utopian city in the Amazon

আমাজ়নের গহীনে শহর তৈরিতে বাধা দেয় প্রকৃতি, প্রবাদপ্রতিম শিল্পপতির ব্যর্থতার গল্প শোনায় ‘ফোর্ডল্যান্ডিয়া’র দৈত্যাকার কঙ্কাল

আমাজ়নীয় বাসিন্দাদের এক সম্পূর্ণ নতুন জীবনযাত্রার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি নিয়ে এসেছিলেন আমেরিকার গাড়িশিল্পের ‘সম্রাট’ হেনরি ফোর্ড। হেনরি ফোর্ডের স্বপ্ন ছিল, পৃথিবীর এক কোণে নিজের একটি আলাদা সাম্রাজ্য গড়ে তুলবেন। আমাজ়নের গহীন জঙ্গলের ভিতরে শুধুমাত্র একটি কারখানা তৈরি হোক, তা তিনি চাননি।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ০৭ জানুয়ারি ২০২৬ ১৫:৫০
Share:
০১ ২১

কারখানার দৈত্যাকার কঙ্কাল আর সংস্থার মলিন হয়ে যাওয়া লোগো আঁকা ওয়াচ টাওয়ার যেন চিৎকার করে বলতে চাইছে ব্যর্থতার কথা। পৃথিবীর ইতিহাসে অন্যতম সফল শিল্পোদ্যোগীর জীবনের প্রথম ও শেষ ব্যর্থতার কথা। যাবতীয় নাগরিক স্বাচ্ছন্দ্য ও উপার্জনের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তথাকথিত পিছিয়ে পড়া এক দেশের নাগরিকদের ‘বোকামির’ আখ্যান।

০২ ২১

মার্কিন শিল্পপতি এমন একটি জনপদ তৈরি করতে চেয়েছিলেন, যা তাঁর শিল্পকে রসদ জোগাবে। ১৯২৮ সালে উত্তর ব্রাজ়িলের বাসিন্দারা এক আকর্ষণীয় সংবাদে পুলকিত হয়েছিলেন। সেই অঞ্চলের বাসিন্দারা এক নতুন অতিথিকে স্বাগত জানানোর জন্য তৈরিও হয়ে গিয়েছিলেন। এমন এক ব্যক্তি যিনি অসুস্থ ও ধুঁকতে থাকা লাটিন আমেরিকার দেশটির অর্থনীতিতে অক্সিজেনের জোগান দিতে চান স্বেচ্ছায়!

Advertisement
০৩ ২১

আমাজ়নীয় বাসিন্দাদের এক সম্পূর্ণ নতুন জীবনযাত্রার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার স্বপ্ন নিয়ে এসেছিলেন আমেরিকার গাড়িশিল্পের ‘সম্রাট’ হেনরি ফোর্ড। রাবার কারখানা ছাড়াও সূদূর ব্রাজ়িলে কলোনি তৈরির নেপথ্যে ছিল তাঁর নিজের একটি বহু দিনের স্বপ্ন। আদর্শ ও নীতির মিশেলে একটি আমেরিকান সমাজ প্রতিষ্ঠা করার স্বপ্ন।

০৪ ২১

১৯২০ সাল নাগাদ হেনরি ফোর্ডের গাড়ি নির্মাণকারী সংস্থা ফোর্ড মোটরের খ্যাতি ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়েছিল গোটা বিশ্বে। অটোমোবাইল শিল্পে বিপ্লবের সূচনা হয়েছিল হেনরির হাত ধরেই। ফোর্ডের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে হেনরির মাথায় চাপে এক অদ্ভুত পরিকল্পনা। ব্রাজ়িলের প্রতি হেনরির আগ্রহ ছিল একটি ব্যবসায়িক উদ্যোগের কারণে।

০৫ ২১

ফোর্ডল্যান্ডিয়া। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে গড়ে তোলা এক আধুনিক শহরের রূপরেখা। ফোর্ড তাঁর কর্মজীবন জুড়ে যে ধারণাগুলি অনুসরণ করেছিলেন, তার সঙ্গে আধুনিক উন্নত সভ্যতার সমস্ত উপকরণ মিলিয়ে তৈরি হওয়ার কথা ছিল সেই জনপদের। আর সেই শহরটি তাঁর নাম বহন করবে। এই জন্য ব্রাজ়িল সরকারের কাছ থেকে ২৫ লক্ষ একর জায়গা কিনে নেন ফোর্ড।

০৬ ২১

১৯০৩ সালে আমেরিকার মিশিগানের ডিয়ারবর্ন প্রতিষ্ঠার এক দশকের মধ্যেই ‘ফোর্ড মোটর কোম্পানি’ গাড়ি উৎপাদনে বিপ্লব এনেছিল। সেই সময়ে ফোর্ডের নাম স্টিভ জোবস বা মার্ক জ়ুকেরবার্গের মতোই প্রযুক্তিগত বিপ্লবের মুখ বলে সারা বিশ্বে পরিচিত হয়ে ওঠে। সংস্থা ও তার মালিক দু’জনকেই বিশ্বব্যাপী সাফল্য এনে দিয়েছিল ফোর্ডের প্রধান গাড়ি, ‘মডেল টি’।

০৭ ২১

গাড়িনির্মাণে প্রয়োজনীয় কাঠ, কাচ, লোহা থেকে শুরু করে প্রায় সব কাঁচামালই নিজেরা তৈরি করত ফোর্ড। তৈরি করত না টায়ারের রাবার। হেনরি ফোর্ড তখন নিজস্ব রাবার উৎপাদনের কেন্দ্র তৈরি করার সুযোগ খুঁজছিলেন। সেই সুযোগ মিলল ১৯২৮ সালে। ফোর্ড আদর্শ শহরের জন্য জায়গা খুঁজে পান আলবামার অনেকটা দক্ষিণে আমাজ়ন অববাহিকায়। প্রস্তাবিত শহরের জন্য ফোর্ড প্রথমে বেছেছিলেন আলবামাকে।

০৮ ২১

আমাজ়নে ঘাঁটি গাড়তে মিশিগানের অঙ্গপ্রদেশ ডেট্রয়েট থেকে যন্ত্রপাতি ও কর্মচারীদের আমাজ়নের জঙ্গলে পাঠানো হয়। ফোর্ডের মূল লক্ষ্য ছিল ব্রাজ়িলের উৎকৃষ্ট রাবার গাছ থেকে রাবার সংগ্রহ করে তা জাহাজে চাপিয়ে ফিরতি পথে ডেট্রয়েটে নিয়ে আসা। সেখানে কারখানায় গাড়ির চাকা ও অন্যান্য অংশ তৈরিতে সেই রাবার ব্যবহার করা, যাতে ইউরোপের বাজার থেকে রাবার কিনতে না হয়, অন্যান্য যন্ত্রাংশের মতো রাবারের জন্য ইউরোপের মুখাপেক্ষী হয়ে না থাকতে হয়।

০৯ ২১

হেনরি ফোর্ডের স্বপ্ন ছিল, পৃথিবীর এক কোণে নিজের একটি আলাদা সাম্রাজ্য গড়ে তুলবেন। আমাজ়নের গহীন জঙ্গলের ভিতরে শুধুমাত্র একটি কারখানা তৈরি হোক, তা তিনি চাননি। ব্রাজ়িলের স্থানীয় বাসিন্দাদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য নিয়েও বিশেষ পরিকল্পনা ছিল ফোর্ডের। কর্মীদের উপযুক্ত বেতন, বাসস্থান, খাবার ও বিনোদনের ব্যবস্থা, সমস্তই মজুত ছিল। সেখানে ছিল সংস্থার নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র, টেলিফোনের সুবিধা, হাসপাতাল, সুইমিং পুল, বিশাল এক নাচঘর ও গির্জা।

১০ ২১

উনিশ শতকের শুরুতে রাবার চাষ ও সারা পৃথিবী জুড়ে রফতানিতে একচেটিয়া আধিপত্য ছিল ব্রাজ়িলেরই। বিশ্বের সমস্ত রাবারই আমাজ়নের গভীর জঙ্গল থেকে সংগ্রহ করে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাজারজাত করা হত। রাবার শিল্পের বিকাশ ঘটার সঙ্গে সঙ্গে পর্যাপ্ত শ্রমিকের চাহিদাও বেড়ে যায়। প্রচুর স্থানীয় মানুষ এই কাজে যুক্ত হলেও উপযুক্ত পারিশ্রমিক পেতেন না। বহু দাসকেও রাবার চাষ ও রাবার সংগ্রহের কাজে নিযুক্ত করতেন রাবারের বাগানের মালিকেরা।

১১ ২১

উনিশ শতকের শেষের দিকে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রাজ়িলের একচেটিয়া আধিপত্য কমতে থাকে। ব্রিটিশ অনুসন্ধানকারী হেনরি উইকহাম ১৮৭৬ সালে আমাজ়নের জঙ্গল থেকে প্রায় ১০ হাজার রাবার বীজ লুকিয়ে ইংল্যান্ডে নিয়ে আসেন। ইংল্যান্ড থেকে উইকহামের রাবার বীজ মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কা, ইন্দোনেশিয়ার মতো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ইউরোপীয় কলোনিতে ছড়িয়ে পড়ে।

১২ ২১

দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দ্বীপরাষ্ট্রগুলির অনুকূল জলবায়ু রাবার চাষে ব্রাজ়িলকে টেক্কা দিতে শুরু করে। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে ব্রাজ়িল রাবার শিল্পে আধিপত্য হারিয়ে ফেলে। তার পর থেকে আমাজ়ন অববাহিকার দেশগুলির দুর্দশা শুরু হয়। অন্য দিকে ইউরোপীয় ব্যবসায়ীরা রাবার ব্যবসা কুক্ষিগত করে রাখার ফলে প্রমাদ গোনেন ফোর্ড সাহেব। তাঁর শঙ্কা হয়, ইউরোপীয়েরা যদি রাবারের দাম বাড়িয়ে দেয়, তা হলে তাঁর গাড়িনির্মাণ শিল্পের খরচ বেড়ে যাবে। গাড়ির দাম বাড়লে ক্রেতা মুখ ফিরিয়ে নিতে শুরু করবে।

১৩ ২১

ফলে তলে তলে তৎকালীন ব্রাজ়িল সরকারের সঙ্গে চুক্তি করতে শুরু করেন ফোর্ড। মার্কিন শিল্পপতির এ-হেন প্রস্তাবে হাতে চাঁদ পায় গরিব দেশটি। দু’পক্ষের সমঝোতাতেই ব্রাজ়িল সরকারের কাছ থেকে আমাজ়নে নতুন শহরের গোড়াপত্তন করেন হেনরি ফোর্ড। ১৯২৮ সালে ফোর্ড কোম্পানির জাহাজ গিয়ে ভেড়ে তাপাজস নদীর ঘাটে। ফোর্ডল্যান্ডিয়া গড়ে তোলার জন্য জঙ্গল সাফাইয়ের কাজ শুরু হয়।

১৪ ২১

শুরু থেকে সমস্যাসঙ্কুল হয়ে ওঠে পরিবেশ। খালি গায়ে কাজ করতে গিয়ে শ্রমিকেরা বিষাক্ত সাপ ও পোকামাকড়ের কবলে প্রাণ হারাতে থাকেন। বহু কষ্টে শেষপর্যন্ত শ্রমিকেরা বৃষ্টি-অরণ্যের মাঝমাঝি কিছু অংশ পরিষ্কার করতে সক্ষম হয়। সেখানে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলির আদলে কাছাকাছি ঘন ভাবে রাবার গাছ লাগানো হয়। এটিই ছিল ফোর্ডের দলের আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। বিশেষজ্ঞদের কথায় কর্ণপাত না করে নিজেদের খেয়ালখুশি মতো গাছের চারা রোপণ করেন অনভিজ্ঞ কর্মীরা।

১৫ ২১

তবে শ্রমিকদের স্বাচ্ছন্দ্য নিয়ে কোনও সমঝোতা করেননি ফোর্ড। শ্রমিকেরা উপযুক্ত পারিশ্রমিক পেতেন। কাজের সময়ও আট ঘণ্টা বেঁধে দিয়েছিলেন তিনি। বিনোদনের জন্য সুইমিং পুল, গল্‌ফ কোর্স আর নাচঘরের ব্যবস্থাও করেছিলেন। শ্রমিকদের সন্তানদের জন্য স্কুল, বয় স্কাউটও ছিল। একটি আধুনিক হাসপাতালও নির্মাণ করা হয়। সেখানে শ্রমিকেরা বিনামূল্যে চিকিৎসার সুযোগ পেতেন।

১৬ ২১

জঙ্গলের মাঝখানে তাঁর আদর্শকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য ফোর্ডের যা যা প্রয়োজন ছিল, তার সবই গহীন জঙ্গলে মজুত করা হয়েছিল। তবুও ফোর্ডের স্বপ্ন সফল হয়নি। তাঁর ফোর্ডল্যান্ডিয়া স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে বোর্ডিং স্কুলের নামান্তর হয়ে ওঠে। ফোর্ডের সংস্থার নিয়ম ছিল টানা আট ঘণ্টার কাজ। স্থানীয় রেওয়াজ অনুযায়ী, দুপুরে খাওয়ার পর শ্রমিকেরা কিছু ক্ষণ বিশ্রাম নিতেন। সেই নিয়ে ফোর্ডের সংস্থার কর্মচারীদের তুমুল অশান্তি শুরু হয়।

১৭ ২১

হেনরি ফোর্ড আমেরিকান, কিন্তু শ্রমিকেরা সকলেই ব্রাজ়িলীয়। তাঁদের সংস্কৃতির সঙ্গে মার্কিন সংস্কৃতির আকাশপাতাল তফাত। জঙ্গলের আদিবাসীদের আমেরিকার মতো জীবনধারায় চালিত করার জেদ করার জন্য ফোর্ডল্যান্ডিয়াকে গোড়া থেকেই প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হয়। ফোর্ড ছিলেন নিরামিষভোজী। তিনি ব্রাজ়িলীয় শ্রমিকদের জন্যও নিরামিষ খাবারের ব্যবস্থা করেন। এটিও বিরূপ প্রভাব ফেলে। মদ্যপান নিষিদ্ধ হয়। যৌনবৃত্তি নিয়েও ফোর্ডল্যান্ডিয়ায় নিষেধাজ্ঞা জারি হয়।

১৮ ২১

শ্রমিকদের ভাল মজুরি দেওয়া সত্ত্বেও বিধিনিষেধ নিয়ে অসন্তোষ শুরু হয়। হেনরির আশা ছিল, আমেরিকার উন্নত সংস্কৃতি দিয়ে আমাজ়নের বাসিন্দাদের স্বপ্নের নগরী উপহার দেবেন। বাস্তবে তার ঠিক উল্টোটাই ঘটেছিল। ১৯৩০ সালে শ্রমিকদের অসন্তোষের মাত্রা চরমে ওঠে। ক্ষুব্ধ শ্রমিকেরা চাকরির মায়া ভুলে দাঙ্গা সৃষ্টি করে। সমাবেশ করে শহর জুড়ে ভাঙচুর চালায়। জেনারেটর, উৎপাদন সরঞ্জাম, এমনকি তাঁদের নিজস্ব বাড়িঘরও ধ্বংস করে। ফোর্ডল্যান্ডিয়ায় এতে হাজার হাজার ডলারের ক্ষতি হয়।

১৯ ২১

আমেরিকান কর্মচারীরা জাহাজে করে ফোর্ডল্যান্ডিয়া থেকে পালিয়ে আসতে বাধ্য হন। ফোর্ডল্যান্ডিয়ার বিদ্রোহ দমনে মাঠে নামে ব্রাজ়িলের সেনাবাহিনী। এত কিছুর পর দমে না গিয়ে নতুন উদ্যমে তাঁর স্বপ্ননগরীকে গড়ে তুলতে হাজার হাজার ডলার বিনিয়োগ করেন ফোর্ড। তা সত্ত্বেও ফোর্ডল্যান্ডিয়ায় ক্ষতির গ্রহণ যেন কাটতেই চাইছিল না। মূল উদ্দেশ্য যে রাবার উৎপাদন, তা-ও মাঠে মারা যাচ্ছিল।

২০ ২১

ফোর্ডল্যান্ডিয়ার কফিনে শেষ পেরেক ছিল রাবার গাছে শুঁয়োপোকা ও ছত্রাকের সংক্রমণ এবং প্লেগ। ১৯৪৫ সাল নাগাদ ফোর্ডের আত্মোপলব্ধি হয় যে তাঁর স্বপ্নের নগরীর কোনও ভবিষ্যৎ নেই। শেষ পর্যন্ত ব্রাজ়িল সরকারের কাছেই আবার জমি বিক্রি করেন তিনি। সব মিলিয়ে প্রায় ২ কোটি ডলার আর্থিক ক্ষতি হয় তাঁর। আজকের দিনে যে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২০ কোটি ডলার।

২১ ২১

তবে সবচেয়ে মজার কথা প্রথম বিশ্বের একটি উন্নত দেশে বসে হেনরি ফোর্ড যে ‘নতুন দেশ’ গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিলেন, নিজে এক বারের জন্যও সেই দেশে পা রাখেননি।

সব ছবি: সংগৃহীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement