Rajiv Gandhi and Khalistani Terrorist

ইন্দিরা হত্যাকাণ্ডের এক বছরের মধ্যেই রাজীব গান্ধীকে খুনের ছক! কী ভাবে খলিস্তানি-চক্রান্ত বানচাল করে এফবিআই?

১৯৮৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফরকালে ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীকে খতম করার নীলনকশা তৈরি করে ফেলেছিল খলিস্তানি জঙ্গিরা। হরিয়ানার মুখ্যমন্ত্রী এবং যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দাবাহিনীর তৎপরতায় প্রাণে বেঁচে যান তিনি।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ০৬ জুলাই ২০২৬ ০৮:১০
Share:
০১ ১৮

মায়ের মতো তাঁকেও খুনের ছক কষে শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদীরা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বসে ষড়যন্ত্রের নীলনকশা প্রায় পাকা করে ফেলে তারা। যদিও তক্কে তক্কে ছিল আমেরিকার গোয়েন্দা বিভাগ। ফলে হামলার আগেই চক্রান্তকারীর ঠাঁই হয় শ্রীঘরে। আর প্রাণে বেঁচে যান ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী। তাঁর ৩৫তম মৃত্যুবার্ষিকীতে প্রকাশ্যে এল সেই রোমহর্ষক কাহিনি।

০২ ১৮

১৯৮৪ সালে শিখ দেহরক্ষীদের গুলিতে নিহত হন ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। তাঁর মৃত্যুর পর হওয়া লোকসভা নির্বাচনে সারা দেশে সহানুভূতির হাওয়া ছিল প্রবল। ফলে ৪০০-র বেশি আসনে জয়ী হয় কংগ্রেস। শুধু তা-ই নয়, মায়ের ছেড়ে যাওয়া কুর্সিতে অভিষেক ঘটে রাজীবের। দেশের প্রশাসনিক প্রধান হিসাবে শপথের এক বছরের মাথায় আমেরিকা সফরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

Advertisement
০৩ ১৮

ইন্দিরা জমানার শেষ দিকে খলিস্তানপন্থী শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দাপাদাপিতে অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে পঞ্জাব। তাঁদের একাংশ বিদেশ থেকেও ভারত-বিরোধী প্রচার চালাত। সেই গোষ্ঠীর অন্যতম সদস্য ছিলেন মার্কিন নিবাসী গুরপ্রতাপ সিংহ বির্ক। ১৯৮৫ সালে আমেরিকা সফররত রাজীবকে হত্যার ষড়যন্ত্র করেন তিনি। যদিও পরিকল্পনা সফল হওয়ার আগেই তাঁকে গ্রেফতার করে এফবিআই (ফেডারেল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন)।

০৪ ১৮

মার্কিন গোয়েন্দাদের দাবি, রাজীব হত্যার পাশাপাশি ভারত সরকারকে উৎখাত করার চক্রান্তেও শামিল ছিলেন গুরপ্রতাপ। এ দেশে একাধিক জঙ্গি নাশকতার পরিকল্পনা ছিল তাঁর। সেই লক্ষ্যে কয়েক জন সঙ্গীর সঙ্গে একটি খলিস্তানি সন্ত্রাসী শিবিরে যোগ দেন তিনি। সেখানে বিস্ফোরক ও স্বয়ংক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্র চালানো, রাসায়নিক যুদ্ধ, শহরাঞ্চলের গেরিলা রণকৌশল, গুপ্তহত্যা, রেললাইন ও সেতু উড়িয়ে দেওয়ার মতো প্রশিক্ষণ দেওয়া হত।

০৫ ১৮

এফবিআই জানিয়েছে, ভারতের পরমাণু গবেষণাকেন্দ্র ‘ভাবা অ্যাটমিক রিসার্চ সেন্টারে’ (বার্ক) হামলারও ছক ছিল গুরপ্রতাপের। কয়েক জন সঙ্গীর সঙ্গে এই হামলার পরিকল্পনা করেন তিনি। ফলে প্রয়োজন হয়ে পড়ে হাতিয়ারের। সেটা জোগাড় করতে স্থানীয় এক ভাড়াটে সেনার সঙ্গে কথা বলতে হয় তাঁদের। সেই ব্যক্তি আবার ছিলেন মার্কিন গোয়েন্দাদেরই এজেন্ট।

