প্রায় ৩৫ বছর আগে একটি অন্তর্বাসের আকার বদলেছিলেন। সেটাই কাল হল কেরলের ৭১ বছর বয়সি বিধায়ক তথা প্রাক্তন মন্ত্রী অ্যান্টনি রাজুর। ওই একটি ভুলের বড় মূল্য চোকাতে হল তাঁকে। ইতি টানতে হল তাঁর প্রায় ৫০ বছরের রাজনৈতিক জীবনের!
তবে রাজুর বিরুদ্ধে যে অন্তর্বাসের আকার বদলের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে, তা কোনও সাধারণ পোশাক ছিল না। তিন দশক আগে একটি মাদক মামলার গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ ছিল সেটি।
বিধায়ক রাজু পেশায় এক জন আইনজীবীও বটে। ৩৫ বছর আগে একটি মাদক মামলায় অভিযুক্ত অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকের হয়ে মামলা লড়েছিলেন তিনি। অভিযোগ, সেই সময় মামলা চলাকালীন মামলার গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ, তাঁর মক্কেলের অন্তর্বাসের আকার বদলে দিয়েছিলেন।
ফলে বেকসুর খালাস পেয়ে যান অস্ট্রেলিয়ার সেই নাগরিক। সেই মামলাতেই প্রমাণ লোপাটের অভিযোগে ২০২৬ সালের ২ জানুয়ারি তিরুঅনন্তপুরমের নেদুমঙ্গদের ফার্স্ট ক্লাস ম্যাজিস্ট্রেট আদালত রাজুকে তিন বছরের কারাদণ্ডের সাজা শুনিয়েছে, যা স্বাভাবিক ভাবেই কেরলের ক্ষমতাসীন এলডিএফ সরকারের বিধায়কের ক্ষমতা কেড়েছে। বিধানসভার পদ খুইয়েছেন তিনি। চলতি বছরে কেরলে বিধানসভা নির্বাচন। ফলে তাঁর রাজনৈতিক কেরিয়ারের কফিনেও পেরেক পুঁতেছে আদালতের এই রায়।
মামলার অন্য অভিযুক্ত কে জোসকেও অপরাধে সহযোগিতার জন্য তিন বছরের কারাদণ্ডের সাজা শুনিয়েছে তিরুঅনন্তপুরমের ওই আদালত। আদালত রাজু এবং জোস উভয়কেই এক মাসের জন্য জামিন দিয়েছে, যাতে তাঁরা রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হতে পারেন।
রাজু কেরলের রাজনৈতিক দল জনাধিপথ্য কেরল কংগ্রেস (জেকেসি)-এর নেতা, তিরুঅনন্তপুরমের বিধায়ক। জেকেসি পরিচিত ডেমোক্র্যাটিক কেরল কংগ্রেস নামেও। জেকেসি ক্ষমতাসীন এলডিএফ-এর সহযোগী দল। ২০১৬ সালের ৯ মার্চ কেইসি(এম) থেকে বিভক্ত হয়ে জেকেসি গঠিত হয়েছিল।
রাজু ২০২১ সালের ২০ মে থেকে ২০২৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত বর্তমান এলডিএফ সরকারের পরিবহণ মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। পরে সেখান থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় তাঁকে। তবে এত দিন বিধায়কপদ অক্ষুণ্ণ ছিল। কিন্তু মাদক মামলায় দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর বিধায়কপদও হারালেন তিনি।
কেরল বিধানসভার সচিবালয়ের ৫ জানুয়ারি জারি করা এক বিজ্ঞপ্তি অনুসারে, একটি ফৌজদারি মামলায় দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর রাজুকে বিধায়ক হিসাবে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে। তিনি সিপিআই(এম)-এর সহযোগী জনাধিপথ্য কেরল কংগ্রেসের একমাত্র বিধায়ক ছিলেন।
