Toxic Desert

ছটফট করে মারা যায় ৫০ হাজার হরিণ, ভূতুড়ে দ্বীপের বালি-বাতাসে মরণফাঁদ! জৈব অস্ত্রের কালকূটে পুড়ছে আরালকুম

সোভিয়েত যুগে উজ়বেকিস্তান এবং কাজ়াখস্তান সীমান্তের আরাল সাগরের ভোজরোঝ‌দেনিয়া দ্বীপে জৈব অস্ত্র তৈরির গবেষণাগার তৈরি করেন কিংবদন্তি জোসেফ স্ট্যালিন। পরিত্যক্ত ওই এলাকাটি বর্তমানে ভূতুড়ে অবস্থায় পড়ে আছে। কিন্তু কেন?

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ১৯ এপ্রিল ২০২৬ ১৪:৪১
Share:
০১ ১৮

দিগন্তবিস্তৃত মরুভূমি। মাইলের পর মাইল জুড়ে ছড়িয়ে থাকা সেই বালিতে মিশে আছে ভয়ঙ্কর বিষ! বাতাস এতটাই বিষাক্ত যে, শ্বাস নেওয়া প্রায় অসম্ভব। অথচ কয়েক বছর আগেও সেখানে ছিল সবুজে ঘেরা ছোট্ট একটা দ্বীপ। দিব্যি মাছশিকার করে জীবনধারণ করতেন সেখানকার বাসিন্দারা। এ-হেন ভোলবদলের নেপথ্যে কোন প্রাকৃতিক রহস্য? না কি ক্ষমতালোভীদের চক্রান্তে ছারখার হয়েছে গোটা এলাকা? গত দু’দশক ধরে এই প্রশ্নের জবাব খুঁজছে দুনিয়া।

০২ ১৮

বিষাক্ত মরুভূমিতে বদলে যাওয়া এলাকাটি হল ভোজরোঝ‌দেনিয়া। বর্তমানে এর অবস্থান কাজ়াখস্তান ও উজ়বেকিস্তান সীমান্তে। একসময় সংশ্লিষ্ট দেশগুলি ছিল সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্গত। তখনই প্রতিরক্ষা গবেষণার নামে ভোজরোঝদেনিয়ার উপর ‘মারাত্মক নির্যাতন’ শুরু করে মস্কো। ফলস্বরূপ, পরিত্যক্ত বালুকাময় উপদ্বীপে পরিণত হয় গোটা এলাকা। এর লবণাক্ত বালিতে মিশে আছে মারণ ক্যানসার সৃষ্টিকারী কোটি কোটি জীবাণু!

Advertisement
০৩ ১৮

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৩৯-’৪৫) পরবর্তী পৃথিবীতে দুই মহাশক্তির মধ্যে বেধে যায় ‘ঠান্ডা লড়াই’ (কোল্ড ওয়ার)। এর এক দিকে ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন আর অন্য দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সংঘাত চলাকালীন প্রতিরক্ষা, মহাকাশ গবেষণা, অর্থনীতি থেকে বৈদেশিক বাণিজ্য— সব কিছুতে একে অপরকে টেক্কা দিতে মরিয়া হয়ে ওঠে তারা। ওয়াশিংটন তখন পরমাণু শক্তিধর। অথচ মস্কোর তূণে নেই ওই গণবিধ্বংসী ‘ব্রহ্মাস্ত্র’। ফলে ক্রেমলিনের কপালের চিন্তার ভাঁজ ক্রমশ চওড়া হচ্ছিল।

০৪ ১৮

এ-হেন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রকে টেক্কা দিতে ‘জৈবিক হাতিয়ার’ (বায়োলজিক্যাল ওয়েপন) তৈরির ভয়ঙ্কর সিদ্ধান্ত নেয় মস্কো। সাবেক সোভিয়েতের শীর্ষনেতা তখন কিংবদন্তি জোসেফ স্ট্যালিন। তাঁর নির্দেশ অনুযায়ী অতি গোপনে ওই মারণাস্ত্র নির্মাণের গবেষণার কাজে হাত লাগান ক্রেমলিনের কয়েক জন বাছা বাছা প্রতিরক্ষা বিজ্ঞানী। সবার অলক্ষে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছোতে কাজ়াখ ও উজ়বেকিস্তান সীমান্তের ভোজরোঝ‌দেনিয়া দ্বীপটিকে বেছে নেন তাঁরা।

০৫ ১৮

১৯৪৮ সালে সংশ্লিষ্ট দ্বীপে একটি জৈব অস্ত্র পরীক্ষাগার তৈরি করে সাবেক সোভিয়েত সরকার। সেখানে শুরু হয় অ্যানথ্র্যাক্স, গুটিবসন্ত, প্লেগ, ব্রুসেলোসিস এবং তুলারেমিয়ার মতো ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়াঘটিত রোগ ছড়িয়ে দেওয়ার কৌশল নিয়ে গবেষণা। ১৯৫৪ সালে সংশ্লিষ্ট পরীক্ষাগারটির বিস্তার ঘটায় মস্কো। এর জন্য জলের মতো টাকা খরচ করতে পিছপা হয়নি ক্রেমলিন। ভোজরোঝদেনিয়া দ্বীপের গবেষণাকেন্দ্রটির সাঙ্কেতিক নাম ছিল আরালস্ক-৭।

০৬ ১৮

সোভিয়েত যুগে কাজ়াখস্তান ও উজ়বেকিস্তান সীমান্তে ছিল বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম হ্রদ আরাল সাগর। ৬৮,০০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত ওই জলাভূমিকে ছোটখাটো সমুদ্র বললে অত্যুক্তি হবে না। উত্তর থেকে দক্ষিণে প্রায় ৪৩৫ কিলোমিটার লম্বা এবং পূর্ব থেকে পশ্চিমে আনুমানিক ২৯০ কিলোমিটার চওড়া এ-হেন আরাল সাগরেরই দ্বীপ হল ভোজরোঝদেনিয়া। সেখানে জৈবিক অস্ত্র তৈরির প্রধান গবেষণাগারে বিভিন্ন ধরনের বিপজ্জনক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতেন মস্কোর বিজ্ঞানীরা।

০৭ ১৮

১৯৪৯ সালের অগস্টে কাজ়াখস্তানে পরমাণু বোমার সফল পরীক্ষা চালায় সোভিয়েত ইউনিয়ন। গণবিধ্বংসী হাতিয়ার হাতে চলে আসার পরও জৈব অস্ত্রের গবেষণা কিন্তু বন্ধ করেনি মস্কো। শুধু তা-ই নয়, এর মধ্যে আবার কৃষি উৎপাদন বাড়াতে আরাল সাগরের দিকে আসা নদীগুলির মুখ অন্যত্র ঘুরিয়ে দেয় ক্রেমলিন। ফলে জলসঙ্কটের মুখে পড়ে ধীরে ধীরে শুকিয়ে যেতে শুরু করে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম হ্রদ। সোভিয়েত রাজনৈতিক নেতৃত্ব অবশ্য এর বিপদ তখন আঁচ করতে পারেননি।

০৮ ১৮

গত শতাব্দীর ৬০-এর দশক থেকে সঙ্কুচিত হতে শুরু করে আরাল সাগর। ১৯৭১ সালে আবার ভোজরোঝদেনিয়া দ্বীপে ঘটে যায় আর এক বিপর্যয়। ওই বছর হঠাৎই গুটিবসন্তে আক্রান্ত হন এক তরুণ রুশ বিজ্ঞানী। তাঁর শরীরে বাসা বাঁধে ভ্যারিওলা ভাইরাস। কয়েক দিনের মধ্যেই আরালস্ক-৭ গবেষণাগারে কর্মরত অন্তত ১০ জন সংক্রমিত হন গুটিবসন্তে। তাঁদের মধ্যে মৃত্যু হয় তিন জনের। এই খবর ক্রেমলিনে পৌঁছোতেই প্রমাদ গোনে মস্কো।

০৯ ১৮

তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, ভো‌জরোঝদেনিয়া দ্বীপে আক্রান্ত তরুণ রুশ বিজ্ঞানীকে গুটিবসন্তের টিকা দেওয়া হয়েছিল। তাতে তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন। অন্য দিকে বসন্তে আক্রান্ত হয়ে তাঁর ভাইয়ের মৃত্যু হয়। এই ঘটনার পরের বছরই (পড়ুন ১৯৭২ সাল) ওই দ্বীপ সংলগ্ন এলাকায় পাওয়া যায় দুই মৎস্যজীবীর মৃতদেহ। প্লেগের কারণে তাঁরা প্রাণ হারিয়েছেন বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গিয়েছিল। যদিও বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টায় খামতি ছিল না সোভিয়েত কর্তৃপক্ষের।

১০ ১৮

১৯৮৮ সালের মে মাসে ওই দ্বীপে আরও একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটে। মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যে সেখানকার তৃণভূমিতে চরতে থাকা ৫০ হাজার সাইগা হরিণ হঠাৎই ছটফট করতে করতে মারা যায়। এর পর সোভিয়েত কর্তৃপক্ষ আর কোনও ঝুঁকি নেননি। আরালস্ক-৭ প্রকল্পটিকে পুরোপুরি বন্ধ করার নির্দেশ দেয় মস্কো। দ্রুত দেশে ফেরানো হয় সেখানে কর্মরত সমস্ত বিজ্ঞানীকে।

১১ ১৮

পশ্চিমি গবেষকদের অভিযোগ, আরালস্ক-৭ বন্ধ করার সময় কোনও রকম সতর্কতা নেয়নি মস্কো। ফলে সেখানকার মাটিতে মিশে যায় জৈব অস্ত্র তৈরিতে ব্যবহৃত ওই গবেষণাগারের ভাইরাস এবং ব্যাকটেরিয়া। জীবাণু ছড়িয়ে পড়ে বাতাসেও। ৯০-এর দশক আসতে আসতে পুরোপুরি পরিত্যক্ত হয় ওই দ্বীপ। ১৯৯১ সালে সাবেক সোভিয়েতের পতন হলে আত্মপ্রকাশ করে আজকের রাশিয়া-সহ ১৫টি দেশ। এতে আরও খারাপ হয় পরিস্থিতি।

১২ ১৮

সোভিয়েত পতনে আর্থিক ভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে মস্কো। ভো‌জরোঝদেনিয়াকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়ার মতো টাকা উজ়বেকিস্তান এবং কাজ়াখস্তানের ছিল না। ফলে কয়েক বছরের মধ্যে পুরোপুরি ভূতুড়ে দ্বীপে পরিণত হয় গোটা এলাকা। গোদের উপর বিষফোড়ার মতো আরাল সাগরের বড় অংশ শুকিয়ে গিয়ে সেখানে গজিয়ে ওঠে আরালকুম মরুভূমি। বর্তমানে ভোজরোঝদেনিয়ার একাংশ তার সঙ্গে মিশে গিয়ে একটা উপদ্বীপীয় চেহারা নিয়ে ফেলেছে।

১৩ ১৮

সোভিয়েত-পরবর্তী যুগে আরালস্ক-৭ প্রসঙ্গে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে। এ বিষয়ে গণমাধ্যমে মুখ খোলেন রাশিয়ার দলত্যাগী ভ্লাদিমির পাসেচনিক এবং জৈব অস্ত্র কর্মসূচির প্রাক্তন প্রধান কেন আলিবেক। তাঁদের দাবি, অ্যানথ্রাক্স স্পোর এবং বুবোনিক প্লেগ ব্যাসিলিকে জৈব অস্ত্রে বদলে ফেলার গবেষণা চলছিল সেখানে। এর জন্য দ্বীপের মধ্যে বিজ্ঞানী ও অন্যান্য কর্মচারী মিলিয়ে ১,৫০০ লোকের থাকার বন্দোবস্ত করা হয়, যার নাম কান্টুবেক।

১৪ ১৮

মার্কিন গুপ্তচর সংস্থা সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির (সিআইএ) রিপোর্ট অনুযায়ী, দ্বীপটিতে একটি রাইফেল রেঞ্জ, সেনা ব্যারাক ও প্যারেড গ্রাউন্ড তৈরি করা হয়েছিল। এ ছাড়া ছিল পশুপালন কেন্দ্র, ক্লাব, স্টেডিয়াম, স্কুল ও দোকান। সোভিয়েত বিজ্ঞানীরা অ্যানথ্র্যাক্স, গুটিবসন্ত বা প্লেগকে মেঘের আড়ালে লুকিয়ে দিতে চেয়েছিলেন, যেটা বৃষ্টি হয়ে শত্রু দেশের মাটিতে ঝরে পড়বে। তার পর মিশে যাবে সেখানকার মাটি, জল ও বাতাসে।

১৫ ১৮

যদিও বাস্তবে ঘটে ঠিক এর উল্টো ঘটনা। সোভিয়েত বিজ্ঞানীরা কান্টুবেক ছেড়ে পালাতেই গবেষণাগারের ভাইরাস এবং ব্যাকটেরিয়াগুলি ভোজরোঝদেনিয়া দ্বীপের মাটি ও বাতাসে মিশতে শুরু করে। বর্তমানে এর বালুকাময় মাটির তাপমাত্রা ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ঘোরাফেরা করে। পড়ে আছে কিছু শুষ্ক গাছের কঙ্কাল। জীবনের লেশমাত্র সেখানে নেই।

১৬ ১৮

১৯৯২ সালে ভোজরোঝদেনিয়া থেকে শেষ ব্যক্তিকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে দেয় রাশিয়া। ২০০৫ সালে ভূগোলবিদ নিক মিডলটন একটি তথ্যচিত্র তৈরি করতে ওই দ্বীপে গিয়েছিলেন। এ কাজে তাঁকে সাহায্য করেন ডেভ বাটলার নামের এক প্রাক্তন ব্রিটিশ সৈনিক। টিকা নিয়ে সংশ্লিষ্ট দ্বীপে পা রাখেন তাঁরা। এ ছাড়াও উচ্চ প্রযুক্তির এয়ার ফিল্টার, রাবারের মোটা বুট, বিশেষ পোশাক এবং গ্যাস মুখোশ পরতে হয়েছিল তাঁদের।

১৭ ১৮

২০০২ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক সহযোগিতায় ভোজরোঝদেনিয়াকে কিছুটা দূষণমুক্ত করার চেষ্টা করে উজ়বেকিস্তান সরকার। অন্তত ১০টি অ্যানথ্রাক্সের সমাধিক্ষেত্রকে দূষণমুক্ত করতে সক্ষম হন তারা। এতে দূষণের মাত্রা কমলেও এলাকাটিকে পুরোপুরি জীবাণুমুক্ত করা গিয়েছিল, এমনটা নয়।

১৮ ১৮

এ-হেন ভূতুড়ে ভোজরোঝদেনিয়াকে নিয়ে উপন্যাস, কল্পবিজ্ঞানের কাহিনি কম লেখা হয়নি। এর মধ্যে অন্যতম হল ‘দ্য হোম টিম: ওয়েপন্স গ্রেড’। ২১ শতকে এর জৈব রাসায়নিক অস্ত্র তৈরির প্রকল্প জায়গা পায় ভিডিয়ো গেমেও। এর নাম ‘কমান্ড অ্যান্ড কনকয়ার: জেনারেলস’।

সব ছবি: সংগৃহীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement