জম্মু-কাশ্মীর হোক বা পঞ্জাব-হরিয়ানা। উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম ভারতের বিস্তীর্ণ এলাকায় মহাকাশ থেকে গোপন নজরদারি চালাচ্ছে পাকিস্তান! সূত্রের খবর, চিনা সহায়তায় গত ১৬ মাসে ছ’টির বেশি কৃত্রিম উপগ্রহ অন্তরীক্ষে পাঠিয়েছে ইসলামাবাদ। তবে কি এ বার যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে রাওয়ালপিন্ডি? না কি ফের কোনও জঙ্গি নাশকতার চক্রান্ত? ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাওয়ায় উদ্বেগ বাড়ছে কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকারের।
পশ্চিমি গণমাধ্যমগুলির প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছরের (২০২৫ সাল) জানুয়ারি থেকে এ বছরের জুনের মধ্যে মোট ছ’টি ভূ-পর্যবেক্ষণকারী কৃত্রিম উপগ্রহের সফল উৎক্ষেপণ করে পাকিস্তান। ফলে জম্মু-কাশ্মীর, পঞ্জাব ও হরিয়ানা-সহ উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম ভারতের বিস্তীর্ণ এলাকার উপর নজরদারি চালাতে পারছে ইসলামাবাদ। শুধু তা-ই নয়, সেখানকার ‘অপটিক্যাল ইমেজ়’ হাতে পেতে সমস্যা হচ্ছে না রাওয়ালপিন্ডির।
সংবাদমাধ্যম ‘দ্য প্রিন্ট’ আবার জানিয়েছে, পৃথিবীর নিম্নকক্ষে এমন ভাবে কৃত্রিম উপগ্রহগুলিকে মোতায়েন করা হয়েছে, যাতে তারা ক্রমাগত ভারতীয় ভূখণ্ডের ছবি তুলতে পারে। বেজিঙের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে এগুলি বানিয়েছে ইসলামাবাদ। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, চিনা সহায়তাতেই (পড়ুন রকেট) অন্তরীক্ষে গিয়েছে ওই ছয় উপগ্রহ, যা নজর এড়ায়নি নয়াদিল্লির সেনা কমান্ডারদের।
পাক উপগ্রহপুঞ্জ নিয়ে ইতিমধ্যেই একটি ব্লগে নিজের মতামত তুলে ধরেছেন ভারতীয় নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ফ্ল্যাগ অফিসার রিয়ার অ্যাডমিরাল সুধীর পিল্লাই। তাঁর কথায়, ‘‘মাত্র ১৬ মাসে ইসলামাবাদের পর পর উপগ্রহ উৎক্ষেপণ কোনও স্বাভাবিক ঘটনা নয়। আমাদের পশ্চিমের প্রতিবেশীর ভূ-পর্যবেক্ষণ তত্ত্বটাও বেশ সন্দেহজনক। তারা নিশ্চয়ই এগুলিকে সামরিক কাজে ব্যবহার করছে।’’
নিজের ব্লগে পাক উপগ্রহপুঞ্জের কক্ষপথের গঠন, সেন্সর এবং প্রাতিষ্ঠানিক উৎস নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন ভারতীয় নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত রিয়ার অ্যাডমিরাল সুধীর। তাঁর কথার প্রতিধ্বনি শোনা গিয়েছে ‘দ্য প্রিন্ট’-এর প্রতিবেদনে। সেখানে বলা হয়েছে, ইসলামাবাদের উপগ্রহগুলির রয়েছে অতি শক্তিশালী ক্যামেরা। এর সাহায্যে জম্মু-কাশ্মীরের দুর্গম পাহাড়ি এলাকার ছবি তোলাও সম্ভব।
সূত্রের খবর, ছদ্মবেশী বস্তু, হাতিয়ার বা সামরিক যানকে নিমেষে চিহ্নিত করতে পারে পাক উপগ্রহপুঞ্জ। কৌশলগত এলাকা অর্থাৎ সামরিক ছাউনি, জ্বালানি ডিপো এবং বিমানঘাঁটির ‘হাঁড়ির খবর’ জোগাড়ের সক্ষমতা রয়েছে তাদের। গত বছরের (২০২৫ সাল) অক্টোবরে একটি হাইপারস্পেকট্রাল উপগ্রহ (পড়ুন এইচএস-১) মহাকাশে পাঠায় ইসলামাবাদ। বিভিন্ন পদার্থের মধ্যে পার্থক্যের পাশাপাশি প্রচলিত অপটিক্যাল সেন্সরের চোখ এড়িয়ে যেতে পারে এমন বস্তুকেও শনাক্ত করতে পারে সেটি।
এ ছাড়া ‘পিআরএসসি-ইও২’ এবং ‘পিআরএসসি-ইও৩’-এর মতো বেশ কয়েকটা অত্যাধুনিক কৃত্রিম উপগ্রহ অন্তরীক্ষে পাঠিয়েছে পাকিস্তান। সেগুলি আবার ভূপৃষ্ঠের বিভিন্ন অংশের স্পষ্ট ছবি এবং কৃত্রিম মেধা বা এআই (আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স) সহায়ক তথ্য প্রক্রিয়াকরণ বা ডেটা প্রসেসিংয়ের কাজ করতে সক্ষম। এর মধ্যে ‘পিআরএসসি-ইও৩’কে নিয়ে আবার বিশেষ সতর্কবার্তা দিয়েছে আমেরিকা।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ‘কমার্শিয়াল স্পেস অপারেশন্স সেন্টার’ (কমস্পক) জানিয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার একাধিক এলাকার উপর নজরদারির উদ্দেশ্য নিয়ে পৃথিবীর নিম্নকক্ষের একটি বিশেষ জায়গায় ‘পিআরএসসি-ইও৩’ নামের উপগ্রহটিকে স্থাপন করা হয়েছে। ফলে দিনের মধ্যে একাধিক বার জম্মু-কাশ্মীরের উপর গোপন নজরদারি চালাতে পারছে পাকিস্তান। এ ছাড়া আফগানিস্তান, চিন, ইরান এবং ভারত মহাসাগরের উত্তরাংশেও দৃষ্টি দিয়েছে তারা।
গত বছরের (২০২৫ সাল) ২২ এপ্রিল জম্মু-কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ে হামলা চালায় পাক মদতপুষ্ট জঙ্গিগোষ্ঠী লশকর-এ-ত্যায়বার শাখা সংগঠন দ্য রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট। পর্যটক-সহ ২৬ জন নিরীহ নাগরিকের বুক গুলিতে ঝাঁঝরা করে দেয় তারা। সূত্রের খবর, ওই ঘটনার তিন মাস আগে থেকে কৃত্রিম উপগ্রহের উৎক্ষেপণ শুরু করে ইসলামাবাদ। ব্লগে সে কথা উল্লেখ করেছেন ভারতীয় নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ফ্ল্যাগ অফিসার রিয়ার অ্যাডমিরাল সুধীর পিল্লাই।
পহেলগাঁও হামলার বদলা নিতে ২০২৫ সালের মে মাসে পাকিস্তানে সামরিক অভিযান চালায় ভারতীয় ফৌজ। এর সাঙ্কেতিক নাম রাখা হয় ‘অপারেশন সিঁদুর’। ফলে চার দিনের সংক্ষিপ্ত ‘যুদ্ধে’ জড়িয়ে পড়ে দুই প্রতিবেশী। এই পর্বে ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ইসলামাবাদের ১১টি বিমানঘাঁটিকে গুঁড়িয়ে দেয় এ দেশের সেনা। এর জেরে সংঘর্ষবিরতিতে বাধ্য হন রাওয়ালপিন্ডির ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির।
‘অপারেশন সিঁদুর’-এ মার খেয়ে সংঘর্ষবিরতিতে রাজি হলেও ভারতের উপর নজরদারি বন্ধ করেনি পাকিস্তান। যদিও মহাকাশের লড়াইয়ে এখনও অনেকটাই পিছিয়ে আছে পশ্চিমের প্রতিবেশী। বর্তমানে সামরিক ও আধা সামরিক মিলিয়ে নয়াদিল্লির হাতে আছে ৯-১১টি কৃত্রিম উপগ্রহ। এ ছাড়া ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোনের জন্য দিকনির্দেশকারী একটি ব্যবস্থাও ব্যবহার করে এ দেশের সেনা। এর পোশাকি নাম ‘নেভিগেশন উইথ ইন্ডিয়ান কনস্টেলেশন’ বা নেভিক।
সামরিক বিশ্লেষকদের দাবি, দু’দিক থেকে অন্তরীক্ষের লড়াইয়ে এগিয়ে আছে ভারত। প্রথমত, মহাকাশ গবেষণায় এ দেশের ‘ইন্ডিয়ান স্পেস রিসার্চ অর্গানাইজ়েশন’ বা ইসরোর মুনশিয়ানা অনেক বেশি। দ্বিতীয়ত, কৃত্রিম উপগ্রহ তৈরি বা সেগুলিকে পৃথিবীর নিম্নকক্ষে পাঠানোর ক্ষেত্রে অন্য কোনও দেশের উপর নয়াদিল্লির কোনও নির্ভরশীলতা নেই। তা ছাড়া ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোনের জন্য নিজস্ব কোনও দিক নির্ণয়কারী ব্যবস্থা তৈরি করতে পারেনি ইসলামাবাদ।
ভারতের সামরিক ও আধা সামরিক উপগ্রহগুলির মধ্যে জিস্যাট, রিস্যাট, কার্টোস্যাট এবং মাইক্রোস্যাট-আর সিরিজ় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এগুলির মধ্যে কোনওটায় আছে অত্যাধুনিক ক্যামেরা। কোনওটা আবার শুধুমাত্র রণতরী বা বিমানবাহিনীকে রিয়্যাল-টাইম তথ্য সরবরাহ করে থাকে। রিস্যাট সিরিজ়ের উপগ্রহগুলি প্রাকৃতিক দুর্যোগের (ঝড়-বৃষ্টি বা মেঘলা আবহাওয়া) মধ্যেও কাজ করতে সক্ষম।
‘অপারেশন সিঁদুর’ চলাকালীন আবার নিজের জাত চিনিয়েছিল ‘নেভিক’-এর উপগ্রহপুঞ্জ। সূত্রের খবর, ওই সময় পাক বায়ুসেনার ঘাঁটিগুলি ওড়াতে রাশিয়ার সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে তৈরি ব্রহ্মস সুপারসনিক ক্রুজ় ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ভারত। নয়াদিল্লির ওই নিখুঁত হামলার ১৬ আনা কৃতিত্বই যে ‘নেভিক’-এর প্রাপ্য, তা স্বীকার করেছেন সাবেক সেনাকর্তাদের প্রায় সকলেই।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা সমস্যার মুখে পড়েছে ভারতের এই কৃত্রিম উপগ্রহভিত্তিক দিক নির্ণয়কারী ব্যবস্থা। গত বছরের (২০২৫) জুলাইয়ে এ ব্যাপারে একটি বিস্ফোরক তথ্য প্রকাশ্যে আনে কেন্দ্র। তখনই জানা যায়, নেভিকের ১১টি উপগ্রহের মধ্যে কাজ করছে মাত্র চারটি, যা দেশের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বিপজ্জনক।
আতঙ্কের এখানেই শেষ নয়। নেভিকের ‘জীবিত’ চারটি কৃত্রিম উপগ্রহের মধ্যেও দু’টির আয়ু প্রায় ফুরিয়ে এসেছে। এর মধ্যে একটি হল ‘ইন্ডিয়ান রিজিয়োনাল নেভিগেশন স্যাটেলাইট সিস্টেম’ বা আইআরএনএসএস-১বি। গত ১০ বছর ধরে কর্মরত রয়েছে এই নভোযান। জীবনকাল শেষ হয়ে যাওয়ার কারণে যে কোনও সময় তথ্য পাঠানো বন্ধ করতে পারে এই উপগ্রহ।
প্রায় একই অবস্থা নেভিকের আইআরএনএসএস-১এফ-এর। শেষ ন’বছর ধরে মহাকাশ থেকে দিকনির্ণয়কারী তথ্য ক্রমাগত পাঠিয়ে চলেছে এই কৃত্রিম উপগ্রহ। বর্তমানে এতে বেশ কিছু প্রযুক্তিগত ত্রুটি দেখা দিয়েছে। শুধু তা-ই নয়, বিগড়েছে কিছু কলকব্জাও। ফলে আগের মতো আর প্রত্যাশা পূরণ করতে পারে না আইআরএনএসএস-১এফ। এই অবস্থায় নেভিককে চাঙ্গা রাখতে দ্রুত ‘জীবন ফুরিয়ে’ যাওয়া কৃত্রিম উপগ্রহগুলিকে বদলে ফেলা প্রয়োজন, বলছেন বিশ্লেষকেরা।
মহাশূন্যে নেভিকের কৃত্রিম উপগ্রহগুলিকে পাঠানোর সময় দু’বার ব্যর্থ হয়েছে ইসরো। দু’বারই উৎক্ষেপণের সময় রকেট ঠিকমতো কাজ না করায় সেগুলিকে পৃথিবীর কক্ষপথে নিয়ে যেতে পারেননি জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। এই ব্যবস্থার পারমাণবিক ঘড়িটিও নষ্ট হয়ে গিয়েছে। ফলে শুরু হয়েছে নেভিক ২.০ তৈরির কাজ। সেই লক্ষ্যে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে এনভিএস সিরিজ়ের একটি উন্নত উপগ্রহকে অন্তরীক্ষে পাঠিয়েছেন এ দেশের গবেষকেরা।
এ ছাড়া মহাকাশ থেকে শত্রুদের উপর নজরদারি বাড়াতে ৫২টি কৃত্রিম উপগ্রহের একটি নক্ষত্রপুঞ্জকে অন্তরীক্ষে পাঠানোর লক্ষ্যে দ্রুত গতিতে কাজ করছে ইসরো। এর মধ্যে বেসরকারি উদ্যোগে ৩১টি উপগ্রহ নির্মাণের অনুমোদন দিয়েছে কেন্দ্র। ২০২৯ সালের মধ্যে মহাশূন্য থেকে সেগুলি তথ্য পাঠাতে পারবে বলে সূত্র মারফত মিলেছে খবর।
গত বছর (২০২৫ সাল) কলকাতায় সেনা কমান্ডারদের একটি সম্মেলনে মহাকাশভিত্তিক রণকৌশলে জোর দেওয়ার কথা বলা হয়। চিন ও পাকিস্তানের মতো শত্রুর মোকাবিলায় ছোট অথচ দ্রুতগামী কৃত্রিম উপগ্রহ তৈরিতে জোর দিচ্ছে ইসরো। পাশাপাশি, ইসলামাবাদ ও বেজিঙের উপগ্রহ ব্যবস্থাকে দিক্ভ্রান্ত করার গবেষণায় গতি আনা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।