কখনও ভারত। কখনও আবার পশ্চিম ইউরোপ। কিংবা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া। গত এক বছর ধরে ক্রমাগত বিভিন্ন দেশের উপর শুল্ক চাপিয়ে গিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। উদ্দেশ্য, আমদানি হ্রাস। কিন্তু, লাভ হওয়া তো দূর অস্ত, এতে উল্টে হু-হু করে বাড়ছে আমেরিকার বাণিজ্যিক ঘাটতি। সম্প্রতি সেই পরিসংখ্যান প্রকাশ্যে আসতেই চোখ কপালে ওঠে ওয়াশিংটনের আর্থিক বিশ্লেষকদের।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে, ২০২৫ সালের আমদানি-রফতানি সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করেছে মার্কিন বাণিজ্য দফতর। ট্রাম্প প্রশাসন জানিয়েছে, পণ্যের ক্ষেত্রে রেকর্ড পরিমাণ ঘাটতিতে চলছে আমেরিকার ব্যবসা। যদিও সার্বিক ভাবে বাণিজ্যিক লেনদেন বাড়াতে সক্ষম হয়েছে ওয়াশিংটন। অনেকেই এর জন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ‘অপরিকল্পিত’ শুল্কনীতিকে দায়ী করেছেন। পরিস্থিতি না বদলালে যুক্তরাষ্ট্র বিপদের মুখে পড়তে পারে বলেও মনে করা হচ্ছে।
পৃথিবীর প্রতিটা দেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মূলত দু’টি বিষয়ের উপর নির্ভরশীল। সেগুলি হল, পণ্য ও পরিষেবা। মার্কিন বাণিজ্য দফতর জানিয়েছে, গত বছর প্রথমটিতেই ১.২৪ লক্ষ কোটি ডলার ছাপিয়ে যায় ঘাটতির অঙ্ক, ২০২৪ সালের তুলনায় যা কিছুটা বেশি। ২০২৫ সালের এপ্রিলে নতুন ‘পারস্পরিক শুল্ক’ (রেসিপ্রোক্যাল ট্যারিফ) নীতির ঘোষণা করেন ট্রাম্প। সেটা বছরভর চালু ছিল। তার পরও বিন্দুমাত্র কমেনি আমদানি।
এ ব্যাপারে আবার পৃথক তথ্য দিয়েছে আমেরিকার জনশুমারি (সেনসাস) ব্যুরো এবং আর্থিক বিশ্লেষণ ব্যুরো। এই দুই বিভাগের কর্তা-ব্যক্তিদের দাবি, গত বছরের ডিসেম্বরে সামগ্রিক ভাবে পণ্য ও পরিষেবা ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়ায় ৭,০৩০ কোটি ডলার। অন্য দিকে ৫,৩০০ কোটি ডলার ছিল নভেম্বরে সংশোধিত ঘাটতির অঙ্ক। অর্থাৎ, এক মাসের ব্যবধানে আমেরিকার আমদানি-রফতানির ফারাক বৃদ্ধি পায় ১,৭৩০ কোটি ডলার।
ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, ডিসেম্বরে মোট ২৮ হাজার ৭৩০ কোটি ডলারের পণ্য রফতানি করেছে ওয়াশিংটন, নভেম্বরের তুলনায় যা ৫০০ কোটি ডলার কম। অন্য দিকে, এই সময়সীমার মধ্যে ১,২৩০ কোটি ডলারের আমদানি বৃদ্ধি পেয়ে ৩৫ হাজার ৭৬০ কোটি ডলারে গিয়ে পৌঁছোয়। এ ভাবে বিদেশ থেকে মাত্রাতিরিক্ত পণ্য কেনার কারণেই নষ্ট হয়েছে বাণিজ্যিক ভারসাম্য, রিপোর্ট স্বীকার করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
মার্কিন বাণিজ্য বিভাগ জানিয়েছে, আমদানির সূচক ঊর্ধ্বমুখী থাকায় ডিসেম্বরে পণ্যখাতে ঘাটতির অঙ্ক ১,৫৭০ কোটি ডলার বৃদ্ধি পায়। ফলে সেটা ৯,৯৩০ কোটি ডলারে পৌঁছোতে একেবারেই সময় নেয়নি। উদ্বেগের বিষয় হল, পরিষেবার ক্ষেত্রেও সঙ্কুচিত হয়েছে উদ্বৃত্ত। এই ব্যবসা থেকে মুনাফার পরিমাণ ১৬০ কোটি ডলার কমে ২,৯০০ কোটি ডলারে নেমে এসেছে।
পরিষেবার ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হল একাধিক ইউরোপীয় বহুজাতিক কোম্পানি। শুধু তা-ই নয়, এ ক্ষেত্রে মার্কিন টেক জায়ান্টগুলি ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থাগুলির উপর ব্যাপক ভাবে নির্ভরশীল। আর তাই বিশ্লেষকদের দাবি, ট্রাম্প জমানায় পরিষেবার ক্ষেত্রে খুব দ্রুত আমেরিকা ব্যবসা বৃদ্ধি করতে সক্ষম হবে, তা ভাবার কোনও কারণ নেই। উল্টে শুল্কনীতির জন্য ‘বন্ধু’ রাষ্ট্রগুলির বাজার হারাতে পারে যুক্তরাষ্ট্র।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট অবশ্য ঘাটতির এই তথ্যকে গুরুত্ব দিতে নারাজ। উল্টে পণ্য ও পরিষেবা মিলিয়ে আমদানি হ্রাসের অঙ্ককেই বেশি করে তুলে ধরছেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বিভাগের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছর সামগ্রিক ভাবে ২১০ কোটি ডলার কমেছে আমেরিকার ঘাটতি। ফলে সেটা ৯০ হাজার ১৫০ কোটি ডলারে নেমে এসেছে বলে জানিয়েছে তারা। ট্রাম্পের দাবি, শুল্কের জন্যই নিম্নমুখী হয়েছে ঘাটতির সূচক।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনিক কর্তারা জানিয়েছেন, সামগ্রিক ভাবে ২০২৫ সালে রফতানি বাণিজ্য ৬.২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, গত বছর মোট ৩ লক্ষ ৪৩ হাজার ২৩০ কোটি ডলার মূল্যের পণ্য ও পরিষেবা বিদেশের বাজারে বিক্রি করতে সক্ষম হয়েছে আমেরিকা। ফলে সব মিলিয়ে ১৯ হাজার ৯৮০ কোটি ডলারের রফতানি বাণিজ্য বাড়াতে পেরেছে ওয়াশিংটন। কিন্তু, এই সময়সীমার মধ্যে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে তাদের আমদানিও।
বাণিজ্য দফতরের রিপোর্ট অনুযায়ী, গত বছর পণ্য ও পরিষেবা ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের মোট আমদানির পরিমাণ ছিল ৪ লক্ষ ৩৩ হাজার ৩৮০ কোটি ডলার। অর্থাৎ, এই খাতে ওয়াশিংটনের সূচক বৃদ্ধি পেয়েছে ৪.৮ শতাংশ। সব মিলিয়ে আমদানিতে ১৯ হাজার ৭৮০ কোটি ডলার বেশি খরচ করেছে আমেরিকা। বিশ্লেষকদের দাবি, পরিষেবার ক্ষেত্রে কিছুটা বাড়তি রোজগার হওয়ায় ঘাটতির অঙ্ক সামান্য কমাতে সক্ষম হয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন।
গত বছর পরিষেবাক্ষেত্রে আমেরিকার রফতানির পরিমাণ ছিল মোট ৩৩ হাজার ৯৫০ কোটি ডলার। সেটা ২০২৪ সালের নিরিখে ২,৭৬০ কোটি ডলার বৃদ্ধি পেয়েছে। এটাই পণ্য ঘাটতির ২,৫৫০ কোটি ডলারের লোকসানকে আংশিক ভাবে পুষিয়ে দিতে সাহায্য করেছে। ২০২৫ সালে মূলধনী পণ্য, কম্পিউটার, অসামরিক বিমান এবং শিল্প সরবরাহের বৃদ্ধির জেরে রফতানি বাণিজ্য বাড়িয়ে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, বলছে ওয়াকিবহাল মহল।
অন্য দিকে গত বছর বহু শিল্পের কাঁচামাল, টেলি যোগাযোগের সরঞ্জাম এবং কম্পিউটারের আনুষঙ্গিক সরঞ্জাম প্রচুর পরিমাণে বিদেশ থেকে আমদানি করেছে আমেরিকা। পাশাপাশি, ব্যবসায়িক পরিষেবা, বৌদ্ধিক সম্পত্তি সংক্রান্ত খরচ এবং আর্থিক পরিষেবার বৃদ্ধি যুক্তরাষ্ট্রের রফতানি বাণিজ্যের সূচককে ঊর্ধ্বমুখে নিয়ে গিয়েছে। তবে ট্রাম্পের শুল্কের কারণে মূল অংশীদারদের সঙ্গে বাণিজ্যিক ভারসাম্যের বদল ঘটেছে।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে রিপাবলিক অফ চায়না বা তাইওয়ানের সঙ্গে ১,৯৮০ কোটি ডলার, ভিয়েতনামের সঙ্গে ১,৭৬০ কোটি ডলার, মেক্সিকোর সঙ্গে ১,৪৫০ কোটি ডলার, চিনের সঙ্গে ১,২৪০ কোটি ডলার এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে আমেরিকার বাণিজ্যিক ঘাটতি ১,১১০ কোটি ডলারে গিয়ে পৌঁছোয়। তবে নেদারল্যান্ডস, ব্রিটেন এবং ব্রাজ়িলের সঙ্গে উদ্বৃত্ত বাণিজ্য করতে সক্ষম হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন।
এ বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি অবশ্য ট্রাম্পের শুল্কনীতিকে ‘বেআইনি’ বলে ঘোষণা করে আমেরিকার সুপ্রিম কোর্ট। যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালত রায়ে বলেছে, ‘‘জাতীয় জরুরি অবস্থার দোহাই দিয়ে মার্কিন পার্লামেন্ট কংগ্রেসের অনুমতি ছাড়া একক সিদ্ধান্তে আমদানিকৃত পণ্যের উপরে এই বিশাল শুল্ক আরোপ করে ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন প্রেসিডেন্ট।’’ এর তীব্র সমালোচনা করে সঙ্গে সঙ্গে বিবৃতি দেন ‘পোটাস’ (প্রেসিডেন্ট অফ দ্য ইউনাইটেড স্টেটস)।
গত ২৫ ফেব্রুয়ারি আমেরিকার ‘স্টেট অফ ইউনিয়নে’ (সব প্রদেশের সম্মিলিত মঞ্চে) বক্তৃতা দেন ট্রাম্প। সেখানে ফের এক বার নিজের শুল্কনীতির প্রসঙ্গ তোলেন তিনি। এ ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্টের রায়কে ‘দুর্ভাগ্যজনক’ বলে উল্লেখ করেছেন ‘পোটাস’। তিনি যখন এই রায়ের সমালোচনা করছেন, তখন দর্শকাসনে বসে ছিলেন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরাও। তাঁদের সামনেই ট্রাম্প বলেন, ‘‘অর্থনীতি এবং জাতীয় নিরাপত্তার ভিত্তিতে শুল্ক নিচ্ছে ওয়াশিংটন।’’
ট্রাম্পের দাবি, দীর্ঘ দিন ধরে অন্যান্য দেশ আমেরিকাকে ‘নিংড়ে’ নিয়েছে। বিরোধী দল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সদস্যেরা সেটা জানেন, কিন্তু তাঁরা কিছু বলছেন না। নিজের শুল্কনীতির সপক্ষে মার্কিন প্রেসিডেন্টের বক্তব্য, ‘‘সেই দেশগুলি এখন খুশি। আমরাও খুশি। কারণ আমরা চুক্তি করেছি। সব চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। ওরাও এখন প্রচুর উপার্জন করছে। আমরাও করছি।’’ এই পরিস্থিতিতে আয়কর কাঠামোর বদলের ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।
সংশ্লিষ্ট রায়ের জেরে তাঁর ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে বলে দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। পাশাপাশি, শুল্ক নিয়ে ফের হুঁশিয়ারি দিতে শোনা গিয়েছে তাঁকে। ট্রাম্পের কথায়, কোনও দেশ যদি সুপ্রিম-নির্দেশ দেখিয়ে আমেরিকার সঙ্গে ‘খেলতে যায়’ তা হলে তার পরিণতি হবে ভয়ঙ্কর। কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই আগামী দিনে শুল্ক চাপাবেন বলে জানিয়ে রেখেছেন তিনি।
গত বছর প্রথমে ভারতীয় পণ্যে ২৬ শতাংশ শুল্ক চাপান ট্রাম্প। পরে সেটা কমে ২৫ এবং আরও পরে বেড়ে ৫০ শতাংশে গিয়ে দাঁড়ায়। সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর এ দেশের সামগ্রীর উপরে শুল্কের মাত্রা কমিয়ে ১৫ এবং ১০ শতাংশ করেছে আমেরিকা। শুল্ক সূচকের এই ধরনের লাফালাফির জেরে নয়াদিল্লির সঙ্গে কোনও রকমের বাণিজ্যচুক্তি করতে সক্ষম হয়নি ওয়াশিংটন। ঘাটতির সরকারি তথ্য তাতে আরও জটিলতা তৈরি করে কি না, সেটাই এখন দেখার।