নুন আনতে যাঁদের পান্তা ফুরিয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা, তাঁদের আশা-ভরসার উপর বাজি রেখে মুম্বইয়ে জুয়ার সাম্রাজ্য খুলে বসেছিলেন ‘মটকা কিং’। কেরানির দোকানে কম বেতনে কাজ করার সময় থেকেই বুনে ফেলেছিলেন কোটিপতি হওয়ার স্বপ্ন। সম্প্রতি সেই জুয়ার সাম্রাজ্যের ‘সম্রাট’-এর জীবনের উপর ভিত্তি করে ওটিটির পর্দায় মুক্তি পেয়েছে ‘মটকা কিং’। মুম্বইয়ের এই ‘জুয়ার সম্রাট’-এর পরিচয় কী?
সম্প্রতি ওটিটির পর্দায় মুক্তি পেয়েছে ‘মটকা কিং’ নামের একটি ওয়েব সিরিজ়। সেই সিরিজ়ে মুখ্যচরিত্রে অভিনয় করেছেন বলি অভিনেতা বিজয় বর্মা। তাঁর চরিত্রনাম ব্রিজ ভট্টি। সুতির কাপড়ের সাধারণ ব্যবসায়ী থেকে ব্রিজ কী ভাবে মুম্বইয়ের জুয়ার সম্রাট হয়ে উঠল— তা নিয়েই আট পর্বের এই সিরিজ়।
বলিপাড়া সূত্রে খবর, ব্রিজ চরিত্রটি ভারতের কুখ্যাত জুয়াড়ি রতন ক্ষাত্রির জীবনের উপর ভিত্তি করে নির্মিত। সত্যের সঙ্গে কল্পনার মিশেলে এই সিরিজ়ের চিত্রনাট্য তৈরি করা হয়েছে। শোনা যায়, বাস্তবের ‘মটকা কিং’-এর জীবন ছিল আরও বেশি রোমাঞ্চকর। রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে অন্ধকারজগতের লোকেদের সঙ্গেও নাকি আনাগোনা ছিল তাঁর।
১৯৩২ সালে তৎকালীন করাচিতে জন্ম রতনের। দেশভাগ হওয়ার পর পরিবারসমেত মুম্বই চলে যান তিনি। নতুন জায়গায় নতুন সংসার পাতার জন্য অর্থের প্রয়োজন ছিল। শৈশবে চরম অর্থাভাবে ভুগেছিলেন রতন। সংসারের ভার কম বয়সে নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন রতন।
সংসারের জন্য কখনও কেরানির কাজ করেছিলেন, কখনও আবার মুদির দোকানে কাজ করতেন। সেই সময় মুম্বইয়ে বস্ত্রশিল্প ডানা মেলতে শুরু করেছিল। পরে তিনি কল্যাণজি ভগতের কাপড়ের কারখানায় কাজ করতে শুরু করেছিলেন। মাস গেলে বেতন পাচ্ছিলেন ঠিকই। কিন্তু সেই বেতনেও দিন চলছিল না।
কারখানায় কাজ করার সময় কল্যাণজির সুনজরে পড়েছিলেন রতন। কারখানার কর্মী থেকে কল্যাণজির ম্যানেজার হয়ে গিয়েছিলেন তিনি। তখনই রতনের সামনে উপার্জনের অন্য পথ খুলে গিয়েছিল। কল্যাণজির সঙ্গে সব সময় থাকার সুবাদে তিনি জেনে ফেলেছিলেন যে, কারখানার কাজ শেষ হওয়ার পর এলাকার সকলে মিলে জুয়া খেলতেন। আশপাশের কারখানার মালিক এবং শ্রমিকেরাও সেই খেলায় অংশগ্রহণ করতেন। তাঁর মাথা ছিলেন কল্যাণজি নিজেই।
নিউ ইয়র্কের কটন এক্সচেঞ্জ থেকে প্রতি দিন তুলোর দর জানানো হত মুম্বইয়ে। বাজার খোলা এবং বন্ধ হওয়ার সময় তুলোর যে দর রাখা হবে, সেই অঙ্কের উপর বাজি রাখতেন সকলে। তবে, এই জুয়া খেলার নিয়মও ছিল। নূন্যতম এক টাকা জমা দিয়ে বাজি রাখা ছিল বাধ্যতামূলক। সপ্তাহে সাত দিনই এই খেলা চলত। পরবর্তী কালে রতনের উপরেই এই ব্যবসার ভার দিয়েছিলেন কল্যাণজি।
কানাঘুষো শোনা যায়, কোনও কারণে কল্যাণজির সঙ্গে মতের অমিল হয়েছিল রতনের। রেগেমেগে কাজ ছেড়ে দিয়েছিলেন তিনি। পরে বন্ধুদের পরামর্শে নিজের আলাদা ‘সিন্ডিকেট’ চালু করেছিলেন রতন। জুয়ার ব্যবসায় কম সময়ের মধ্যেই নামডাক হতে থাকে রতনের।
কল্যাণজির কাছে যাঁরা জুয়া খেলতে যাচ্ছিলেন, তাঁদেরও নিজের দিকে টেনে নিয়েছিলেন রতন। কারণ, তাঁর খেলার নিয়ম ছিল ভিন্ন। একসময় নিউ ইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জের তরফে তুলোর দর পাঠানো বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু খেলার জন্য নির্দিষ্ট সংখ্যা প্রয়োজন। তাই রতন দ্বারস্থ হয়েছিলেন ‘মটকা’ অর্থাৎ মাটির কলসির।
খেলার স্বচ্ছতা বজায় রাখতে সকলের সামনেই রতন নম্বর তুলতেন। কলসির ভিতর কখনও কাগজ ফেলে দিতেন, আবার কখনও তাস ব্যবহার করে জুয়া খেলার নিয়ম তৈরি করতেন। অদ্ভুত গাণিতিক সূত্র মেনে খেলা চালু রাখতেন তিনি। কিন্তু সেই খেলা হত সপ্তাহে পাঁচ দিন। জুয়ায় টাকা বাজি রেখে কেউ জিতলে ১৫০ গুণ পর্যন্ত টাকা পেতে পারতেন।
কলকারখানার শ্রমিক শ্রেণি, মালিক শ্রেণির মধ্যে ভেদাভেদ দূর করে দিয়েছিল ‘মটকা’র খেলা। পরে উচ্চবিত্ত শ্রেণির মধ্যেও এই খেলা চালু হয়ে গিয়েছিল। মুম্বইয়ের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন রাজ্যে টেলিফোনের মাধ্যমে জুয়া খেলানো হত। শোনা যায়, সেই সময় প্রতি দিন কোটি টাকার ব্যবসা করতেন রতন।
গুঞ্জন, সেই সময় মুম্বইয়ে ৫০০ কোটি টাকার সাম্রাজ্য তৈরি করে ফেলেছিলেন রতন। বলিউডের তারকা থেকে শুরু করে রাজনীতিবিদদের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখতেন তিনি। বলিউড সূত্রে খবর, ১৯৭৬ সালে ঋষি কপূর অভিনীত ‘রঙ্গিলা রতন’ নামের একটি ছবির প্রযোজনা করেছিলেন রতন। সেই ছবিতে একটি বিশেষ চরিত্রে অভিনয় করতেও দেখা গিয়েছিল তাঁকে।
১৯৭৫ সালে ফেরোজ় খানের পরিচালনায় প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায় ‘ধর্মাত্মা’ নামের একটি হিন্দি ছবি। এই ছবিটি নাকি রতনের জীবনকাহিনির উপর নির্ভর করেই বানানো হয়েছিল। তবে সুখের সময় দীর্ঘস্থায়ী হয়নি রতনের। ভারতে কংগ্রেস সরকারের আমলে জরুরি অবস্থা জারি হলে রতনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল।
কানাঘুষো শোনা যেতে থাকে, জুয়া খেলার সঙ্গে প্রচুর পরিমাণে কালো টাকার লেনদেন হত। এমনকি, অপরাধজগতের সঙ্গেও এর যোগসূত্র ছিল। সেই কারণে জুয়া সাম্রাজ্যের ‘সম্রাট’কে গ্রেফতার করেছিল মুম্বই পুলিশ। তত দিনে ‘মটকা কিং’-এর তকমা পেয়ে গিয়েছিলেন রতন। তাঁর পরনে সব সময় সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি এবং মাথায় একটি সরু কাপড় বাঁধা থাকত।
১৯ মাস জেলে কাটিয়েছিলেন রতন। তাঁর অনুপস্থিতিতে জুয়ার ব্যবসা চললেও সেই বাজারে রতনের প্রতিযোগী অনেক বেড়ে গিয়েছিল। অন্য দিকে, মুম্বই পুলিশও সেই সাম্রাজ্যকে সমূলে বিনাশ করার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল। জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর পরিবারের সঙ্গে বিমানে চড়ে এক জায়গায় যাওয়ার কথা ছিল রতনের। কিন্তু রতনের প্রতি নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল। তখনই স্পষ্ট বাস্তব দেখতে পেয়েছিলেন তিনি।
রতন বুঝতে পেরেছিলেন যে, জুয়ার ব্যবসা করে বেশি দিন বিলাসবহুল জীবনযাপন করতে পারবেন না। তাই তিনি স্বেচ্ছাবসর নিয়ে মুম্বইয়ে একটি সাদামাঠা ফ্ল্যাটে জীবনযাপন করতে শুরু করেছিলেন। জীবনের শেষ পর্যায় এ ভাবেই কেটেছিল তাঁর।
২০০১ সালে প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হয়েছিলেন রতন। তার পর ব্রেন স্ট্রোকও হয়েছিল। ২০২০ সালে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছিলেন তিনি। মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স ছিল ৮৮ বছর। রতনের সঙ্গে সঙ্গে ‘মটকা’র সাম্রাজ্যও তলিয়ে যায়।