ কিলোমিটারের মধ্যে ভেঙে পড়ে তিনটি জেট। সংশ্লিষ্ট ‘এয়ারফিল্ড’টিতে মোতায়েন আছে মার্কিন ফৌজ এবং প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। ফলে ‘বন্ধুত্বপূর্ণ’ গুলিবর্ষণে যুদ্ধবিমানগুলির ভূপতিত হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়ার নয়। যদিও ইরানের দাবিকেও পুরোপুরি মিথ্যা বলে নাকচ করা ঠিক হবে না, বলছেন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকেরা।
সামরিক বিশেষজ্ঞদের যুক্তি, তেহরানের হাতে আছে রুশনির্মিত এস-৩০০ এবং চিনের এইচকিউ-৯বি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। এগুলির জেট ধ্বংসকারী ইন্টারসেপ্টর রকেটের পাল্লা কম-বেশি ৩০০ কিলোমিটার। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, আলি আল সালেম বিমানঘাঁটি থেকে ইরান সীমান্তের অবস্থান মেরেকেটে ১৫০ কিলোমিটার। ফলে সাবেক পারস্যের সেনা যে যুদ্ধবিমানগুলি ধ্বংসের সুযোগ পেয়েছিল, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
তবে এ ক্ষেত্রে উল্টো যুক্তিও রয়েছে। আমেরিকার সঙ্গে মিলে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে নিকেশ করতে ২০০ লড়াকু জেট নিয়ে হামলা চালায় ইজ়রায়েল। এর মধ্যে ছিল যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম প্রজন্মের স্টেল্থ শ্রেণির এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান। তা ছাড়া এফ-১৫ ও এফ-১৬ জেট ওড়ান ইহুদি পাইলটেরা। আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী হলে সেগুলির একটাকেও কেন ধ্বংস করতে পারল না তেহরান? উল্টে চিনা এয়ার ডিফেন্স এইচকিউ-৯বি সে ভাবে কাজ করেনি বলে সূত্র মারফত মিলেছে খবর।
গত বছরের (পড়ুন ২০২৫ সাল) জুনে ইরান-ইজ়রায়েল যুদ্ধতেও একই ছবি ধরা পড়েছিল। লড়াইয়ের গোড়াতেই তেহরানের আকাশের একরকম একচ্ছত্র দখল নিয়ে ফেলে তেল আভিভ। শুধু তা-ই নয়, তাদের নিখুঁত হামলায় প্রাণ হারান সাবেক পারস্যের বেশ কয়েক জন শীর্ষ সেনা আধিকারিক। তাঁদের অধিকাংশই আবার ছিলেন ‘ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর’ বা আইআরজিসির কমান্ডার। তখনও প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি উপসাগরীয় দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।
পশ্চিম এশিয়ায় মার্কিন ফৌজের বিরুদ্ধে নিজেদের জেট গুলি করে নামানোর অভিযোগ এই প্রথম উঠল, এমনটা নয়। ২৩ বছর আগে ব্রিটিশ বিমানবাহিনীর (রয়্যাল এয়ারফোর্স) টর্নেডো জিআর-৮ সামরিক বিমান ধ্বংস করে যুক্তরাষ্ট্রের প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। ওই ঘটনায় প্রাণ হারান ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কেভিন মেইন এবং ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট ডেভ উইলিয়ামস। ইরাক যুদ্ধ চলাকালীন সংশ্লিষ্ট এই বিমান গুলি করে নামানোর ঘটনা সারা বিশ্বে সাড়া ফেলে দিয়েছিল।
২০০৩ সালের ২৩ মার্চ ধ্বংস হয় ব্রিটেনের টর্নেডো জিআর-৮ সামরিক বিমান। পরে এ প্রসঙ্গে রয়্যাল এয়ারফোর্সের এক আধিকারিক বলেন, ‘‘ইরাকে অভিযান শেষ করে আমাদের পাইলটেরা ফিরছিলেন। আমেরিকান সৈন্যরা ওই যুদ্ধবিমানকে বাগদাদের বলে ভেবেছিল। আর তাই মাঝ-আকাশেই সেটা উড়িয়ে দেয় তারা। দুঃখের বিষয় হল, হামলার আগে পাইলটকে সতর্ক করা হয়নি।’’ এর ঠিক ১২ দিনের মাথায়, ৩ এপ্রিল মার্কিন নৌবাহিনীর এফ/এ-১৮সি সুপার হর্নেট যুদ্ধবিমানকে উড়িয়ে দেয় সেন্টকমের প্যাট্রিয়ট।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে একই ভাবে রণতরী থেকে ইন্টারসেপ্টর রকেট ছুড়ে নিজেদের এফ/এ-১৮সি সুপার হর্নেট যুদ্ধবিমান ধ্বংস করে আমেরিকার নৌবাহিনী। রাতের অন্ধকারে আলো নিবিয়ে ওই জেট নিয়ে পাইলট বিমানবাহী রণতরীর দিকে যাচ্ছিলেন। তাতেই সন্দেহ হয় মার্কিন সেনার। কোনও ঝুঁকি না নিয়ে এয়ার ডিফেন্স ব্যবহার করে বসেন তাঁরা। ভেঙে পড়া জেট সমুদ্র থেকে উদ্ধারও করা যায়নি।
২০২৪ সালে লোহিত সাগরে মোতায়েন থাকা বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস হ্যারি ট্রুম্যান থেকে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের গুপ্ত ঘাঁটিতে একের পর এক হামলা পরিচালনা করে মার্কিন নৌসেনা। ওই সময়েই যুদ্ধজাহাজ থেকে ভুলবশত ইন্টারসেপ্টর রকেট ছোড়া হয়েছিল বলে পরে মেনে নেয় পেন্টাগন। এর জন্য কোনও সেনা অফিসারের শাস্তি হয়েছিল কি না, তা অবশ্য জানা যায়নি। প্রতি বারই এই ধরনের ঘটনাকে ‘দুর্ভাগ্যজনক’ বলে দায় সেরেছে আমেরিকা।
পশ্চিম এশিয়ায় কেন বার বার নিজেদের সামরিক বিমানকে নিজেরাই গুলি করে নামাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের প্যাট্রিয়ট? এর নেপথ্যে একাধিক কারণের কথা বলেছেন মার্কিন প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ শানাকা আনসলেম পেরেরা। তাঁর কথায়, ‘‘সংশ্লিষ্ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাটিকে দুর্দান্ত ভরসাযোগ্য বলা যাবে না। তা ছাড়া বর্তমান পরিস্থিতিতে তাকে একসঙ্গে একাধিক কাজ করতে হচ্ছে। বিভিন্ন হামলা ঠেকাতে গিয়ে সব কিছু গুলিয়ে ফেলছে ওই এয়ার ডিফেন্স।’’
শানাকা জানিয়েছেন, প্যাট্রিয়ট মূলত সাবসনিক এবং সুপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করতে সক্ষম। ইরান যুদ্ধে ‘হাইপারসনিক’ ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রকে চিহ্নিত করতে হচ্ছে সেটিকে। তা ছাড়া তেহরানের ড্রোনের ঝাঁকও যুক্তরাষ্ট্রের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাঝ-আকাশে সেগুলিকে ওড়াতে ঘন ঘন ছুড়তে হচ্ছে ইন্টারসেপ্টর রকেট। সেই কারণেই হিসাবের গোলমাল করে ফেলছেন সৈনিকেরা। ফলে মাঝেমধ্যেই ভাঙছে নিজেদের জেট।
সামরিক বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ আবার এই ঘটনাগুলিকে পুরোপুরি ‘মানব-ত্রুটি’ হিসাবে মানতে নারাজ। তাদের যুক্তি, লড়াকু জেট চেনার ক্ষেত্রে যথেষ্ট সমস্যা রয়েছে প্যাট্রিয়টের। একসঙ্গে অনেক রকেট উড়ে এলে ঠিকমতো কাজ করে না এর রেডার। গত বছর এই সংক্রান্ত একটি রিপোর্টই নাকি জমা পড়ে পেন্টাগনে। যদিও বিষয়টি নিয়ে সরকারি ভাবে কোনও মন্তব্য করেনি যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ দফতর।
সূত্রের খবর, আগামী দিনে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় কৃত্রিম মেধা বা এআই (আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স) প্রযুক্তি সংযুক্ত করবে আমেরিকা। তখন আর নিজেদের লড়াকু জেট চেনার ক্ষেত্রে কোনও সমস্যা হবে না বলেই মনে করছে পেন্টাগন। পাশাপাশি, শত্রুর ড্রোন হামলা ঠেকাতে আলাদা হাতিয়ার নির্মাণে জোর দিতে পারেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা গবেষকেরা।
ইরান যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য আমেরিকার পার্লামেন্ট ‘কংগ্রেস’-এর থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের বর্ষীয়ান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফলে আগামী দিনে তেহরানের উপর আক্রমণের ঝাঁজ বাড়াতে পারে তাঁর সেনা। এককথায় আরও বড় পরীক্ষা অপেক্ষা করে আছে প্যাট্রিয়ট-সহ অন্যান্য মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য। তখন নিজেদের জেটে গুলি চালানোর ‘দোষ’ ওই এয়ার ডিফেন্স কাটিয়ে উঠতে পারে কি না, সেটাই এখন দেখার।