India Wants Chinese FDI

ভারতীয় অর্থনীতি নিয়ে আমেরিকার ‘ভয়ঙ্কর উক্তি’! বিপদ বুঝে গালওয়ান ভুলে চিনা লগ্নি টানতে মরিয়া দিল্লি?

দেশের আর্থিক বৃদ্ধির সূচক ঊর্ধ্বমুখী রাখতে চিনের প্রত্যক্ষ বিদেশি লগ্নি পেতে চাইছে নয়াদিল্লি। ইতিমধ্যেই বিনিয়োগের নিয়মে সামান্য শীথিলতা এনেছে কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকার। এতে সুবিধা হবে কতটা?

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ১৬ মার্চ ২০২৬ ০৮:০০
Share:
০১ ১৮

ইরান বনাম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজ়রায়েল যুদ্ধে রক্তাক্ত পশ্চিম এশিয়া। ওই সংঘাতের সরাসরি প্রভাব পড়েছে ভারতের শেয়ার বাজারে। লড়াই শুরু হওয়া ইস্তক বম্বে ও ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জের থেকে একরকম মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন বিদেশি লগ্নিকারীরা। ফলে প্রতি দিনই লাফিয়ে লাফিয়ে নামছে সেনসেক্স ও নিফটির সূচক। এ-হেন পরিস্থিতিতে চিনা বিনিয়োগ টানতে নিয়মের ‘জাঁতাকল’ কিছুটা শীথিল করেছে কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকার। নয়াদিল্লির এই সিদ্ধান্ত ‘খেলা ঘোরাবে’ বলেই মনে করছেন আর্থিক বিশ্লেষকদের একাংশ।

০২ ১৮

চলতি মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে প্রত্যক্ষ বিদেশি লগ্নি বা এফডিআইয়ের (ফরেন ডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট) নিয়মে বড় বদল আনে কেন্দ্র। এই বিষয়ে বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে সরকার। সেখানে বলা হয়েছে, শর্তসাপেক্ষে প্রশাসনের অনুমতি ছাড়াই এ দেশে বিনিয়োগ করতে পারবে কোনও চিনা সংস্থা। তবে সেটা ১০ শতাংশের নীচে হতে হবে। তা ছাড়া এখানকার কোনও সংস্থায় লগ্নি করে তার অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে ‘নাক গলানো’র অধিকারী হবে না ড্রাগনের বিনিয়োগকারীরা।

Advertisement
০৩ ১৮

উল্লেখ্য, ২০২০ সালের এপ্রিলে এফডিআই ইস্যুতে একটি বিশেষ নির্দেশিকা জারি করে মোদী প্রশাসন। সেই বিজ্ঞপ্তিতে পাকিস্তানকে বাদ দিয়ে সমস্ত প্রতিবেশী দেশের প্রত্যক্ষ লগ্নির ক্ষেত্রে কেন্দ্রের অনুমতি বাধ্যতামূলক করা হয়। সংশ্লিষ্ট নির্দেশিকার পোশাকি নাম ছিল প্রেস নোট-৩ বা পিএন-৩। এই ঘটনার দু’মাসের মাথায় (পড়ুন জুনে) পূর্ব লাদাখের গালওয়ানে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখায় (লাইন অফ অ্যাকচুয়াল কন্ট্রোল বা এলএসি) বেজিঙের ‘পিপল্‌স লিবারেশন আর্মি’র (পিএলএ) সঙ্গে সীমান্ত সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে ভারতীয় ফৌজ।

০৪ ১৮

গালওয়ান সংঘর্ষের পর চিনা এফডিআই নিয়ে বেশি মাত্রায় কড়াকড়ি শুরু করে কেন্দ্রের মোদী সরকার। নয়াদিল্লির সেই প্রশাসনিক চাপ বেজিঙের লগ্নিকারী সংস্থাগুলি সহ্য করতে পারেনি। ফলে অচিরেই এ দেশ থেকে পাত্তারি গোটাতে শুরু করে তারা। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, ওই সময় কোভিড অতিমারিতে আক্রান্ত ছিল গোটা বিশ্ব। শুধু তা-ই নয়, অত্যন্ত ছোঁয়াচে ভাইরাসঘটিত রোগটিকে দুনিয়া জুড়ে ছড়িয়ে দেওয়ার নেপথ্যে ড্রাগনের হাত থাকার অভিযোগ ওঠে। এর আঁচ থেকে এ দেশের অর্থনীতিকে বাঁচানোর তাগিদ অনুভব করেছিল কেন্দ্র।

০৫ ১৮

গালওয়ান কাণ্ডের ছ’বছরের মাথায় কেন হঠাৎ এফডিআইয়ের নিয়মে বদল? মোদী সরকারের এই সিদ্ধান্তের নেপথ্যে একাধিক যুক্তি খুঁজে পেয়েছেন আর্থিক বিশ্লেষকেরা। তাঁদের দাবি, ইরান যুদ্ধের জেরে বর্তমানে ভারতীয় বাজার পুরোপুরি ঝিমিয়ে পড়েছে। পাশাপাশি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-সহ পশ্চিমি দেশগুলির লগ্নিকারী এখান থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ায় আগামী দিনে আর্থিক বৃদ্ধি অব্যাহত রাখা কঠিন হতে পারে। আর তাই চিনের থেকে প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ টেনে পরিস্থিতি মোকাবিলার পরিকল্পনা রয়েছে কেন্দ্রের।

০৬ ১৮

২০২০ সালের আগে ভারতের আর্থিক বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয় বেজিঙের এফডিআই। সংবাদমাধ্যম মানি কন্ট্রোল-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, একটা সময়ে এ দেশের ৩০টি ইউনিকর্ন স্টার্ট আপের (বাজার মূলধন ১০০ কোটি ডলার) মধ্যে ১৮টিতে বিপুল পরিমাণে চিনা লগ্নি প্রত্যক্ষ করা গিয়েছিল। ফলে সুইগি, জ়োম্যাটো, ওলা, পেটিএম, বিগ বাস্কেট বা বাইজ়ু-র মতো সংস্থার পক্ষে দ্রুত ব্যবসা ছড়িয়ে দেওয়া অনেক বেশি সহজ হয়েছে। ঘরোয়া অর্থনীতিতে সেই ছবি ফেরাতে চাইছে মোদী প্রশাসন।

০৭ ১৮

প্রসঙ্গত, গালওয়ান সংঘর্ষের পর ৫৮টি চিনা সংস্থার প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের আর্জি বাতিল করে কেন্দ্র। বিবেচনাধীনে চলে যায় ১৪টি সংস্থার আবেদন। গত পাঁচ-ছ’বছরে ভারতের বাজারে ১০০ কোটি ডলার লগ্নি করতে চেয়েও অনুমোদন পায়নি বেজিঙের বহুজাতিক বৈদ্যুতিন গাড়ি নির্মাণকারী সংস্থা বিওয়াইডি। এই তালিকায় নাম রয়েছে গ্রেট ওয়াল ওয়াটার এবং ফরচুন ফার্মাসিউটিক্যাল্‌সের। এ দেশে ১০০ কোটি এবং ১৩০ কোটি ডলার বিনিয়োগের ইচ্ছা আছে ড্রাগনের ওই দুই সংস্থার।

০৮ ১৮

প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের চরিত্র নিয়ে এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে কেন্দ্রীয় বাজেটের আগে প্রকাশ হওয়া আর্থিক সমীক্ষা রিপোর্টে একটি বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার (আরবিআই) কর্তা-ব্যক্তিদের দাবি, এফডিআইয়ের মূল ভান্ডারে কোনও আঘাত আসেনি। কিন্তু, নানা কারণে খুচরো লগ্নিতে মুনাফা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-সহ পশ্চিমের বিনিয়োগকারীদের সরে পড়তে দেখা যাচ্ছে। এই প্রবণতা শেয়ার বাজারের আর্থিক স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর। তা ছাড়া পণ্য উৎপাদনে দুনিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান পেতে হলে আরও বিদেশি পুঁজির প্রয়োজন রয়েছে।

০৯ ১৮

আরবিআইয়ের পাশাপাশি একই কথা বলতে শোনা গিয়েছে নীতি আয়োগকেও। তাঁরা জানিয়েছে, পশ্চিমি লগ্নিকারীরা ভারতের বাজার থেকে শুধুমাত্র নিজেদের লাভ তুলতে ব্যস্ত থাকেন। কিন্তু, সেখানে চিনের এফডিআই ভাল বিকল্প হতে পারে। কারণ, ভারতের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে যথেষ্ট উৎসাহী বেজিং। আর তাই আগামী দিনে বিবেচনাধীন ড্রাগনের সংস্থাগুলি থেকে পুঁজি টানার রাস্তায় কেন্দ্রকে হাঁটার পরামর্শ দিয়েছে নীতি আয়োগ। যদিও সেটা করতে হবে সীমান্ত সংঘাতকে মাথায় রেখেই।

১০ ১৮

চিনের সঙ্গে বিপুল বাণিজ্যিক ঘাটতি রয়েছে ভারতের। বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বেজিঙের জন্য দরজা খুললে আখেরে লাভ হবে নয়াদিল্লির। তখন ড্রাগনের পুঁজিতে বিভিন্ন কৌশলগত দিকে উৎপাদন বৃদ্ধি করতে পারবে কেন্দ্র। বর্তমানে বিশ্ব জুড়ে বিরল খনিজের সরবরাহশৃঙ্খল মোটের উপর নিয়ন্ত্রণ করছেন মান্দারিনভাষীরা। গালওয়ান-পরবর্তী বছরগুলিকে এর রফতানি বন্ধ করে নয়াদিল্লির রক্তচাপ বাড়িয়েছিলেন চিনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং।

১১ ১৮

কিন্তু আর্থিক বিশ্লেষকদের দাবি, এফডিআইয়ের মাধ্যমে বেজিঙের সংস্থাগুলি ভারতের বাজারে বিপুল লগ্নি করলে বিরল ধাতুর ব্ল্যাকমেলিংয়ের রাস্তা ছাড়তে হবে ড্রাগনকে। কারণ, এর সরবরাহ বন্ধে লোকসানের মুখ পড়বে তারই একাধিক কোম্পানি, যা অবশ্যই এড়াতে চাইবেন প্রেসিডেন্ট শি। আমেরিকা-সহ একাধিক পশ্চিমি দেশ ইতিমধ্যেই পণ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে ‘চিন প্লাস ওয়ান’ নীতি নিয়ে শুরু করেছে। আর সেখানে তাদের ‘অটোমেটিক চয়েস’ হিসাবে সামনে এসেছে নয়াদিল্লি।

১২ ১৮

গত বছরের (পড়ুন ২০২৫ সাল) এপ্রিলে নতুন পারস্পরিক শুল্কনীতি চালু করেন মার্কিন প্রেসি়ডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর জেরে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও ব্রিটেন-সহ মোট ৩৮টি দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি বা এফটিএ (ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট) সেরেছে ভারত। ফলে আগামী দিনে ইউরোপ-সহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের বাজার ধরতে বিপুল পরিমাণে পণ্য উৎপাদন করতে হবে নয়াদিল্লিকে। সেই লক্ষ্যপূরণে চিনা এফডিআই বড় ভূমিকা পালন করতে সহায়ক হবে বলেই মনে করা হচ্ছে।

১৩ ১৮

কেন্দ্রীয় বাণিজ্য ও অর্থ মন্ত্রকের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত এক দশকে সর্বনিম্ন পর্যায়ে চলে এসেছে বেজিঙের প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ। এ দেশে চিনা পুঁজি টানার নেপথ্যে আরও একটি যুক্তি রয়েছে। সম্প্রতি রাইসিনা আলোচনায় নয়াদিল্লির অর্থনীতি নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য করে বসেন মার্কিন বিদেশ দফতরের সহ-সচিব ক্রিস্টোফার ল্যান্ডিউ। তিনি বলেন, ‘‘অতীতে অর্থনৈতিক দিক থেকে চিনকে ছাড় দিয়ে যে ভুল আমেরিকা করেছে, ভারতের ক্ষেত্রে তার পুনরাবৃত্তি করতে চায় না ওয়াশিংটন।’’

১৪ ১৮

ক্রিস্টোফারের করা ওই মন্তব্যের পর দেশ জুড়ে পড়ে যায় হইচই। এমনিতেই ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক বেশ টালমাটাল অবস্থার মধ্যে গিয়ে এগোচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে নয়াদিল্লির আর্থিক শ্রীবৃদ্ধি আটকাতে ওয়াশিংটন যে তৎপর হতে পারে, ল্যান্ডিউর কথায় তা একরকম নিশ্চিত হয়ে গিয়েছে। ফলে বিকল্প হিসাবে অতি সাবধানে চিনের এফডিআই হাতে পেতে চাইছে কেন্দ্রের মোদী সরকার। সেটা যে বৃদ্ধির সূচককে ঊর্ধ্বমুখী রাখতে সাহায্য করবে, তা বলাই বাহুল্য।

১৫ ১৮

বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হতে ইতিমধ্যেই বিদেশের বাজারে লগ্নি শুরু করে দিয়েছেন এ দেশের ধনকুবের শিল্পপতিরা। উদাহরণ হিসাবে মুকেশ অম্বানীর কথা বলা যেতে পারে। এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের ব্রাউন্‌সভিলে একটি তৈল শোধনাগার নির্মাণের কথা ঘোষণা করেছেন ট্রাম্প। সেখানে বিপুল বিনিয়োগ করতে চলেছে মুকেশের সংস্থা রিলায়্যান্স ইন্ডাস্ট্রিজ়। এর জন্য মার্কিন সরকারের সঙ্গে ৩০ হাজার কোটি ডলারের চুক্তি করেছে তারা। ভারতীয় মুদ্রায় সেটা প্রায় ২৭ লক্ষ কোটি টাকা।

১৬ ১৮

তৈল শোধনাগার নির্মাণ প্রকল্পে রিলায়্যান্স এবং মার্কিন সরকারের হওয়া চুক্তিকে ইতিমধ্যেই ঐতিহাসিক বলে উল্লেখ করেছেন ট্রাম্প। নিজের সমাজমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যালে’ এর জন্য মুকেশ অম্বানীকে ব্যক্তিগত ভাবে ধন্যবাদও জানিয়েছেন তিনি। একই রকমের বিনিয়োগ আছে গুজরাতের ধনকুবের শিল্পপতি গৌতম আদানিরও। ভূমধ্যসাগর সংলগ্ন ইজ়রায়েলের হাইফা বন্দরের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে আদানি পোর্টস নামে তাঁর সংস্থা।

১৭ ১৮

নীতি আয়োগ মনে করে, আর্থিক দিক থেকে আরও মজবুত ভিত্তির উপর দাঁড়াতে হলে এই ধরনের বিনিয়োগগুলি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলির ঘরোয়া ব্যবসা মার খেলে চলবে না। আমেরিকা-সহ পশ্চিমি দুনিয়ার এফডিআইয়ের পরিমাণ বেশি হলে সেই ঝুঁকি থাকবে। চিনের ক্ষেত্রে সেই সম্ভাবনা অনেকটাই কম।

১৮ ১৮

গত এক মাসে ৮,৫০০ পয়েন্টের বেশি পড়েছে সেনসেক্স। ৯.৮৬ শতাংশ কমেছে নিফটি-৫০র সূচক। এই পরিস্থিতিতে কেন্দ্রের সিদ্ধান্তে বেজিঙের প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ বাড়লে কতটা চাঙ্গা হবে শেয়ার বাজার? তার উত্তর পেতে অপেক্ষা করতে হবে আরও কয়েক দিন।

ছবি: সংগৃহীত ও এআই সহায়তায় প্রণীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement