বলিউডের প্রথম সারির কৌতুকাভিনেতা। দর্শকের মুখে হাসি ফোটালেও অভিনেতা ‘বন্ধুহীন’। জীবনে চলার পথে ইন্ডাস্ট্রির কোনও তারকাকেই পাশে পাননি তিনি। তিহাড় জেল কর্তৃপক্ষের কাছে আত্মসমপর্ণের আগে এমনটাই দাবি করলেন বলি অভিনেতা রাজপাল যাদব।
১৯৭১ সালের মার্চে উত্তরপ্রদেশের শাহজানপুরের একটি গ্রামে জন্ম রাজপালের। তাঁর বাবা পেশায় কৃষক ছিলেন। বাবা-মা এবং পাঁচ ভাইকে নিয়ে অভাবের সংসার ছিল রাজপালের। স্কুল যাতায়াতের খরচ থাকত না বলে ট্রাকের পিছনে চেপে স্কুল যেতেন তিনি।
রোজগারের আশায় লটারির টিকিটও কিনতেন রাজপাল। এক সাক্ষাৎকারে অভিনেতা জানিয়েছিলেন, তাঁর ভাইয়ের কাছে মাত্র ১ টাকা ছিল। তা দিয়েই লটারির টিকিট কিনেছিলেন। পুরস্কার হিসাবে ৬৫ টাকা পেয়েছিলেন তিনি। ৫ টাকা নিজের কাছে রেখে বাকি টাকা দিয়ে আরও লটারির টিকিট কিনেছিলেন রাজপাল। পরে ভাইয়ের পরামর্শে আর লটারির টিকিট কেনেননি অভিনেতা।
রাজপালের বাবা-মা চাইতেন তাঁদের ছেলে চিকিৎসক হোক। সে কারণে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়েছিলেন রাজপাল। কিন্তু বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনার কোনও আগ্রহ ছিল না তাঁর। তাই পরে কলাবিভাগে ভর্তি হয়ে গিয়েছিলেন তিনি।
রোজগারের জন্য কাপড়ের কারখানায় কাজ শুরু করেন রাজপাল। মাত্র ২০ বছর বয়সে পরিবারের পছন্দে করুণা নামের এক তরুণীকে বিয়ে করেন তিনি। কিন্তু সন্তানপ্রসব করতে গিয়ে মারা যান করুণা। তখন সদ্যোজাতের বয়স মাত্র ১ দিন।
কলেজে পড়াকালীন নাটকে অভিনয় করা শুরু করেন রাজপাল। প্রশংসা পেলে অভিনয় নিয়েই কেরিয়ার গড়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। স্নাতক হওয়ার পর নাটকের একটি দলে যুক্ত হন রাজপাল। নাটক নিয়ে পড়াশোনাও করেন তিনি।
নাটক নিয়ে পড়াশোনা করতে দিল্লির ন্যাশনাল স্কুল অফ ড্রামায় ভর্তি হন রাজপাল। ১৯৯৭ সালে প্রশিক্ষণ শেষ হলে তিনি মুম্বই চলে যান। সেখানে গিয়ে বলিউডের বহু প্রযোজক এবং পরিচালকের দফতরের বাইরে হত্যে দিয়ে পড়ে থাকতেন তিনি।
রাজপাল এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘‘রামগোপাল বর্মার অফিসের বাইরে আমি এত দিন গিয়েছিলাম যে, সেখানকার পাহারাদারও আমায় চিনে ফেলেছিলেন।’’ হাতেগোনা কয়েকটি হিন্দি ধারাবাহিকে অভিনয়ের পর হিন্দি ছবিতে মুখ দেখানোর সুযোগ পান তিনি।
একাধিক হিন্দি ছবিতে ছোটখাটো চরিত্রে অভিনয় করতে দেখা যায় রাজপালকে। তবে বলিপাড়ায় তাঁর কপাল খুলে দেয় ২০০০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘জঙ্গল’ ছবিটি। এই ছবিতে রাজপালের নেতিবাচক চরিত্রে অভিনয় বহুল প্রশংসিত হয়। তার পর আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। একের পর এক ছবিতে অভিনয়ের প্রস্তাব পেতে শুরু করেন তিনি।
২০০১ সালে একটি হিন্দি ছবির শুটিংয়ের জন্য কানাডায় গিয়েছিলেন রাজপাল। সেখানকার আইসক্রিমের একটি দোকানে অভিনেতার সঙ্গে দেখা হয় রাধা নামে এক তরুণীর। প্রথম আলাপেই রাধার প্রেমে পড়ে যান রাজপাল। ভারতে ফিরে আসার পর রাধার সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখেন তিনি।
রাজপালের চেয়ে ন’বছরের ছোট রাধা। আলাপের ১০ মাস পর রাজপালের টানে কানাডা থেকে ভারতে চলে আসেন তিনি। পরে দুই পরিবারের সম্মতিতে ২০০৩ সালে বিয়ে সারেন রাজপাল এবং রাধা। বিয়ের পর দুই সন্তানের জন্ম দেন রাধা।
‘হাঙ্গামা’, ‘গরম মশালা’, ‘চুপ চুপ কে’, ‘মালামাল উইকলি’, ‘ফির হেরা ফেরি’, ‘ভাগম ভাগ’, ‘ভুল ভুলাইয়া’র মতো বহু হিন্দি ছবিতে কৌতুকাভিনেতা হিসাবে অভিনয় করে প্রশংসা অর্জন করেন রাজপাল। অভিনয়ের পাশাপাশি ক্যামেরার পিছনে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
২০০৯ সালের মার্চে প্রযোজনা সংস্থার প্রতিষ্ঠা করেন রাজপাল। কিন্তু দেনায় ডুবে যাওয়ার কারণে সেই সংস্থাও ভরাডুবির মুখ দেখে। বলিপা়ড়া সূত্রে খবর, ২০১০ সালে ‘অতা পতা লাপতা’ ছবির পরিচালনার জন্য এক সংস্থার কাছ থেকে ৫ কোটি টাকা ধার নিয়েছিলেন। কিন্তু ছবিটি বক্সঅফিসে মুখ থুবড়ে পড়েছিল।
সংস্থার দাবি, তাদের প্রাপ্য অর্থ ফেরত দেননি রাজপাল। রাজপাল এবং তাঁর স্ত্রীর থেকে পাওয়া একাধিক চেক বাউন্স হয়ে যায়। ২০১৩ সালে সেই কারণে চার দিন হাজতবাস করেছিলেন রাজপাল। ২০১৮ সালে দিল্লির একটি ম্যাজিস্ট্রেট আদালত চেক বাউন্স মামলায় অভিনেতা এবং তাঁর স্ত্রীকে দোষী সাব্যস্ত করে।
ইন্ডাস্ট্রির অন্দরমহলে কান পাতলে শোনা যায়, ৯ কোটি টাকা ঋণ রয়েছে রাজপালের। বার বার ঋণ পরিশোধ করার সময়সীমা বাড়ানোর অনুরোধ করতেন তিনি। কিন্তু সময়মতো টাকা দিতে পারেননি অভিনেতা। ফের আদালতের কাছে বাড়তি সময় চেয়েছিলেন।
কিন্তু রাজপালের আর্জি বুধবার খারিজ করে দিয়েছে দিল্লি হাই কোর্ট। অভিনেতার আইনজীবী আদালতে জানিয়েছিলেন, তাঁর মক্কেল ৫০ লক্ষ টাকা জোগাড় করেছেন। বাকি টাকা শোধ করার জন্য আরও এক সপ্তাহ সময় চান। কিন্তু, রাজপালকে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেয় আদালত।
বৃহস্পতিবার বিকেলে দিল্লির তিহাড় জেল কর্তৃপক্ষের কাছে আত্মসমর্পণ করেন রাজপাল। আত্মসমপর্ণের আগে অভিনেতা বলেছিলেন, ‘‘আমি কী করব বুঝতে পারছি না। আমার কাছে টাকা নেই। এখানে আমরা সবাই খুবই একা। কোনও বন্ধু নেই। এই কঠিন সময়টা আমায় একাই পার করতে হচ্ছে।’’
তবে রাজপালের এই কঠিন সময়ে তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছেন বলি অভিনেতা সোনু সুদ। সমাজমাধ্যমের পাতায় রাজপালের অভিনয়ের প্রশংসা করে সোনু লিখেছেন, ‘‘আপনজন যখন বিপদে পড়েন, তখন আমাদের উচিত তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর। তাঁরা যেন কখনও নিজেদের একা না ভাবেন।’’ রাজপালকে একটি ছবিতে অভিনয়ের প্রস্তাব দিয়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন সোনু।