Diamond Merchant of Gujarat

সাড়ে বারো টাকা নিয়ে ঘর ছাড়েন, বিদ্যে পঞ্চম শ্রেণির, ১২ হাজার কোটির হিরে সাম্রাজ্যের মালিক কর্মীদের উপহার দেন মার্সিডিজ়!

সুরতে হিরে পালিশের কাজ শুরু করার পর ১০ বছর নিজের দক্ষতা ও নৈপুণ্যে কেবল ধৈর্য ধরে শানই দিয়ে গিয়েছিলেন গুজরাতের ভূমিপুত্র। পঞ্চম শ্রেণিতে স্কুলে নাম কাটা গেলেও নিজের চেষ্টায় ১২ হাজার কোটি টাকার হিরের সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ১০ জানুয়ারি ২০২৬ ১১:১৯
Share:
০১ ১৬

স্কুলছুটদের দলে নাম লিখিয়েছিলেন মাত্র ১৩ বছর বয়সে। তার বেশ কয়েক বছর বাদে গুজরাতের একটি ছোট্ট গ্রাম থেকে উঠে আসা ছেলেটি ভাগ্য অন্বেষণ করতে সুরতগামী বাসে চেপে বসে। পকেটে সম্বল বলতে মাত্র ১২ টাকা ৫০ পয়সা। ১৯৭৭ সাল থেকে ২০২৬ সাল। এই দীর্ঘ বছরগুলিতে তাঁর সঙ্গী ছিল অকৃত্রিম জেদ ও অটল ইচ্ছাশক্তি। পরিবারকে সাহায্য করা ও কাজ করে যাওয়া।

০২ ১৬

অখ্যাত গ্রাম দুধালার ততোধিক অখ্যাত দরিদ্র পরিবারের সেই স্কুলে যেতে না পারা ছেলেটিই আজ হিরে সাম্রাজ্যের এক উজ্জ্বল রত্ন। প্রতি বছর দীপাবলিতে কর্মচারীদের বোনাস হিসাবে গাড়ি, অ্যাপার্টমেন্ট এবং গয়না উপহার দিয়ে শিরোনামে এসেছেন। পেয়েছেন পদ্মশ্রী সম্মানও। সাড়ে বারো টাকা পকেটে করে ভাগ্যপরীক্ষা করতে আসা ছোট্ট ছেলেটির বর্তমানে মোট সম্পত্তির পরিমাণ ১২ হাজার কোটি টাকা!

Advertisement
০৩ ১৬

সাভজি ঢোলাকিয়ার নাম হয়তো অনেকেই সংবাদ শিরোনামে লক্ষ করে থাকতে পারেন। তাঁর হিরের ব্র্যান্ড আজ বিশ্ব জুড়ে সমাদৃত। হাজার হাজার কোটি টাকার হিরের সাম্রাজ্য যিনি নিজের হাতে গড়ে তুলেছেন সেই সাভজি একসময় ১৭৯ টাকা বেতনের চাকরি দিয়ে জীবন শুরু করেন। সংস্থাটি পালিশ করা হিরে বিদেশে রফতানির জন্য খ্যাতি লাভ করেছে।

০৪ ১৬

সুরতের ঘিঞ্জি এলাকায় সার দিয়ে হিরে পালিশের কারখানা। সারা ক্ষণ সরগরম থাকা গলির মধ্যে মাথা গুঁজে হিরে পালিশের কাজ করতে শুরু করেন সাভজি। দুনিয়ার অন্যতম দামি রত্নটির সঙ্গে পরিচয় ঘটে তাঁর। জীবন কঠিন ছিল, মানসিকতা ছিল দৃঢ়। সেই সামান্য আয়ের মধ্যেও তিনি প্রতি মাসে ৩৯ টাকা আলাদা করে সরিয়ে রাখতেন।

০৫ ১৬

জীবনের প্রথম ধাপের সঞ্চয়ের এই শৃঙ্খলা পরবর্তী জীবনে ব্যবসায়িক যাত্রাকে আরও সমৃদ্ধ করে তুলতে সাহায্য করেছিল। কারখানার কাজ করার সময় যে অর্থ তিনি তিলে তিলে জমিয়েছিলেন তা শুধু সঞ্চয়ই ছিল না, ছিল তাঁর ভবিষ্যতের উদ্যোগের ভিত্তি।

০৬ ১৬

পরিবারের দ্বিতীয় সন্তান ছিলেন সাভজি। পরিবারটি প্রচণ্ড আর্থিক সঙ্কটের মুখোমুখি হয়েছিল। ফলে পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার পরেই অর্থাভাবের কারণে সাভজি স্কুল ছেড়ে দিতে বাধ্য হন।

০৭ ১৬

সুরতে হিরে পালিশের কাজ শুরু করার পর ১০ বছর নিজের দক্ষতা ও নৈপুণ্যে কেবল ধৈর্য ধরে শানই দিয়ে গিয়েছিলেন গুজরাতের এই ভূমিপুত্র। বিভিন্ন সংস্থা থেকে কেবল প্রযুক্তিগত দক্ষতাই অর্জন করেননি তিনি, আরও একটি বিষয় মাথায় গেঁথে নিয়েছিলেন যে এই শিল্পে বিশ্বাসই সবচেয়ে বড় সম্পদ।

০৮ ১৬

১৯৮৪ সালে, সাভজি এবং তাঁর দুই ভাই হিমত ও তুলসী মিলে একটি সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। অভিজ্ঞতা, নিষ্ঠা এবং কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে সংস্থার লাভের অঙ্ক দ্রুত বাড়তে থাকে। কৃতিত্বের ভাগ একা নেওয়ার পরিবর্তে সাভজি তাঁর সংস্থার সমস্ত কর্মীর সঙ্গে তা ভাগ করে নিতে পছন্দ করেন। তাঁর মতে, একটি সংস্থা তখনই আড়েবহরে বাড়তে পারে যখন তার সঙ্গে যুক্ত সকলেই মানসিক এবং আর্থিক ভাবে খুশি থাকে। এই দর্শন তাঁকে বিশ্বের সবচেয়ে ‘উদার বসের’ খেতাব এনে দিয়েছে।

০৯ ১৬

সাভজি ঢোলাকিয়া তাঁর কর্মীদের দীপাবলি বোনাস হিসাবে মার্সেডিজ় থেকে শুরু করে বিএমডব্লিউ এবং লক্ষ লক্ষ টাকার বাড়ি উপহার দিয়ে গোটা বিশ্বের নজর কেড়ে নিয়েছেন। ২০২৫ সালে তিনি এই ঐতিহ্য অব্যাহত রেখে ২৫ বছর আগের তিন সহযোগী কর্মচারীকে ৩ কোটি টাকারও বেশি দামের মার্সেডিজ়-বেঞ্জ জিএলএস এসইউভি উপহার দেন। এই তিন জন সাভজির সঙ্গে তাঁর কিশোর বয়স থেকে একসঙ্গে যাত্রা শুরু করেছিলেন।

১০ ১৬

২০১৪ সালে তিনি কর্মীদের জন্য ৫০ কোটি টাকা দীপাবলি বোনাস হিসাবে খরচ করেছিলেন। তার পরের বছর কর্মীদের জন্য ৪৯১টি গাড়ি এবং ২০০টি ফ্ল্যাটের বোনাস। ২০১৬ সালে কর্মীদের জন্য ৫১ কোটি টাকার বোনাস। সঙ্গে ১,২৬০টি গাড়ি এবং ৪০০টি ফ্ল্যাট উপহার। ২০১৭ সালে কর্মীদের জন্য নববর্ষের বোনাস হিসাবে ১,২০০টি ড্যাটসান রেডি-জিয়ো উপহার। ২০১৮ সালে সংস্থায় ২৫ বছর পূর্ণ করা তিন জন কর্মচারীকে মার্সিডিজ়-বেঞ্জ জিএলএস এসইউভি (অন-রোড দাম প্রায় ১ কোটি টাকা) দিয়ে পুরস্কৃত করেন তিনি।

১১ ১৬

যখন এই হিরে ব্যবসায়ীর কাছে চাকরিটুকু ছাড়া আর কিছুই ছিল না তখনও এই তিন জন তাঁর উপর আস্থা রেখেছিলেন। যে সময় তাঁর দেওয়ার মতো কিছু ছিল না এঁরাই তাঁর পাশে দাড়িয়েছিলেন। তাই সাফল্য পেয়ে এঁদের ভুলে যেতে পারেননি তিনি। কৃতজ্ঞতা স্বীকারের এর চেয়ে ভাল উপায় আর কী বা হতে পারে!

১২ ১৬

সাভজি মনে করেন কর্মীরা কখনওই শুধু সংস্থার বেতনভুক শ্রমিক নন, তাঁরা পরিবার। এই নীতিতে বরাবর বিশ্বাসী সাভজি তাই শুধুমাত্র দেশ নয়, সমগ্র বিশ্বের কাছে দৃষ্টান্ত তৈরি করেছেন, এমনটাই মত তাঁর সংস্থার বহু কর্মীর। সাভজির দর্শন সহজ, ‘‘যখন আমার পরিবার সমৃদ্ধ হয়, তখন আমার ব্যবসা সমৃদ্ধ হয়।’’

১৩ ১৬

সাভজি যে তাঁর সংস্থার কর্মীদের পরিবারেরই বর্ধিত অংশ বলে মনে করেন তারই একটি দৃষ্টান্ত হল সাভজির দুই ভাইয়ের ছেলেদের বিয়ের একটি ঘটনা। তিন ভাইপোর বিয়েতেই তিনি তাঁর পরিবারের ৪০০ সদস্যের সঙ্গে সংস্থার ১৫০ জন কর্মীকে নিয়ে সিঙ্গাপুর গিয়েছিলেন। তাঁর এই সিদ্ধান্তের কারণ অনেকেই তাঁদের জীবদ্দশায় কখনও বিদেশে ভ্রমণের সুযোগ পাননি।

১৪ ১৬

অসাধারণ সাফল্য সত্ত্বেও, সাভজি মাটিতে পা রেখেই বরাবর চলতে ভালবাসেন। তিনি সামাজিক ভাবেও অত্যন্ত সচেতন। তিনি বোঝেন, কোনও ব্যক্তি যখন সম্পদ অর্জন করতে শুরু করেন তখনই তার পিছু পিছু সমাজের জন্য দায়িত্ববোধ চলে আসে। সেই বোধ থেকে তিনি তৈরি করেছেন ঢোলাকিয়া ফাউন্ডেশন। গুজরাতের খরাপীড়িত অঞ্চলে জলের ঘাটতি মোকাবিলার জন্য কয়েকশো হ্রদ এবং চেকড্যামও নির্মাণ করেন। এর ফলে লক্ষ লক্ষ চাষি উপকৃত হয়েছেন।

১৫ ১৬

২০২২ সালে কেন্দ্রীয় সরকার তাঁর নিজের রাজ্য গুজরাতে সমাজসেবামূলক কাজে অবদানের জন্য দেশের সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান পদ্মশ্রীতে ভূষিত করে সাভজিকে। তিনি বিশ্বাস করেন যে আসল কর্তব্য হল প্রতিদান দেওয়া। গাছ লাগানো, জল সংরক্ষণ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পরিবেশ রক্ষা করতে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে তাঁর ফাউন্ডেশন।

১৬ ১৬

গৌরীবেন ঢোলাকিয়াকে বিবাহ করেছেন সাভজি। এই দম্পতিকে খুব কমই জনসমক্ষে উপস্থিত থাকতে দেখা যায়। তাঁদের চার সন্তান রয়েছে: মেনা, নিমিষা, দ্রব্য এবং কিসনা। সন্তানদের মধ্যেও মূল্যবোধ এবং সংগ্রামের মন্ত্র ছড়িয়ে দিয়েছেন সাভজি। তাঁর এক ছেলেও তাঁরই মতো রাস্তায় নেমে রোজগার করেছেন। কোটিপতি হিরে ব্যবসায়ীর এক ছেলে দ্রব্যও দোকানের কর্মী হিসাবে কাজ করেছেন।

সব ছবি: সংগৃহীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement