UAE Pakistan debt issue

সৌদির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়তেই‘ইসলামিক ভ্রাতৃত্বে’ ফাটল! ঋণশোধের বার্তা দিয়েই কি পাক-সঙ্গ ছাড়ার ইঙ্গিত দিল আমিরশাহি?

পাকিস্তান ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহির ‘বন্ধুত্বে’ ফাটল, এমনই গুঞ্জন পশ্চিম এশিয়া জুড়ে। একাধিক সংবাদ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ইয়েমেন নিয়ে উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলির মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা চুক্তিটিই এই ফাটল চওড়া হওয়ার ক্ষেত্রে ইন্ধন জুগিয়েছে।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ২১ এপ্রিল ২০২৬ ১৫:৩৮
Share:
০১ ১৮

দুঃসময়ের ‘বন্ধু’ সরে যাচ্ছে দূরে? ভরসা কমছে পাকিস্তানের উপর? পাকিস্তানকে দেওয়া ৩৫০ কোটি ডলারের ঋণ পুনর্নবীকরণের প্রতিশ্রুতি থেকে সরে এসেছে স‌ংযুক্ত আরব আমিরশাহি। দীর্ঘ দিন ধরে পাকিস্তানকে দেওয়া এই ঋণ নবায়ন (রোলওভার) করে চলেছে সংযুক্ত আরব আমিরশাহি। ২০২৬ সালের এপ্রিলে আরব মুলুকের দেশটি হঠাৎ করে সেই ঋণের অর্থ ফেরত চেয়ে বসতেই বিভিন্ন মহলে জল্পনা শুরু হয়। ‘ইসলামিক ভ্রাতৃত্বে’ চিড় ধরার কারণেই কি তবে আবু ধাবির এই পদক্ষেপ?

০২ ১৮

মোট ৩৫০ কোটি ডলারের (ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকা) ঋণ ফেরত দিতে হবে শাহবাজ় শরিফের সরকারকে। একাধিক সংবাদ প্রতিবদনের রিপোর্টে দাবি করা হচ্ছে, পশ্চিম এশিয়ার চলমান সংঘাতের কারণে ইসলামাবাদকে ওই ঋণ দ্রুত মিটিয়ে ফেলতে বলা হয়েছে। সেই টাকা মিটিয়ে দিতে রাজিও হয়েছে পাকিস্তান। পাকিস্তান ইতিমধ্যেই ২০০ কোটি ডলার পরিশোধ করেছে এবং বাকি ১৫০ কোটি ডলার ২৩ এপ্রিলের মধ্যে পরিশোধের পরিকল্পনা করছে।

Advertisement
০৩ ১৮

পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডারের পরিমাণ বজায় রাখতে প্রতি বছর ঋণের পুনর্নবীকরণ করা হত। এই বছরেও প্রথম বার এক মাস এবং পরে মাত্র দু’মাসের জন্য পাকিস্তানের ঋণ নবায়ন (রোলওভার) করেছিল সংযুক্ত আরব আমিরশাহি। কিন্তু পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের আবহে পাকিস্তানকে দেওয়া কয়েক দশক পুরনো ঋণ শোধ করতে বলে আবু ধাবি।

০৪ ১৮

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে আন্তর্জাতিক মুদ্রাভান্ডার বা আইএমএফ বিশেষ কয়েকটি শর্তে পাকিস্তানকে ঋণ দিতে প্রস্তুত হয়। সেই বেলআউটের একটি প্রধান শর্ত ছিল পাকিস্তানকে তার বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডার পুনর্গঠন করতে হবে। সেই অর্থবছরে তা ১০০ কোটি ডলারের নীচে নেমে গিয়েছিল। পাকিস্তান অবশ্য নিজে সেই অবস্থার উন্নতি করতে পারেনি।

০৫ ১৮

বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডারকে স্থিতিশীল করার জন্য ইসলামাবাদকে অন্য দেশের কাছে হাত পাততে হয়েছে। চিন থেকে শুরু করে সৌদি আরব, সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল সংযুক্ত আরব আমিরশাহির মতো ‘মিত্রপক্ষেরা’। এই তিনটি দেশ আশ্বাস দিয়েছিল, পাকিস্তানের কাছে তাদের পাওনা কয়েকশো কোটি ডলারের ঋণ নবায়ন করবে, যাতে দেশ চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থাটির সহায়তা পেতে পারে পাকিস্তান।

০৬ ১৮

এই বকেয়া অর্থের পরিমাণ পাকিস্তানের মোট বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডারের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে, সংযুক্ত আরব আমিরশাহির পক্ষ থেকে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কে রাখা ১০০ কোটি ডলারের দু’টি আমানতের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল। গত বছরের জানুয়ারিতেই শেখ মহম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের সঙ্গে একটি বৈঠকে বসে ইসলামাবাদ। সেই বৈঠক ফলপ্রসূও হয়। সেই সময় শাহবাজ় শরিফ নিশ্চিত করেন যে, ২০০ কোটি ডলার পরিশোধের সময়সীমা বাড়ানো হবে এবং আমানতগুলি আরও এক বছরের জন্য পাকিস্তানেই থাকবে।

০৭ ১৮

যুদ্ধের কারণে আকাশছোঁয়া তেলের দামের মধ্যেই বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয়ের পরিমাণ বজায় রাখতে পাকিস্তান টাকার ব্যবস্থার বিকল্প বিবেচনা করছে বলে জানিয়েছেন পাক অর্থমন্ত্রী। হঠাৎ এত বড় অঙ্কের অর্থ পরিশোধ করতে গিয়ে পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডারে বড় ধরনের টান পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ৮ এপ্রিলের ১৩০ কোটি ডলারের ইউরোবন্ড পরিশোধ করার ঠিক পরেই আমিরশাহির এই ৩৫০ কোটি ডলারের দাবি পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডারকে তলানিতে নামিয়ে আনার ঝুঁকি তৈরি করেছে।

০৮ ১৮

তার সঙ্গে সঙ্গে আরও একটি জল্পনা উস্কে দিয়েছে আন্তর্জাতিক মহলে। পাকিস্তান ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহির ‘বন্ধুত্বে’ ফাটল ধরেছে, এমনই গুঞ্জন পশ্চিম এশিয়া জুড়ে। একাধিক সংবাদ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ইয়েমেন নিয়ে উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলির মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা চুক্তিটিই এই ফাটল চওড়া হওয়ার ক্ষেত্রে ইন্ধন জুগিয়েছে।

০৯ ১৮

আবার বেশ কিছু সূত্রের দাবি, পশ্চিম এশিয়ার সাম্প্রতিক সংঘাত জুড়ে ইরানের সঙ্গে পাকিস্তানের গা ঘষাঘষি দেখে চটেছে আরব মুলুকের এই দেশটি। সেই অসন্তোষ থেকেই তহবিলের তাৎক্ষণিক প্রত্যাহারের দাবি করেছে আবু ধাবি। শুধু তাই নয়, মোট ঋণের মধ্যে ১৯৯০ সালের শেষ ভাগে নেওয়া বকেয়া ৪৫ কোটি ডলারের একটি ঋণও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে বলে বেশ কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি উঠেছে।

১০ ১৮

তাতেই ভুরু কুঁচকেছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞেরা। তাঁরা মনে করছেন, সাধারণত কোনও দেশ যখন ২০-৩০ বছরের পুরনো ঋণ হঠাৎ পরিশোধ করতে বাধ্য হয়, তখন বুঝতে হবে দুই দেশের মধ্যে কৌশলগত আস্থার চরম অবনতি ঘটেছে।

১১ ১৮

বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য রক্ষায় পাকিস্তানকে সাহায্য করতে এই ঋণ দিয়েছিল সংযুক্ত আরব আমিরশাহি। সাধারণত এই ধরনের ঋণের ক্ষেত্রে বার বার ‘রোলওভার’ বা মেয়াদ বাড়ানো হয়। এই ঋণের মেয়াদ গত কয়েক দফায় পুনর্নবীকরণও করা হয়েছে। কিন্তু এ বার দীর্ঘ মেয়াদের পরিবর্তে মাত্র এক মাসের জন্য মেয়াদ বাড়িয়েছিল আরব রাষ্ট্রটি। পরবর্তী কালে সম্পূর্ণ অর্থ ফেরত চায় তারা।

১২ ১৮

১৯৯০-এর সেই ৪৫ কোটি ডলারের ঋণটি এত দিন এক প্রকার বিস্মৃত বা দীর্ঘমেয়াদি ঋণ হিসাবেই বিবেচিত হত। সংযুক্ত আরব আমিরশাহি যখন এই পুরনো হিসাব টেনে বার করে, তখন সেটি আর কেবল অর্থনৈতিক লেনদেন থাকে না, বরং একটি রাজনৈতিক বার্তা হয়ে দাঁড়ায়। বিশ্লেষকদের ধারণা, মাত্র ৩০ দিনের মেয়াদ বাড়িয়ে আবু ধাবি আসলে ইসলামাবাদকে এই বার্তা দিয়েছিল যে পাকিস্তানকে আর নিঃশর্ত বন্ধু বলে ভাবতে চাইছে না তারা।

১৩ ১৮

আর্থিক বিশেষজ্ঞদের একাংশের মত, পাকিস্তানকে নিঃশর্ত ভাবে কয়েকশো কোটি ডলারের খয়রাতিতে আর বিশ্বাস করছে না আবু ধাবি। কারণ সৌদি আরবের সঙ্গে হওয়া ‘কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি’কে সামনে রেখে পরমাণু অস্ত্রের নিরাপত্তার টোপ দিয়ে মুসলিম দেশগুলির জোট ‘ইসলামীয় নেটো’ তৈরির স্বপ্ন দেখছে ইসলামাবাদ। পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তির সময় ‘গাল্‌ফ কো-অপারেশন কাউন্সিল’কেও পাত্তা দেননি সৌদির যুবরাজ।

১৪ ১৮

সৌদির এ-হেন মনোভাবকে একেবারেই ভাল চোখে দেখছে না আমিরশাহি প্রশাসন। আবু ধাবির আশঙ্কা, পাকিস্তানের পরমাণু হাতিয়ারের নিরাপত্তার হাত মাথার উপরে থাকায় আগামী দিনে আগ্রাসী হয়ে উঠবে রিয়াধ। এই আশঙ্কার কাঁটাও স্বস্তি দিচ্ছে না আবু ধাবিকে।

১৫ ১৮

পাকিস্তানের জিডিপিতে বিদেশ থেকে পাঠানো পাক নাগরিকদের অর্থ বা রেমিট্যান্সের অবদান অপরিসীম। সংযুক্ত আরব আমিরশাহিতে কর্মরত পাকিস্তানিদের রেমিট্যান্স সে দেশের আয়ের দ্বিতীয় বা তৃতীয় বৃহত্তম উৎস। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অবনতি হলে আবু ধাবি, দুবাইয়ে কর্মরত শ্রমিকদের সংখ্যা যদি কমে যায়, তবে পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে যে স্থায়ী ঘাটতি তৈরি হবে, তা পূরণ করার মতো কোনও বিকল্প উৎস বর্তমানে পাকিস্তানের হাতে নেই।

১৬ ১৮

পাকিস্তানের জিডিপিতে বিদেশ থেকে পাঠানো পাক নাগরিকদের অর্থ বা রেমিট্যান্সের অবদান অপরিসীম। সংযুক্ত আরব আমিরশাহিতে কর্মরত পাকিস্তানিদের রেমিট্যান্স সে দেশের আয়ের দ্বিতীয় বা তৃতীয় বৃহত্তম উৎস। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অবনতি হলে আবু ধাবি, দুবাইয়ে কর্মরত শ্রমিকদের সংখ্যা যদি কমে যায়, তবে পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে যে স্থায়ী ঘাটতি তৈরি হবে, তা পূরণ করার মতো কোনও বিকল্প উৎস বর্তমানে পাকিস্তানের হাতে নেই।

১৭ ১৮

ঋণের পরিমাণ যত বাড়ছে, ততই সেই আর্থিক বোঝা ঘাড় থেকে নামানোর জন্য পাক সরকারকে নানা পন্থা অবলম্বন করতে হচ্ছে। বেলআউট কর্মসূচির আওতায় দেশকে দেউলিয়া হওয়া থেকে উদ্ধারের জন্য সরাসরি নগদ পরিশোধের বিকল্প খুঁজছে ইসলামাবাদ। গভীর অর্থনৈতিক সঙ্কট মোকাবিলা করতে এবং ক্রমবর্ধমান বৈদেশিক ঋণের কিছু অংশ মেটানোর জন্য বি‌ভিন্ন দেশের সঙ্গে সামরিক চুক্তিগুলির কাঁধে ভর করতে চাইছে ভারতের পশ্চিমের পড়শি দেশটি।

১৮ ১৮

পাকিস্তানের বর্তমান অবস্থা অনেকটা এমন যে, তারা এক পাওনাদারের কাছ থেকে টাকা ধার করে অন্য পাওনাদারের পাওনা মেটাচ্ছে। চেয়েচিন্তে সৌদি আরবের থেকে ৩০০ কোটি ডলারের ব্যবস্থা করেছে ইসালামাবাদ। পাকিস্তানের এই অর্থনৈতিক দৈন্য এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, কেবল বন্ধু পরিবর্তন করে (আমিরশাহি থেকে সৌদি) তারা সাময়িক ভাবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে। অর্থনৈতিক সংস্কার না করলে, হয়তো কয়েক বছর পর সৌদি আরবের সঙ্গেও ঠিক একই ধরনের ‘ঋণবিরোধ’ শুরু হবে, যেমনটি এখন আবু ধাবির সঙ্গে ঘটছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞেরা।

সব ছবি: সংগৃহীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement