মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-সহ পশ্চিমি দুনিয়ার চাপিয়ে দেওয়া নিষেধাজ্ঞায় কোণঠাসা রাশিয়া ও ইরান। এর জেরে দিন দিন পঙ্গু হচ্ছে মস্কো ও তেহরানের অর্থনীতি। এই পরিস্থিতিতে পাল্টা প্রত্যাঘাতে ওয়াশিংটনের যাবতীয় ছক ভেস্তে দিতে সাবেক পারস্য দেশের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ১৬২ কিলোমিটার লম্বা রেলপথ নির্মাণে নেমেছে ক্রেমলিন। এই রেলপথ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে দিতে পারে নতুন রূপ। শুধু তা-ই নয়, সংশ্লিষ্ট প্রকল্পটিকে নয়াদিল্লির কাছে ‘মেঘ না চাইতেই জল’ বলে উল্লেখ করেছেন বিশ্লেষকদের একাংশ।
পশ্চিমি নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে বাণিজ্য চালাতে ‘আন্তর্জাতিক উত্তর-দক্ষিণ পরিবহণ বারান্দা’ বা আইএনএসটিসি (ইন্টারন্যাশনাল নর্থ সাউথ ট্রান্সপোর্ট করিডর) নামের একটি বিকল্প রাস্তার স্বপ্ন দীর্ঘ দিন ধরেই দেখে আসছে রাশিয়া। সেই লক্ষ্যে ২০০২ সালে ভারত এবং ইরানের সঙ্গে চুক্তি করে মস্কো। ঠিক হয় এই রুটে মুম্বই থেকে ক্রেমলিন পর্যন্ত চলবে পণ্যের আমদানি ও রফতানি। এর কাজ শেষ করতে রাশ্ত ও আস্তারার মধ্যে রেল যোগাযোগ স্থাপনে উঠে পড়ে লেগেছে রাশিয়া ও ইরান।
কাস্পিয়ান সাগর সংলগ্ন সাবেক পারস্য দেশের এই দুই শহরের কৌশলগত গুরুত্ব অপরিসীম। জায়গাটিতে পৌঁছে একটা গুরুত্বপূর্ণ বাঁক নিয়েছে আইএনএসটিসি। রাশ্ত ও আস্তারার মধ্যে রেলপথে ১৬২ কিলোমিটার লম্বা রাস্তা জুড়ে গেলে ‘আন্তর্জাতিক উত্তর-দক্ষিণ পরিবহণ বারান্দা’র কাজ প্রায় শেষ হবে ধরে নেওয়া যেতে পারে। সেই কারণেই সংশ্লিষ্ট ‘মিসিং লিঙ্ক’কে এতটা গুরুত্ব দিচ্ছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। অন্য দিকে প্রকল্পের কাজ যত এগোচ্ছে, ততই কপালের ভাঁজ চওড়া হচ্ছে পশ্চিমি দুনিয়ার।
যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যমগুলি রাশ্ত ও আস্তারার মধ্যে নির্মীয়মাণ রেলপথটিকে ইস্পাত আর কংক্রিটের চেয়ে অনেক বেশি বলে উল্লেখ করেছে। কারণ, এই ‘মিসিং লিঙ্ক’ জুড়ে গেলে ৭,২০০ কিলোমিটার লম্বা ‘আন্তর্জাতিক উত্তর-দক্ষিণ পরিবহণ বারান্দা’টিকে মোটের উপর চালু করতে পারবে রাশিয়া-ইরান-ভারত। এতে এশিয়া থেকে ইউরোপ বাণিজ্যের খরচ কমবে ৩০ শতাংশ। পাশাপাশি, ৩৭ দিনের বিপদসঙ্কুল সামুদ্রিক রাস্তা এড়িয়ে মাত্র ১৯ দিনে একে অপরের বাজারে নিয়ে যাওয়া যাবে পণ্য।
রাশ্ত ও আস্তারার মধ্যে রেলপথ স্থাপনে গত বছরের (পড়ুন ২০২৫ সাল) জানুয়ারিতে তেহরানের সঙ্গে ২০ বছরের অংশীদারি চুক্তিতে সই করে মস্কো। তার পরই শুরু হয় প্রকল্পটির কাজ। এর মোট খরচ ধার্য হয়েছে ১৬০ কোটি ইউরো। এই টাকার পুরোটাই দিচ্ছে ক্রেমলিন। পাশাপাশি পুতিনের স্বপ্নের রেল প্রকল্পটিতে কাজ করছেন রুশ ইঞ্জিনিয়ারেরাই। ২০২৬ সালের মধ্যে রেলপথ স্থাপনের কাজ পুরোপুরি শেষ হবে বলে আশাবাদী ক্রেমলিন।
বিশেষজ্ঞদের কথায়, আইএনএসটিসির এ-হেন ‘মিসিং লিঙ্ক’ সংযুক্তিকরণ মোটেই সহজ নয়। এতে রয়েছে একাধিক চ্যালেঞ্জ। প্রথমত, রাশ্ত ও আস্তারার মধ্যবর্তী ভূপ্রকৃতি বেশ কঠিন এবং দুর্গম। ফলে সেখানে রেললাইন পাতা একেবারেই সহজ নয়। দ্বিতীয়ত, সাম্প্রতিক সময়ে বারে বারে রাজনৈতিক অস্থিরতার মুখে পড়েছে ইরান। এর জেরে আগামী দিনে নির্মীয়মাণ প্রকল্পটির কাজ ব্যাহত হতে পারে বলেও মনে করা হচ্ছে।
গত বছরের (পড়ুন ২০২৫ সাল) জুনে ইজ়রায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে ইরান, যেটা টানা ১২ দিন ধরে চলেছিল। ওই সংঘাতে ‘নাক গলায়’ আমেরিকাও। সাবেক পারস্য দেশের পরমাণু কেন্দ্রগুলিকে নিশানা করে মার্কিন বোমারু বিমান। ওই সময় কিছু দিনের জন্য বন্ধ ছিল সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের কাজ। এ বছর ফের ইহুদি-শিয়া সংঘাত শুরু হলে রেললাইন পাতার কাজ যে থমকে যাবে, তা বলাই বাহুল্য।
তা ছাড়া পশ্চিমি নিষেধাজ্ঞার জেরে বর্তমানে আন্তর্জাতিক স্তরে একেবারে তলানিতে গিয়ে পৌঁছেছে ইরানি টাকার দাম। এর ফলে সাবেক পারস্য দেশে শুরু হয়েছে প্রবল গণবিক্ষোভ, যা সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তেহরানের কট্টরপন্থী শিয়া ধর্মগুরুদের। এই পরিস্থিতিতে কোনও কারণে সেখানকার সরকার বদল হলে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ যে প্রশ্নের মুখে পড়বে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
তৃতীয়ত, ‘আন্তর্জাতিক উত্তর-দক্ষিণ পরিবহণ করিডর’ মধ্য এশিয়ার একাধিক দেশের উপর দিয়ে গিয়েছে। আগামী দিনে তাদের নিষেধাজ্ঞার ভয় দেখাতে পারে আমেরিকা। তা ছাড়া নির্মীয়মাণ রেলপথটির উপর ইজ়রায়েল এবং মার্কিন বিমানবাহিনীর বোমাবর্ষণের আশঙ্কাও রয়েছে ষোলো আনা। এই সমস্ত বাধা সত্ত্বেও অবশ্য দ্রুত গতিতে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের কাজ চলছে বলে জানা গিয়েছে।
বর্তমানে ভারত তথা পূর্ব এশিয়ার দেশগুলির ইউরোপে পণ্য পরিবহণের একমাত্র রাস্তা হল সুয়েজ খাল। ওই সামুদ্রিক রুট অনেকাংশেই নিয়ন্ত্রণ করে পশ্চিমি বিশ্ব। সেই কারণেই বিকল্প রাস্তা হিসাবে ‘আন্তর্জাতিক উত্তর-দক্ষিণ পরিবহণ বারান্দা’টিকে গড়ে তুলতে চাইছেন রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন। এর কাজ পুরোপুরি শেষ হলে বছরে দু’কোটি টন পর্যন্ত পণ্য মস্কো থেকে মুম্বই পর্যন্ত আমদানি-রফতানি করা যাবে। এই রাস্তায় তেল, গ্যাস, ইস্পাত, খাদ্যসামগ্রী এবং বিভিন্ন যন্ত্রের পরিবহণ সর্বাধিক হওয়ার সম্ভাবনা।
আইএনএসটিসির সবচেয়ে বড় সুবিধা হল এটি কোনও সামুদ্রিক রাস্তা নয়। ফলে নিষেধাজ্ঞার নামে নৌবহর নামিয়ে সংশ্লিষ্ট রুটটিকে বন্ধ করতে পারবে না যুক্তরাষ্ট্র বা পশ্চিমি বিশ্ব। এতে পণ্যের আদান-প্রদান আটকে দেওয়া তাদের পক্ষে একরকম অসম্ভব বলা যেতে পারে। যদিও গোটা প্রকল্পটির উপর সতর্ক দৃষ্টি রেখেছে চিন। বিশেষজ্ঞদের দাবি, এটি বেজিঙের স্বার্থের সংঘাতকে তীব্র করতে পারে। কারণ, মধ্য এশিয়ার দেশগুলিকে জুড়তে এত দিন ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’কে সামনে রেখে এগিয়েছে ড্রাগন সরকার।
২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরবর্তী বছরগুলিতে নিষেধাজ্ঞার কারণে চিনের উপর নির্ভরশীলতা বেড়েছে রাশিয়ার। সাবেক সেনাকর্তারা মনে করেন, এর বিপদ ভালই টের পাচ্ছেন পুতিন। ফলে সেই জায়গা থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসার প্রচেষ্টা আছে তাঁর। ‘আন্তর্জাতিক উত্তর দক্ষিণ পরিবহণ বারান্দা’ সেই সুযোগ দিতে পারে তাঁকে। বেজিংকে এড়িয়ে এর মাধ্যমে ‘বন্ধু’ রাষ্ট্রগুলির সঙ্গে দিব্যি বাণিজ্য চালিয়ে নিয়ে যেতে পারবেন তিনি।
২০২৪ সালে তালিবানশাসিত আফগানিস্তানকে স্বীকৃতি দেয় মস্কো। বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ মনে করেন, আগামী দিনে আইএনএসটিসির গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল হয়ে উঠবে কাবুল। তখন পাকিস্তানকে এড়িয়ে মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলির সঙ্গে পণ্য আমদানি-রফতানির ক্ষেত্রে কোনও সমস্যাই হবে না রাশিয়ার। সংশ্লিষ্ট প্রকল্পটির সাফল্যে ভারতেরও বেশ কিছু কৌশলগত সুবিধা রয়েছে।
দীর্ঘ দিন ধরেই দক্ষিণ ইরানের চাবাহার বন্দরটিকে নিয়ন্ত্রণ করছে নয়াদিল্লি। বর্তমানে পাকিস্তানকে এড়িয়ে মধ্য এশিয়ায় পণ্য নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে ওই বন্দর ব্যবহার করা ছাড়া ভারতের কাছে দ্বিতীয় কোনও রাস্তা নেই। আইএনএসটিসির কাজ সম্পূর্ণ হলে কয়েক গুণ বাড়বে এর গুরুত্ব। তাতে ইরানের পাশাপাশি আখেরে লাভ হবে এ দেশেরও।
সদা ব্যস্ত সুয়েজ খাল এড়িয়ে রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বৃদ্ধিতে আরও একটি সামুদ্রিক রাস্তা তৈরি করেছে ভারত। সেটা হল ‘চেন্নাই-ভ্লাদিভস্তক সামুদ্রিক করিডর’ (সিভিএমসি)। ২০২৪ সালের নভেম্বরে তা পুরোপুরি ভাবে চালু হয়েছে বলে জানিয়ে দেয় কেন্দ্র। এই ‘বাইপাস’ এ দেশের অর্থনীতির জন্য নতুন মাইলফলক হতে চলেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞদের একাংশ।
সুয়েজ খাল দিয়ে ইউরোপে পৌঁছোনোর ক্ষেত্রে এ দেশের জাহাজগুলিকে পাড়ি দিতে হয় ৮ হাজার ৬৭৫ নটিক্যাল মাইল। অর্থাৎ, ১৬ হাজার ৬৬ কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করতে হয় তাদের। উপরন্তু মিশরের নিয়ন্ত্রণে থাকা সুয়েজ খাল দিয়ে মালপত্র নিয়ে যাওয়ার জন্য মোটা টাকা ফি নিয়ে থাকে কায়রো। জাহাজপিছু তা প্রায় ৭০ হাজার ডলার।
অন্য দিকে, জলপথে চেন্নাই থেকে পূর্ব রাশিয়ার শহর ভ্লাদিভস্তকের দূরত্ব ৫ হাজার ৬৪৭ নটিক্যাল মাইল। অর্থাৎ, এই রাস্তায় ভারতীয় জাহাজকে মালপত্র নিয়ে ১০ হাজার ৪৫৯ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে। ফলে অনেক কম সময়ে (১৬ থেকে ২০ দিনের মধ্যে) পৌঁছোনো যাচ্ছে ইউরোপ।
সুয়েজ খালের দ্বিতীয় সমস্যা হল পশ্চিম এশিয়ায় ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে যখন-তখন এটিকে বন্ধ করতে পারে মিশর। অতীতে বেশ কয়েক বার সেই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছে নয়াদিল্লি। খালটি বন্ধ থাকলে ইউরোপে পৌঁছোনো ভারতের পক্ষে প্রায় অসম্ভব। চেন্নাই-ভ্লাদিভস্তক সামুদ্রিক করিডরে সেই সমস্যা মিটেছে বলে জানিয়েছে কেন্দ্র।