জাপানে ক্রমেই বেড়ে চলেছে বৃদ্ধ জনগোষ্ঠী। চাকরি থাকলেও কর্মক্ষম মানুষের অভাব দেখা দিয়েছে ‘উদীয়মান সূর্যের দেশে’। জাপানের জনসংখ্যার বয়সের ভারসাম্যহীনতা ভারতীয় পেশাদারদের কাছে সুবর্ণসুযোগ হয়ে উঠেছে, যা গত কয়েক দশকেও দেখা যায়নি। জাপান বর্তমানে সবচেয়ে দ্রুত বার্ধক্যের দিকে এগিয়ে যাওয়া দেশগুলির মধ্যে একটি। সেখানে জন্মহার অত্যন্ত কম এবং কর্মক্ষম তরুণ প্রজন্মের সংখ্যা ক্রমশ কমছে।
এই বিশাল শূন্যস্থান পূরণ করার জন্য জাপান এখন শুধুমাত্র নিজেদের মানবসম্পদের উপর নির্ভর করতে পারছে না। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে, বিশেষ করে ভারত থেকে মেধাবী প্রযুক্তিবিদদের আমদানিতে সচেষ্ট হয়েছে দ্বীপরাষ্ট্র। দক্ষ ভারতীয় কর্মীদের সঙ্কট কাটাতে নয়াদিল্লির সঙ্গে চুক্তি করেছে টোকিয়ো।
২০২০ সালে ভারতে চিনা বিনিয়োগের উপর কড়া বিধিনিষেধ আরোপ করে নয়াদিল্লি। তখন থেকেই এশিয়ার অর্থনৈতিক সমীকরণে জাপান ভারতের এক শক্তিশালী সহযোগী হিসাবে উঠে এসেছে। ভারত ও জাপানের মধ্যে যে ‘ইন্ডিয়া-জাপান করিডর’ তৈরি হয়েছে, তার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল সরবরাহ শৃঙ্খল থেকে চিনা নির্ভরশীলতা কমানো।
জাপানের বিভিন্ন আর্থিক সংস্থা ভারতীয় স্টার্টআপ সংস্থাগুলিতে প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করেছে। ভারতীয় ব্যাঙ্কগুলিতেও বড় মাপের অংশীদারি রয়েছে জাপানি সংস্থাগুলির। ফলে শুধুমাত্র ২০২৫ সালেই জাপানি সংস্থাগুলি ভারতীয় সংস্থাগুলিতে প্রায় ৯০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে।
বর্তমানে বিভিন্ন জাপানি সংস্থা এবং ভারত সরকারের মধ্যে ক্রমবর্ধমান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ফলে তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে দক্ষ ভারতীয় কর্মীদের চাহিদা উল্লেখযোগ্য ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। জাপান বর্তমানে তাদের শিল্প ও প্রশাসনিক কাঠামোর আধুনিকীকরণের জন্য ‘ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন’-এর উপর জোর দিচ্ছে।
জাপানের জনসংখ্যা হ্রাস পাওয়ার ফলে সেখানে দক্ষ আইটি ইঞ্জিনিয়ারের বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এই শূন্যস্থান পূরণে ভারতীয় মেধাকে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মনে করছে দেশটি। সুদক্ষ কর্মীদের অভাব পূরণের জন্য ভরসাস্থল হয়ে উঠছেন ভারতীয়েরাই।
২০১৮ সালে, জাপান ভারত থেকে তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে প্রায় ২ লক্ষ পেশাদারকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। এই সমস্ত ভারতীয় পেশাদারদের গ্রিন কার্ড দেওয়ার পরিকল্পনাও করে জাপান সরকার। ২০১৮-২০১৯ সালে জাপানে প্রায় ৯ লক্ষ ২০ হাজার কর্মী প্রযুক্তিক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তা সত্ত্বেও বিভিন্ন প্রযুক্তিক্ষেত্রে ২ লক্ষের বেশি পেশাদারের প্রয়োজন ছিল। একাধিক পেশাসম্পর্কিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ২০৩০ সালের মধ্যে জাপানে ভারতীয় পেশাদারদের চাহিদা আরও বাড়বে। এই সংখ্যা ৮ লক্ষ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
জাপান ভারতের সঙ্গে যে চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছে, সেই চুক্তির লক্ষ্যই হল আগামী পাঁচ বছরে পাঁচ লাখ ভারতীয় কর্মীকে সে দেশে অভিবাসনের সুযোগ করে দেওয়া। জাপানে তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে শূন্যস্থান পূরণের সুযোগ কাজে লাগাতে পারবেন ভারতীয়েরা। এই ধরনের চাকরির ক্ষেত্রে গড় বার্ষিক বেতন আনুমানিক ৪০ লক্ষ টাকা।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং মেশিন লার্নিং, সাইবার নিরাপত্তা, ক্লাউড কম্পিউটিং, সেমিকন্ডাক্টর ডিজ়াইন ও ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের মতো বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাগুলিতে প্রতি বছর কয়েক লক্ষ দক্ষ কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা করছে জাপান সরকার। বিদেশ থেকেই সেই কর্মী আমদানি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা। সে দেশে তরুণ প্রজন্মের সংখ্যা হ্রাসের ফলে দক্ষ কর্মীর অভাব চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। ফলে দেশের অর্থনীতি ক্রমেই মন্থর হয়ে পড়ছে, যা খুবই উদ্বেগের বিষয়।
তাই আগামী ৫ বছরে জাপান তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্র ছাড়াও উৎপাদন শিল্প, স্বাস্থ্য পরিষেবা, লজিস্টিকস এবং শিক্ষাক্ষেত্রে প্রতিভাবান কর্মীদের নিয়োগ করবে। ফুজিৎসু, এনটিটি ডেটা এবং এনইসির মতো সংস্থাগুলি সরাসরি নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভারতীয়দের গুরুত্ব দিতে শুরু করেছে। মূলত ক্লাউড কম্পিউটিং এবং ৫জি প্রযুক্তির জন্য ভারতীয় পেশাদারদের খুঁজছে জাপানি সংস্থাগুলি।
জাপানি সংস্থাগুলিতে নিয়োগ প্রক্রিয়া সাধারণত ৩ থেকে ৪টি ধাপে সম্পন্ন হয়। প্রথমে অনলাইন আবেদন ও বাছাই, তার পর রেজ়ুমে এবং পোর্টফোলিয়ো যাচাই। বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে প্রোগ্রামিং দক্ষতা পরীক্ষা করা হয়। টেকনিক্যাল ইন্টারভিউয়ে মূলত সমস্যা সমাধানের দক্ষতা এবং সিস্টেম ডিজ়াইন নিয়ে আলোচনা করা হয়। সবশেষে জাপানি কর্মসংস্কৃতির সঙ্গে চাকরিপ্রার্থী কতটা মানিয়ে নিতে পারবেন এবং কর্মীর দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য কী, তা দেখা হয়।
জাপানিরা কঠোর পরিশ্রমী এবং নির্দিষ্ট সময় মেনে কাজ করার জন্য পরিচিত। কিন্তু জনসংখ্যার অভাব মেটাতে তারা এখন কর্মক্ষেত্রে নমনীয়তা আনছে। তরুণ বিদেশি কর্মীদের আকৃষ্ট করতে অনেক সংস্থাই এখন সপ্তাহে পাঁচ দিন কাজ এবং বাড়ি থেকে বা দূর থেকে কাজের নীতি গ্রহণ করছে।
ভাষা যাতে বাধার সৃষ্টি না করে, সে জন্য অনেক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে এখন ইংরেজির প্রচলন শুরু হয়েছে। তবে জাপানি ভাষা শিখলে ভারতীয়দের সুযোগ বহু গুণ বেড়ে যাবে। ইন্ডিয়া-নিপ্পন প্রোগ্রাম ফর অ্যাপ্লায়েড কম্পিটেন্সি ট্রেনিং বা ইনপ্যাক্ট নামের একটি প্রকল্প চালু করা হয়েছে, যাতে জাপানে চাকরি করতে যাওয়া কর্মীদের ভাষাগত বাধা দূর হয়ে যায়।
আগে জাপানে স্থায়ী ভাবে বসবাসের অনুমতি পেতে ১০ বছর লাগত। এখন, কাজের সূত্রে আসা ভিসায় ভারতীয়েরা মাত্র ১ থেকে ৩ বছরের মধ্যেই স্থায়ী বসবাসের আবেদন করতে পারছেন।
জাপানে চাকরির প্রথম ধাপের বেতনও ভারতের তুলনায় যথেষ্ট বেশি। তিন বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বার্ষিক ২২ থেকে ৩০ লক্ষ টাকা বেতন ধার্য হয় সে দেশে। ৩৩-৫০ লক্ষ টাকার বেতন পান মধ্যম অভিজ্ঞতার কর্মীরা। সাত বছরের বেশি দক্ষ কর্মীদের ৫৬-৮৪ লক্ষ টাকা বেতন হয়। বিশেষজ্ঞ ক্ষেত্রগুলিতে বেতন আরও চোখধাঁধানো।
এআই বা মেশিন লার্নিং ইঞ্জিনিয়ারদের বেতন আরও আকর্ষণীয়। ৩৯ লক্ষ টাকা পে প্যাকেজে যোগ দিতে পারেন ভারতীয়েরা। সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের বেতন ৮০ লক্ষ থেকে কোটি টাকাও ছাড়িয়ে যেতে পারে। জাপানে (বিশেষ করে টোকিয়োয়) জীবনধারণের খরচ ভারতের তুলনায় অনেক বেশি। তবে একজন আইটি পেশাদার যে বেতন পান, তাতে স্বাচ্ছন্দ্যে জীবনযাপন করেও লক্ষ লক্ষ টাকা সঞ্চয় করা সম্ভব।
জাপানি কর্মসংস্কৃতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে সক্ষম পেশাদারদের জন্য বেশ কিছু বাছাই করা কাজের সুযোগ দিচ্ছে টোকিয়ো। আকর্ষণীয় বেতনের পাশাপাশি জাপানের উচ্চমানের জীবনধারা, শৃঙ্খলা এবং নিরাপত্তার কারণে অনেক পেশাদারই আমেরিকা বা ইউরোপের দেশগুলিকে বাদ দিয়ে এশীয় দেশকেই বেছে নিচ্ছেন। জাপানে উচ্চশিক্ষা বা চাকরির ক্ষেত্রে জাপানি ভাষা সম্পর্কিত জ্ঞান থাকলে বাড়তি সুবিধা পাবেন ভারতীয়েরা, এমনটাই মনে করছেন বিশেষজ্ঞদের একাংশ।