Gandiva AI for Crime Control

জঙ্গিদমনে গোয়েন্দাদের হাতে ‘গাণ্ডীব’! কৃত্রিম মেধা দিয়ে তৈরি অর্জুনের ধনুকের ছিলায় কেন সিঁদুরে মেঘ দেখছেন বিরোধীরা?

সন্ত্রাস দমনে এ বার এনআইএ বা এটিএসের মতো দলগুলির হাতে ‘গাণ্ডীব’ তুলে দিয়েছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। কী ভাবে কাজ করে এই কৃত্রিম মেধা প্রযুক্তি?

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ০২ জানুয়ারি ২০২৬ ১১:২৩
Share:
০১ ২০

সন্ত্রাসী হামলা থেকে শুরু করে আর্থিক তছরুপ কিংবা ভিন্‌রাজ্যে গিয়ে ডাকাতি-খুন। এর পাশাপাশি আছে ধর্ষণ, মাদক ও অস্ত্র পাচার। দেশ জুড়ে বেড়ে চলা যাবতীয় অপরাধের সূচককে নিম্নমুখী করতে এ বার কৃত্রিম মেধা বা এআইয়ের (আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স) সাহায্য নিচ্ছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। ইতিমধ্যেই পুলিশ ও তদন্তকারী সংস্থাগুলির হাতে ‘গাণ্ডীব’ তুলে দিয়েছেন তিনি। এর জেরে নাগরিকদের উপর সরকারের কড়া নজরদারি শুরু হবে বলে সুর চড়িয়েছে একাধিক বিরোধী দল।

০২ ২০

কী এই ‘গাণ্ডীব’? গত বছরের ৯ ডিসেম্বর সংসদের নিম্নকক্ষ লোকসভায় ‘অর্জুনের ধনুক’ সংক্রান্ত যাবতীয় প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, জঙ্গিহামলার মতো ঘটনা আটকাতে জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা (ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি বা এনআইএ) এবং রাজ্য পুলিশের সন্ত্রাসবিরোধী স্কোয়াডের (অ্যান্টি টেররিস্ট স্কোয়াড বা এটিএস) মধ্যে আরও বেশি সমন্বয় ও তথ্যের আদানপ্রদান প্রয়োজন। সেই কাজটাই করবে কৃত্রিম মেধা প্রযুক্তিতে তৈরি ‘গাণ্ডীব’।

Advertisement
০৩ ২০

শাহের মন্ত্রক জানিয়েছে, এনআইএ এবং এটিএসের মতো সন্ত্রাসবিরোধী তদন্তকারী এবং পুলিশি দলগুলির মধ্যে নিরাপদে তথ্য ভাগাভাগির কাজটি সহজতর করতে ‘ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স গ্রিড’ বা ন্যাটগ্রিড নামের একটি তথ্যপ্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা হয়েছে। এর মাধ্যমে একগুচ্ছ সরকারি এবং বেসরকারি সংস্থার রিয়্যাল টাইম তথ্য যখন-তখন হাতে পেতে পারবে পুলিশ ও কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা। ‘গাণ্ডীব’ নামের এআই টুলটি এর সঙ্গেই কাজ করবে বলে জানা গিয়েছে।

০৪ ২০

সম্প্রতি এই ন্যাটগ্রিডকে ‘ন্যাশনাল পপুলেশন রেজিস্ট্রার’ বা এনপিআরের সঙ্গে সংযুক্ত করেছে কেন্দ্র। এতে দেশের ১১৯ কোটি বাসিন্দার পরিবারভিত্তিক তথ্য রয়েছে। একে জাতীয় নাগরিকপঞ্জি বা এনআরসি (ন্যাশনাল রেজিস্ট্রার অফ সিটিজ়েন) তৈরির প্রথম ধাপ হিসাবে গণ্য করা হচ্ছে। ফলে ন্যাটগ্রিডকে ব্যবহার করে অধিকাংশ ভারতবাসীর হাঁড়ির খবর যে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা ও এটিএসের মতো সংস্থার অফিসারেরা হাতে পেয়ে যাবেন, তা বলাই বাহুল্য।

০৫ ২০

কেন্দ্রের এই পদক্ষেপের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ আধিকারিক থেকে শুরু করে দুঁদে গোয়েন্দাকর্তাদের একাংশ। তাঁদের দাবি, ২৬/১১-র মুম্বই হামলা বা তার পরবর্তী সময়ের নাশকতার প্রতিটা ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে, সীমান্তের ওপার থেকে এসেছে জঙ্গিরা। এ দেশে নৃশংস হত্যাকাণ্ড চালিয়ে দিব্যি বিদেশে পালিয়েও গিয়েছে তাঁদের কয়েক জন। এই ব্যর্থতার মূল কারণ হল তথ্যের অভাব।

০৬ ২০

তদন্তকারীদের দাবি, বছরের পর বছর ধরে পাকিস্তান মদতপুষ্ট জঙ্গিরা এ দেশের কিছু ‘বিশ্বাসঘাতক’ নাগরিকের সাহায্য পেয়ে এসেছে। সরকারের কাছে তাঁদের ব্যাপারে যে কোনও তথ্য নেই, এমনটা নয়। কিন্তু সেটা এতটাই ছড়ানো-ছেটানো যে, প্রয়োজনের সময় দ্রুত একসঙ্গে সেগুলি পেতে সমস্যা হচ্ছিল। আর সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নাশকতার সঙ্গে সঙ্গেই দেশ ছেড়ে চম্পট দিচ্ছিল অভিযুক্তেরা। ন্যাটগ্রিড ও গাণ্ডীবের সাহায্যে তা বন্ধ করা যাবে বলে মনে করা হচ্ছে।

০৭ ২০

কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক জানিয়েছে, একসঙ্গে ২১ উৎসের তথ্য একত্রিত করে নিমেষে তদন্তকারীর প্রশ্নের জবাব দিতে পারে কৃত্রিম মেধা প্রযুক্তির ‘গাণ্ডীব’। একটি উদাহরণের সাহায্যে এর কর্মপদ্ধতি বুঝে নেওয়া যেতে পারে। ধরা যাক, কোনও সন্দেহভাজন জঙ্গির স্কেচ তৈরি করল জন্মু-কাশ্মীর পুলিশের এটিএস। এর পর তা ‘গাণ্ডীব’ প্ল্যাটফর্মে তুলে দিলেই ওই ছবির মতো দেখতে কোনও লোক এ দেশে আছেন কি না, তা বলে দেবে সংশ্লিষ্ট এআই টুল।

০৮ ২০

শুধু তা-ই নয়, এ ব্যাপারে তদন্তকারীদের আরও কিছু সাহায্য করবে ‘গাণ্ডীব’। সন্দেহভাজন ব্যক্তির ছবির সঙ্গে ড্রাইভিং লাইসেন্স, পাসপোর্ট, ব্যাঙ্ক বা টেলি পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থায় জমা করা ‘নো ইয়োর কাস্টমার’ বা কেওয়াইসি ফর্মে সাঁটা ছবির সঙ্গে কোনও মিল আছে কি না তা-ও দ্রুত বলে দেবে ওই কৃত্রিম মেধা প্রযুক্তি। ফলে দ্রুত অভিযুক্তকে চিহ্নিত করে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে নামতে পারবেন এটিএস এবং এনআইএ-র আধিকারিকেরা।

০৯ ২০

এ-হেন ‘গাণ্ডীব’কে ন্যাটগ্রিডের মতো প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে যুক্ত করেছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক। ন্যাটগ্রিড আবার যুক্ত আছে এনপিআরের সঙ্গে। ফলে সংশ্লিষ্ট কৃত্রিম মেধাভিত্তিক প্রযুক্তিটি ব্যবহার করে ১১৯ কোটি বাসিন্দার মধ্যে থেকে অপরাধীকে চিহ্নিত করতে পারবেন তদন্তকারীরা। সাবেক পুলিশকর্তারা অবশ্য মনে করেন, জঙ্গি নাশকতা এবং অন্যান্য অপরাধের সূচককে টেনে নামাতে আরও বেশি তথ্য এই ধরনের সরকারি প্ল্যাটফর্মগুলিতে থাকা উচিত।

১০ ২০

শাহের মন্ত্রকের এই ধরনের পদক্ষেপ নিয়ে ইতিমধ্যেই প্রশ্ন তুলেছেন বিরোধীরা। তাঁদের অভিযোগ, ন্যাটগ্রিড ও ‘গাণ্ডীব’-এর মতো এআই প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে নাগরিকদের উপর নজরদারি চালানোর সুযোগ পেয়ে যাবে সরকার। কোনও ব্যক্তি দূরপাল্লার কোনও রেল বা বিমান সফর করছেন কি না, কখন কোথায় থাকছেন, আয়ের উৎস থেকে ব্যাঙ্কে জমানো টাকার পরিমাণ, ইচ্ছামতো সবই দেখতে পারবেন তদন্তকারীরা।

১১ ২০

২০২৩ সালে আইএমইআই ট্যাম্পারিং, ফোন চুরি এবং মোবাইল সংক্রান্ত জালিয়াতি রোধ করার জন্য ভোক্তা-সুরক্ষা ব্যবস্থা হিসাবে ‘সঞ্চার সাথী’ নামের একটি অ্যাপ চালু করে কেন্দ্র। গত বছরের নভেম্বরে সংশ্লিষ্ট অ্যাপটিকে সমস্ত মোবাইল ফোনে বাধ্যতামূলক ভাবে প্রি-ইনস্টল করার বিজ্ঞপ্তি জারি করে সরকার। সঙ্গে সঙ্গে এই নিয়ে তীব্র বিরোধিতা শুরু করেন বিরোধীরা। ফলে কিছুটা বাধ্য হয়ে পিছু হটে প্রশাসন। জটিলতা কাটাতে ডিসেম্বরে নতুন করে বিবৃতি দেয় কেন্দ্র।

১২ ২০

কী এই ‘সঞ্চার সাথী’? সরকারের দাবি, সংশ্লিষ্ট অ্যাপটি ব্যবহার করে গ্রাহক তাঁদের ফোন আসল কি না তা যাচাই করতে, ফোন হারানোর পর অভিযোগ জানাতে, ফোনের আইএমইআই নম্বর ব্লক করতে এবং অননুমোদিত সিম শনাক্ত করতে পারবেন। যে স্মার্টফোনগুলি ইতিমধ্যে বাজারে এসে গিয়েছে, সেগুলিতেও সফ্‌টঅয়্যার আপডেটের মাধ্যমে ওই সরকারি অ্যাপটি প্রবেশ করিয়ে দেওয়ার (ইনস্টল করার) কথা বলেছিল কেন্দ্র।

১৩ ২০

নভেম্বরে সংশ্লিষ্ট অ্যাপটিকে নিয়ে বিবৃতি দেয় কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকার। সেখানে বলা হয়, ‘‘নাগরিকদের নকল হ্যান্ডসেট কেনা থেকে রক্ষা করার জন্য, সহজে টেলিযোগাযোগ সংক্রান্ত অপব্যবহারের অভিযোগ জানাতে এবং ‘সঞ্চার সাথী’ উদ্যোগের কার্যকারিতা বৃদ্ধির জন্য টেলিকম দফতরের তরফে এই নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে।’’

১৪ ২০

এর পরই ‘সঞ্চার সাথী’ অ্যাপ বাধ্যতামূলক ভাবে স্মার্টফোনে প্রি-ইনস্টল করার নির্দেশ দেয় কেন্দ্র। মোদী সরকারের ওই নির্দেশের পরেই হইচই পড়ে। শুরু হয় বিতর্ক। বিষয়টি নিয়ে বিরোধীরা প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন। ওই অ্যাপের মাধ্যমে নাগরিকদের ‘ব্যক্তিগত পরিসরে’ নজরদারি চালানো হবে বলেও অভিযোগ তোলেন তাঁরা।

১৫ ২০

গত ডিসেম্বরে কংগ্রেস সাংসদ প্রিয়ঙ্কা গান্ধী ইজ়রায়েলি ‘স্পাইঅয়্যার’ পেগাসাসের সঙ্গে তুলনা টেনে ‘সঞ্চার সাথী’কে ‘স্নুপিং অ্যাপ’ বলে চিহ্নিত করেন। তাঁর অভিযোগ, এই অ্যাপের মাধ্যমে ফোন ব্যবহার করা গ্রাহকের গোপনীয়তার সুরক্ষা লঙ্ঘিত হবে।

১৬ ২০

আইফোন প্রস্তুতকারী সংস্থা অ্যাপ্‌ল এই নির্দেশের গোপনীয়তা এবং সুরক্ষার প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। মার্কিন টেক জায়ান্টটি কেন্দ্রের ওই নির্দেশ মানতে রাজি নয় বলে জানিয়েছিল সংবাদসংস্থা রয়টার্স। এ ব্যাপারে সমাধানসূত্র পেতে কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে অ্যাপ্‌ল ও স্যামসাঙের বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। তার আগেই সংশ্লিষ্ট নির্দেশিকা প্রত্যাহার করে মোদী সরকার।

১৭ ২০

বিতর্কের আবহে কেন্দ্রীয় যোগাযোগ মন্ত্রী জ্যোতিরাদিত্য শিন্ডে জানান, ফোন ব্যবহারকারী গ্রাহকেরা যদি ওই অ্যাপ ব্যবহার না করতে চান, তা হলে তাঁরা তা মুছে ফেলতে (ডিলিট করতে) পারবেন। তিনি বলেন, ‘‘এটি অ্যাক্টিভেট করবেন না। যদি আপনার ফোনে এটা রাখতে চান, রাখুন। যদি এটা মুছে দিতে চান, তা-ই করুন।’’ ‘সঞ্চার সাথী’ অ্যাপ নিয়ে বিরোধীদের তোলা নজরদারির অভিযোগ খারিজ করে জ্যোতিরাদিত্য জানান, এটি পুরোপুরি গ্রাহক সুরক্ষার বিষয়। বাধ্যতামূলক কিছু নয়।

১৮ ২০

গত ৩ ডিসেম্বর ‘সঞ্চার সাথী’ অ্যাপ বাধ্যতামূলক ভাবে স্মার্টফোনে প্রি-ইনস্টল করার পূর্ববর্তী নির্দেশ প্রত্যাহার করার কথা ঘোষণা করে কেন্দ্রীয় সরকার। বাজারে চালু থাকা স্মার্টফোনের গ্রাহকদের ‘সঞ্চার সাথী’ অ্যাপ ডাউনলোড করার ‘পরামর্শ’ দিয়ে সরকারি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘‘ব্যবহারকারীদের সুরক্ষা দেওয়া ছাড়া অ্যাপটির অন্য কোনও কাজ নেই। সরকার স্পষ্ট ভাবে জানাচ্ছে, তাঁরা (গ্রাহকেরা) যখন খুশি অ্যাপটি সরিয়ে ফেলতে পারেন।’’

১৯ ২০

এখনও পর্যন্ত ১ কোটি ৪০ লক্ষ ব্যবহারকারী এই অ্যাপটি ডাউনলোড করেছেন এবং প্রতি দিন ২০০০টি জালিয়াতির ঘটনার তথ্য প্রদান করছে বলেও ওই বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে। এটি ৩ কোটিরও বেশি জাল বা প্রতারণামূলক মোবাইল সংযোগ শনাক্ত এবং বন্ধ করতে সাহায্য করেছে বলেও দাবি কেন্দ্রের।

২০ ২০

‘সঞ্চার সাথী’-এর ব্যাপারে শেষ পর্যন্ত মোদী সরকারের পিছিয়ে আসার ব্যাপারটিকে একেবারেই ভাল চোখে দেখেননি সাবেক পুলিশকর্তাদের একাংশ। তাঁদের দাবি, এটি বাধ্যতামূলক হলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ অনেক সহজ হত। ন্যাটগ্রিড ও ‘গাণ্ডীব’-এর ক্ষেত্রেও একই ধরনের অভিযোগ তুলেছেন বিরোধীরা। এ ক্ষেত্রে কড়া মনোভাব দেখাক কেন্দ্র, চাইছেন অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ আধিকারিকেরা।

সব ছবি: সংগৃহীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement