জানুয়ারির শেষে মোক্ষম কাম়়ড় বসিয়েছে শীত। আমেরিকার প্রায় অধিকাংশ রাজ্যই ঢেকে গিয়েছে তুষারে। প্রবল তুষারঝড়ের আশঙ্কায় কাঁটা হয়ে আছেন মার্কিন নাগরিকেরা। তুষারঝড় শুরু হলে বিপর্যস্ত হতে পারে পরিবহণ ব্যবস্থা। জনজীবনেও তার প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছে প্রশাসন। রকি পর্বত থেকে গ্রেট লেক পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়া তুষারপাতের দাপটে বেসামাল আটলান্টিক পারের দেশটি।
আমেরিকার পূর্বাঞ্চলের দুই তৃতীয়াংশ তুষারপাত, শিলাবৃষ্টি এবং বরফঝড়ের জন্য প্রস্তুতি সেরে রাখছে। যে কোনও মুহূর্তে আছড়ে পড়বে হাড়কাঁপানো তুষারঝড়। বরফের পুরু চাদরে ডুবে যাবে বেশ কিছু রাজ্য। উত্তর মেরুপ্রদেশ থেকে ঝাঁপিয়ে পড়া কনকনে ঠান্ডা বাতাসে ঝড়ের পূর্বাভাস। বেশ কিছু রাজ্যে জারি করা হয়েছে জরুরি অবস্থাও।
শুক্রবারই টেক্সাস, ওকলাহোমা এবং কানসাসে নতুন করে প্রবল তুষারপাত শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যেই আমেরিকার ১৪টি রাজ্যে ও কলম্বিয়ায় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে। আবহাওয়া বিশেষজ্ঞেরা জানিয়েছেন, প্রবল ঝড় শুরু হলে বিস্তীর্ণ এলাকায় বিদ্যুৎবিভ্রাট দেখা দিতে পারে। এ বিষয়ে আগাম সতর্কতা জারি করেছে প্রশাসন। কিছু জায়গায় বেশ কয়েক দিন ধরে বিদ্যুৎ আকাল চলতে পারে।
এমন আবহাওয়ায় সাধারণত যে ভাবে উড়ান পরিষেবা ব্যাহত হয়, এ বারও ঠিক তেমনটাই আশঙ্কা করছে মার্কিন প্রশাসন। ঝড়ের কারণে বিমান সংস্থাগুলিকেও প্রস্তুত থাকার পরামর্শ দিয়েছে সে দেশের সরকার। প্রবল তুষারঝড়ের কারণে বিমান বাতিল বা সময়সূচির পরিবর্তন হতে পারে বলে জানিয়েছে বিমান সংস্থাগুলি। শনিবার আমেরিকায় বাতিল হয়েছে বা দেরিতে চলছে ৩,৪০০টি উড়ান। রবিবার ওড়ার কথা থাকলেও উড়ছে না ৫,০০০ বিমান। সপ্তাহের শেষে প্রায় আট হাজার বিমান বাতিল হয়েছে বা দেরিতে চলছে, যার জেরে ভোগান্তির শিকার যাত্রীরা।
যে সব রাজ্যের উপর দিয়ে তুষারঝড় বয়ে যাবে সেখানে আবহাওয়ার পরিস্থিতি প্রবল প্রতিকূল থাকবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তাপমাত্রার পতনও লক্ষণীয় হবে। খুব প্রয়োজন ছাড়া ওই সব এলাকার লোকজনকে বাড়ি থেকে বাইরে বেরোতে বারণ করেছে স্থানীয় প্রশাসন।
২৩ জানুয়ারির পূর্বাভাসে আবহাওয়া পূর্বাভাস কেন্দ্র সতর্কতা জারি করে জানিয়েছে, দক্ষিণ আরকানসাস, উত্তর লুইসিয়ানা এবং উত্তর মিসিসিপির কিছু অংশে ৭২ ঘণ্টা ধরে আধ ইঞ্চিরও বেশি তুষারপাতের আশঙ্কা রয়েছে। জমতে শুরু করেছে নায়াগ্রাও। নিউ ইয়র্কের প্রশাসন ইতিমধ্যেই জলপ্রপাত দেখতে আসা পর্যটকদের সতর্ক করেছে। তুষারঝড়ের কবলে পড়লে কী কী করণীয় তা ভ্রমণার্থীদের জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।
এই তীব্র ঝড় বা শিলাবৃষ্টির প্রভাবে ২৩ কোটিরও বেশি মানুষ ঝুঁকিতে রয়েছেন। দক্ষিণ রকি পর্বতমালা থেকে উত্তর-পূর্ব পর্যন্ত তুষারপাতের আশঙ্কা করা হচ্ছে এবং দক্ষিণ থেকে দক্ষিণ-মধ্য আটলান্টিকের দু’টি করিডর ভারী বরফপাতের কবলে পড়বে। পরিস্থিতি শোচনীয় হতে পারে।
যে ক’দিন এই ঝড়ের দাপট বজায় থাকবে, সাধারণ মানুষ স্বভাবতই চরম দুর্ভোগে পড়বেন বলে জানিয়ে রাখা হয়েছে। একাধিক শীতপোশাক ছাড়া তাই বাসিন্দাদের বাইরে বেরোতে নিষেধ করা হয়েছে। হাতে গ্লাভস পরলেও তার নীচে মিটেনস পরার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞেরা। ‘ফ্রস্ট বাইট’ থেকে বাঁচতে গায়ে চাপাতে বলা হচ্ছে একাধিক ঢিলেঢালা পশমের কোট।
প্রবল ঠান্ডা বাতাস বয়ে নিয়ে আসা মেরুঝড় আছড়ে পড়বে পূর্ব ও মধ্য আমেরিকার প্রদেশগুলিতে। উত্তর মেরু থেকে সরাসরি বয়ে আসা এই তুষারঝড়ের প্রকোপে ঘরবন্দি থাকতে হতে পারে কয়েক কোটি মানুষকে। শুক্রবার শুরু হওয়া এই ঝড় আগামী সোমবার পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আমেরিকার আবহাওয়া বিভাগ ‘ন্যাশনাল ওয়েদার সার্ভিস’ বা ‘এনডব্লিউএস’।
শীতকালীন ঝড়ের প্রস্তুতি সেরে রাখতে নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর দোকানে ছুটে গিয়েছিলেন অনেকেই। দোকানের ফাঁকা তাকগুলি তাঁদের হতাশ করেছিল। কারণ দোকানে মজুত নেই কোনও পণ্যই। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘ফক্স বিজ়নেসের’ একটি প্রতিবেদন অনুসারে, আতঙ্কের কারণে মিসিসিপি, টেক্সাস, নিউ ইয়র্ক, এমনকি রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসির বেশির ভাগ মুদি দোকানের তাকগুলি সম্পূর্ণ ফাঁকা।
জল এবং দুধের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রও শেষ হয়ে গিয়েছিল। এ ছাড়াও ডিম, সসেজ এবং হট ডগের মতো খাবার যেটুকু পড়েছিল তা প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য।
তুষারঝড় এবং বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা থাকায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কিছু অংশে বিদ্যুৎ সংযোগে ব্যাঘাত ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ‘ব্লুমবার্গের’ প্রতিবেদন অনুসারে, ন্যাশভিল এবং শার্লটের মতো শহরের প্রশাসনিক কর্মকর্তারা বাসিন্দাদের বিদ্যুৎবিভ্রাট, বরফে জমাট বাঁধা পাইপ এবং যান চলাচলের অনুপযোগী রাস্তাঘাটের জন্য প্রস্তুত থাকার কথা জানিয়েছেন। তুষারঝড়ের সতর্কতার মধ্যেই কয়েকটি এলাকায় বিদ্যুতের দামও বেড়ে গিয়েছে বলে খবর।
অতি শীতল বাতাসের মেরু ঘূর্ণি সাধারণত উত্তর মেরুতেই ঘুরপাক খায়। এর পর সেই ঘূর্ণি দক্ষিণের দিকে প্রসারিত হওয়ার জেরে প্রবল ঠান্ডার মুখে পড়ে আমেরিকা, ইউরোপ এবং এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল। উত্তর-পূর্বের শহরগুলির বিভিন্ন অঞ্চলে ১২ থেকে ১৮ ইঞ্চি তুষারপাতের সম্ভাবনা রয়েছে।
ওকলাহোমা সিটি থেকে বোস্টন পর্যন্ত প্রায় ২৪১৪ কিলোমিটার জুড়ে ভারী তুষারপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। করিডরের পাশের প্রধান মহানগর এলাকাগুলিতে তুষারপাতের আশঙ্কা রয়েছে, যা বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। ওকলাহোমাতে ১২ থেকে ১৪ ইঞ্চি তুষারপাত হতে পারে। শীর্ষ ১০টি তুষারপাতের রেকর্ডের মধ্যে জায়গা করে নেবে ওকলাহোমার তুষারপাত। এ ছাড়াও লুইসভিলে ১০ থেকে ১৪ ইঞ্চি তুষারপাতের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, যা সর্বকালের তুষারপাতের রেকর্ডের সীমা ছাড়িয়ে যেতে পারে।
টেক্সাস এবং ওকলাহোমাতে ইতিমধ্যেই মেরুঝড়ের তাণ্ডব শুরু হয়েছে। শুক্রবার সন্ধ্যার মধ্যে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল আগেই। রবিবার উত্তর-পূর্ব দিকে আঘাত হানার আগে শনিবার নিউ মেক্সিকো থেকে ভার্জিনিয়া পর্যন্ত এই ঝড় ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। দক্ষিণে ভারী তুষারপাত, শিলাবৃষ্টি এবং তার সঙ্গে অঝোরে বৃষ্টিতে নাকাল হবেন বাসিন্দারা। টেক্সাস থেকে ক্যারোলিনা পর্যন্ত অনেক এলাকায় যাওয়া-আসা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠতে পারে। অচল হয়ে পড়বে দৈনন্দিন জীবনও।
আমেরিকার একাংশ অন্তত এক সপ্তাহ বরফে মুড়ে থাকতে পারে বলে আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে। সর্বত্র প্রায় একই ছবি। কয়েক প্রজন্ম এমন নজিরবিহীন ঠান্ডার মুখোমুখি হয়নি। জনমানবহীন শুনশান রাস্তায় জমে পুরু বরফ। কনকনে ঠান্ডা বাতাস আর বরফের থেকে এখনই আমেরিকাবাসীর মুক্তি নেই বলে জানিয়েছে আবহাওয়া দফতর।