প্রাচীন সময় থেকে শুরু করে বর্তমান— সোনার প্রতি ভারতের প্রেম এবং মুগ্ধতা দীর্ঘস্থায়ী। সাংস্কৃতিক এবং অর্থনৈতিক উভয় দিক থেকেই হলুদ ধাতু মূল্যবান। সেই সোনা নিয়েই শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সুপ্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষা অবশেষে বাস্তবে পরিণত হচ্ছে অন্ধ্রপ্রদেশের কুর্নুল জেলার শুষ্ক, খনিজ-সমৃদ্ধ ভূখণ্ডে।
মে মাসের প্রথম সপ্তাহে চালু হতে চলেছে জিয়োমহীসূর সার্ভিসেস ইন্ডিয়া প্রাইভেট লিমিটেডের জোন্নাগিরী স্বর্ণপ্রকল্পের প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র। স্বাধীনতার পর এটিই ভারতের প্রথম বৃহৎ আকারের বেসরকারি স্বর্ণখনি।
চালু হওয়ার আগে কেন্দ্রটিতে বাণিজ্যিক কার্যক্রমের পূর্ববর্তী প্রক্রিয়া জোরকদমে চলছে। পুরোদমে সোনা উৎপাদনের প্রস্তুতি পর্বটি নিবিড় ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ। প্রকল্পটিকে তাদের শিল্প উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে মিলিয়ে এবং ছাড়পত্র দেওয়ার ক্ষেত্রে সহায়তা করে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে সে রাজ্যের চন্দ্রবাবু নাইডুর নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকার।
ভারত প্রতি বছর ৮০০ টনেরও বেশি সোনা আমদানি করে, যা বৈদেশিক মুদ্রাভান্ডারের উপর ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করছে। অন্য দিকে, অভ্যন্তরীণ উৎপাদন সীমিতই থেকেছে। ফলে দেশে হলুদ ধাতুর উৎপাদনের চেষ্টা অনেক দিন ধরেই চালিয়ে যাচ্ছে ভারত।
দেশের সোনার তালুক নামে পরিচিত কেজিএফ বা কোলার গোল্ড ফিল্ডে সোনা উৎপাদন অনেক আগেই বন্ধ হয়েছে। বছর বিশেক আগেও কেজিএফ ছিল সোনার আঁতুড়ঘর। বক্স অফিসে ঝড় তুলে দেওয়া কন্নড় ভাষার ছবির দৌলতে এখন কেজিএফ পরিচিত নাম। কিন্তু ২০০০ সালে কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে কোলার স্বর্ণক্ষেত্র।
২০০০ সালের পর গত ২৬ বছর কেজিএফের কথা মনেই রাখেননি দেশের মানুষ। কালের নিয়মে এই ‘সোনার শহর’ এখন ‘ভূতের শহরে’ পরিণত হয়েছে। ফলে বৃহৎ পরিসরে সোনা উৎপাদনের খনির শূন্যতা তৈরি হয়েছে দেশে। কেন্দ্রীয় মালিকানাধীন হুট্টি স্বর্ণখনিই একমাত্র উল্লেখযোগ্য উৎপাদককেন্দ্র হিসাবে টিকে আছে ভারতে, যা বছরে প্রায় দেড় টন সোনা উৎপাদন করে।
নবরত্ন খনি সংস্থা এনএমডিসি লিমিটেডের মতো সরকারি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোও স্বর্ণখনির ব্যবসায় বৈচিত্র্য এনেছে। কিন্তু তা করা হয়েছে বিদেশের খনি সংস্থা এবং খনি অধিগ্রহণের মাধ্যমে। মাউন্ট সেলিয়া স্বর্ণ প্রকল্পে ব্লু পিটার এবং ক্যাঙারু বোরের মূল মজুত থেকে আকরিক উত্তোলনের জন্য খননকাজ চালিয়ে আসছে এনএমডিসি লিমিটেডের সহযোগী প্রতিষ্ঠান লেগাসি আয়রন ওর লিমিটেড। ২০২৪ সালের শুরুতে প্রথম স্বর্ণ আকরিক উৎপাদনে সফল হয়েছে সংস্থাটি।
তবে এখন কুরনুলের জোন্নাগিরী, এরাগুড়ি এবং পাগিদিরাই গ্রামে প্রায় ৫৯৮ হেক্টর জুড়ে বিস্তৃত জোন্নাগিরী স্বর্ণপ্রকল্প ভারতে স্বর্ণখনির ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতের একটি বড় উদ্যোগের প্রতিনিধিত্ব করছে।
জিয়োমহীসূর সার্ভিসেস ভারতের অন্যতম বৃহৎ খনি উন্নয়নকারী ও পরিচালক প্রতিষ্ঠান। ত্রিবেণী আর্থমুভার্স অ্যান্ড ইনফ্রা এবং ডেকান গোল্ড দ্বারা সমর্থিত সংস্থাটি বম্বে স্টক এক্সচেঞ্জেও তালিকাভুক্ত রয়েছে।
জিয়োমহীসূর সার্ভিসেসের বহুল আলোচিত জোন্নাগিরী স্বর্ণপ্রকল্পটি ইতিমধ্যেই ৪০০ কোটি টাকারও বেশি বিনিয়োগ এনেছে। অন্ধ্রপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নাইডু মে মাসের শুরুতে এই প্রকল্পটি দেশের উদ্দেশে উৎসর্গ করবেন বলে মনে করা হচ্ছে।
জোন্নাগিরী স্বর্ণপ্রকল্প প্রসঙ্গে অন্ধ্রপ্রদেশের খনি এবং ভূতত্ত্ব বিভাগের প্রধান সচিব মুকেশকুমার মিনা সংবাদমাধ্যমে বলেন, ‘‘এটি একটি যুগান্তকারী মুহূর্ত। শুধু অন্ধ্রপ্রদেশের জন্যই নয়, ভারতের বৃহত্তর স্বর্ণ খনি সংক্রান্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষার জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ।’’
জোন্নাগিরী স্বর্ণপ্রকল্পের কাজ ইতিমধ্যেই দ্রুতগতিতে এগোচ্ছে। পরিকল্পনার ১৩ মাসের মধ্যে চালু করা হচ্ছে প্রকল্পের সোনা প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্রটি। সে প্রসঙ্গে ত্রিবেণী আর্থমুভার্সের প্রতিষ্ঠাতা তথা ম্যানেজিং ডিরেক্টর বি প্রভাকরণ বলেছেন, ‘‘যখন দূরদৃষ্টি, প্রযুক্তি এবং বাস্তবায়ন একত্রিত হয়, তখন ভারত কী করতে সক্ষম— জোন্নাগিরী তারই প্রতিফলন। আমরা শুধু একটি খনিই তৈরি করছি না, বরং দেশে দায়িত্বশীল, দক্ষ এবং বিশ্বব্যাপী প্রতিযোগিতামূলক খনির একটি মডেল তৈরি করছি।’’
জোন্নাগিরী খনিতে আনুমানিক ১৩.১ টন সোনা মজুত থাকার প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। আরও অনুসন্ধান চালালে সম্ভাব্য মজুতের পরিমাণ ৪২.৫ টন পর্যন্ত হতে পারে বলেও ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। সর্বোচ্চ উৎপাদন ক্ষমতায়, খনিটি আগামী ১৫ বছরে বার্ষিক প্রায় এক টন পর্যন্ত পরিশোধিত সোনা উৎপাদন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রকল্পটি ভারতে স্বর্ণখনির ভবিষ্যতেরও আশা জুগিয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞেরা। জিয়োমহীসূর সার্ভিসেসের পরিচালক তথা ডেকান গোল্ডের ম্যানেজিং ডিরেক্টর হনুমা প্রসাদ মোডালি সংবাদমাধ্যমে জানিয়েছেন, এই প্রকল্পের সাফল্য অনেক বিনিয়োগকারীকে ভারতের স্বর্ণ এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ খাতে বিনিয়োগ করতে উৎসাহিত করবে, যা বাণিজ্যিক এবং কৌশলগত ভাবে দেশের জন্য এই মুহূর্তে অত্যন্ত জরুরি।
মোডালি এ-ও উল্লেখ করেছেন, ধারাবাহিক অনুসন্ধানের মাধ্যমে দেশ জুড়ে থাকা বেশ কিছু অনাবিষ্কৃত স্বর্ণ এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ভান্ডারে উৎপাদন শুরু করা সম্ভব। আগামী দশকে ভারতে বছরে অন্তত ৫০ থেকে ১০০ টন স্বর্ণ উৎপাদনের লক্ষ্য রাখা উচিত বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।
উল্লেখ্য, ডেকান গোল্ড কিরঘিজ়স্তানেও একটি স্বর্ণখনি তৈরি করছে। ভারত এবং বিদেশে তামা, নিকেল, লিথিয়াম ও টাংস্টেন-সহ বিভিন্ন খনিজ সম্পদেরও অনুসন্ধান চালাচ্ছে সংস্থাটি।
জোন্নাগিরীকে একটি সামাজিক ভাবে সমন্বিত প্রকল্প হিসাবেও তুলে ধরা হচ্ছে। কারণ এই প্রকল্পের আশপাশের গ্রামগুলিতে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, পয়ঃনিষ্কাশন, পানীয় জল এবং দক্ষতা উন্নয়নও নাকি করতে চাইছেন কর্তৃপক্ষ।
তবে বিশেষজ্ঞেরা জানিয়েছেন, প্রকল্পটি হয়তো সঙ্গে সঙ্গে ভারতের স্বর্ণ আমদানির ব্যয়ে আমূল পরিবর্তন আনবে না, কিন্তু এটি একটি কাঠামোগত পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে। ভারত যে আবারও তার নিজস্ব খনিজ সম্পদকে কাজে লাগাতে প্রস্তুত, তারও ইঙ্গিত দিয়েছে জোন্নাগিরী।