কখনও নোটবন্দির ঘটনা দেখানো হচ্ছে, কখনও আবার ভেসে আসছে রামমন্দিরের কথা। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ছবি বার বার ফুটে উঠেছে সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত ‘ধুরন্ধর: দ্য রিভেঞ্জ’-এ। কারও দাবি, এই ছবির মাধ্যমে ভারত সরকারের স্তুতিগান গাওয়া হয়েছে। কেউ কেউ আবার ‘প্রোপাগান্ডা’র দাবি হাওয়ায় উ়়ড়িয়ে দিয়ে সত্য ঘটনা বলে দাবি করেছেন। তাঁদের মতে, ‘ধুরন্ধর’ ছবিতে সব চরিত্র কাল্পনিক নয়।
ধুরন্ধর: দ্য রিভেঞ্জ’ ছবিতে ‘বড়ে সাহাব’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে দাউদ ইব্রাহিমকে। ডি-কোম্পানি অপরাধচক্রের প্রতিষ্ঠাতা দাউদের সঙ্গে সন্ত্রাসবাদ, সংগঠিত অপরাধ এবং ১৯৯৩ সালের মুম্বই হামলার যোগসূত্র রয়েছে। দানিশ ইকবাল অভিনীত ‘বড়ে সাহেব’ চরিত্রটি দাউদ ইব্রাহিম দ্বারা অনুপ্রাণিত।
ছবিতে দেখানো হয়েছে যে, দাউদ পক্ষাঘাতগ্রস্ত এবং শয্যাশায়ী। ২০২৩ সালের শেষের দিকে গুঞ্জন ছড়িয়ে যায় যে, দাউদকে বিষপ্রয়োগ করা হয়েছে এবং আশঙ্কাজনক অবস্থায় তিনি পাকিস্তানের করাচির এক হাসপাতালে ভর্তি।
অসুস্থতার কারণে দাউদ ঠিকমতো চলাফেরা করতে পারেন না বলে শোনা যায়। তবে দাউদ-ঘনিষ্ঠ ছোটা শাকিল পরে সমস্ত গুঞ্জন উড়িয়ে জানান যে, দাউদ সম্পূর্ণ সুস্থ রয়েছেন। করাচিতে অত্যন্ত কড়া নিরাপত্তায় দাউদ আত্মগোপন করে আছেন বলেও মনে করা হয়।
‘ধুরন্ধর’ ছবিতে এসপি চৌধরি আসলামের চরিত্রে অভিনয় করতে দেখা গিয়েছে বলি অভিনেতা সঞ্জয় দত্তকে। বলিপাড়ার অধিকাংশের দাবি, সেই চরিত্রটি পাকিস্তানের করাচির ‘সুপার কপ’ চৌধরি আসলাম খান দ্বারা অনুপ্রাণিত। করাচি পুলিশের সন্ত্রাস দমন শাখার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন আসলাম।
মূলত করাচির লিয়ারির গ্যাংওয়ার এবং দাউদ ইব্রাহিমের ডি-কোম্পানির নেটওয়ার্ক ধ্বংস করার জন্য পরিচিত ছিলেন আসলাম। তাঁর উপর একাধিক বার প্রাণঘাতী হামলা হয়েছিল। ২০১১ সালে আসলামের বাড়িতে একটি ট্রাক-বোমা বিস্ফোরণ হয়। সেই হামলায় তাঁর ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল কিন্তু আসলাম অক্ষত ছিলেন। পরে নাকি তিনি প্রকাশ্যে বলেছিলেন, ‘‘আমি ভয় পাই না। সন্ত্রাসবাদীরা যদি মনে করে আমায় ভয় দেখাবে, তবে তারা ভুল ভাবছে।’’
২০১৪ সালের জানুয়ারিতে করাচির লিয়ারি এক্সপ্রেসওয়েতে আত্মঘাতী বোমা হামলায় তিনি নিহত হন। তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান এই হামলার দায় স্বীকার করেছিল। পাকিস্তান সরকার তাঁকে মরণোত্তর ‘তমঘা-ই-শুজাত’ (সাহসিকতার পদক) প্রদান করে।
মেজর ইকবালের চরিত্রে অভিনয় করে নজর কেড়েছেন অর্জুন রামপাল। চিত্রনাট্যের প্রয়োজনে ইকবালকে পর্দার আড়ালে থাকা একটি চরিত্র হিসাবে দেখানো হয়েছে, যে দাউদ ইব্রাহিমের সঙ্গে বিভিন্ন জঙ্গিগোষ্ঠীগুলির সেতুবন্ধন তৈরি করে। এই চরিত্রটিও নাকি বাস্তব থেকে ধার নেওয়া।
জনশ্রুতি, মেজর ইকবাল নামে এক ব্যক্তি পাকিস্তানের গুপ্তচর সংস্থা আইএসআই-এর আধিকারিক ছিলেন এবং তিনিই নাকি মুম্বইয়ের ২৬/১১ হামলার অন্যতম পরিকল্পনাকারী ছিলেন। যদিও তাঁর বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে পাকিস্তানের তরফে কোনও রকম মন্তব্য করা হয়নি।
চরিত্রনামের চেয়েও ‘মিস্টার ১০ পার্সেন্ট’ নামেই অধিক পরিচিত ‘ধুরন্ধর’-এর চরিত্র জ়রওয়ারি। অনেকে মনে করেন, পাকিস্তানের প্রাক্তন এবং একমাত্র মহিলা প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টোর স্বামী আসিফ আলি জ়ারদারির অবলম্বনে তৈরি করা হয়েছে জ়রওয়ারির চরিত্র। বেনজির ভুট্টোর শাসনকালে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন জ়ারদারি।
বিরোধীদের অভিযোগ, কোনও সরকারি প্রকল্প বা বিদেশি বিনিয়োগের অনুমতি দেওয়ার বিনিময়ে জারদারি মোট চুক্তির উপর ১০ শতাংশ ঘুষ নিতেন। সাধারণ মানুষের কাছে তিনি নাকি ‘মিস্টার ১০ পার্সেন্ট’ নামে পরিচিত ছিলেন। ঘুষ নেওয়ার অভিযোগে তাঁকে দীর্ঘ সময় হাজতবাসও করতে হয়েছে। বর্তমানে যদিও পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট পদে রয়েছেন তিনি।
‘ধুরন্ধর’ ছবিতে জাভেদ খানানির চরিত্রে অভিনয় করেছেন অঙ্কিত সাগর। শোনা যায়, ‘খানানি অ্যান্ড কালিয়া ইন্টারন্যাশনাল’ নামে বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় সংস্থার সঙ্গে যুক্ত খানানির উপর নির্ভর করে জাভেদের চরিত্রটি বোনা হয়েছে। বিভিন্ন সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীকে অর্থপাচারের অভিযোগে সংস্থাটি বন্ধ করে দেওয়া হয়।
ছবিতে উজাইর বালোচের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন দানিশ পাণ্ডর। শোনা যায়, সেই চরিত্রটিও নাকি বাস্তবে রয়েছে। বর্তমানে পাকিস্তানের কারাগারে রয়েছেন উজাইর। একসময় করাচির লিয়ারি এলাকার ‘অঘোষিত সম্রাট’ এবং কুখ্যাত গ্যাংস্টার ছিলেন তিনি।
পাকিস্তানের একটি অপরাধচক্র পরিচালনা করতেন উজাইর। বহু রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। তাঁর বিরুদ্ধে হত্যা, তোলাবাজি, অপহরণ এবং রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধঘোষণার মতো ৬০টিরও বেশি মামলা রয়েছে। দীর্ঘ আত্মগোপনের পর ২০১৬ সালে করাচির উপকণ্ঠ থেকে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়।
‘ধুরন্ধর’-এর জামিল জামালির চরিত্রটি নাকি পাকিস্তানের এক বিশিষ্ট রাজনীতিবিদকে ঘিরে বোনা হয়েছে। রাকেশ বেদী এই চরিত্রে অভিনয় করেছেন। অধিকাংশের দাবি, এই চরিত্রটি নাকি নাবিল গোবিলের থেকে অনুপ্রাণিত।
পাক রাজনীতির আঙিনায় নাবিল পা দেন পাকিস্তান পিপল্স পার্টির (পিপিপি) হাত ধরে। পরে পিপিপি ছেড়ে ২০১৩ সালে মুত্তাহিদা কওমি মুভমেন্ট-লন্ডন দলে যোগ দেন। ২০১৭ সালে ফের পিপিপি-তে যোগদান এবং ২০২৫ সালে আবার পিপিপি ছেড়ে দেন নাবিল। বর্তমানে তিনি মুত্তাহিদা কওমি মুভমেন্ট-পাকিস্তান দলের সদস্য।