US Army Nuclear Energy

পাওয়ার গ্রিডে হামলাতেও পরোয়া নেই, ট্রাকে চেপে ঘুরবে পরমাণু চুল্লি! সেনাকে ভ্রাম্যমাণ আণবিক বিদ্যুৎ উপহার দিলেন ট্রাম্প

ট্রাকের উপর ছোট পরমাণু চুল্লি বসানোর কাজ দ্রুত গতিতে শুরু করেছে মার্কিন ফৌজ। কেন ভ্রাম্যমাণ আণবিক বিদ্যুতের প্রয়োজন হচ্ছে তাদের?

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ২৫ জানুয়ারি ২০২৬ ১৪:২৪
Share:
০১ ২০

ট্রাকের উপর আস্ত একটা পরমাণু চুল্লি! তাতে ঠেসে ভরা হয়েছে তেজস্ক্রিয় ইউরেনিয়াম। এ ভাবেই মালবাহী গাড়িকে চলমান আণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বদলে ফেলছে মার্কিন ফৌজ। শুধু তা-ই নয়, পরমাণু চুল্লিওয়ালা ওই ট্রাকগুলিকে ন’টি সেনাঘাঁটিতে মোতায়েনের পরিকল্পনা রয়েছে আমেরিকার যুদ্ধ দফতরের (ডিপার্টমেন্ট অফ ওয়ার) সদর কার্যালয় পেন্টাগনের। আগামী দিনে যে কোনও সংঘাত পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীর জন্য ‘গেম চেঞ্জার’ হয়ে উঠবে এই পদক্ষেপ, বলছে ওয়াকিবহাল মহল।

০২ ২০

গত বছরের (পড়ুন ২০২৫ সাল) ১৪ অক্টোবর পেন্টাগনের নির্দেশে ‘জানুস’ নামের একটি প্রকল্প শুরু করে মার্কিন ফৌজ। এতে আকারে ছোট পরমাণু চুল্লি বা এসএমআর (স্মল মডিউলার রিঅ্যাক্টর) হাতে পাবে বাহিনী। সেগুলিকেই ট্রাক বা ট্রেলারের মতো বড় গাড়িতে বসাবে তারা। কিছু ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট চুল্লিগুলিকে সামরিক বাহনে স্থাপনেরও চেষ্টা চলছে। সংবাদসংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৮ সালের মধ্যে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের কাজ শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।

Advertisement
০৩ ২০

২০২৫ সালের মে মাসে ‘জানুস’ প্রকল্পের ব্যাপারে সবুজ সঙ্কেত দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর জন্য মোট চারটি এগ্‌জ়িকিউটিভ অর্ডারে সই করেন তিনি। তার পরেই আকারে ছোট পরমাণু চুল্লিগুলি (স্মল মডিউলার রিঅ্যাক্টর) বাহিনীকে সরবরাহের কাজে কোমর বেঁধে লেগে পড়ে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ দফতর (ডিপার্টমেন্ট অফ ওয়ার)। সেনাঘাঁটি, ফৌজি নেটওয়ার্ক, অত্যাধুনিক হাতিয়ার ও কমান্ড সেন্টারে নিরবচ্ছিন্ন ভাবে গ্রিডবিহীন বিদ্যুৎ সরবরাহ এর উদ্দেশ্য বলে জানা গিয়েছে।

০৪ ২০

কেন সেনাঘাঁটিতে চলমান আণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র মোতায়েন করতে চাইছে আমেরিকা? প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের দাবি, এর নেপথ্যে রয়েছে একাধিক কারণ। প্রথমত, গত প্রায় চার বছর ধরে চলা ইউক্রেন যুদ্ধে শত্রুর বিদ্যুতের গ্রিডগুলিতে ঘন ঘন সাইবার হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। ফলে লড়াই চলাকালীন মোক্ষম সময়ে অন্ধকারে ডুবে যেতে দেখা গিয়েছে রাজধানী কিভ-সহ পূর্ব ইউরোপের দেশটির একাধিক শহরকে। পাশাপাশি, বিপর্যস্ত হয়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থা। এর সুযোগ নিয়ে মাঝেমধ্যেই আক্রমণের তেজ বাড়িয়েছে মস্কো।

০৫ ২০

ইউক্রেনের লড়াইয়ে এই রুশ যুদ্ধকৌশল খুব ভাল করে পর্যালোচনা করেন মার্কিন সেনা কমান্ডারেরা। এর পরই ট্রাকে বসানো ছোট পরমাণু চুল্লি বা এসএমআরের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন তাঁরা। সেইমতো জ্বালানি বিভাগকে (ডিপার্টমেন্ট অফ এনার্জি) ছোট পরমাণু চুল্লি বা স্মল মডিউলার রিঅ্যাক্টর তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়। এ বছরের জুলাইয়ের মধ্যে এর তিনটি যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীকে সরবরাহ করবে তারা। বাকিগুলি ২০২৮ সালের মধ্যে ধাপে ধাপে হাতে পাবে ফৌজ।

০৬ ২০

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের দাবি, ট্রাক বা ট্রেলারের উপর পরমাণু চুল্লি বসিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করলে থাকবে না কোনও সাইবার হামলার ভয়। ফলে আপৎকালীন পরিস্থিতিতে কখনওই পুরোপুরি অন্ধকারে ডুবে যাবে না সেনাঘাঁটি। এর জেরে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বা এয়ার ডিফেন্স ও ইলেকট্রনিক যুদ্ধের (ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার) সরঞ্জামগুলি চালু রাখতে পারবে ফৌজ।

০৭ ২০

আমেরিকার জ্বালানি দফতর যে ছোট আকারের পরমাণু চুল্লি তৈরি করছে, তাতে ২০ থেকে ৭৫ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাবে। বর্তমানে গ্রিডবিহীন বিদ্যুতের জন্য জেনারেটর ব্যবহার করে মার্কিন ফৌজ। সেখান থেকে ৮০০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ পায় তারা। অর্থাৎ, স্মল মডিউলার রিঅ্যাক্টরের মাধ্যমে ২৫ গুণ বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারবে বাহিনী, যা নিরবচ্ছিন্ন ভাবে জ্বালানি সরবরাহ করে যাবে তাদের।

০৮ ২০

পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রে যে চুল্লি থাকে তার থেকে স্মল মডিউলার রিঅ্যাক্টর অন্তত হাজার গুণ ছোট হবে। সেগুলি তৈরি করতে ২০১৯ সালে প্রকল্প চালু করে মার্কিন জ্বালানি দফতর। এর মাধ্যমে প্রথমে দেড় মেগাওয়াটের চুল্লি তৈরির চেষ্টা হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট প্রকল্পটিতে গবেষণার কাজে জড়িত ছিল আইডাহো ন্যাশনাল ল্যাবরেটরি। তবে সেখানে তেমন সাফল্য মেলেনি। ফলে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ওই প্রকল্প বন্ধ করে দেয় আমেরিকার জ্বালানি দফতর।

০৯ ২০

সংবাদসংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, আগের ভুলগুলি থেকে শিক্ষা নিয়ে প্রকল্প ‘জানুস’কে সফল করতে ডিফেন্স ইনোভেশন ইউনিটের সাহায্য নিয়েছে আমেরিকার জ্বালানি দফতর। একে অ্যাডভান্সড নিউক্লিয়ার পাওয়ার ফর ইনস্টলেশনস প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। আগামী দিনে ট্রাকের উপর বসানো পরমাণু চুল্লিকে অন্য কাজেও ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে ওয়াশিংটনের।

১০ ২০

যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যমগুলির দাবি, ভ্রাম্যমাণ পরমাণু বিদ্যুৎ চুল্লির মালিকানা কিন্তু পাবে না মার্কিন ফৌজ। সব কাজ শেষ হয়ে গেলে এগুলি পরিচালনা করবে কোনও না কোনও বেসরকারি সংস্থা। আগামী দিনে সংশ্লিষ্ট স্মল মডিউলার রিঅ্যাক্টার কৃত্রিম মেধা বা এআই (আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স) প্রযুক্তির তথ্যভান্ডার বা ডেটা সেন্টারগুলিকে দেওয়া হবে। সেগুলি চালাতে যে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুতের প্রয়োজন তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

১১ ২০

রাশিয়াকে ছোট পরমাণু বিদ্যুৎ চুল্লি প্রযুক্তির জনক বলা যেতে পারে। ২০২০ সালে বিশ্বের প্রথম ভাসমান আণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি করে মস্কো। এর পোশাকি নাম আকাডেমিক লোমোনোসভ। এতে জলযানের উপর বসানো আছে দু’টি স্মল মডিউলার রিঅ্যাক্টর, যা ৩৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করে থাকে। পাঁচ থেকে ছ’বছর অন্তর সংশ্লিষ্ট চুল্লিগুলিতে ইউরেনিয়াম ভরার প্রয়োজন হবে বলে জানা গিয়েছে।

১২ ২০

এই ধরনের ছোট পরমাণু চুল্লি নির্মাণে সাফল্য পেয়েছে চিনও। বর্তমানে হাইনান প্রদেশে লিং লং নামের একটি স্মল মডিউলার রিঅ্যাক্টর রেখেছে বেজিং। এটি ১২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষম। তবে ড্রাগনের ছোট পরমাণু চুল্লি ভ্রাম্যমান নয়। এর মাধ্যমে পাঁচ লক্ষাধিক পরিবারকে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে থাকে মান্দারিনভাষী সরকার।

১৩ ২০

গত বছর পরমাণু শক্তিচালিত সীমাহীন পাল্লার টর্পেডোর সফল পরীক্ষা চালায় মস্কো। ২০২৫ সালের অক্টোবরে একটি সামরিক হাসপাতাল পরিদর্শনে গিয়ে এ ব্যাপারে বোমা ফাটান রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। তাঁর কথায়, ওই হাতিয়ারটির পোশাকি নাম ‘পোসাইডন’। এটিকে ড্রোন বলে উল্লেখ করেন তিনি। বলেন, ‘‘পরীক্ষায় ১০০ শতাংশ সাফল্য পেয়েছি আমরা। খুব দ্রুত সংশ্লিষ্ট অস্ত্রের বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হবে।’’

১৪ ২০

পুতিন জানিয়েছেন, পরীক্ষার সময় পোসাইডন ড্রোনটিকে একটি ডুবোজাহাজ থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছিল। পরমাণু শক্তিচালিত ডুবোজাহাজের ১০০ ভাগ ছোট আণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র দ্বারা চালিত এই স্বয়ংক্রিয় মনুষ্যবিহীন সাবমার্সিবল (ডুবো) যান। ফলে সীমাহীন দূরত্ব পাড়ি দিয়ে সংশ্লিষ্ট হাতিয়ারটি হামলা চালাতে পারবে বলে দাবি করেছেন তিনি।

১৫ ২০

আমেরিকা, রাশিয়া ও চিনের কায়দায় ছোট পরমাণু বিদ্যুৎ চুল্লি নির্মাণের চেষ্টা চালাচ্ছে ভারতও। ২০৩৩ সালের মধ্যে সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে এগুলি তৈরি করা যাবে বলে আশাবাদী নয়াদিল্লি। এর জন্য ইতিমধ্যেই ২০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকার। সংশ্লিষ্ট গবেষণায় ভাবা অ্যাটমিক রিসার্চ সেন্টার (বার্ক) বড় ভূমিকা নিতে চলেছে বলে জানা গিয়েছে।

১৬ ২০

এ-হেন পরিস্থিতিতে ভারতে ছোট পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরিতে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে ইচ্ছুক রাশিয়া। গত বছরের সেপ্টেম্বরে বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে মুখ খোলেন মস্কোর রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ‘রোসাটম’-এর দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক প্রকল্প পরিচালক আলেকজ়ান্ডার ভলগিন। তবে নয়াদিল্লি তাদের সঙ্গে কোনও চুক্তি করবে কি না, তা স্পষ্ট নয়।

১৭ ২০

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে একটি সাক্ষাৎকারে ভলগিন বলেন, ‘‘ভারতকে এসএমআরের প্রযুক্তি সরবরাহ করার ক্ষেত্রে আমাদের কোনও সমস্যা নেই। উৎপাদনক্ষেত্রে এটা বিপ্লব আনতে পারে। প্রচলিত পরমাণু কেন্দ্রগুলির চেয়ে অনেক কম জায়গায় এগুলি তৈরি করা যায়। আবার প্রয়োজনে এসএমআরকে এক জায়গা থেকে অন্যত্র নিয়ে যাওয়ারও সুবিধা রয়েছে।’’

১৮ ২০

রাশিয়ার ছোট পরমাণু চুল্লিগুলি ৫৫ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে। পাশাপাশি, ২০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত তাপ সরবরাহের ক্ষমতা রয়েছে এগুলির। স্মল মডুলার রিঅ্যাক্টর চালাতে তেজস্ক্রিয় পদার্থ ইউরেনিয়ামের ২০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধিকরণের প্রয়োজন পড়ে। প্রচলিত আণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলির তুলনায় তা অনেকটাই বেশি। তবে তেজস্ক্রিয় বিকিরণের মতো বিপদের আশঙ্কা এসএমআরে নেই বলে আশ্বস্ত করেছেন ভলগিন।

১৯ ২০

এসএমআরের দ্বিতীয় সুবিধা হল এটিকে ট্রেনে পরিবহণ করার সুবিধা রয়েছে। দেশের প্রত্যন্ত এলাকা, যেখানে শুধুমাত্র ডিজ়েল গাড়ি ব্যবহার হয়, সেখানেও একে অনায়াসেই নিয়ে যাওয়া যেতে পারে। ইয়াকুটিয়া এলাকার জন্য ইতিমধ্যেই একটি স্থলভিত্তিক এসএমআর নির্মাণ করেছে রাশিয়া। পাশাপাশি, এই ধরনের ছ’টি ছোট পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি করতে মস্কোর সঙ্গে চুক্তি সেরেছে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের সদস্য থাকা উজ়বেকিস্তান।

২০ ২০

ভলগিনের দাবি, ১৯৫০ সাল থেকে ছোট আকারের পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যবহার করে আসছে রাশিয়া। পরবর্তী কালে আরআইটিএম-২০০০ নামের একটি আণবিক চুল্লি তৈরি করে মস্কোর রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ‘রোসাটম’। এটি এসএমআরের সংজ্ঞাকেই পাল্টে দিয়েছিল বলে জানিয়েছেন তিনি। কেন্দ্র অবশ্য স্মল মডুলার রিঅ্যাক্টর নির্মাণের ক্ষেত্রে ‘আত্মনির্ভরতা’র রাস্তায় হাঁটতে আগ্রহী। অর্থাৎ এই প্রযুক্তির সবটাই দেশের মানুষকে বার্কের গবেষকেরা উপহার দিক, চাইছে মোদী সরকার।

সব ছবি: সংগৃহীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement