‘অপারেশন রোরিং লায়ন্স’-এর পর এক পক্ষকাল কেটে গিয়েছে। পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ থামার কোনও লক্ষণই নেই। ইরানের উপর শুরু হওয়া ইজ়রায়েলি এবং মার্কিন হামলার জেরে অশান্তি ছড়িয়ে পড়েছে গোটা পশ্চিম এশিয়ায়। ইরান-ইজ়রায়েল-আমেরিকার চলমান সংঘাতের মাঝেই প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের বিমান ধ্বংসের দাবি তুলল ইজ়রায়েল।
ইজ়রায়েল সামরিক বাহিনীর শীর্ষকর্তাদের দাবি, তেহরানের মেহরাবাদ বিমানবন্দরে রাতভর বোমাবর্ষণে ধ্বংস হয়েছে একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বিমান। ইহুদি বাহিনীর কর্মকর্তাদের মতে, বিমানটি ব্যবহার করতেন ইরানের প্রয়াত শীর্ষনেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেই এবং সামরিক বাহিনীর পদস্থ অফিসারেরা। দেশের অভ্যন্তরে ও বিদেশে ভ্রমণের পাশাপাশি মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় রক্ষা করার জন্য কৌশলগত ভাবে এই বিমানটি ব্যবহার করা হত।
ইরানের বিমানবন্দরের হামলার বেশ কয়েকটি ভিডিয়ো ফুটেজ প্রকাশ্যে এসেছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, বিমানবন্দর থেকে আকাশে কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠছে আগুন এবং কালো ধোঁয়া। এই বিমানবন্দরটি তেহরানের মূল বাণিজ্যিক বিমানবন্দর।
অনেকেই বিমানটিকে ইরানের ‘এয়ারফোর্স ওয়ান’ হিসাবে অভিহিত করেন। ইরানের শত্রুদের দাবি অনুযায়ী, এই বিমানটি কেবল ক্ষমতার উচ্চপদে আসীন রাজনৈতিক নেতাদের যাতায়াতের জন্য নয়, বরং আঞ্চলিক ছায়াযুদ্ধে গোষ্ঠীগুলোর (যেমন হিজবুল্লা, হুথি, হামাস) সঙ্গে সমন্বয় এবং সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহের কাজেও ব্যবহার করা হত।
ইরানের রাজধানী তেহরানে ১৬ মার্চ থেকে রাতভর লাগাতার বোমাবর্ষণ করে চলেছে ইজ়রায়েল। সেই গোলাবর্ষণে গুঁড়িয়ে গিয়েছে খামেনেইয়ের সাধের উড়ন্ত ‘কৌশলগত সম্পদ’টি। এই বিমানটি ছিল ‘বোয়িং ৭৪৭’। পেল্লায় চেহারা। ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে আকাশে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে এই বিমান।
‘বোয়িং ৭৪৭’ যখন আকাশে ওড়ে, তখন তার রাজকীয় হাবভাব তাক লাগিয়ে দেয়। তাক তো লাগারই কথা! কারণ তাকে বলা হয় ‘আকাশের রানি’। ‘বোয়িং ৭৪৭’ গত কয়েক দশক ধরে যাত্রী ও পণ্য পরিবহণ করে আসছে। ‘আকাশের রানি’ তকমা দেওয়ার পাশাপাশি এই বিমানকে ‘জাম্বো জেট’ও বলা হয়ে থাকে।
আর পাঁচটা সাধারণ বিমানের থেকে ‘বোয়িং ৭৪৭’-এর নকশা অনেকটাই আলাদা। এই বিমানে চারটি ইঞ্জিন রয়েছে। রয়েছে দু’টি করিডর। একসঙ্গে প্রায় ৫০০ জন যাত্রীকে নিয়ে উড়তে পারে এই বিমান। সেই বিমানে চড়েই বিদেশভ্রমণ করতেন প্রয়াত সুপ্রিম লিডার ও তাঁর পারিষদেরা।
আকাশপথে হামলা এড়ানোর জন্য বিমানটিতে উন্নত মানের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পাশাপাশি ইলেকট্রনিক জ্যামিং প্রযুক্তিও ছিল। সরাসরি সামরিক কমান্ড সেন্টারের সঙ্গে যোগাযোগ করা ও সংযুক্ত থাকার জন্য বিমানটিতে ‘এনক্রিপ্টেড স্যাটেলাইট কমিউনিকেশন সিস্টেম’ ছিল বলেও জানা গিয়েছে।
ইজ়রায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা এবং সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিমানটি ধ্বংস করার নেপথ্যে ইহুদি রাষ্ট্রের শুধুমাত্র প্রতীকী কারণ ছিল না। ইরান সরকারের মদতপুষ্ট সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলির সঙ্গে মসৃণ যোগাযোগ ব্যাহত করার জন্য ইজ়রায়েলের কৌশলগত আক্রমণের অংশ এটি। বিমানটি হারানোর ফলে অক্ষশক্তির এই সমন্বয় ব্যাহত হবে।
ইজ়রায়েলি প্রতিরক্ষা দফতরের বায়ুসেনা কর্তাদের দাবি, খামেনেইয়ের ঘনিষ্ঠ বৃত্ত এবং লেবানন, প্যালেস্টাইন ও ইয়েমেনের সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সরাসরি সংযোগের একটি নিরাপদ মাধ্যম ছিল এই বিশেষ বিমানটি। ইজ়রায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনীর দাবি, তেহরানের মেহরাবাদ বিমানবন্দরে তাদের এই সুনির্দিষ্ট হামলা মূলত ইরানের কৌশলগত যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করার ক্ষেত্রে একটি বড় পদক্ষেপ।
আইডিএফ খামেনেইয়ের ব্যবহৃত বিমানকে একটি কৌশলগত সম্পদ হিসাবে বর্ণনা করেছে। এটি ধ্বংস হওয়ার ফলে ইরানি শাসনব্যবস্থার শীর্ষনেতৃত্বের মনোবল ও পরিচালনার সক্ষমতা দুর্বল হয়ে গিয়েছে বলে দাবি ইজ়রায়েল ডিফেন্স ফোর্স বা আইডিএফের। বিমানটি শুধুমাত্র ‘ভিভিআইপি’দের পরিবহণের জন্য ব্যবহার করা হত না। বরং সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহ ও বিতরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম ছিল খামেনেইয়ের ‘এয়ারফোর্স ওয়ান’।
১৬ মার্চের এই হামলায় বিমানটি মেহরাবাদ বিমানবন্দরের হ্যাঙ্গারে থাকা অবস্থায় ধ্বংস হয়। ইজ়রায়েলের দাবি অনুযায়ী, এর ফলে ইরানের নেতৃত্বের গতিবিধি এবং তাদের লজিস্টিক চেনের ওপর বড় ধরনের আঘাত হানা সম্ভব হয়েছে। বিমানটি ধ্বংস হওয়ার ফলে স্বাভাবিক ভাবেই ইরানকে যোগাযোগের ক্ষেত্রে কিছুটা বেগ পেতে হতে পারে বলে মনে করছে ইজ়রায়েল।
আইডিএফ দাবি করেছে যে, বিমানের এই ক্ষতি ‘প্রতিরোধ অক্ষ’-এর (হামাস, হিজবুল্লা, হুথি) সঙ্গে ইরানি শীর্ষনেতাদের সমন্বয় সাধনে বাধা দিতে সক্ষম হবে। সংগঠনগুলিকে রসদ সরবরাহের ক্ষমতাও উল্লেখযোগ্য ভাবে হ্রাস হবে তেহরানের। আইডিএফ এই অভিযানকে সুনির্দিষ্ট হামলা হিসাবে বর্ণনা করেছে এবং জোর দিয়ে বলেছে ইরানের কব্জায় থাকা এই ধরনের পরিকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করে হামলা জারি রাখবে তারা।
এই অভিযানটি একটি বৃহত্তর বিমান অভিযানের অংশ ছিল, যেখানে ইজ়রায়েল পশ্চিম ও মধ্য ইরান জুড়ে ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্র এবং প্রতিরক্ষা স্থাপন-সহ ২০০টিরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার খবর দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্র, মানববিহীন উড়ুক্ক যান বা ইউএভি ড্রোন লঞ্চ প্যাড এবং সামরিক কমান্ড সেন্টার।
চলতি মাসের শুরুতে ইজ়রায়েল জানায়, তারা একই বিমানবন্দরে ১৬টি বিমান ধ্বংস করেছে। এই সমস্ত বিমানগুলি ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোরের বৈদেশিক শাখা কুদস ফোর্স ও হিজবুল্লাহ-সহ বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠীর কাছে অস্ত্র ও নগদ অর্থ স্থানান্তরের জন্য ব্যবহার করা হত।
বেশ কিছু ইজ়রায়েলি সামরিক কর্মকর্তার মতে, নজরদারি ও লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণকে জটিল করে তোলার চেষ্টায় ইরান অচল বিমানের জন্য নির্ধারিত সংরক্ষণাগারে কিছু বিমানকে সরিয়ে নিয়ে গোপন করার চেষ্টা করেছিল। বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সরকারের প্রতিরক্ষা আধিকারিক জানিয়েছেন, এই ধরনের অভিযানগুলোর লক্ষ্য হল ইরানের সামরিক ‘নেটওয়ার্ক’গুলোকে দুর্বল করা। এই অঞ্চলে মিত্র গোষ্ঠীগুলির সঙ্গে সমন্বয় করার ক্ষমতা হ্রাস করা।
দূরপাল্লার অভিযানগুলো পরিচালনার জন্য ইজ়রায়েল তাদের সবচেয়ে উন্নত কিছু যুদ্ধবিমান ব্যবহার করেছে। ইহুদিদের বিমানবাহিনী এর আগে ইরানের দিকে ধাবমান স্টিলথ জেটের একটি ফুটেজ প্রকাশ করেছিল। অনলাইনে শেয়ার করা ভিডিয়োটিতে বিমানগুলোকে লকহিড মার্টিন এফ-৩৫আই প্রকৃতির যুদ্ধবিমান হিসাবে শনাক্ত করা হয়েছে। এই জেটগুলি ইজ়রায়েলের ব্যবহৃত এফ-৩৫ স্টিলথ বিমানের একটি বিশেষ সংস্করণ।