কিন্তু কেন বিধায়কপদ গেল রাজুর? কাহিনির সূত্রপাত ১৯৯০ সালের ৯ এপ্রিল। ভারতে আসা অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক অ্যান্ড্রু সালভাডর সার্ভেলির অন্তর্বাস থেকে দু’টি প্যাকেটে ৬১.৫ গ্রাম চরস উদ্ধার হয়। তিরুঅনন্তপুরম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গ্রেফতার করা হয় তাঁকে।
রাজু তখন সবে আইনজীবী হিসাবে প্র্যাকটিস শুরু করেছেন। তিরুঅনন্তপুরমের দায়রা আদালতে ছোটখাটো মামলা লড়তেন তিনি। সেখানেই সার্ভেলির আইনজীবীর সহকারী হিসাবে মামলা লড়ার সুযোগ পান রাজু। কিন্তু সার্ভেলি মামলাটি হেরে যান। দোষী সাব্যস্ত হন তিনি। ১৯৯২ সালে তাঁকে ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং ১ লক্ষ টাকা জরিমানা দেওয়ার সাজা শোনায় তিরুঅনন্তপুরমের দায়রা আদালত।
এর পর কেরল হাই কোর্টের দ্বারস্থ হন সার্ভেলি। সেখানে আদালতের হেফাজতে অন্তর্বাস, যা মামলার মূল প্রমাণ ছিল, সেটি আবার নতুন করে উত্থাপন করা হয়। যুক্তি দেওয়া হয় সার্ভেলি স্থূল। কিন্তু যে অন্তর্বাস প্রমাণস্বরূপ হেফাজতে পুলিশ জমা দিয়েছে, তার আকার অনেক ছোট। ফলে সেটি সার্ভেলির হওয়া সম্ভব নয়।
আদালতে অন্তর্বাসটি সার্ভেলিকে পরতে বলা হয়। দেখা যায়, সত্যিই সেটি সার্ভেলির কোমরের আকারের তুলনায় অনেক ছোট। হতবাক হয়ে যান সেই মামলার মূল তদন্তকারী অফিসার কে কে জয়মোহন এবং সরকার পক্ষের আইনজীবী। প্রমাণ বদলে দেওয়ার অভিযোগ তোলেন তাঁরা।
অন্য দিকে, প্রমাণের অভাবে ১৯৯৩ সালে সার্ভেলিকে বেকসুর খালাস করে কেরল হাই কোর্ট। যদিও বিচারপতি বলেছিলেন, ‘‘আমি আশা করি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এই বিষয়টি যথাযথ ভাবে তদন্ত করবেন এবং সঠিক ভাবে খতিয়ে দেখবেন।’’
মুক্তি পাওয়ার পর দেশ ছেড়ে চলে যান সার্ভেলি। যদিও বিষয়টি সেখানেই থেমে থাকেনি। কিছু দিন পরেই অস্ট্রেলিয়ায় একটি খুনের মামলায় গ্রেফতার হন সার্ভেলি। এর পর মামলাটি নাটকীয় মোড় নেয়।
জিজ্ঞাসাবাদের সময় অস্ট্রেলিয়ার তদন্তকারীদের সার্ভেলি জানান, কী ভাবে একটি মাদক মামলায় গ্রেফতার হওয়ার পর তাঁর পরিবার ভারতের এক জন আদালতের কেরানি এবং অন্যদের ঘুষ দিয়েছিলেন প্রমাণ নষ্ট করতে এবং গুরুতর মাদক মামলা থেকে মুক্তি পেতে। তিনি এ-ও জানান, মামলার মূল প্রমাণ হিসাবে রাখা তাঁর অন্তর্বাস কী ভাবে একটি ছোট অন্তর্বাসের সঙ্গে বদলে দেওয়া হয়েছিল।
সেই তথ্য হাতে পেয়ে অস্ট্রেলিয়ার পুলিশ ইন্টারপোলকে সতর্ক করে। অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরোর মাধ্যমে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলিকে সেই তথ্য পাঠানো হয়। ১৯৯০ সালের মাদক মামলার মূল তদন্তকারী জয়মোহনের কাছেও সেই তথ্য পৌঁছোয়। জয়মোহন বিষয়টি নিয়ে অনেক দিন ধরেই সন্দিহান ছিলেন। কারণ, তিনি নিজে সার্ভেলির কাছ থেকে অন্তর্বাসটি বাজেয়াপ্ত করেছিলেন।
পুরো বিষয়টি নিয়ে নতুন করে তদন্ত শুরু হয়। ১৯৯৪ সালে অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো থেকে তথ্য পাওয়ার পর প্রমাণ কারচুপির অভিযোগে রাজু এবং আদালতের এক জন কেরানির বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়।
২০০২ সালে কেরল হাই কোর্টের উদ্যোগে মামলাটি পুনরায় চালু করা হয়েছিল। তবে মামলায় কোনও অগ্রগতি না হওয়ায় অমীমাংসিত মামলা হিসাবে সেটি বাতিল করা হয়। ২০০৫ সালে টিপি সেনকুমার দক্ষিণাঞ্চলীয় রেঞ্জের আইজি হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণ করার পর মামলাটির পুনঃতদন্ত শুরু হয়।
২০০৬ সালে ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ওঠে মামলাটি। তদন্তে উঠে আসে, ১৯৯০ সালের এপ্রিলে যখন সার্ভেলির অন্তর্বাসটি প্রমাণ হিসাবে আদালতে পৌঁছোয়, তখন তিরুঅনন্তপুরমের ওই আদালতের কেরানি জোসে সেখানেই উপস্থিত ছিলেন।
১৯৯০ সালের অগস্টে সার্ভেলির ব্যক্তিগত জিনিসপত্র আদালতের হেফাজত থেকে মুক্তি পায়, তখন অন্তর্বাসটিও তার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে তা আবার আদালতের হেফাজতে ফেরত দেওয়া হয়। জোসেই নথিতে স্বাক্ষর করে সেগুলি গ্রহণ করেছিলেন।
তদন্ত অনুযায়ী, এর পর জোসের সাহায্যে অন্তর্বাসটি রাজুর হাতে পৌঁছোয়। মূল অন্তর্বাসটি বদলে দেননি তিনি। বদলে আকারে ছোট করার জন্য সেটি নতুন করে সেলাই করিয়েছিলেন। এর পর সার্ভেলি হাই কোর্টের দ্বারস্থ হওয়ার ঠিক আগে রাজু সেই অন্তর্বাস জোসেকে দিয়ে প্রমাণের জায়গায় রেখে দিতে বলেন।
ফরেন্সিক প্রমাণের উপর নির্ভর করে প্রমাণ হয় যে, আসল অন্তর্বাসটি বিকৃত করেছিলেন রাজু। অন্তর্বাসের একটি অংশে পুনরায় সেলাই করার কথাও উঠে আসে, যা প্রমাণ নষ্ট করার অভিযোগকে সমর্থন করে।
এর পর সরকারি আইনজীবী রাজু এবং জোসের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র, প্রমাণ নষ্ট, মিথ্যা প্রমাণ তৈরি, অসদাচরণ এবং জাল নথি তৈরির অভিযোগ আনেন। ২০১৩ সালে দায়রা আদালতে রাজু এবং জোসের বিরুদ্ধে চার্জশিট জমা দেওয়া হয়। তার পরেও মামলাটি বেশ কয়েক বার পিছিয়ে যায়।
২০২৩ সালে কেরল হাই কোর্ট প্রযুক্তিগত কারণে মামলার কার্যক্রম বাতিল করে নতুন করে বিচার শুরু করার নির্দেশ দেয়। স্বস্তি পান রাজু। যদিও সেই স্বস্তি ক্ষণস্থায়ী ছিল। সুপ্রিম কোর্ট ২০২৪ সালের নভেম্বরে হাই কোর্টের রায় বাতিল করে এবং বিচারপ্রক্রিয়া পুনরায় শুরু করার নির্দেশ দেয়। শীর্ষ আদালতের হস্তক্ষেপের পর মামলায় গতি আসে। ১৯ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়।
৩ জানুয়ারি নেদুমঙ্গদের বিচার বিভাগীয় ফার্স্ট ক্লাস ম্যাজিস্ট্রেট আদালত রাজুকে অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র, প্রমাণ লোপাট, মিথ্যা প্রমাণ পেশ, নিয়ম লঙ্ঘন-সহ একাধিক অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে। দোষী সাব্যস্ত হন জোসও। দু’জনকেই তিন বছরের কারাদণ্ডের সাজা শোনানো হয়েছে। উল্লেখ্য, এর আগে চোরাচালানের অভিযোগেও দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন রাজু।