Pakistan Economy

হু-হু করে বিকোচ্ছে যুদ্ধবিমান, আর প্রয়োজন হবে না আন্তর্জাতিক ঋণের! পাক প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দাবি কি দিবাস্বপ্ন?

পাক সংবাদমাধ্যম জিয়ো নিউজ়কে আসিফ জানিয়েছেন, ছয় মাসের মধ্যে আইএমএফ-এর ঋণ এড়াতে পারবে পাকিস্তান। নতুন করে আর ঋণেরও প্রয়োজন পড়বে না।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ১২ জানুয়ারি ২০২৬ ০৭:৫৯
Share:
০১ ২৪

ছ’মাসের মধ্যে আন্তর্জাতিক অর্থভান্ডার (আইএমএফ)-এর প্রয়োজন পড়বে না ইসলামাবাদের! অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে আর আন্তর্জাতিক সংস্থাটির মুখাপেক্ষী থাকতে হবে না তাদের। নিকট ভবিষ্যতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক পরিকল্পনার কথা বলে তেমনটাই দাবি করলেন পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খোয়াজা আসিফ। পাক প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সেই দাবিতে হইচই পড়ে গিয়েছে। পাকিস্তানের অর্থনীতির হাল নিয়ে ওয়াকিবহাল মহলও তাঁর সেই দাবির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছেন না।

০২ ২৪

অর্থবর্ষের প্রথম ন’মাসের একটি হিসাবের ভিত্তিতে পাকিস্তানের শাহবাজ় শরিফ সরকারের একটি রিপোর্ট বলছে, ঋণের বেড়াজাল ক্রমশ ঘিরছে ইসলামাবাদকে। গলা পর্যন্ত দেনায় হাঁসফাঁস অবস্থা ভারতের প্রতিবেশী দেশের। পাকিস্তান সরকারের প্রকাশিত ওই রিপোর্টে উঠে এসেছে গত অর্থবর্ষের (২০২৪-২০২৫) তুলনায় ১৩ শতাংশ জাতীয় ঋণ বৃদ্ধি পাওয়ার বিষয়টি। ২০২৫ অর্থবর্ষে ইসলামাবাদের ঋণ বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ২৮ হাজার ৬৮৩ কোটি ডলার (ভারতীয় মুদ্রায় ২৫ লক্ষ ১৯ হাজার কোটি টাকারও বেশি)।

Advertisement
০৩ ২৪

হিসাব এ-ও বলছে, পাকিস্তানের বিভিন্ন ব্যাঙ্ক থেকে শাহবাজ় সরকারের ঋণ রয়েছে ৫১ লক্ষ ৫০ হাজার কোটি পাকিস্তানি রুপি। অন্য বিভিন্ন জায়গা থেকে তাদের ঋণ রয়েছে ২৪ লক্ষ ৫০ হাজার কোটি পাকিস্তানি রুপির। করোনা অতিমারির পরে ডলারের তুলনায় পাকিস্তানি মুদ্রার দাম অত্যধিক পড়ে গিয়েছিল। পাশাপাশি, ব্যাপক মুদ্রাস্ফীতি এবং জ্বালানির অভাবে ভুগছিল পাকিস্তান।

০৪ ২৪

সেই সময় আন্তর্জাতিক অর্থভান্ডারের কাছে হাত পেতেছিল ইসলামাবাদ। পাকিস্তানের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার জন্য মোট ৭০০ কোটি ডলারের ঋণ মঞ্জুর করে আন্তর্জাতিক অর্থভান্ডার বা আইএমএফ। এ ছাড়াও বিভিন্ন দেশের থেকে কয়েকশো কোটি ডলারের ঋণ নিয়ে দেশের ফোঁপরা অর্থনীতি মেরামত করার মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে শাহবাজ় সরকার। সে দেশের কোষাগার প্রায় খালি। বিদেশি মুদ্রার ভান্ডারও তলানিতে।

০৫ ২৪

এ-হেন পরিস্থিতিতে ঋণের পরিমাণ যত বাড়ছে ততই সেই আর্থিক বোঝা ঘাড় থেকে নামানোর জন্য পাক সরকারকে নানা পন্থা অবলম্বন করতে হচ্ছে। বেলআউট কর্মসূচির আওতায় দেশকে দেউলিয়া হওয়া থেকে উদ্ধারের জন্য সরাসরি নগদ পরিশোধের বিকল্প খুঁজছে ইসলামাবাদ।

০৬ ২৪

গভীর অর্থনৈতিক সঙ্কট মোকাবিলার জন্য এবং ক্রমবর্ধমান বৈদেশিক ঋণের কিছু অংশ মেটানোর জন্য বি‌ভিন্ন দেশের সঙ্গে সামরিক চুক্তির কাঁধে ভর করতে চাইছে ভারতের পশ্চিমের পড়শি দেশটি। এমনকি কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তিগুলিকেও ঋণ পরিশোধের চুক্তিতে রূপান্তরিত করছেন পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা দফতরের শীর্ষকর্তারা।

০৭ ২৪

তা হলে কিসের ভিত্তিতে ছ’মাসের মধ্যে দেশের অর্থনীতি চাঙ্গা করে ফেলার এমন দাবি করছেন পাক প্রতিরক্ষামন্ত্রী? কী এমন বিশেষ পরিকল্পনা করে ফেলেছেন তিনি? এখন সেই প্রশ্নই ঘোরাফেরা করতে শুরু করেছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মহলে।

০৮ ২৪

পাক সংবাদমাধ্যম জিয়ো নিউজ়কে আসিফ জানিয়েছেন, ছয় মাসের মধ্যে আইএমএফ-এর ঋণ এড়াতে পারবে পাকিস্তান। নতুন করে আর ঋণেরও প্রয়োজন হবে না। কারণ, ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর পরে আন্তর্জাতিক বাজারে নাকি পাকিস্তানি প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের চাহিদা আকাশ ছুঁয়েছে!

০৯ ২৪

পাক প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দাবি, মে মাসে ভারতের সঙ্গে সংঘাতের সময় পাকিস্তান যে ‘সঙ্কল্প এবং সামরিক কার্যকারিতা’ প্রদর্শন করেছিল, তার জেরেই তাদের সামরিক সরঞ্জামের চাহিদা ‘বৃদ্ধি’ পেয়েছে।

১০ ২৪

আসিফ এ-ও দাবি করেছেন, ভারতের সঙ্গে সংঘাতের পর সে দেশের তৈরি যুদ্ধবিমান এত বিকোচ্ছে যে, আর ঋণ নেওয়ার প্রয়োজনই পড়বে না পাকিস্তানের। যুদ্ধবিমান বিক্রি করেই বড়লোক হবে ইসলামাবাদ। অর্থনৈতিক শ্রীবৃদ্ধি হবে দেশের।

১১ ২৪

জিয়ো নিউজ়কে আসিফ বলেন, ‘‘ভারতের সঙ্গে সামরিক সংঘাতের সময় পরীক্ষায় উতরে গিয়েছে পাকিস্তানের যুদ্ধবিমান। এত বরাত পাচ্ছি যে, ছ’মাস পর আর আন্তর্জাতিক অর্থভান্ডারের ঋণের প্রয়োজন পড়বে না।’’ পাকিস্তানের ‘সামরিক যোগ্যতা’ সারা বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে বলেও দাবি করেছেন তিনি।

১২ ২৪

যদিও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের দাবি, আসিফের এই দাবিটি নড়বড়ে। বাস্তবের সঙ্গে ওই পরিসংখ্যানের কোনও মিল নেই। এমনকি, অনেকে পাক প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দাবিকে ‘দিবাস্বপ্ন’ এবং ‘ফ্যান্টাসি’র তকমাও দিয়েছেন।

১৩ ২৪

পহেলগাঁও হত্যাকাণ্ডের পর ভারতের ‘অপারেশন সিঁদুর’-এ পাকিস্তান এবং পাক-অধিকৃত কাশ্মীরের অভ্যন্তরে জঙ্গিঘাঁটির উপর হামলা চালিয়েছিল নয়াদিল্লি। সংঘর্ষে পাকিস্তানের সামরিক সাফল্য এবং ভারতীয় বিমান ধ্বংস করার ইসলামাবাদের দাবির সত্যতা প্রমাণিত হয়নি।

১৪ ২৪

বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, পাকিস্তানের নেতৃত্ব পুরো বিষয়টিকে একটি বাণিজ্যিক লাভের পরিসরে রূপান্তরিত করার চেষ্টা চালাচ্ছেন। বিশ্বের দরবারে নিজেদের সমরাস্ত্রগুলিকে উন্নত মানের প্রমাণ করতে মিথ্যার আশ্রয় নিচ্ছে ইসলামাবাদ। ঘটনার ভুয়ো আখ্যানও ছড়ানো হচ্ছে।

১৫ ২৪

ভুয়ো বীরত্বের উপ্যাখ্যান ছড়িয়ে বেশ কয়েকটি প্রতিরক্ষা চুক্তিও স্বাক্ষর করে ফেলেছে পাকিস্তান। বেশ কয়েকটি নিয়ে আলোচনাও চলছে। সংবাদসংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুসারে, প্রায় ২০০ কোটি ডলারের সৌদি ঋণকে সামরিক চুক্তিতে রূপান্তরিত করার জন্য ইতিমধ্যেই আলোচনা শুরু করেছে পাকিস্তান।

১৬ ২৪

চিন-পাকিস্তান যৌথ উদ্যোগে তৈরি জেএফ-১৭ থান্ডারকে সৌদির কাছে বিক্রির চুক্তি সম্পন্ন করার মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রক। বাংলাদেশও বিমানটি কিনতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে বলে খবর। লিবিয়ার ‘লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মি’র সঙ্গেও নাকি অস্ত্রচুক্তি নিয়ে আলোচনা চালাচ্ছে ইসলামাবাদ।

১৭ ২৪

যদিও বিশেষজ্ঞদের অনেকে মনে করছেন, চুক্তিগুলি নিয়ে পাকিস্তানের তরফে লাফালাফি শুরু হলেও আখেরে সেগুলি করতে পারবে না পাকিস্তান। আর চুক্তি যদি করেও ফেলে ভবিষ্যতে সত্যি প্রকাশ্যে এলে আন্তর্জাতিক বাজারে বিশ্বাসযোগ্যতা হারাবে ইসলামাবাদ।

১৮ ২৪

পাশাপাশি, আইএমএফের সঙ্গে পাকিস্তানের বোঝাপড়া ঐচ্ছিক এবং আকস্মিক নয়। কাঠামোগত। ১৯৫৮ সাল থেকে ২৪টি আইএমএফ প্রকল্পে প্রবেশ করেছে পাকিস্তান। আইএমএফ থেকে ঘন ঘন ঋণগ্রহীতাদের অন্যতম ইসলামাবাদ। হিসাব বলছে, ২০২৬ সালের ৭ জানুয়ারি পর্যন্ত আইএমএফের কাছে ১০৬০ কোটি ডলারেরও বেশি ঋণ রয়েছে পাকিস্তানের।

১৯ ২৪

বিভিন্ন দেশ থেকে ঋণ পাওয়ার সমস্ত রাস্তা বন্ধ হয়ে গেলে তবেই কোনও দেশকে আর্থিক সহায়তা করতে শুরু করে আইএমএফ। বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে পাকিস্তানের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে ৩৭ মাসের জন্য ৭০০ কোটি ডলারের বর্ধিত তহবিলও অনুমোদন করে আইএমএফ। তার আগে ২০২৩ সালের জুলাই মাসে ৩০০ কোটি ডলারের বেলআউট অনুমোদন করে যা দেশটিকে অল্পের জন্য ঋণখেলাপি হওয়া এড়াতে সাহায্য করে।

২০ ২৪

পাশাপাশি, আইএমএফের চাপের মুখেও রয়েছে পাকিস্তান। দেশের অর্থনীতিতে বার বার হস্তক্ষেপ করেছে সংস্থাটি। করবৃদ্ধি, ভর্তুকি হ্রাস এবং রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সংস্থাগুলিকে বেসরকারিকরণের চাপও রয়েছে। সম্প্রতি ঋণের শর্তপূরণে সরকারি বিমানসংস্থা পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্সও বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয়েছে ইসলামাবাদ।

২১ ২৪

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিসংখ্যানে স্পষ্ট যে অর্থনৈতিক ভাবে স্বাবলম্বী হয়ে পাকিস্তানের ঘুরে দাঁড়ানোর লক্ষণ এখনও পর্যন্ত নেই। পাকিস্তান আগের অবস্থানেই দাঁড়িয়ে। এ ছা়ড়াও আইএমএফের এক মূল্যায়নে ধরা পড়েছে, পাকিস্তানের অর্থনৈতিক সঙ্কটে অনেকটাই দায়ী সে দেশের নীতি।

২২ ২৪

পাকিস্তানে রাজনৈতিক নেতা, সেনাকর্তা এবং অভিজাতদের তোষণ করার চল রয়েছে। সে দেশের অভিজাতদের ভোগ করা সুযোগ-সুবিধা পাকিস্তানের জিডিপির প্রায় ছয় শতাংশ ব্যয় করে বলেও উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। পাকিস্তানের কোনও অস্ত্রচুক্তিই সেই সমস্যার সমাধান করতে পারবে না।

২৩ ২৪

অন্য একটি অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানেও ইসলামাবাদের দুর্দশার ছবি স্পষ্ট। ২০২৪-’২৫ অর্থবর্ষে পাকিস্তানের জিডিপি বৃদ্ধি তিন শতাংশের সামান্য বেশি ছিল। আইএমএফের অনুমান, ২০২৫-’২৬ অর্থবর্ষে সেই বৃদ্ধি ৩.২ শতাংশ হবে। মুদ্রাস্ফীতি চরম স্তর থেকে কমে এলেও সে দেশে দারিদ্র বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। বিশ্বব্যাঙ্কের তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানের ২৫ শতাংশ মানুষ দারিদ্রসীমার নীচে বাস করেন।

২৪ ২৪

তাই পাক প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দাবি কিছুতেই মানতে রাজি নন অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞেরা। বিষয়টিকে পাকিস্তানের ‘রাজনৈতিক নাটক’ এবং বিশ্ব দরবারে নিজেদের অর্থনৈতিক দিক থেকে শক্তিশালী দেখানোর জন্য জিগির তোলা হিসাবেই দেখছেন তাঁরা। তাঁদের দাবি, পাকিস্তান আইএমএফ থেকে সরে আসবে না। পারবেও না। বরং পাকিস্তানের নেতৃত্ব দেশের ভয়াবহ আর্থিক বাস্তবতা থেকে কতটা বিচ্ছিন্ন তা-ই প্রমাণ করে আসিফের মন্তব্য।

সব ছবি: সংগৃহীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement