সবুজে ঘেরা পাহাড়ে মেঘ কেটে কেটে যাচ্ছে। পাহাড়ময় দৌড়ে বেড়িয়ে গানের দৃশ্যে অভিনয় করছেন বলি অভিনেতা দেব আনন্দ। ষাটের দশকে মহম্মদ রফির কণ্ঠে সেই গান নির্মাণের নেপথ্যকাহিনি ছিল আকষর্ণীয়। দেশলাইয়ের বাক্স থেকে শুরু হয়েছিল গানটির সৃষ্টিকথা।
১৯৬০ সালে প্রেক্ষাগৃহে দেব আনন্দের প্রযোজনায় মুক্তি পায় ‘কালা বাজার’। ছবিটির পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন দেব আনন্দের ভাই বিজয় আনন্দ। সেই ছবিতে সঙ্গীতনির্মাণের দায়িত্ব পালন করেছিলেন বাঙালি সঙ্গীতশিল্পী শচীন দেব বর্মন।
কানাঘুষো শোনা যায়, ছবির জন্য শচীন এমন একটি গান তৈরি করতে চেয়েছিলেন যা তরুণ প্রজন্মের মনে জায়গা করে নিতে পারে। গানটি যেন অত্যন্ত সাবলীল এবং স্বতঃস্ফূর্ত শোনায় এই দাবি করেছিলেন সঙ্গীতনির্মাতা শৈলেন্দ্রের কাছে।
গানের বাণী রচনার দায়িত্ব ছিল শৈলেন্দ্রের উপর। কিন্তু তাঁর মাথায় একটি শব্দও আসছিল না। অন্য দিকে, সময়ও পার হয়ে যাচ্ছিল। শচীন বাধ্য হয়ে সময়ের চাকায় বেঁধে দিয়েছিলেন শৈলেন্দ্রকে। তাঁর পুত্র রাহুল দেব বর্মনকে গান নিয়ে তাড়া দিতে শৈলেন্দ্রের বাড়িতে পাঠিয়েছিলেন শচীন। বাবার আদেশ অমান্য করতে পারেননি রাহুল।
বন্ধ ঘরে খোলামেলা চিন্তা করতে পারছেন না ভেবে শৈলেন্দ্রকে নিয়ে মুম্বইয়ের জুহুর সমুদ্রসৈকতে ঘুরতে গিয়েছিলেন রাহুল। ঘড়িতে তখন রাত ১১টা। সমুদ্রসৈকতের ধারে চুপচাপ বসেছিলেন দু’জনে। কিন্তু শৈলেন্দ্র যে গান লিখতে পারছেন না সে বিষয়ে রাহুলকে জানান।
কিছু ক্ষণ সমুদ্রের ধারে বসে থাকার পর রাহুলকে গানের তাল দিতে বলেন শৈলেন্দ্র। দু’জনে বসে ধূমপান করছিলেন বলে রাহুলের হাতে দেশলাইয়ের একটি বাক্স ছিল। হাতে সেই বাক্স নিয়েই তাল দিতে শুরু করেন রাহুল।
ধূমপান করতে করতে রাতের আকাশের দিকে তাকান শৈলেন্দ্র। চাঁদ দেখে তখনই গানের কলিগুলি মাথায় সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়ছিল। কিন্তু তখন শৈলেন্দ্র এবং রাহুলের কাছে কাগজ নেই। অথচ সেই মুহূর্তে বাণী না লিখে রাখলে খুব মুশকিলে পড়বেন সকলে।
শেষমেশ উদ্ধার করল দেশলাইয়ের বাক্স। শোনা যায়, রাহুলের কাছ থেকে সেই বাক্সটি চেয়ে সেখানেই গানের কলিগুলি লিখতে শুরু করলেন শৈলেন্দ্র। রাহুলও ভাবলেন, খালি হাতে বাবার কাছে ফিরে গেলে না জানি কী হত! ‘নাই মামার চেয়ে কানা মামাই ভাল’ ভেবে দেশলাইয়ের বাক্স নিয়ে বাড়ি ফিরলেন রাহুল।
ছেলের হাত থেকে দেশলাইয়ের বাক্স নিয়ে শচীন দেখেন তাতে লেখা গানের প্রথম দু’কলি। গানটি হল ‘খোয়া খোয়া চাঁদ, খুলা আসমান’। শৈলেন্দ্রের হাতের জাদুর প্রশংসা না করে পারলেন না তিনি। সঙ্গে সঙ্গে গানে সুরও দিয়ে ফেললেন।
‘কালা বাজার’ ছবিতে ‘খোয়া খোয়া চাঁদ’ গানের দৃশ্যে দেখা গিয়েছিল দেব আনন্দ এবং ওয়াহিদা রহমানকে। তুলনামূলক ভাবে ওয়াহিদার চেয়ে দেব আনন্দের দৃশ্য অনেকটাই বেশি ছিল। তাঁর কণ্ঠে গানটি গেয়েছিলেন মহম্মদ রফি। গানটি জনপ্রিয় হলেও তা নিয়ে চিন্তা কম ছিল না শচীনের।
গুঞ্জন শোনা যায়, শচীন নাকি খুঁতখুঁতে স্বভাবের মানুষ ছিলেন। গানটি গাওয়ার সময় তিনি রফিকে চড়া সুরে গাইতে বারণ করেছিলেন। রফিকে এমন ভাবে তিনি গানটি গাইতে বলেছিলেন যেন দেব আনন্দের ব্যক্তিত্বের সঙ্গে রফির কণ্ঠও মিলেমিশে যায়। সঙ্গীতনির্মাতার এই অনুরোধ অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছিলেন গায়ক।
১৯৬০ সালে ‘কালা বাজার’ ছবিটি মুক্তি পায়। ‘খোয়া খোয়া চাঁদ’ গানটিও বিশেষ প্রশংসা লাভ করে। এমনকি, গানটির মুক্তির পর কয়েক দশক পেরিয়ে গেলেও আজও গানটি সঙ্গীতপ্রেমীদের মুখে মুখে ঘোরে।
পঞ্চাশ-ষাটের দশকে সাধারণত স্টুডিয়োর ভিতর সেট তৈরি করে গানের শুটিং হত। কিন্তু ‘খোয়া খোয়া চাঁদ’ গানের শুটিং হয়েছিল মহাবালেশ্বরের পাহাড়ি এলাকায়। এই গানে দেব আনন্দের হাঁটার বিশেষ অভিব্যক্তিও তাঁর ‘ট্রেডমার্ক স্টাইল’-এ পরিণত হয়েছিল।