রাজকোষ প্রায় শূন্য। অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছে সিংহভাগ জনতা। এ-হেন মুসলিম দেশগুলিকে নিয়ে ‘ইসলামীয় নেটো’ তৈরির স্বপ্নে বিভোর পাকিস্তান। শুধু তা-ই নয়, পরমাণু সুরক্ষার ‘কুমিরছানা’ দেখিয়ে দ্রুত তাদের সঙ্গে সামরিক চুক্তি সেরে ফেলতে মরিয়া হয়ে উঠেছে ইসলামাবাদ।
গত বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর সৌদি আরবের সঙ্গে ‘কৌশলগত পারস্পরিক’ সামরিক চুক্তি করেন পাক প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ় শরিফ। সংশ্লিষ্ট সমঝোতাটির পরই রিয়াধকে ‘পরমাণু সুরক্ষা’র আশ্বাস দিতে শোনা গিয়েছিল ইসলামাবাদের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খোয়াজা আসিফের গলায়।
এর পর ভারতের ‘বন্ধু’ রাষ্ট্র বলে পরিচিত সৌদি আরবের থেকে নেওয়া ২০০ কোটি ডলার ঋণের ফাঁদ থেকে বেরোনোর জন্য তদ্বির শুরু করে পাকিস্তান। সংবাদসংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ২০০ কোটি ডলারের সৌদি ঋণকে নিরাপত্তা চুক্তিতে রূপান্তরিত করার জন্য ইতিমধ্যেই আলোচনা শুরু করেছে দুই দেশ। এর মধ্যেই ‘ইসলামীয় নেটো’র পালে হাওয়া লাগিয়ে পাকিস্তান এবং সৌদির হাত শক্ত করতে এ বার এগিয়ে এল আরও একটি ইসলামীয় দেশ!
সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নেটোর যৌথ প্রতিরক্ষা কাঠামোর অনুরূপ সৌদি আরব-পাকিস্তান নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ হতে আলোচনা চালাচ্ছে তুরস্ক। প্রস্তাবিত চুক্তিটি নেটোর ৫ নম্বর অনুচ্ছেদের উপর ভিত্তি করে তৈরি।
সেই অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, জোটের সদস্য দেশের বিরুদ্ধে অন্য কোনও দেশের ‘যে কোনও আগ্রাসন’ সকল সদস্য দেশের উপর সম্মিলিত আক্রমণ হিসাবে বিবেচিত হবে। মূলত রিয়াধ এবং ইসলামাবাদের মধ্যে হওয়া সেই চুক্তিতে এখন ঢুকে পড়ার চেষ্টা করছে আঙ্কারাও। তেমনটাই উঠে এসেছে রিপোর্টে।
আঙ্কারাভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ‘টিইপিএভি’-এর কুশলী নিহাত আলি ওজ়কান জানিয়েছেন, যদি তিন দেশের মধ্যে চুক্তি হয়, অর্থাৎ, পাকিস্তান এবং সৌদির চুক্তিতে তুরস্ক ঢুকে পড়তে পারে, তা হলে তিন দেশেরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকবে। চুক্তি ফলপ্রসূ করতে টাকা ঢালবে সৌদি আরব। পাকিস্তান সাহায্য করবে তার পরমাণু শক্তি, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও জনবল দিয়ে এবং তুরস্ক সামরিক দক্ষতা এবং প্রতিরক্ষা শিল্প দিয়ে সাহায্য করবে, তেমনটাই জানিয়েছেন ওজ়কান।
ওজ়কানের কথায়, ‘‘আমেরিকা যখন এই অঞ্চলে তার নিজস্ব এবং ইজ়রায়েলের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, তখন পরিবর্তিত পরিস্থিতি এবং আঞ্চলিক সংঘাতের ফলাফল সমস্ত দেশকেই ‘বন্ধু’ এবং ‘শত্রু’ শনাক্ত করার জন্য নতুন পন্থা অবলম্বন করতে বাধ্য করছে।’’
বিষয়টি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল মহলের একাংশের দাবি, দক্ষিণ এশিয়া, পশ্চিম এশিয়া এবং আফ্রিকার কিছু অংশ জুড়ে তুরস্কের কৌশলগত স্বার্থই তাদের ক্রমশ সৌদি আরব এবং পাকিস্তানের সঙ্গে একত্রিত হওয়ার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। দু’দেশের সঙ্গে নিরাপত্তা চুক্তি আঙ্কারার একটি যৌক্তিক পদক্ষেপ বলেও মত বিশেষজ্ঞদের।
সূত্রের খবর, পাকিস্তান, সৌদি আরব এবং তুরস্ক ইতিমধ্যেই তাদের চুক্তি নিয়ে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় শুরু করেছে। তুরস্কের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মতে, চলতি সপ্তাহেই আঙ্কারায় তাদের প্রথম নৌসভা করতে চলেছে তিন দেশ।
তবে তুরস্কের ‘ইসলামীয় নেটো’তে যোগ দেওয়ার বিষয়টি অতিরিক্ত গুরুত্ব বহন করে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের একাংশ। কারণ, তুরস্ক কোনও সাধারণ ‘আঞ্চলিক খেলোয়াড়’ নয়। মার্কিন নেতৃত্বাধীন নেটো জোটের সদস্য এই দেশ। এ ছাড়া আমেরিকার পরে নেটোর মধ্যে দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক বাহিনী রয়েছে তুরস্কের কাছেই।
পাশাপাশি, সৌদি আরব এবং তুরস্ক— উভয়ের সঙ্গেই শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ ইরানের সম্পর্ক ভাল নয়। দু’দেশই ইরানকে নিয়ে স্থায়ী উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। যদিও উভয়েই সামরিক সংঘাতের পরিবর্তে তেহরানের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে মিটমাটের পক্ষে। একই সঙ্গে স্থিতিশীল, সুন্নি-নেতৃত্বাধীন সিরিয়াকে সমর্থন এবং প্যালেস্টাইন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষেও একমত আঙ্কারা এবং রিয়াধ।
অন্য দিকে, পাকিস্তানের সঙ্গে তুরস্কের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক সর্বজনবিদিত। পাকিস্তানের নৌবাহিনীর জন্য কর্ভেট শ্রেণির যুদ্ধজাহাজ নির্মাণে হাত লাগিয়েছে আঙ্কারা। ইসলামাবাদের কয়েক ডজন এফ-১৬ যুদ্ধবিমান আধুনিকীকরণের কাজও করেছে।
পাশাপাশি, রিয়াধ এবং ইসলামাবাদ— উভয়ের সঙ্গেই তাদের অত্যাধুনিক ড্রোন প্রযুক্তি ভাগ করে নেওয়ার পক্ষে আঙ্কারা। তুরস্ক তাদের পঞ্চম প্রজন্মের কান যুদ্ধবিমান কর্মসূচিতেও অংশগ্রহণের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছে দুই দেশকে। সেই আবহে তিন দেশের জোট বাঁধা খুব একটা অস্বাভাবিক বলে মনে করছেন না বিশেষজ্ঞেরা।
বিশেষজ্ঞেরা এ-ও মনে করছেন, পহেলগাঁও হত্যাকাণ্ড এবং প্রতিক্রিয়াস্বরূপ ভারতের ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর পর ২০২৫ সালের মে মাসে ভারত এবং পাকিস্তানের মধ্যে যে সংক্ষিপ্ত সামরিক সংঘাত হয়েছিল, তার পরেই অন্য দেশের সঙ্গে জোট বাঁধতে আরও তৎপর হয়েছিল ইসলামাবাদ।
সে সময় পাকিস্তানকে সরাসরি সমর্থন করে তাদের হয়ে সরব হতে দেখা গিয়েছিল তুরস্ককে। আর তার কয়েক মাসের মধ্যেই পাকিস্তান, সৌদি আরব এবং তুরস্কের ত্রিপক্ষীয় জোট নেহাতই কাকতালীয় বলে মনে করছেন না বিশেষজ্ঞেরা। পুরো বিষয়টির দিকে নজর রেখেছে নয়াদিল্লি।
যদিও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের অনেকের দাবি, ‘ইসলামীয় নেটো’র জিগির তুললেও তা তৈরি করা পাকিস্তানের পক্ষে কষ্টসাধ্য। বর্তমানে বিশ্বের ৫৭টি মুসলিম রাষ্ট্রের সংগঠন ‘অর্গানাইজ়েশন অফ ইসলামিক কান্ট্রিজ়’ বা ওআইসিকে পুরোপুরি ‘ইসলামীয় নেটো’য় বদলে ফেলার ছক কষছে পাক ফৌজ ও সরকার। কিন্তু, সমস্যার জায়গা হল এর মধ্যে একাধিক দেশেই চলছে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। দুনিয়ার মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বা জিডিপির (গ্রস ডোমেস্টিক প্রোকাক্ট) মাত্র আট শতাংশ অবদান রয়েছে ওআইসির। তা ছাড়া পরমাণু শক্তিধর হওয়া সত্ত্বেও দারিদ্র্য এঁটুলি পোকার মতো গায়ে লেগে আছে ইসলামাবাদের।
দুর্ভিক্ষের কবলে থাকা ওআইসির ৩৪টি রাষ্ট্রের মধ্যে ২৪টির আবার মাথাপিছু গড় আয় মাত্র ২,৫০০ ডলার। সারা বিশ্বে সাধারণ ভাবে এটি ১৩ হাজার ডলার। অর্থাৎ, দুনিয়ার নিরিখে পাঁচ ভাগের এক ভাগ রোজগার করছেন সেখানকার বাসিন্দারা। ফলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলির পক্ষে প্রতিরক্ষা খাতে বিপুল খরচ করা একেবারেই সম্ভব নয়।
পাকিস্তানের ‘ইসলামীয় নেটো’ তৈরির রাস্তায় দ্বিতীয় কাঁটা হল শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্ব। বর্তমানে সারা বিশ্বের মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশই সুন্নিপন্থী। বাকি ১০ শতাংশ শিয়া মতাদর্শ মেনে চলেন। সুন্নি মতবাদকে সামনে রেখে ওআইসি-সহ সমগ্র ইসলামীয় দুনিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করার স্বপ্ন রয়েছে সৌদি আরবের। পাকিস্তান সেই পথেরই পথিক। কিন্তু, পারস্য উপসাগরের কোলের শিয়া মুলুক ইরান সেটা কতটা মেনে নেবে, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। সামরিক জোট গঠন তো দূরস্থান, উল্টে নিজেদের সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না কেউই।
ইসলামীয় দেশগুলির আর একটি বড় সমস্যা হল সন্ত্রাসবাদ। পাকিস্তান, ইরান, সিরিয়া, আফগানিস্তান, ইরাক বা তুরস্ক— কেউই এর বাইরে নেই। জঙ্গি সংগঠনগুলির জাল ছড়িয়ে রয়েছে আফ্রিকার মুসলিম রাষ্ট্রগুলিতেও। কোথাও স্থানীয় সরকার, কোথাও আবার প্রত্যক্ষ বিদেশি মদতে ক্রমাগত শক্তি বাড়াচ্ছে তারা। ফলে অধিকাংশ জায়গাতেই রয়েছে গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতি। পাশাপাশি, ধর্মীয় কট্টরপন্থা এবং মৌলবাদ সেখানে দিন দিন চরম আকার ধারণ করছে।
বিজ্ঞান-প্রযুক্তির উন্নতির নিরিখে মারাত্মক ভাবে পিছিয়ে রয়েছে ওআইসি-ভুক্ত যাবতীয় রাষ্ট্র। ওআইসি-ভুক্ত অধিকাংশ মুসলিম দেশ ধর্মীয় শিক্ষায় বিশ্বাসী। ফলে বিজ্ঞান-প্রযুক্তির উন্নতি সেখানে বিশেষ ভাবে ঘটছে না।
সাবেক সেনাকর্তাদের দাবি, আধুনিক যুদ্ধ অনেকাংশই কৃত্রিম মেধা, মহাকাশে থাকা উপগ্রহের উপর নির্ভরশীল। এগুলি ইসলামীয় দেশগুলির হাতে নেই বললেই চলে। শুধু তা-ই নয়, অত্যাধুনিক হাতিয়ারের ব্যাপারেও তারা পুরোপুরি যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমি দেশগুলির উপর নির্ভরশীল।
পাকিস্তানের ‘ইসলামীয় নেটো’র স্বপ্নের কফিনে পেরেক পুঁততে পারে রাজনৈতিক অস্থিরতাও। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর গত ৭৭ বছরে চার বার সেনা অভ্যুত্থান দেখেছে ইসলামাবাদ। একই অবস্থা ইরাক, সিরিয়া, ইয়েমেন বা মিশরের মতো দেশগুলিরও। দুর্নীতির নিরিখে বিশ্বের প্রথম ২০টি স্থানেই রয়েছে কোনও না কোনও মুসলিম দেশ। সন্ত্রাসবাদের ক্ষেত্রে প্রথম ১০টির মধ্যে ন’টি রাষ্ট্রই ইসলাম ধর্মাবলম্বী।
আর তাই পাক সরকার ও ফৌজের ‘ইসলামীয় নেটো’ তৈরির আকাঙ্ক্ষা অঙ্কুরেই নষ্ট হতে পারে বলে মনে করেন দুঁদে কূটনীতিকদের অনেকে। তাঁদের কথায়, পেটে খিদে নিয়ে সামরিক জোট তৈরি করলেও বাস্তবে তা কতটা সফল হবে তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।
যদিও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, ওআইসি-ভুক্ত ৫৭টি দেশের মধ্যে মাত্র আটটি দেশের আর্থিক অবস্থা ভাল। সেই তালিকায় রয়েছে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, কাতার, বাহরাইন, কুয়েত এবং জর্ডনের নাম। অপরিশোধিত খনিজ তেল রফতানির উপরে চলছে এদের অর্থনীতি। ফলে দেশগুলির বদান্যতায় ভবিষ্যতে ‘ইসলামীয় নেটো’ তৈরির স্বপ্ন সফল হলেও হতে পারে বলেও মনে করছেন অনেকে।