তিন দশকের কেরিয়ারে ২০০টিরও বেশি ছবিতে অভিনয় করে ফেলেছেন। বলিপাড়ার প্রথম সারির অভিনেতা। কিন্তু পরিচালনার ক্ষেত্রে কেরিয়ার শুরুর স্বপ্ন দেখাই কাল হল রাজপাল যাদবের। ধার নিয়েও টাকা শোধ করতে না পেরে তিহাড় জেলে আত্মসমর্পণ করতে হল তাঁকে। বর্তমানে কত সম্পত্তির মালিকানা রয়েছে তাঁর কাছে?
নব্বইয়ের দশকে কেরিয়ার শুরু করলেও ২০০০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘জঙ্গল’ ছবিতে নেতিবাচক চরিত্রে অভিনয় করে প্রশংসা অর্জন করেন রাজপাল। তার পর একের পর এক হিন্দি ছবিতে অভিনয়ের প্রস্তাব পেতে শুরু করেন রাজপাল। তবে তিনি জনপ্রিয়তা পান কৌতুকাভিনেতা হিসাবে।
‘হাঙ্গামা’, ‘গরম মশালা’, ‘চুপ চুপ কে’, ‘মালামাল উইকলি’, ‘ফির হেরা ফেরি’, ‘ভাগম ভাগ’, ‘ভুল ভুলাইয়া’, ‘হলচল’-এর মতো বহু হিন্দি ছবিতে রাজপালের অভিনয় দর্শকমন ছুঁয়ে যায়। বলিপাড়ার অন্দরমহল সূত্রে খবর, প্রতি ছবিতে অভিনয় করে ১ থেকে ২ কোটি টাকা পারিশ্রমিক আদায় করেন তিনি।
গুঞ্জন শোনা যায়, ২০২৪ সালে কার্তিক আরিয়ান অভিনীত ‘ভুল ভুলাইয়া ৩’ ছবিতে পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করে দেড় কোটি টাকা আয় করেছেন রাজপাল। একই বছরে মুক্তি পেয়েছিল কার্তিক আরিয়ানের ‘চন্দু চ্যাম্পিয়ন’। এই ছবিতে পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করে ২ কোটি টাকা পারিশ্রমিক পেয়েছেন তিনি।
বলিপাড়ার জনশ্রুতি, বিজ্ঞাপনী প্রচারে অভিনয় করে বছরে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ লক্ষ টাকা উপার্জন করেন রাজপাল। কাজের পরিমাণের উপর অবশ্য এই উপার্জনের পরিমাণও নির্ভর করে।
বলিউড সূত্রে খবর, বিভিন্ন অনুষ্ঠান বা মঞ্চে উপস্থিতির জন্য প্রায় ১০ থেকে ১৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত পারিশ্রমিক আদায় করেন রাজপাল। অডি এবং বিএমডব্লিউয়ের দামি গাড়ি রয়েছে অভিনেতার সংগ্রহে।
বিলাসবহুল গাড়ি ছাড়া মুম্বই এবং উত্তরপ্রদেশের শাহজানপুরে নিজস্ব সম্পত্তি রয়েছে রাজপালের। মধ্যপ্রদেশের রতিখেড়া গ্রামে ৫,০০০ বর্গফুটের একটি বাড়ি রয়েছে তাঁর। বাড়িটির বাজারমূল্য ৩০ লক্ষ টাকা।
বলিপাড়া সূত্রে খবর, ২.২ হেক্টর কৃষিজমিও রয়েছে রাজপালের, যার বাজারমূল্য প্রায় ৪০ লক্ষ টাকা। উত্তরপ্রদেশের শাহজানপুরের বাড়ি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছেন তিনি। কিন্তু ২০২৪ সালের অগস্টে ব্যাঙ্কের তরফে তা সিল করে দেওয়া হয়।
২০২৬ সালের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, রাজপালের গড় মাসিক আয় প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ লক্ষ টাকা এবং বার্ষিক আয় ৪ থেকে ৭ কোটি টাকার মধ্যে।
বলিপাড়ায় কান পাতলে শোনা যায়, রাজপালের মোট সম্পত্তির পরিমাণ আনুমানিক ৫০ থেকে ৮৫ কোটি টাকা। তবে সম্প্রতি তিনি দীর্ঘস্থায়ী আইনি এবং আর্থিক সঙ্কটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। ১৬ বছর আগে ছবি পরিচালনার জন্য টাকা ধার নিয়েছিলেন। তা সময়মতো শোধ করতে পারেননি অভিনেতা।
২০০৫ সালে রাজপাল এবং তাঁর স্ত্রী রাধা যাদব এক প্রযোজনা সংস্থা গড়ে তুলেছিলেন। ২০১০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘কুস্তি’ ছবিতে অভিনয়ের পাশাপাশি সহ-প্রযোজনা করেন রাজপাল। ক্যামেরার পিছনে কাজ করতে আগ্রহী হয়ে পড়েন তিনি। ২০১২ সালে মুক্তি পায় রাজপাল অভিনীত ‘অতা পতা লাপতা’। এই ছবিতে অভিনেতার পাশাপাশি প্রযোজক এবং পরিচালকের আসনে দেখা গিয়েছিল রাজপালকে।
বলিপাড়া সূত্রে খবর, কেরিয়ারের প্রথম পরিচালিত ছবির জন্য এক সংস্থার থেকে ৫ কোটি টাকা ধার নিয়েছিলেন রাজপাল। প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, ছবিমুক্তির কয়েক দিন পর সেই টাকা শোধ করে দেবেন। কিন্তু বক্সঅফিস মুখ তুলে চায়নি। ‘অতা পতা লাপতা’ ছবিটি বক্সঅফিসে মুখ থুবড়ে পড়ে। রাজপালের প্রযোজনা সংস্থা ভরাডুবির সম্মুখীন হয়। যে সংস্থার কাছে রাজপাল টাকা ধার নিয়েছিলেন, তাদের আর সময়মতো টাকা শোধ করতে পারেননি তিনি।
সংস্থার দাবি, রাজপাল এবং তাঁর স্ত্রীর থেকে পাওয়া একাধিক চেক বাউন্স করে। টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য সময় চেয়েছিলেন অভিনেতা। কিন্তু হাই কোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ সেই আপিল খারিজ করে দেয়। ২০১৩ সালে সেই কারণে চার দিন হাজতবাস করেছিলেন রাজপাল। ২০১৩ সালের ৩ ডিসেম্বর থেকে ৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত জেলে ছিলেন রাজপাল। বছরের পর বছর সেই মামলা চলতে থাকে। এ দিকে বাড়তে থাকে সুদের পরিমাণও।
টাকা শোধ না করতে পারায় ২০১৮ সালের নভেম্বরে রাজপালকে হেফাজতে নেয় দিল্লি পুলিশ। ২০১৮ সালে দিল্লির একটি ম্যাজিস্ট্রেট আদালত চেক বাউন্স মামলায় রাজপাল এবং তাঁর স্ত্রীকে দোষী সাব্যস্ত করে। তিন মাসের হাজতবাসের নির্দেশও দেয় আদালত। আদালতের এই রায়ের পর রাজপালের কেরিয়ার থমকে যায়।
ইন্ডাস্ট্রির অন্দরমহলে কান পাতলে শোনা যায়, ৯ কোটি টাকা ঋণ রয়েছে রাজপালের। বার বার ঋণ পরিশোধ করার সময়সীমা বাড়ানোর অনুরোধ করতেন তিনি। কিন্তু সময়মতো টাকা দিতে পারেননি অভিনেতা। বলিপাড়া সূত্রে খবর, ২০২৫ সালে ৭৫ লক্ষ টাকা ফেরত দিয়েছিলেন রাজপাল। পরে আড়াই কোটি টাকার চেক বাউন্স হয়ে যায় অভিনেতার।
রাজপালের বিরুদ্ধে যে সাতটি মামলা চলছে, প্রতিটি মামলার জন্য ১.৩৫ কোটি টাকা জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল দিল্লি হাই কোর্ট। কিন্তু টাকা শোধ করতে ব্যর্থ হন অভিনেতা। ঋণ পরিশোধ করার জন্য রাজপাল সময়সীমা বৃদ্ধি করার আর্জি জানালে গত বুধবার তা খারিজ করে দেয় দিল্লি হাই কোর্ট।
রাজপালের আইনজীবী আদালতে জানিয়েছিলেন, তাঁর মক্কেল ৫০ লক্ষ টাকা জোগাড় করেছেন। বাকি টাকা শোধ করার জন্য আরও এক সপ্তাহ সময় চান। কিন্তু, রাজপালকে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেয় আদালত। গত বৃহস্পতিবার বিকেলে দিল্লির তিহাড় জেল কর্তৃপক্ষের কাছে আত্মসমর্পণ করেন রাজপাল।
তিহাড় জেল কর্তৃপক্ষের কাছে আত্মসমর্পণের আগে অভিনেতা বলেছিলেন, ‘‘আমি কী করব বুঝতে পারছি না। আমার কাছে টাকা নেই। এখানে আমরা সবাই খুবই একা। কোনও বন্ধু নেই। এই কঠিন সময়টা আমায় একাই পার করতে হবে।’’ কিন্তু অভিনেতাকে এই পরিস্থিতিতে দেখে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন ইন্ডাস্ট্রির অনেকে।
বলি অভিনেতা সোনু সুদ, সলমন খান, অজয় দেবগনের পাশাপাশি সঙ্গীত পরিচালক রাও ইন্দ্রজিৎ যাদব আর্থিক সহায়তা করেছেন রাজপাল এবং তাঁর স্ত্রীকে। তা ছাড়া টেলি অভিনেতা গুরমীত চৌধরি এবং লালুপ্রসাদ যাদবের জ্যেষ্ঠপুত্র এবং ‘জনশক্তি জনতা দল’-এর প্রধান তেজপ্রতাপ যাদবও কঠিন সময়ে রাজপালের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
রাজপাল বর্তমানে দিল্লির তিহাড় জেলে রয়েছেন। আড়াই কোটি টাকার চেক বাউন্স এবং ন’কোটি টাকা ঋণ সংক্রান্ত মামলায় দিল্লি হাই কোর্টের নির্দেশে তিনি ৫ ফেব্রুয়ারি আত্মসমর্পণ করেছেন। আদালত তাঁকে ৬ মাসের কারাদণ্ড দিয়েছে।
বৃহস্পতিবার দিল্লি হাই কোর্টে রাজপালের জামিন আবেদনের শুনানি ছিল। আদালত তাঁর জামিন মঞ্জুর না করে সেই শুনানি আগামী সোমবার পর্যন্ত স্থগিত করেছে। অভিনেতার পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, রাজপালের ভাইঝির বিয়ে আগামী ১৯ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। পরিবারের সকলে আশাবাদী যে, তিনি সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পারবেন। চলতি বছরে ‘ভূত বাংলা’ এবং ‘ওয়েলকাম টু দ্য জঙ্গল’ নামের দু’টি হিন্দি ছবি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাওয়ার কথা। এই দু’টি ছবিতে রাজপালকে অভিনয় করতে দেখা যাবে।