০৬ ১৮

গুরপ্রতাপেরা হাতিয়ার ও গোলা-বারুদের খোঁজখবর শুরু করায় সন্দেহ হয় মার্কিন ভাড়াটে সেনার। তড়িঘড়ি এফবিআইকে খবর দেন তিনি। সঙ্গে সঙ্গে খলিস্তানপন্থীদের গোপন ডেরায় অভিযান চালায় আমেরিকার পুলিশ ও গোয়েন্দাদের দল। গ্রেফতার হয় গুরপ্রতাপ। ফাঁস হয়ে যায় রাজীব গান্ধী হত্যার যাবতীয় পরিকল্পনা।

০৭ ১৮

খলিস্তানপন্থী গুরপ্রতাপ গ্রেফতার হতেই যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত, দুই দেশেই শোরগোল পড়ে যায়। ১৯৮৫ সালে ‘ইন্ডিয়া টুডে’ পত্রিকায় এ ব্যাপারে মুখ খোলেন নিউ ইয়র্কের একটি বেসরকারি সংস্থার এক্‌জ়িকিউটিভ ফ্রেড রসেটি। ধৃত গুরপ্রতাপকে সহকর্মী বলে উল্লেখ করে তার স্বভাবের বর্ণনা দেন তিনি। বলেন, ‘‘বির্কের সঙ্গে প্রায়ই মধ্যাহ্নভোজে যেতাম। ওকে এখানে সবাই জন সিংহ নামে চেনে।’’

০৮ ১৮

রসেটির বয়ান অনুযায়ী, গুরপ্রতাপ ছিলেন সফ্‌টঅয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। বছরে ৬০,০০০ ডলার পর্যন্ত আয় করতে তিনি। এ ছাড়া একটা ডক্টরেট ডিগ্রিও ছিল তাঁর। তাঁকে দেখতে আর পাঁচজন প্রযুক্তিবিদের মতোই লাগত। তবে অন্য শিখদের তুলনায় অনেক কম পাগড়ি পরতেন বির্ক। এফবিআই তদন্তেও এই তথ্যগুলি মোটের উপর মিলে গিয়েছিল।

০৯ ১৮

গোড়ার দিকে গুরপ্রতাপের উপর নজরদারি শুরু করলেও তাঁকে আগমার্কা চরমপন্থী হিসাবে চিহ্নিত করেনি মার্কিন গোয়েন্দা দফতর। কারণ, তাঁর চালচলন ছিল খুবই সাদামাঠা। তা ছাড়া বির্ক সরাসরি ভারত থেকে যুক্তরাষ্ট্রে যাননি। দীর্ঘ দিন ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জের রাজধানী লন্ডনে কাটান। সেখানেই ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ডিগ্রি অর্জন করেন এই খলিস্তানি সন্ত্রাসবাদী।

১০ ১৮

লন্ডনে থাকাকালীনই সংসার পাতেন গুরপ্রতাপ। পরে স্ত্রী ও সন্তানদের সেখানে রেখে ব্রিটিশ পাসপোর্ট নিয়ে সটান পাড়ি দেন আমেরিকা। যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছে নিউ ইয়র্কের ‘অটোমেটেড টুলস কোম্পানি’তে সফ্‌টঅয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে চাকরি নেন বির্ক। সেখানেই তাঁর সঙ্গে আলাপ হয় রসেটির। যদিও সহকর্মীর আসল অভিসন্ধি ঘুণাক্ষরেও টের পাননি তিনি।

১১ ১৮

১৯৮৫ সালে ‘ইন্ডিয়া টুডে’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রসেটি বলেন, ‘‘সহকর্মী হিসাবে গুরপ্রতাপ ছিলেন ভদ্র ও বুদ্ধিমান। ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যুর পর একটা টেলিভিশনের অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে কিছু মন্তব্য করেছিলেন তিনি। ওই দিন বির্ক পাগড়ি পরে গিয়েছিলেন। সেটা সাধারণ ভাবে ওঁকে আমি ব্যবহার করতে দেখিনি। কথা শুনে মনে হচ্ছিল হত্যাকাণ্ডকে সমর্থন করছেন গুরপ্রতাপ।’’

১২ ১৮

‘ইন্ডিয়া টুডে’র প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যু নিয়ে বির্কের টেলিভিশন মন্তব্য কানে আসতেই নড়েচড়ে বসে এফবিআই। কয়েক দিনের মধ্যেই সূত্র মারফত খলিস্তানপন্থীদের সঙ্গে তাঁর ওঠাবসার খবর পেতে থাকেন মার্কিন গোয়েন্দাকর্তারা। জানা যায়, সামরিক প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন গুরপ্রতাপ। অস্ত্র পাচারকারীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন তিনি।

১৩ ১৮

তত দিনে অবশ্য ইন্দিরা হত্যাকাণ্ডের সাত মাস কেটে গিয়েছে। ১৯৮৫ সালের জুনে আমেরিকা সফরে গিয়ে প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রেগ্যানের সঙ্গে সাক্ষাতের পরিকল্পনা করেন রাজীব গান্ধী। যুক্তরাষ্ট্রের পার্লামেন্ট ‘কংগ্রেস’-এর যৌথ অধিবেশনে ভাষণ দেওয়ার কথা ছিল তাঁর। এই পরিস্থিতিতে গুরপ্রতাপের উপর শুধুমাত্র নজরদারি চালিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি নিতে রাজি ছিল না এফবিআই।

১৪ ১৮

বির্ককে ধরতে অস্ত্র পাচারকারীর ছদ্মবেশে ফাঁদ পাতে যুক্তরাষ্ট্রের দুঁদে গোয়েন্দাবাহিনী। গুরপ্রতাপ ও তাঁর দুই সহযোগীর সঙ্গে তখন নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন এফবিআইয়ের বেশ কয়েক জন এজেন্ট। ১৯৮৫ সালের জানুয়ারিতে নিউ ইয়র্কে একটি গোপন বৈঠকে মিলিত হন তাঁরা। সেখানেই ভারতের পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র, সেতু, হোটেল এবং সরকারি ভবনে হামলার নীলনকশা প্রকাশ্যে আনে এই খলিস্তানি জঙ্গিরা।

১৫ ১৮

এই বৈঠকের পরই এফবিআইয়ের নির্দেশে গুরপ্রতাপের সঙ্গে দেখা করেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন ফৌজি টমাস নরিস। ভিয়েতনাম যুদ্ধে অংশ নেওয়ার কারণে নিজেকে বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ হিসাবে পরিচয় দেন তিনি। তাঁর কাছে জাল পাসপোর্ট, প্লাস্টিক বোমা এবং বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক চেয়ে বসেন বির্ক। সুচতুর টমাস এর জন্য কিছুটা সময় চেয়ে নিয়ে ফিরে আসেন গোয়েন্দাকর্তাদের দফতরে।

১৬ ১৮

এর কিছু দিন পর চিকিৎসার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ অরলিয়্যান্সে যান হরিয়ানার মুখ্যমন্ত্রী ভজন লাল। সেই খবর কানে যেতে তাঁকেও খুন করার পরিকল্পনা করেন গুরপ্রতাপ। এর জন্য পয়েন্ট ৪৫ ক্যালিবারের একটি পিস্তল কেনেন তিনি। এর পর তিন সঙ্গী নিয়ে যে হোটেলে ভজন লাল ছিলেন, সেখানে পৌঁছে যান বির্ক। তখনই তাঁকে হাতেনাতে গ্রেফতার করে এফবিআই।

১৭ ১৮

গুরপ্রতাপকে জেরা করে এফবিআই জানতে পারে নিউ জার্সির জঙ্গলে জঙ্গি প্রশিক্ষণ শিবির চালাচ্ছে খলিস্তানি জঙ্গিরা। মোট ১০০ জনের একটি কমান্ডো বাহিনী তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। এই ফৌজের সাহায্যেই ভারত সরকারকে উৎখাতের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে তারা। পরবর্তী কয়েক দিনে ওই গোপন ডেরাগুলিতে অভিযান চালিয়ে বেশি কিছু সন্ত্রাসীকে ধরতে সক্ষম হয় আমেরিকার গোয়েন্দাবাহিনী।

১৮ ১৮

খলিস্তানপন্থী জঙ্গিদের হাতে বেঁচে গেলেও রাজীব গান্ধীর পরিণতি ভাল হয়নি। ১৯৯১ সালে তামিলনাড়ুর শ্রীপেরামবুদুরে শ্রীলঙ্কার ‘লিবারেশন টাইগার্স অফ তামিল এলাম’ বা এলটিটিই জঙ্গিদের মানববোমা হামলায় মৃত্যু হয় তাঁর।

সব ছবি: সংগৃহীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement