এ যেন বজ্র আঁটুনি ফস্কা গেরো! আটলান্টিক মহাসাগরে মার্কিন ফৌজের হাতে রুশ তেলবাহী জাহাজ মেরিনেরার ‘অপহরণ’কে ঠিক এ ভাবেই ব্যাখ্যা করছেন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের একাংশ। তাঁদের দাবি, ওই ঘটনায় প্রকাশ্যে চলে এসেছে মস্কোর সামরিক দুর্বলতা। প্রশ্নের মুখে পড়েছে ক্রেমলিনের পরমাণু ডুবোজাহাজের শক্তি। শুধু তা-ই নয়, মেরিনেরা কাণ্ডের একটা যুৎসই জবাব রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন আদৌ দিতে পারবেন কি না, তা নিয়েও তীব্র হচ্ছে জল্পনা।
চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহেই মস্কোর ওই তেলবাহী জাহাজটিকে আটলান্টিকে আটক করে মার্কিন নৌসেনা। বিষয়টি কানে যেতেই ফুঁসে ওঠে ক্রেমলিন। যদিও তাদের তর্জন-গর্জনকে একেবারেই পাত্তা দেয়নি ওয়াশিংটন। তেলের ট্যাঙ্কার ছাড়ার যে প্রশ্নই নেই, শরীরী ভাষায় তা একরকম বুঝিয়ে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এই পরিস্থিতিতে প্রকাশ্যে আসে একটি বিস্ফোরক তথ্য। জানা যায়, মেরিনেরার ‘অপহরণের’ সময়ে অদূরেই ছিল রুশ পরমাণু ডুবোজাহাজ। সব বুঝেও টুঁ শব্দটি করেননি তার ক্যাপ্টেন।
আটলান্টিকে এ-হেন রুশ-মার্কিন নজিরবিহীন সংঘাতের ব্যাখ্যা দিয়েছেন ভারতীয় বিমানবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত পাইলট তথা প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক বিজয়িন্দর কে ঠাকুর। সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ইউরেশিয়ান টাইমস’কে তিনি বলেন, ‘‘আমেরিকার উপকূল থেকে অন্তত চার হাজার কিলোমিটার দূরে মেরিনেরাকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী। ইচ্ছা করলেই মস্কোর পরমাণু ডুবোজাহাজ সেটা আটকাতে পারত। কিন্তু তারা চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে গোটা বিষয়টা দেখেছে, যা সত্যিই আশ্চর্যের।’’
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক বিজয়িন্দরের কথায়, এই ঘটনায় দু’টো বিষয় প্রমাণ হয়ে গিয়েছে। প্রথমত, পুতিন ‘কাগুজে বাঘ’ ছাড়া আর কিছুই নন। সমাজমাধ্যমে যাঁকে ‘কাপড়হীন সম্রাট’ আখ্যা দিয়ে চলছে ট্রোলিং। দ্বিতীয়ত, গত প্রায় চার বছর ধরে চলা ইউক্রেন যুদ্ধে মারাত্মক ভাবে শক্তিক্ষয় হয়েছে মস্কোর। এই পরিস্থিতিতে আমেরিকার মতো ‘সুপার পাওয়ার’কে জবাব দেওয়ার ক্ষমতা নেই ক্রেমলিনের। আর তাই আটলান্টিকে ওয়াশিংটনের ‘দৌরাত্ম্য’ মুখ বুজে সহ্য করছে রাশিয়া।
যদিও মেরিনেরা ‘অপহরণের’ অপমান হজম করা পুতিনের পক্ষে একেবারেই সহজ নয়। কারণ, এই ঘটনার জেরে দেশের মধ্যেই প্রবল সমালোচনার মুখে পড়েছেন তিনি। এর ফলে গত আড়াই দশক ধরে আঁকড়ে থাকা তাঁর প্রেসিডেন্টের গদিও টলমল করতে পারে। আর তাই আমেরিকাকে মুখের মতো জবাব দেওয়ার দাবিতে রুশ পার্লামেন্ট ‘ফেডারেল অ্যাসেম্বলি’র নিম্নকক্ষ স্টেট ডুমায় সরব হয়েছেন মস্কোর প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীরা।
উদাহরণ হিসাবে প্রথমেই বলতে হবে স্টেট ডুমার প্রতিরক্ষা কমিটির প্রধান ডেপুটি চেয়ারম্যান অ্যালেক্সি ঝুরাভলেভের কথায়। পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে আটলান্টিকে রুশ তেলবাহী জাহাজের ‘অপহরণ’কে মার্কিন জলদস্যুতা বলে উল্লেখ করেছেন তিনি। আমেরিকার এই ‘ঔদ্ধত্যের’ বিরুদ্ধে সামরিক প্রতিক্রিয়া জানানোর পক্ষে সওয়াল করতেও শোনা গিয়েছে তাঁকে। ঝুরাভলেভ বলেন, ‘‘যুক্তরাষ্ট্রকে শিক্ষা দিতে হলে টর্পেডো দিয়ে ওদের কয়েকটা জাহাজ ডোবাতে হবে।’’
এ ব্যাপারে মার্কিন প্রত্যাঘাতের জবাব কী ভাবে দেওয়া উচিত, তার নীল নকশাও দিয়েছেন স্টেট ডুমার প্রতিরক্ষা কমিটির ডেপুটি চেয়ারম্যান অ্যালেক্সি। তিনি মনে করেন, ক্রেমলিনের পরমাণু হাতিয়ার এর যোগ্য উত্তর হতে পারে। ডুমার সদস্য জেনারেল আন্দ্রেই গুরুলেভ আবার বাল্টিক সাগরে আমেরিকার তেলবাহী জাহাজ আটকের পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁর দাবি, এতে ‘ঢিল মারলে পাটকেল খেতে হবে’ বার্তা দেওয়া যাবে। সেই সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে হবে না মস্কোকে।
ডুমার সদস্যেরা যা-ই বলুন না কেন, প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকেরা মনে করেন, এই বিকল্পগুলি পুতিনের কাছে ‘আত্মহত্যা’র শামিল। কারণ, গত প্রায় চার বছর ধরে লড়াই করেও ইউক্রেনের বিশাল এলাকা তাঁর ফৌজ যে কব্জা করতে পেরেছে, এমনটা নয়। এই অবস্থায় আমেরিকার মতো ‘সুপার পাওয়ার’-এর বিরুদ্ধে দ্বিতীয় ফ্রন্ট খোলা তাঁর পক্ষে বেশ ঝুঁকির। তখন পশ্চিমি শক্তি আরও এককাট্টা হয়ে ক্রেমলিনের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে। তখন মস্কোর পক্ষে ‘প্রাণ বাঁচানো’ যে কঠিন হবে, তা বলাই বাহুল্য।
দ্বিতীয়ত, গত কয়েক বছরে একের পর এক ‘বন্ধু’ হারিয়ে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে কার্যত একা হয়ে পড়েছে রাশিয়া। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সিরিয়ায় ক্ষমতাচ্যূত হন বাশার আল-আসাদ। এ বছরের গোড়াতেই ভেনেজ়ুয়েলায় ঢুকে সেখানকার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তুলে নিয়ে আসে মার্কিন ফৌজ। দু’টি জায়গাতেই নিজেদের তাঁবেদার সরকার প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে আমেরিকা, ক্রেমলিনের কাজে যা একেবারেই স্বস্তিজনক নয়।
বর্তমানে রাশিয়ার পাশে আছে হাতে গোনা তিনটি দেশ। সেগুলি হল, গণপ্রজাতন্ত্রী চিন (পিপলস রিপাবলিক অফ চায়না), উত্তর কোরিয়া (ডেমোক্র্যাটিক পিপলস রিপাবলিক অফ কোরিয়া) এবং ইরান। এদের মধ্যে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করার ব্যাপারে যথেষ্ট অনীহা আছে বেজিঙের। ওয়াশিংটনের সঙ্গে বাণিজ্যিক সংঘাত মিটে গেলে তারা এই ধরনের পরিস্থিতিতে মস্কোকে কতটা সাহায্য করবে, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।
অন্য দিকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার জেরে প্রায় কোমায় চলে গিয়েছে ইরানের অর্থনীতি। এর জেরে তুমুল গণবিক্ষোভের আগুনে পুড়ছে সাবেক পারস্য দেশ। পরিস্থিতি অবিলম্বে নিয়ন্ত্রণে না এলে ক্ষমতা হারাতে পারেন তেহরানের শিয়া ধর্মগুরু তথা ‘সুপ্রিম লিডার’ আয়াতোল্লা আলি খামেনেই। সে ক্ষেত্রে সুযোগের সদ্ব্যবহার করে ওই উপসাগরীয় রাষ্ট্রেও নিজেদের পছন্দসই সরকার গঠন করতে পারে আমেরিকা।
গত কয়েক বছরে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে তীব্র হয়েছে রিপাবলিক অফ কোরিয়া বা দক্ষিণ কোরিয়ার সংঘাত। সম্প্রতি তাদের আকাশসীমায় সোলের ড্রোন ঢুকেছে বলে অভিযোগ করে পিয়ংইয়ং। ঠিক তার পরেই বিষয়টিতে হুঁশিয়ারি দেন উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা (সুপ্রিম লিডার) কিম জং-উন। বলেন, ‘‘আমাদের সার্বভৌমত্বে আঘাত হানার চেষ্টা করলে তার ফল ভাল হবে না। এর জন্য সোলকে বড় মূল্য চোকাতে হতে পারে।’’ তাঁর ওই হুমকির পর গোটা কোরীয় উপদ্বীপে তীব্র হয়েছে যুদ্ধের আতঙ্ক।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকেরা মনে করেন, পিয়ংইয়ংকে উস্কানি দেওয়ার নেপথ্যে রয়েছে আমেরিকা। ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে সৈনিক দিয়ে সাহায্য করছেন কিম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দক্ষিণ কোরিয়ার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামলে তিনি যে কিভের রণাঙ্গন থেকে সৈন্য সরাবেন, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। তখন দখল করা এলাকা ধরে রাখা মস্কোর পক্ষে কঠিন হতে পারে। পুতিনের পক্ষে সেই ঝুঁকি নেওয়া একরকম অসম্ভব।
ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়া ইস্তক রাশিয়ার উপর ১৬ হাজারের বেশি নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে রেখেছে আমেরিকা-সহ পশ্চিমি বিশ্ব। এই পরিস্থিতিতে অর্থনীতি বাঁচাতে ভারতের মতো ‘বন্ধু’ দেশে সস্তায় খনিজ তেল বিক্রি করছেন পুতিন। কিন্তু মস্কোর সেই বাণিজ্যের উপরেও রয়েছে সঙ্কটের কালো মেঘ। কারণ, নয়াদিল্লিকে ওই ‘তরল সোনা’ কেনা বন্ধ করতে ক্রমাগত চাপ দিয়ে যাচ্ছে ওয়াশিংটন। পাশাপাশি, এ দেশের উপর ৫০০ শতাংশ শুল্ক চাপানোর পরিকল্পনাও আছে যুক্তরাষ্ট্রের।
বিশেষজ্ঞেরা মনে করেন, আগামী দিনে মার্কিন শুল্পের অঙ্ক বৃদ্ধি পেলে বাধ্য হয়ে রুশ তেলের আমদানি হ্রাস করবে নয়াদিল্লি। এতে ধাক্কা খেতে পারে মস্কোর অর্থনীতি। কারণ, সে ক্ষেত্রে চিন ছাড়া ‘তরল সোনা’ বিক্রির আর কোনও খদ্দের থাকছে না ক্রেমলিনের কাছে। ফলে আরও একটা যুদ্ধের ফ্রন্ট খোলার ব্যয় সামলানো কোনও অবস্থাতেই পুতিনের পক্ষে সহজ সিদ্ধান্ত নয়।
যদিও মেরিনেরা ‘অপহরণ’ কাণ্ডের পর রাশিয়া হাত-পা গুটিয়ে বসে আছে ভাবলে ভুল হবে। ইতিমধ্যেই চিন, ইরান এবং দক্ষিণ আফ্রিকার নৌবাহিনীর সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়ায় নেমেছে মস্কো। আটলান্টিকে মার্কিন ‘দাদাগিরি’র বিরুদ্ধে কূটনৈতিক আক্রমণও শুরু করে দিয়েছে ক্রেমলিন। পাশাপাশি একের পর এক হাইপারসনিক (শব্দের পাঁচ গুণের চেয়ে গতিশীল) ক্ষেপণাস্ত্রে ইউক্রেনে ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে পুতিনের সেনা।
গত বছরের (২০২৫) জানুয়ারিতে শপথ নেওয়ার পর থেকেই গ্রিনল্যান্ড দখল করতে উঠেপড়ে লেগেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ‘স্বায়ত্তশাসনে’ থাকা সুমেরু সাগর সংলগ্ন পৃথিবীর ওই বৃহত্তম দ্বীপটির আসল মালিকানা আছে ডেনমার্কের কাছে। ফলে বিষয়টি নিয়ে কোপেনহেগেনের সঙ্গে ওয়াশিংটনের শুরু হয়েছে চাপানউতর। ডেনমার্ক সংশ্লিষ্ট দ্বীপটির নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে না দিলে সেখানে সামরিক অভিযান পাঠানোর হুমকিও দিয়ে রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র।
সাবেক সেনাকর্তারা মনে করেন, আপাতত ট্রাম্পের ওই ‘ভুলের’ অপেক্ষায় আছেন পুতিন। সামরিক অভিযান পাঠিয়ে তিনি গ্রিনল্যান্ড দখল করলে নিমেষে ভাঙবে মার্কিন নেতৃত্বাধীন ইউরোপীয় শক্তিজোট নেটো (নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজ়েশন)। পাশাপাশি, যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এককাট্টা হতে পারে ফ্রান্স, জার্মানি, ডেনমার্ক-সহ একাধিক দেশ। রাশিয়ার সঙ্গে বিরোধ মিটিয়ে ফেলার দিকেও হাঁটতে পারে তারা। তখনই যাবতীয় ‘পুরনো হিসাব’ মিটিয়ে নেওয়ার সুযোগ পাবে মস্কো।