ভারত-যুক্তরাজ্য প্রতিরক্ষা সম্পর্কের নতুন মাইলফলক। পাল্টে গেল ভারতের ভূমিকা। এককালের শাসকদেরই শিক্ষা দেবে সাবেক উপনিবেশ। তাও আবার প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে। পরাধীন ভারতে ১৯৩২ সালের অক্টোবরে বায়ুসেনা তৈরি করে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার। ওই সময় এর নাম ছিল ‘রয়্যাল ইন্ডিয়ান এয়ারফোর্স’।
কালে কালে সেই বাহিনী রণাঙ্গনে নিজেদের সুনাম ও প্রভাব বিস্তার করেছে। ইংরেজদের হাতে গড়া সেই বায়ুসেনার বর্তমানে সাতটি কমান্ড রয়েছে। তার মধ্যে পাঁচটি অভিযানের জন্য। বাকি দু’টি প্রশিক্ষণ এবং রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ব্যবহার করে এ দেশের বায়ুসেনা।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অ্যাডল্ফ হিটলারের বাহিনীকে ঘোল খাইয়ে দেওয়া ইংরেজ যোদ্ধা পাইলটেরাই এ বার শরণাপন্ন হয়েছেন ভারতীয় বায়ুসেনার। ভারতীয় বায়ুসেনার তুখোড় ও যুদ্ধবিমান চালাতে পারদর্শী চালকদের কাছে প্রশিক্ষণ নেবে ব্রিটিশ ‘রয়্যাল এয়ার ফোর্স’-এর (আরএএফ) সদস্যেরা। প্রতিরক্ষা সহায়তা চুক্তি হিসাবে প্রথম বার রয়্যাল এয়ার ফোর্স ভ্যালিতে তিন সদস্যের একটি প্রশিক্ষক দল পাঠাবে নয়াদিল্লি।
আকাশপথে লড়াইয়ে ভারতীয় বায়ুসেনার কলাকৌশল জানতে আগ্রহী ব্রিটিশ বায়ুসেনা। তাই আগামী দু’বছরের জন্য তিন জন ভারতীয় ফ্লাইং ইনস্ট্রাক্টর বা যুদ্ধবিমান প্রশিক্ষককে নিয়ে যেতে চায় ইংরেজ সেনাবাহিনী। বিলেতে গিয়ে ব্রিটিশদেরই উড়ানের খুঁটিনাটি প্রশিক্ষণ হাতেকলমে শেখাবেন ভারতের বায়ুসেনার তিন আধিকারিক। গত ১১ ফেব্রুয়ারি নয়াদিল্লি ও ব্রিটেনের প্রতিরক্ষা আধিকারিকদের এক বৈঠকের পর প্রতিরক্ষা সহায়তার বিষয়ে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
প্রতিরক্ষা দফতরের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ব্রিটিশদের আধুনিক প্রজন্মের যুদ্ধবিমান চালানোর কলাকৌশল শিখিয়ে-পড়িয়ে দড় করবেন এ দেশের বিমানবাহিনীর ‘ফ্লাইং ইনস্ট্রাকটার’ পদমর্যাদার অফিসারেরা। নয়াদিল্লির বায়ুসেনা বিভিন্ন ধরনের হাতিয়ার ব্যবহার করে থাকে। সেই তালিকায় লড়াকু জেট ছাড়াও রয়েছে হামলাকারী হেলিকপ্টার ও ড্রোন, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম) এবং মালবাহী বিমান ও কপ্টার। এ ছাড়াও আছে ‘গরুড়’ নামের একটি বিশেষ কমান্ডো বাহিনী। একাধিক আকাশ প্রতিরক্ষার প্রশিক্ষণ দেবেন তিন প্রশিক্ষক।
অ্যাঙ্গেলসির ভ্যালিতে রয়েছে রয়্যাল এয়ার ফোর্সের ৪ নম্বর ফ্লাইং ট্রেনিং স্কুল। পাহাড়ি ও সমুদ্রপথে কঠিন অভিযানের জন্য আরএএফের সদস্যদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় এখানে। এখানে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পাহাড়ের দুর্গম অঞ্চলে ও সঙ্কীর্ণ সমুদ্রখাঁড়ি এলাকায় যুদ্ধবিমান কী ভাবে ওড়ানো হবে তারই অভিজ্ঞতা কাজে লাগান ইংরেজ জেটবিমান চালকেরা। এই পরিবেশেই আরএএফের সদস্যদের হাতেকলমে শেখাবেন ভারতের কৌশলী ও দক্ষ প্রশিক্ষকেরা।
সূত্রের খবর, রয়্যাল এয়ার ফোর্সের বিমানচালকদের হক টি২ এবং টেক্সান টিওয়ান বিমানের সাহায্যে প্রশিক্ষণ দেবেন ভারতীয় বিমানবাহিনীর সুদক্ষ প্রশিক্ষকেরা। এই দু’টিই রয়্যাল এয়ার ফোর্সের উন্নত প্রশিক্ষণ জেট। হক টি২ হল একটি আধুনিক জেট যা রাফাল বা এফ ৩৫-এর মতো যুদ্ধবিমান চালানোর জন্য চালকদের প্রস্তুত করে। অন্য দিকে, টেক্সান টিওয়ান শক্তিশালী টার্বোপ্রপ বেসিক ট্রেনার জেট, যা প্রাথমিক ও মধ্যবর্তী প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত হয়।
গত বছরের (২০২৫) অক্টোবরের মাঝামাঝি ভারতসফরে এসেছিলেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টার্মার। দেশের বাণিজ্য রাজধানী মুম্বইয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক সারেন তিনি। সেখানেই প্রতিরক্ষা এবং সামরিক প্রশিক্ষণ সংক্রান্ত একটি চুক্তি সেরে ফেলেছিল নয়াদিল্লি ও ব্রিটেন। সেই বৈঠকেই প্রস্তাবিত হয়েছিল ইংরেজদের রয়্যাল এয়ার ফোর্সে প্রশিক্ষকের কাজ করবে ভারতীয় বিমানবাহিনী। সেই প্রস্তাবেই সিলমোহর পড়েছে গত ১১ ফেব্রুয়ারির বৈঠকে।
বৈঠক শেষে রয়্যাল এয়ার ফোর্সের অ্যাসিস্ট্যান্ট চিফ অফ দ্য এয়ার স্টাফ ভাইস মার্শাল ইয়ান টাউনসেন্ড জানিয়েছেন, এই চুক্তির ফলে রয়্যাল এয়ার ফোর্স এবং ভারতীয় বিমানবাহিনীর মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক আরও দৃঢ় হল। এই গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের ফলে যৌথ প্রশিক্ষণ এবং পারস্পরিক সহযোগিতার একটি অনন্য সমন্বয় তৈরি হবে। তাতে উপকৃত হবে দু’টি দেশই, আশা টাউনসেন্ডের।
শতাব্দীপ্রাচীন ব্রিটেনের রয়্যাল এয়ার ফোর্সের জন্ম হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষাশেষি, ১৯১৮ সালের এপ্রিলে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন ১৯৪০ সালে ধারে ও ভারে অনেকটা এগিয়ে থাকা অ্যাডল্ফ হিটলারের বিমানবাহিনীকে আকাশযুদ্ধে হারিয়ে দেয় তারা। ফলে পরবর্তী দশকগুলিতে ইংরেজ যোদ্ধা পাইলটদের রণকৌশল নিয়ে মেতে ছিল বিশ্ব। এ বার তা বদলাতে চলেছে বলে মনে করছেন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকেরা।
২০২৪ সালের মে মাস থেকে ব্রিটানিয়া রয়্যাল নেভাল কলেজ ডার্টমাউথের প্রশিক্ষক হিসাবে নিযুক্ত রয়েছেন ভারতীয় নৌবাহিনীর এক আধিকারিক। ঠিক তার পরের বছরই ২০২৫ সালের ব্রিটেনের স্থলবাহিনী রয়্যাল মিলিটারি অ্যাকাডেমি স্যান্ডহার্স্টে এক জন ভারতীয় সেনা অফিসারকে প্রশিক্ষক হিসাবে নিযুক্ত করা হয়েছে। দুই বাহিনীতে ভারতীয় প্রশিক্ষকদের দক্ষতা সন্তোষজনক হওয়ায় রাজকীয় ইংরেজ বাহিনীর আকাশপথে প্রশিক্ষণের ভার ভারতীয়দের হাতে তুলে দিতে চান ব্রিটিশ সেনার কর্তারা।
‘অপারেশন সিঁদুর’-এর সময় যে ভাবে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে একের পর এক পাক জঙ্গিঘাঁটিতে আক্রমণ শানিয়েছে ভারতীয় বায়ুসেনা, তার ঝলক দেখেছে গোটা বিশ্ব। বাহিনীর পরাক্রমে মজেছে ইংরেজরাও। এই ধরনের অভিযানের পাঠ দিতে তাই ভারতীয় তিন আধিকারিককে আমন্ত্রণ জানিয়েছে ব্রিটিশ রয়্যাল এয়ার ফোর্স।
ভারতের সঙ্গে ব্রিটেনের যে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি হয়েছে, সেই অনুযায়ী নয়াদিল্লিকে একটি হালকা বহুমুখী ক্ষেপণাস্ত্র (লাইটওয়েট মাল্টিরোল মিসাইল বা এলএমএম) সরবরাহ করবে ব্রিটেন। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর গত বছরের (২০২৫ সালের) ভারতসফরে সেই প্রতিশ্রুতি পেয়েছে ভারত।
ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর তিন শাখা (স্থল, নৌ এবং বায়ুসেনা) এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে পারবে বলে জানিয়েছে প্রতিরক্ষা মন্ত্রক। ব্রিটিশ অস্ত্রনির্মাতা সংস্থা ‘থ্যালেস এয়ার ডিফেন্স’-এর তৈরি এই ক্ষেপণাস্ত্র কেনার বরাতের অঙ্ক প্রায় ৩৫ কোটি ব্রিটিশ পাউন্ড (ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৪ হাজার ১৪৮ কোটি টাকা)।
হাতিয়ারটির পোশাকি নাম ‘মার্টলেট’। লেজ়ার নির্দেশিত রণাঙ্গনের ক্ষেপণাস্ত্র এটি। নির্মাণকারী সংস্থা হল ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জের উত্তর দিকের বেলফাস্ট এলাকার ‘থেলস এয়ার ডিফেন্স’। চার ফুট তিন ইঞ্চি লম্বা সংশ্লিষ্ট ক্ষেপণাস্ত্রটির ওজন ১৩ কেজি। প্রায় তিন কেজি বিস্ফোরক বহন করতে পারে ‘মার্টলেট’। শব্দের প্রায় দেড় গুণ গতিতে (১.৫ ম্যাক) ছুটে গিয়ে নিখুঁত নিশানায় হামলা করার সক্ষমতা রয়েছে এই ব্রিটিশ মারণাস্ত্রের।
বেশ কয়েক বছর যাবৎ যৌথ মহড়ার ক্ষেত্রেও সহযোগিতা বেড়েছে দু’দেশের মধ্যে। দু’দেশের সেনার মধ্যে ইতিবাচক সম্পর্ক, সেনাবাহিনীর অত্যাধুনিক বিষয়ে তথ্য আদানপ্রদান করতে ২০২১ সালে ব্রিটেনের সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়াও চালিয়েছে ভারত। ‘অজেয় ওয়ারিয়র’ নামের সেই মহড়া শুরু হয়েছিল উত্তরাখণ্ডের চৌবাটিয়ায়। শেষ বার হয়েছে ২০২৫ সালে, রাজস্থানে।
২০২৫ সালে ব্রিটিশ সেনা এবং ভারত দু’দেশের যৌথ নৌবাহিনীর ‘ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ’কে নিয়ে সবচেয়ে বড় সামুদ্রিক মহড়া পরিচালনা করে।