Tavajjoh Announcement Iran

‘তবজ্জোহ’ বলে এলোমেলো নম্বর ঘোষণা! ইরান যুদ্ধে ভয় ধরাচ্ছে অদ্ভুত পুরুষকণ্ঠ, নেপথ্যে কি সেই রহস্যময় নম্বর স্টেশন?

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের উপর মার্কিন-ইজ়রায়েল হামলা শুরু হওয়ার পর থেকে এক রহস্যময় পুরুষকণ্ঠ একটি শর্টওয়েভ ফ্রিকোয়েন্সিতে দিনে দু’বার বাজছে। মনোযোগ দিতে বলে একের পর এক নম্বর বলে যাচ্ছে ওই কণ্ঠ।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ০৪ এপ্রিল ২০২৬ ০৭:৫৫
Share:
০১ ১৯

“তবজ্জোহ! তবজ্জোহ! তবজ্জোহ!”— একটি পুরুষকণ্ঠের ঘোষণা। ধীর এবং ছন্দবদ্ধ ভাবে এর পর কোনও নির্দিষ্ট ক্রম ছাড়াই একগুচ্ছ সংখ্যা বলতে থাকে ওই পুরুষকণ্ঠ। প্রায় দু’ঘণ্টা চলে সেই ঘোষণা। হঠাৎ বন্ধও হয়ে যায়। কয়েক ঘণ্টা পর আবার শুরু হয় একই জিনিস।

০২ ১৯

রহস্য ঘনীভূত হচ্ছে যুদ্ধরত ইরানের আকাশে-বাতাসে ভেসে ওঠা এই পুরুষকণ্ঠকে কেন্দ্র করে। ফারসি ‘তবজ্জোহ’ শব্দের অর্থ ‘মনোযোগ দেওয়া’। কিন্তু কে মনোযোগ দিতে বলছেন ইরানের সাধারণ জনগণকে? কেনই বা দিতে বলছেন?

Advertisement
০৩ ১৯

সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের উপর মার্কিন-ইজ়রায়েল হামলা শুরু হওয়ার পর থেকে এই রহস্যময় পুরুষকণ্ঠটি একটি শর্টওয়েভ ফ্রিকোয়েন্সিতে দিনে দু’বার বাজছে। মনোযোগ দিতে বলে একের পর এক নম্বর বলে যাচ্ছে ওই কণ্ঠ।

০৪ ১৯

বিশ্বব্যাপী সামরিক এবং গোয়েন্দা কাজে শর্টওয়েভ রেডিয়োর ব্যবহার পর্যবেক্ষণ এবং বিশ্লেষণ করে ‘প্রিয়ম’ নামের সংস্থা। ওই সংস্থার দাবি, আমেরিকার তরফে ইরানে হামলা শুরু হওয়ার সময়েই এই সম্প্রচারটি প্রথম শোনা গিয়েছিল। তার পর থেকে ৭৯১০ কিলোহার্ৎজ শর্টওয়েভ ফ্রিকোয়েন্সিতে ঘড়ির কাঁটার মতো নিয়মিত ভাবে— রাত ২টো (কোঅর্ডিনেটে়ড ইউনিভার্সাল টাইম বা সমন্বিত সর্বজনীন সময় অনুযায়ী) এবং পুনরায় সন্ধ্যা ছ’টায় বাজছে।

০৫ ১৯

সম্প্রতি প্রিয়ম জানায়, তারা সম্প্রচারটির সম্ভাব্য উৎস শনাক্ত করেছে। সংস্থাটির দাবি, জার্মানির স্টাটগার্টের দক্ষিণ-পশ্চিমে থাকা বোবলিংগেনের একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটির ভিতরে থাকা একটি শর্টওয়েভ ট্রান্সমিশন কেন্দ্র ওই সঙ্কেতটির উৎস। ওই উৎস খুঁজে বার করতে ‘মাল্টিল্যাটারেশন এবং ট্রায়াঙ্গুলেশন’ কৌশল ব্যবহার করেছে তারা।

০৬ ১৯

ওই শর্টওয়েভ ট্রান্সমিশন কেন্দ্রটি প্যানজ়ার কাসের্নে এবং প্যাচ ব্যারাকসের মধ্যবর্তী একটি সংরক্ষিত প্রশিক্ষণ এলাকার মধ্যে রয়েছে। সেখানকার কারিগরি কার্যক্রম সম্ভবত নিকটবর্তী সদর দফতরে অবস্থিত মার্কিন সেনাবাহিনীর ৫২তম স্ট্র্যাটেজিক সিগন্যাল ব্যাটালিয়নের সঙ্গে যুক্ত বলেও প্রিয়মের দাবি। তবে ওই সম্প্রচারের নেপথ্যে কারা রয়েছে এবং কী উদ্দেশ্যে তা করা হচ্ছে, তা প্রকাশ্যে আসেনি।

০৭ ১৯

দু’ঘণ্টা দীর্ঘ সম্প্রচারটি পাঁচ থেকে ছ’টি অংশে বিভক্ত। প্রতিটি অংশের সম্প্রচার ২০ মিনিট পর্যন্ত স্থায়ী। প্রতিটি অংশ ‘তবজ্জোহ’ বলে শুরু হয় এবং এর পর ফারসি ভাষায় একগুচ্ছ সংখ্যা শোনা যায় পুরুষকণ্ঠে। মাঝেমধ্যে এক বা দু’টি ইংরেজি শব্দও থাকে। সম্প্রচার শুরু হওয়ার পাঁচ দিন পর, রেডিয়ো জ্যামারগুলি ওই সঙ্কেত ‘ব্লক’ করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু পরের দিনই সম্প্রচারটি একটি ভিন্ন ফ্রিকোয়েন্সি— ৭৮৪২ কিলোহার্ৎজ়ে বাজতে থাকে।

০৮ ১৯

বেতার বিশেষজ্ঞেরা মনে করছেন, এই সম্প্রচারটি সম্ভবত ঠান্ডা যুদ্ধ চলাকালীন ‘নম্বর স্টেশন’ নামে পরিচিত একটি ব্যবস্থার অংশ। ‘নম্বর স্টেশন’ হল শর্টওয়েভ রেডিয়ো সম্প্রচার, যেখানে এলোমেলো শোনায় এমন কিছু সংখ্যা বা কোডের ধারা বাজানো হয়— যেমনটি ইরানে এখন শোনা যাচ্ছে।

০৯ ১৯

‘নম্বর স্টেশন’ নিয়ে দীর্ঘ দিন ধরে কাজ করা লাটভিয়ার ইতিহাসবিদ মরিস গোল্ডম্যানিসের কথায়, “এটি একটি সাঙ্কেতিক বা এনক্রিপ্টেড রেডিয়ো বার্তা, যা বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলি ব্যবহার করে। ওই সঙ্কেতের মধ্যে লুকোনো থাকে আসল তথ্য। গোয়েন্দা সংস্থা এবং সামরিক বাহিনীগুলি জটিল অভিযানের অংশ হিসাবে অনেক সময়ই এই পন্থা ব্যবহার করেন।”

১০ ১৯

নম্বর স্টেশনগুলি সাধারণত গুপ্তচরবৃত্তির সঙ্গেই সবচেয়ে বেশি জড়িত। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ-র প্রাক্তন গোয়েন্দাকর্তা জন সাইফার বলেন, “গোয়েন্দা সংস্থাগুলি তাদের গুপ্তচরদের থেকে তথ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যে নম্বর স্টেশন ব্যবহার করে। গুপ্তচরদের কাছ থেকে গোপন তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থা খুব গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা বা সংঘাতের কারণে ব্যক্তিগত ভাবে সব সময় তথ্য পাঠানো সম্ভব হয় না। তখনই নম্বর স্টেশনগুলি ব্যবহার করা হয়।”

১১ ১৯

নম্বর স্টেশনের ব্যবহার প্রথম শুরু হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়। মার্কিন-সোভিয়েত ঠান্ডা যুদ্ধের সময় এটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। গোল্ডম্যানিস জানিয়েছেন, গুপ্তচরবৃত্তি আরও জটিল হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে গোয়েন্দারা তাঁদের চরের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য কোডেড সংখ্যার স্বয়ংক্রিয় ‘ভয়েস ট্রান্সমিশন’ ব্যবহার করতে শুরু করে।

১২ ১৯

সাবেক রুশ গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবি এবং মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ-র নথি উদ্ধৃত করে গোল্ডম্যানিস এ-ও দাবি করেছেন, ঠান্ডা যুদ্ধের সময় নম্বর স্টেশনগুলো ব্যাপক ভাবে ব্যবহৃত হত মর্স কোড (বিশেষ সঙ্কেত) পাঠানোর জন্য। অনেক ক্ষেত্রে দ্বিমুখী যোগাযোগের মাধ্যমও হয়ে উঠেছিল নম্বর স্টেশনগুলি, যেখানে চরেরা তাঁদের নিজস্ব শর্টওয়েভ ট্রান্সমিটার ব্যবহার করে গোপন খবর পাঠাতেন।

১৩ ১৯

নম্বর স্টেশনে এলোমেলো ভাবে একের পর এক সংখ্যা ঘোষণা করা হয়। সেই সংখ্যার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে বার্তা। যিনি নিয়ম জানেন, তিনিই কেবল ওই সাঙ্কেতিক বার্তা বুঝতে পারবেন। তবে বর্তমানে প্রযুক্তি ব্যবহার করে উপগ্রহের মাধ্যমে বা অন্য বিভিন্ন পন্থা ব্যবহার করে গোপন তথ্য পাঠানোর উপায় আছে। ফলে নম্বর স্টেশনের উপযোগিতা কমেছে।

১৪ ১৯

কিন্তু আমেরিকা-ইজ়রায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাতের আবহে আবার আলোচনায় উঠে এসেছে সেই নম্বর স্টেশন। ইরানে শুনতে পাওয়া ওই নম্বরগুলি এবং সেগুলি ঘোষণা করা পুরুষকণ্ঠ কোথা থেকে আসছে, তা নিশ্চিত ভাবে বলতে পারছেন না কেউই। এর নেপথ্যের উদ্দেশ্য এবং ঠিক কাদের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান হচ্ছে, তা-ও বোঝা যাচ্ছে না।

১৫ ১৯

তবে বিশেষজ্ঞদের একাংশের দাবি, এটি একটি পরিকল্পিত অভিযানের অংশ হতে পারে। একটি তত্ত্ব বলছে, সম্প্রচারগুলি ইরান থেকেই করা হচ্ছে, যা তাদের যুদ্ধকালীন গোয়েন্দা কার্যক্রমের একটি অংশ— বিশেষ করে যদি প্রচলিত গোপন যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়ে থাকে। বিদেশে থাকা ইরানীয় চরেদের বার্তা পাঠাতে এই পন্থা ব্যবহার করা হচ্ছে বলেও মত অনেকের।

১৬ ১৯

অন্য একটি দাবি অনুযায়ী, সম্ভবত আমেরিকা, ইজ়রায়েল অথবা ইউরোপে অবস্থিত কোনও নির্বাসিত ইরানীয় বিরোধী গোষ্ঠী দেশের অভ্যন্তরে থাকা বন্ধুদের কাছে পৌঁছোনোর জন্য শর্টওয়েভ ট্রান্সমিটার ব্যবহার করছে।

১৭ ১৯

প্রথম সম্প্রচারের মাত্র কয়েক দিন পরেই সঙ্কেতটি জ্যাম করার প্রচেষ্টা শুরু করেছেন ইরানীয় কর্তৃপক্ষ। ৪ মার্চ থেকে বিষয়টি নিয়ে পর্যবেক্ষণ শুরু হয়েছে। তবে ওই সঙ্কেতের প্রেরকের তরফে বার বার ফ্রিকোয়েন্সি পরিবর্তন করে দেওয়ায় সমস্ত চেষ্টা বিফলে যাচ্ছে।

১৮ ১৯

তবে বহু বছর পর নম্বর স্টেশন নিয়ে চর্চা শুরু হওয়ায় বিষয়টি তাবড় বিশেষ়জ্ঞদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। অনেকেই ওই সম্প্রচারের অর্থ বোঝার চেষ্টা করছেন। একটি বড় ভূ-রাজনৈতিক ঘটনার সময় একটি নতুন স্টেশনের আবির্ভাব তাঁদের আরও সন্দিহান করে তুলেছে, যেখানে আধুনিক সময়ে প্রযুক্তিগত ভাবে গোপনে যোগাযোগের আরও অসংখ্য উপায় রয়েছে।

১৯ ১৯

পাশাপাশি নম্বর স্টেশন ব্যবহার করে সঙ্কেতের মধ্যে থাকা বার্তা খুঁজে বার করা সময়সাপেক্ষ। পুরো বিষয়টি বেশ জটিল। এর জন্য নানাবিধ সরঞ্জাম এবং হেডফোনের প্রয়োজন হয়। বার বার কোডবুকও ব্যবহার করতে হয় সাঙ্কেতিক বার্তা খুঁজে বার করার জন্য। আর সে কারণেই পুরো বিষয়টি নিয়ে রহস্য আরও ঘনীভূত হচ্ছে।

সব ছবি: সংগৃহীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement