পরিচালক যেমন কড়া, অভিনেতার ব্যক্তিত্বও নজরে পড়ার মতো। কেউ কারওর চেয়ে কম যান না। সেটে অধিকাংশ সময় অভিনেতা-পরিচালকের মধ্যে ঝগড়াঝাঁটি চলত। এক রকম ‘সাপে-নেউলের’ মতো সম্পর্ক ছিল তাঁদের। কিন্তু শুটিং শেষ হওয়ার পর নিজে সস্তার গাড়ি চালালেও ‘বিগ বি’কে কোটি কোটি টাকার গাড়ি উপহার দিয়েছিলেন পরিচালক বিধু বিনোদ চোপড়া। সে কারণে মায়ের কাছে চড়ও খেয়েছিলেন তিনি।
২০০৭ সালে বিধুর পরিচালনা এবং প্রযোজনায় প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায় ‘একলব্য’। এই ছবিতে বলিপাড়ার বহু জনপ্রিয় তারকা অভিনয় করেছিলেন। অমিতাভ বচ্চনের পাশাপাশি শর্মিলা ঠাকুর, সইফ আলি খান, বিদ্যা বালন, রাইমা সেন, সঞ্জয় দত্ত, জ্যাকি শ্রফের মতো তারকারা অভিনয় করেছিলেন এই ছবিতে। কিন্তু প্রতি বার সেটে অমিতাভের সঙ্গে ঝামেলা লাগত বিধুর।
বলিপাড়ার অন্দরমহলে কান পাতলে শোনা যায়, বিধু তাঁর কাজের জায়গায় খুব কড়া। অনিয়ম দেখলেই মেজাজ সপ্তমে চড়ে যায় তাঁর। অন্য দিকে, অমিতাভের সময়ানুবর্তিতার প্রশংসাও রয়েছে বলিপাড়ায়। সঠিক সময়ে সেটে পৌঁছে যেতেন তিনি। তা সত্ত্বেও বিধু এবং অমিতাভের মধ্যে প্রথম দিন থেকে গোল বেধেছিল।
‘একলব্য’ ছবির শুটের জন্য ক্রুসমেত বাইরে যাওয়ার কথা ছিল সকল তারকার। রওনা দেওয়ার সময় অমিতাভ খুব কম মালপত্র নিয়ে সেটে পৌঁছেছেন দেখে বিধু তাঁকে বকাবকি করা শুরু করে দিয়েছিলেন।
বিধুর মতে, বাইরে গিয়ে শুটিং শেষ করতে বহু দিন সময় লাগার কথা। কিন্তু অমিতাভ যত কম মালপত্র নিয়ে এসেছেন, তাতে সেই দিন কাটানো সম্ভব নয়। তখন অমিতাভ জানান যে, বিধুকে নিয়ে অমিতাভকে আগে থেকে সাবধানবাণী দিয়ে রেখেছেন জয়া বচ্চন। স্ত্রীর কথা মেনেই নাকি কম জিনিস নিয়ে গিয়েছেন অমিতাভ।
বিধুর ছবিতে অমিতাভ কাজ করছেন জেনে জয়া বলেছিলেন, ‘‘বিধু যে ধরনের মানুষ, তুমি ওখানে বেশি দিন টিকতে পারবে না। শুটিং শেষ না করেই ফিরে আসবে।’’ সে কথা শুনেই কম মালপত্র নিয়ে গিয়েছিলেন অমিতাভ।
যে অমিতাভ বরাবর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সেটে পৌঁছে যান, সেই অমিতাভকেও সময়ানুবর্তিতা নিয়ে জব্দ করেছিলেন বিধু। বলিপাড়া সূত্রে খবর, ভোর ৩টেয় শুটিং শেষ করেছিলেন বিধু। সে দিনই আবার সকাল ৬টায় সকলকে সেটে হাজিরা দিতে বলেছিলেন তিনি। তখনই বিধুর রোষের মুখে পড়েন অমিতাভ।
অমিতাভ ভেবেছিলেন, মাত্র তিন ঘণ্টা বিশ্রাম নিয়ে কেউ ঠিক সময়মতো সেটে পৌঁছোতে পারবেন না । স্বয়ং পরিচালকও নয়। তবুও তিনি ৬টা ১০ মিনিটের মধ্যে সেটে চলে গিয়েছিলেন। সেটে পৌঁছে অমিতাভ দেখেন যে, ক্রুয়ের সকল সদস্য সেখানে উপস্থিত। পরিচালক বিধুও সেখানে রয়েছেন।
আসলে, বিধুর কড়া নিয়ম নিয়ে ক্রুয়ের সকলেই অবগত ছিলেন। তাই পরিচালকের নির্দেশের অবাধ্য হননি কেউ। অমিতাভই সেখানে দেরি করে পৌঁছোন। বলিপাড়ার জনশ্রুতি, ১০ মিনিট দেরি করে সেটে পৌঁছোনোর জন্য অমিতাভকে সকলের সামনে প্রচণ্ড বকাবকি করেছিলেন বিধু।
ছবির বাজেট নিয়ে কোনও ছেলেখেলা করতে রাজি ছিলেন না বিধু। কোনও অভিনেতার তারকাসুলভ শখ মেটানোর প্রভাব বাজেটে পড়তে দিতে নারাজ ছিলেন তিনি। সে কারণেও অমিতাভের সঙ্গে ঝগড়া হয়েছিল বিধুর।
গুঞ্জন, ‘একলব্য’ ছবির শুটিং চলাকালীন অমিতাভ আলাদা ভাবে তাঁকে এমন হোটেলে রাখার আবদার করেছিলেন যেখানকার এক রাতের ঘরের ভাড়া ৬৫ হাজার টাকা। হোটেলের ভাড়া শুনে চমকে গিয়েছিলেন বিধু। কড়া ভাবে অমিতাভকে বলেছিলেন, ‘‘তা হলে সঞ্জয় আর সইফ কী দোষ করলেন? তাঁরাও তো এমন দাবি করতে পারেন।’’
অমিতাভের আবদার মানেননি বিধু। স্পষ্ট জানিয়ে দেন, তিনি সিনেমার জন্য খরচ করতে রাজি, কিন্তু তারকাদের শখ-আহ্লাদ পূরণের জন্য বাড়তি খরচ করতে পারবেন না। অন্য তারকাদের জন্য যে ব্যবস্থা করা হয়েছে, অমিতাভকেও সে ভাবে মানিয়ে নিতে বলেছিলেন বিধু।
‘একলব্য’ ছবির শুটিং শেষ হলে অমিতাভের জন্য সাড়ে চার কোটি টাকা খরচ করে একটি রোলস রয়েস কিনেছিলেন বিধু। তিনি ভেবেছিলেন, বিধুর কড়া শাসন সহ্য করতে না পেরে মাঝপথে কাজ ছেড়ে দেবেন অমিতাভ। কিন্তু পেশার খাতিরে অমিতাভ পরিচালকের সকল নির্দেশ মাথা পেতে নিয়েছিলেন। এই আচরণে আপ্লুত হয়েছিলেন বিধু। তাই দামি গাড়ি উপহার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
বলিপাড়া সূত্রে খবর, অমিতাভকে কোটি টাকার গাড়িটি উপহার দিতে মাকে নিয়ে যাচ্ছিলেন বিধু। কিন্তু মাঝপথে মায়ের কাছে চড় খেতে হয়েছিল পরিচালককে।
বিধু নিজে কম দামি গাড়ি চালিয়ে যাতায়াত করতেন। ভাল গাড়ি কবে কিনবেন তা নিয়ে পরিচালকের মা প্রশ্ন করলে বিধু জানাতেন, পরে কখনও টাকা জমিয়ে বিলাসবহুল গাড়ি কিনবেন। অন্য দিকে, অমিতাভকে দামি গাড়ি কিনে দিচ্ছেন শুনে বেজায় রেগে গিয়েছিলেন বিধুর মা।
অমিতাভের বাড়ি যাওয়ার পথে বিধুকে নতুন গাড়ি কেনা নিয়ে বকাবকি করছিলেন তাঁর মা। তিনি ভেবেছিলেন যে, উপহারের দাম ১১ লক্ষ টাকার কাছাকাছি। তা-ই মেনে নিতে পারছিলেন না তিনি। কিন্তু আসল দাম শুনে চোখ ছানাবড়া হয়ে যায় পরিচালকের মায়ের।
বিধুর মা যখন জানতে পারেন সাড়ে ৪ কোটি টাকা খরচ করে অমিতাভের জন্য বিলাসবহুল গাড়ি কিনেছেন, তখনই ছেলেকে চড়-থাপ্পড় মারতে শুরু করেন তিনি। ছেলেকে মারধর করতে করতে তিনি বলেছিলেন, ‘‘তুই নিজে সস্তার গাড়ি চালাস আর উপহার দিচ্ছিস কোটি কোটি টাকার গাড়ি!’’ কিন্তু মায়ের শাসন উপেক্ষা করেও অমিতাভকে দামি গাড়িটি উপহার দিয়েছিলেন বলি পরিচালক।